ফনেটিক ইউনিজয়
‘সাগরকন্যাকে’ দেখে আসি
আসিফ আহসান

ইট কাঠ পাথরের তৈরী নগরীর মানুষের জন্য প্রকৃতিকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ কম। তাই একটু অবসর পেলেই মানুষ ছুটে যায় কোনো সবুজ ঘাসে, কোনো নদীর পাশে অথবা সমুদ্রের ধারে। বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও এখানে রয়েছে কুয়াকাটার মতো সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত একসাথে দেখা যায়। এটি ‘সাগরকন্যা’ নামেও পরিচিত।  
মূলত, শীতের সময়টাকে বলা হয় ভ্রমণের উৎকৃষ্ট সময়। তাই, অনেকেই সারাবছরের ব্যস্ততার পর এ সময়টুকুর জন্য অপেক্ষায় থাকেন কাছের মানুষদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য। শীতের মৌসুম শুরু হতে এখনও বাকি। তবে এর আগেই বন্ধু সোহেলের কুয়াকাটা দর্শনের প্রস্তাব লুফে নিলাম আমরা চারজন। কোনো আগাম পরিকল্পনা ছাড়াই এক ছুটির দিনে পা বাড়ালাম রাজধানীর সদরঘাটের দিকে। আমাদের গন্তব্য হলো, সাগরকন্যা’কে একনজর কাছ থেকে দেখা। বলে রাখি, কুয়াকাটা দুইভাবে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সরাসরি যায়। বাসে গেলে এটি কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ২০০ মিটার দূরে নামিয়ে দিবে। ঢাকা থেকে কুয়াকাটায় বাসে যেতে সময় লাগে প্রায় ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা। আবার সদরঘাট  থেকে লঞ্চে আগে যেতে হবে পটুয়াখালী। সেখান থেকে বাসে চড়ে সোজা কুয়াকাটা। তবে পরেরটি বেশ আরামদায়ক ভ্রমণ।
যাইহোক, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনেটে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া সুন্দরবন-৯ লঞ্চে চড়ে আমাদের যাওয়া কথা। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আমরা পৌঁছে যাই সদরঘাটে। ১৬০০ টাকার বিনিময়ে ডাবল কেবিন আগে থেকেই ভাড়া করা ছিলো আমাদের। আমরা উঠে গেলাম লঞ্চে। কিন্তু একি! প্রবাল যে এখনও আসেনি ঘাটে। লঞ্চও ছাড়ার সময় হয়ে আসছে। মনে মনে ভাবলাম, প্রবালকে ছেড়েই আমাদের যেতে হবে না তো? সোহেল অবশ্য মোবাইলের মাধ্যমে ওর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে। জানতে পারলাম প্রবাল ঘাটের পাশেই আছে, তবে জ্যামে আটকা। তাই একটু দেরি হচ্ছে। লঞ্চ ছাড়ার সময়ই সে হাজির। আমরা বেশ জোরেশোরে ওয়েলকাম জানালাম প্রবালকে। আমাদের লঞ্চ ছুটে চললো।  
এতোক্ষণে টের পেলাম ক্ষুধায় জ্বালায় আমাদের করুণ অবস্থা। তবে চিন্তার কিছু ছিলো না। কারণ, প্রত্যেকের ব্যাগেই ছিল হালকা খাবার। এ পর্যায়ে আমরা হালকা নাস্তা সেরে খোশ গল্পে মেতে উঠলাম। এভাবেই চলতে থাকলো। কখনও কার্ড খেলা, কখনও চা আর কফির কাপে চুমুক, কখনও নদীর বুকে বড় লঞ্চে চড়ে পূর্ণিমার আলো উপভোগ করা। এরইমধ্যে আবার শান্তকে একটু সময় ঘুমিয়ে নিতেও দেখা গেল। এভাবে ভোরের আলোকে ভেদ করে সকাল ৬ টায় সুন্দরবন-৯ ভিড়লো পটুয়াখালীতে। লঞ্চ থেকে আমরা নেমে পড়লাম। এখানে ভালো কোনো খাবারের  দোকান নেই। তাই একটি অটো ভাড়া করে বাস স্ট্যান্ডে চলে আসলাম। তবে এর আগে চৌরাস্তা নামক জায়গায় নেমে নাস্তা পর্ব সারলাম। এরপর কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড থেকে ১৫০ টাকার বিনিময়ে টিকিটি নিয়ে আমরা বাসে উঠে পড়লাম।
পটুয়াখালী থেকে কলাপাড়া পর্যন্ত রাস্তা অসাধারণ। এরপর কলাপাড়া পার হওয়ার পর থেকে আমাদের জান পানি করা মিশনের শুরু হলো। হেলে-দুলে আর  ঝাঁকি খেতে খেতে ঘণ্টা তিনেক পর আমরা কুয়াকাটা পৌঁছালাম। আগে থেকেই হোটেল বুক করা ছিল। তাই হোটেলে একটু বিশ্রাম শেষে আমরা বেরিয়ে পড়লাম সাইটভিউ করতে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত মাত্র ২০ কিলোমিটার লম্বা। রাস্তা থেকে সৈকতে এসে নামলে ডানে পড়ে লেবুচর ও ফাতরার বন এবং বামে গঙ্গামায়ার চর। ছোট এই সৈকতে তেমন কোনো আভিজাত্য বা চাকচিক্য নেই। দেখে মনে হয়, প্রকৃতির নিজের হাতে সাজানো কোনো ছবি। একদিকে চোখ রাখলে কেবল জলরাশি আর অন্যদিকে নারিকেল গাছের সারি। তবে নজর কাড়বে সূর্যাস্ত। এ সময় রক্তলাল সূর্যের আলো নারিকেল গাছের চিরিচিরি পাতার ফাঁক দিয়ে ঢুকে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

আরও রয়েছে
কুয়াকাটার খুুব নিকটেই অবস্থিত মিস্ত্রিপাড়া। এখানে রয়েছে সেই বৌদ্ধ মন্দির যেখানে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার একটি বুদ্ধমূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। এর পাশে রয়েছে পবিত্র কুয়া। তবে এ দু’টির সাথে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো রাখাইন পল্লী। রাখাইন উপজাতিদের আবাসস্থল এখানে। এখানকার মেয়েদের হাতে বুনানো কাপড় পর্যটকদের নিঃসন্দেহে প্রলুব্ধ করে সেগুলো কিনতে।
রাখাইন পল্লীর পাশেই রয়েছে জেলে পল্লী। এখানে অনেক সুলভমূল্যে মাছ বা শুঁটকি পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানকার জেলেদের জীবন রোমাঞ্চে ভরপুর। তাই অল্প সময়ের জন্য হলেও  কিছু অভিজ্ঞতা নিতে পারলে হয়তো এটিই হতে পারে আপনার জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।

Disconnect