ফনেটিক ইউনিজয়
শীতকালের সাত-সতের
শারমিন সেতু

শীতকাল এসেছে তবে শীতের বুড়ির দেখা এ বছর এখনও মেলেনি ঢাকায়।        লেপ-কাঁথা হয়তো তুলে রাখা আছে এখনো। অবশ্য শহরে এখনও শীত ধরা না দিলেও গ্রামে শীতের আগমন ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ফসলের মাঠ-বনবাদাড়,        লতা-পাতায়-দুর্বাঘাসে সকালের শিশির জমছে। চারিদিক কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে। বিকেল হলেই বদলে যাচ্ছে তাপমাত্রা। শীতের পরশ লাগছে শরীরে। নগরে-গ্রামে-বন্দরে পিঠা-পুলির আয়োজনও চলছে বেশ। নবান্নতে মেতে উঠেছেন সকলে। তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও এ সময়ে শরীরের যত্ন নেয়ার আলাদা তাগিদ অনুভব করছেন। শীতকে স্বাগত জানাতে বাড়তি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন মানুষজন।

শীতের পোশাক
শীতকালে আমাদের পোশাক, ফ্যাশনেও আসে অনেক পরিবর্তন। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ এ সময় আশ্রয় খোঁজে গরম পোশাকে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলো থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকানগুলোতে শীতের পোশাক শোভা পাচ্ছে। কম্বল, জ্যাকেট, সোয়েটার, শালসহ নানাধরনের শীতের পোশাকের বেচাকেনায় জমে উঠেছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। ফুলেল নকশায় তৈরি বম্বার জ্যাকেট, তার সঙ্গে চেকের প্যান্ট। এটাই এই শীতের হটকেক। আবার আগাগোড়া  চেকের জ্যাকেটও এসেছে বাজারে। তার সঙ্গে ট্রাউজার হতে পারে একরঙা। সোয়েটার এখনও জনপ্রিয়। তবে বদলে গেছে তার ধরন। সোয়েটারের আঁটসাঁট গলায় বদল এনেছে হুডি। দেখতেও লাগছে স্মার্ট। তবে ছেলে-মেয়েদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে শালও।  

শীতে শরীরের যত্ন
কম-বেশি সকলেরই জানা যে, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে শীতের সময় আমাদের শরীরে বাড়তি যতেœর প্রয়োজন হয়। রোজানা মেকওভার এর বিউটিশিয়ান লতা ইয়াকুব জানান, শীতের সময় চুলে খুশকির উপদ্রব বেড়ে যায়। তাই খুশকিমুক্ত থাকতে নিয়মিত সপ্তাহে দুইদিন কিটোকোনাজল শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন। আবার হাতের তালু ও পায়ের তলার যত্ন নিতে গ্লিসারিন ও ভ্যাসলিন লাগালে হাতের তালু অনেকটা মসৃণ হয়ে আসে। পাশাপাশি পায়ের তলা ফেটে যাওয়া রোধ হয়। এ সময় মুখের যত্নে ভালো ময়েশ্চারাইজারযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। যাদের ব্রণের সমস্যা আছে, তারা ক্রিমের সঙ্গে একটু পানি মিশিয়ে নিতে পারেন। শীত আসছে বলে ভাববেন না যে সানস্ক্রিন ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। শীতকালেও বাইরে বের হওয়ার ৩০ মিনিট আগে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। শুধু বাইরের দিক থেকে রুক্ষতা প্রতিরোধ করাই নয়, নিজেকে ভিতর থেকে সজীব ও সতেজ রাখার জন্য প্রচুর পানি পান করা দরকার। এমনিতে বেশি পানি খাওয়ার যে উপকারিতা তার কোনো বিকল্প নেই। পর্যাপ্ত পানি শীতে ত্বক তো বটেই, সারা শরীরে সুস্থতার জন্যই কাজ দেবে।

শীতের পিঠা-পুলি
বাঙালির শখের খাদ্য তালিকায় শীর্ষে পিঠা-পুলির অবস্থান। শুধু স্বাদে নয়, এগুলো সংস্কৃতিরও ধারক। পিঠার খাজে খাজে ফুটে ওঠে নিবিড় শিল্প নৈপুণ্য, নামেও থাকে নানান বাহার! পাটিসাপটা, দুধপুলি, ভাজাকলি, নারিকেলী, ভাপা, চিতই, নকশী পিঠা ইত্যাদি। খেজুর রসে ভেজানো পিঠা কার রসনাকে না উসকে দেয়! বিশেষ করে ভাপাপিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায় এ সময়। আতপ চালের গুঁড়ো, গুড় ও নারকেল মিশিয়ে তৈরি করা হয় ভাপাপিঠা। রসের সঙ্গে দুধ মিশিয়ে বানানো হয় রসের পিঠা। এছাড়া দুধচিতই, বড়াপিঠা, ক্ষীরপুলি, চন্দ্রপুলি প্রভৃতি পিঠারও বেশ প্রচলন রয়েছে। বাঙালির খাদ্য রুচিকে বাস্তবিকই একটি স্বতন্ত্র্য রূপ দিয়েছে শীতকালের খেজুরের রস। শহরে খুব একটা না পাওয়া গেলেও গ্রাসে-গঞ্জে এখন ভোরবেলা অনেকেই এ রসের আশায় বসে থাকে। তবে পিঠার উৎসবে জমে উঠে বাংলার গ্রাম ও নগর দু’টোই।

শাক-সবজির প্রাচুর্য
আমাদের দেশে শীতকালে গ্রামের বিস্তীর্ণ জমিতে শীতকালীন শাক-সবজির ক্ষেতের দৃশ্য চোখে পড়ে। বছরের অন্যান্য সময় বাজারে টাটকা সবজি কম পাওয়া গেলেও শীতকালে বাজারে প্রচুর পরিমাণ শাক-সবজি পাওয়া যায়। এ সময় ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, গাজর, সিম, ঢেঁড়স, বেগুন, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, করলা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, আলু, বরবটিসহ শীতকালীন সবজিতে ভরপুর থাকে বাজার। পালং শাক, মুলা শাক, লাল শাকসহ নানা জাতের টাটকা শাকও পাওয়া যায় বাজারে। এ সময় বাজার রঙিন হয়ে ওঠে ফ্রেশ শাক-সবজিতে।

শীতে ফুলের বাহার
প্রকৃতিতে এখন চলছে শীতের আমেজ। শিশিরভেজা এই সময়ে প্রকৃতিতে সৌরভ ছড়ায় শীতের ফুল। শীত মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে গোলাপ আর গাঁদা ফুলের চাষ হয়। তবে শীতের সকালে শিউলী ফুল যে মায়াবী সৌন্দর্য নিয়ে আসে তা উপভোগ করতে সবাই যেন মুখিয়ে থাকে। নানা রং আর গন্ধের ফুলে যেন রঙিন হয়ে ওঠে সর্বত্র। ফুলের দোকানগুলোতে নানা ধরনের ফুলের ক্রেতাও যেন বাড়ে এ সময়ে। এর মধ্যে রয়েছে মল্লিকা, ডালিয়া, নয়নতারা, মাধবীলতা, রঙ্গন, অলোকানন্দ, দোপাটি ইত্যাদি।

Disconnect