ফনেটিক ইউনিজয়
উকিলের মনচোর
ওয়াহিদ সুজন

পারিবারিক নাম আব্দুল হক আকন্দ। বাংলার গীতিকবিতার জগতে তিনি উকিল মুন্সী নামেই পরিচিত। নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১১ জুন জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝিতে স্ত্রী হামিদা খাতুন এবং কয়েক মাস পর ছেলে গীতিকবি সাত্তার মারা যান। এরপর উকিল মুন্সী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ১৩১তম জন্মবার্ষিকীতে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর শ্রদ্ধাঞ্জলি
‘ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে, সোনার জালালপুর। সেখানেতে বসত করে, উকিলের মনচোর।’ লাইন কয়টি গীতিকবি ও সাধক উকিল মুন্সীর নামে প্রচারিত। কিন্তু উকিলের একমাত্র সংকলনে (সংগ্রহ, সম্পাদনা : মাহবুব কবির) এ গানের কোনো উল্লেখ নেই।
তরুণ বয়সে উকিল মুন্সী বেড়াতে আসেন মোহনগঞ্জ থানার জালালপুর গ্রামে চাচা কাজী আলিম উদ্দিনের বাড়িতে। ধনু নদী পার হতে গিয়ে ওই গ্রামের লবু হোসেনের মেয়ে ‘লাবুশের মা’র (হামিদা খাতুন) প্রেমে পড়েন। সে কথা এ গানে লেখেন বলে প্রচার আছে। প্রেমের কথা জানাজানি হলে কাজী পরিবার বাধা দেয়। কারণ হামিদার বাবা সাধারণ কৃষক। অভিমানে কিছুদিন আশপাশের শ্যামপুর, পাগলাজোড়, জৈনপুরে পাগলের মতো ঘোরাঘুরি করেন। ১৯১৫ সালে জালালপুর  থেকে কয়েক মাইল দূরে মোহনগঞ্জের বরান্তর গ্রামের মসজিদে ইমামতি ও আরবি পড়ানোর কাজে যোগ দেন। ইমামতির পাশাপাশি সারা রাত স্বরচিত গজল গেয়ে সময় কাটান। এমন বিরহকালে ১৯১৬ সালে হামিদা খাতুনের আগ্রহে বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বাবার মৃত্যু, মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের কারণে ছোটবেলা থেকেই ছন্নছাড়া উকিল মুন্সী। হামিদাকে প্রথম দেখায় ভালোবাসেন, পরে ঘর বাঁধেন। এ প্রেম তাঁর গানে সরাসরি ধরা পড়েনি। রস পেয়েছে আত্মা-পরমাত্মার  প্রেমে। একের অনুভূতি হয়েও ধরা পড়ে এককের প্রতি আকুলতা। বাংলার প্রচলিত ধারা অনুযায়ী সে ভাবের কথা বলেছেন গানে। উকিলের গানে কৃষ্ণ-রাধার রূপক আর ভাব পাওয়া যায়। বাংলা গানে নদিয়ার ভাবধারা নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। পাশাপাশি ঘাটুগানের দলে উকিল বেশ কয়েক বছর ছিলেন। ফলত বিরহের মর্ম ও তার প্রকাশ জানা ছিল ঢের।
 সে রীতি অনুসারে তার গানে কথা বলছে নারী। অর্থাৎ রাধা হয়ে কৃষ্ণের আকুলতা। সবখানেই আমরা কৃষ্ণের জন্য রাধার প্রতিক্ষা দেখি। এর উল্টোটা বিরল। অথবা উকিলের পার্থিব মনচোরের কোথায়? তা নেই! বৃহত্তর অর্থে, পুরুষ আকারে কৃষ্ণের সঙ্গে নিজের তুলনা আছে। হ্যাঁ, প্রেমের কারণে। সচরাচর এ ধরনের গানে পরমাত্মার বিরহ চোখে পড়ে না। এখানে দুটি গানের উল্লেখ করা যায়, যেখানে সরাসরি কৃষ্ণর বিরহ ঠাঁই পেয়েছে। তার সঙ্গে উকিল জুড়ে দিয়েছেন নিজের বিরহ। উকিলের ভেতর ধরা পড়েছেন কৃষ্ণ!
‘মন কেন আজ কেন্দে কেন্দে ওঠে রে ভাই রে নিতাই, কার কারণে বাঁশি হাতে তারে কোথায় পাই রে। গোকুল মাঠে ধেনু চরাই ডাকি সর্বদাই, কোথায় আমার চূড়া-ধরা প্রেমময়ী রাই রে।’
একই গানের শেষদিকে বলছেন, ‘আমার রাই বিরহে আঁখি ঝরে, তনু মন হইল অঙ্গার রে, হায় উকিল কান্দে বন্ধের লাগি, যেমন শ্যাম কান্দে বলে রাই রাই রে।’
গানটা বেশ মজার। উকিল নিজের সঙ্গে কৃষ্ণের ভাবের তুলনা করছেন। রাধা যেমন নিজের অপূর্ণতাকে পূর্ণ করে তোলার জন্য কৃষ্ণের বিরহে কাতর। অন্যদিকে, কৃষ্ণের কৃষ্ণভাব জাগে না যদি না রাই আসে। উকিলের কান্নাও তেমন।
অন্যটি গান এমন ‘আমি রাই বিনে কারে করি স্মরণ, রে ভাই সুবল, আমার হাঁটিতে চরণ চলে না গো, হয়েছি দুর্বল।’ একই গানে আরও বলছেন, ‘আমি যেদিকে যাই রাধারে পাই, রাধা নামে বেণু বাজাই, তার বিরহে উকিল হইল কাঙাল।’
রাধাই শুধু কৃষ্ণের বিভ্রমের ভোগে না। কৃষ্ণকে কৃষ্ণরূপে মূর্ত হতে রাধা লাগে। এ অপূর্ণতার কারণে কৃষ্ণ নিজেও বিরহী। অথবা বিরহের মর্ম না বুঝে কৃষ্ণ হয়ে ওঠে না। জগৎ সত্যের যে রূপ তা একের প্রেমে চলে না। বিরহের ভাব তাই একের জন্য হলে চলে না। নইলে কৃষ্ণ নিজেই স্বরূপে ধরা দেয় না। নিজেকে বুঝতে পারে না বলে! অন্য অনেক গীতিকবির মতো উকিল রাধার যন্ত্রণার বোঝার আকুতি করেছেন কৃষ্ণের কাছে। কৃষ্ণ যেন রাধা হয়ে ধরা দেয়। আর যখন কৃষ্ণ স্বরূপে রাধার বিরহে কাটান তাও উকিল বুঝতে পারেন। যার সাধনা করে তার যন্ত্রণা বুঝতে না পারলে প্রেমিক কার সাধনা করে!

Disconnect