ফনেটিক ইউনিজয়
খুনের গল্প
অথির চক্রবর্তী

রউফ আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল! চোখ কপালে উঠে গেছে। মনে হলো ‘বোবা’ ধরেছে তাকে। শরীরটাও কাঁপছে! ভয়ে শীতল হয়ে যাওয়া চোখ। অথচ এই রউফ ঠিক কতগুলো খুন করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিটা খুনের পর সে খুন হওয়া ব্যক্তির নামটা মোটা একটা খাতায় লিখে রাখে, নিচে থাকে পেমেন্টের হিসাব-নিকাশ। অনেকটা বাজার খরচের মতো। কত নগদ আর কত রইল বাকি।
আজকেই আমাকেই খুন করার কথা ছিল এবং সবকিছু নির্ঞ্ঝাটভাবেই সম্পন্ন হয়ে যাওয়ারও কথা! যদি না সেই লোকটির আগমন ঘটত।
একটু ভূমিকা দিই।
ঘটনার আগের দিন বেশ গল্পগুজবে মুখর ছিল আমার দিন। দুপুরে ভাতও খাইয়েছিলাম এখানে খুনি বলে উল্লিখিত রউফকে। রুই মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে তার হাত ও মুখ সচল হয়ে উঠছিল ঘন ঘন। আর কখন যেন রউফ আমার দিকে তাকিয়েছিল বিশেষভাবে, বুঝলাম কৃতজ্ঞতায় তার চোখ বুজে আসছিল।
হোটেলে বেশ মোটা একটা বিল হয়ে গেল সব মিলিয়ে। ভাংতি যেটা ফেরত এল, বয়কে ধরিয়ে দিয়ে আমি ঠিক হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ফস করে একটা সিগারেট জ্বালালাম। ওদিকটা একটু অন্ধকার ছিল। দেশলাইয়ের ঘর্ষণে যেটুকু আলো জ্বলে উঠল, সে আলোতে রউফের মুখটা দেখে আমার করুণাই হলো। সে তখন কাঁচুমাচু করে মাথার পেছনে হাত নিয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। আমি তখন তাকে বললাম, টাকা লাগবে? সে বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, হায়াত ভাই, আজ বউয়ের জন্মদিন। কোনো দিন কিছু দিতে পারিনি!
আমি তখন দুই হাজার টাকার দুটো নোট তার হাতে দিয়ে বললাম, বউয়ের জন্য গিফট নিয়ে যেয়ো। রউফের ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি লক্ষ করলাম। হ্যাঁ, আমি যে রউফকে চিনি, এ সেই রউফই। তার হাসির মর্মোদ্ধার সে মুহূর্তে আমার সম্ভব হয়নি!
এখানে রউফের ব্যাপারে আরেকটু বলে রাখি, সে আমার অফিস থেকে ডিসচার্জ হয়েছে অনেক দিন। অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করত। ডিসচার্জ হওয়ার পরও আমার সঙ্গে যোগাযোগটা থেকে গিয়েছিল। আমার দুপুরের লাঞ্চটা বরাবর সেই এনে দিত। চাকরি যাওয়ার পরেও কিছুদিন এনে দিয়েছে। সে হিসাবে বকশিশটা আমি কখনো হাতে গুঁজে দিয়েছি। কখনো পকেটে। অন্য সহকারীর চেয়ে ওর বকশিশটা আমি একটু বেশিই দিয়ে এসেছি। বেচারা এত বিশ্বস্ত! আর মান্যও করে আমাকে ঠিক পীর-কামেলের মতো। সে হিসাবে বকশিশ একটু কম হয়ে গেলে নিজের মনের ভেতরটাই খচখচ করে!
ঘটনাটা ঘটেছিল যেভাবে, সে বর্ণনায় যাই। ঠিক সন্ধ্যার পর পর রউফের ফোন পেলাম। সেদিন ছিল আবার আমার ডে অফ। রউফ বিশেষ কী দরকারে আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। ফোনে বলতে পারবে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি যখন সোহরাওয়ার্দীর গেটে ঢুকি, ঠিক আমার মতোই লম্বায় পাঁচ ফুট সাত, একটু মেদবহুল একটা লোককে ঢুকতে দেখলাম। অন্ধকারে ঠিক মুখও দেখা যাচ্ছিল না ভালোমতো। তবে কেন জানি মনে হলো আমি আমাকেই দেখলাম যেন! লোকটি ঢুকতে গিয়ে তার কনুই বাধিয়ে দিল আমার চোখের ঠিক নিচের দিকে, সঙ্গে সঙ্গে ফুলে উঠল জায়গাটা। আমি প্রতিবাদ করার সময়টাও পেলাম না।
মুহূর্তের মধ্যেই মনে হলো শূন্যে মিলিয়ে গেছে সে লোক। সে কি আমার মতোই কোনো করপোরেট হাউসে জব করে? আমার চেহারার সঙ্গে কি তার সত্যি মিল? ঠোঁটের ওপর গোঁফ? তার কণ্ঠও কি আমারই মতো। তাকেও কি এই সময় কেউ ফোন দিয়ে উদ্যানে ডেকেছে?
আমি হঠাৎ মানুষ জবাই হওয়ার বীভৎস চিৎকার শুনতে পেলাম। ঘটনা কী বোঝার জন্য লুকিয়ে পড়লাম। একটা গাছের আড়াল বেছে নিলাম। আরও কয়েকটা আওয়াজ পরপর। তারপর আর কোনো শব্দ নেই। দেশলাইয়ের আলোয় কালো কাপড়ে ঢাকা একটি মুখ দেখা গেল। তবে ঠিক স্পষ্ট হলো না কার মুখ এটি। খোলা ঠোঁটে সিগারেট টানায় একরকম হিংস্রতা আছে লক্ষ করলাম। গেটে দেখা হওয়া লোকটি কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে সরে না পড়লে ওইখানে হয়তো পড়ে থাকত আমারই রক্তাক্ত লাশ, কে জানে! আমি পার্কে ঢোকার পর থেকেই রউফের ফোন বন্ধ পাচ্ছি। শীতের মধ্যেও বুঝতে পারছি ঘেমে পিঠের সঙ্গে শার্ট লেপ্টে গেছে। কপাল থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির মতো ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। হায় খোদা, এ কী দেখলাম! পেটেও পাক দিয়ে উঠেছে। হঠাৎ মনে হলো আমার তো কিছু হয়নি। খুন হয়েছে আরেকজন। আমি আস্তে আস্তে ঘটনাটা ঠিক যেখানে ঘটেছিল বা ঘটে থাকতে পারে, ওদিক দিয়ে আগাই।
নাহ্ ওখানে লাশ-টাশ কিছু নেই। এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে জায়গাটাকে। হঠাৎ পায়ে কী যেন একটা বাধল, আমি একটু ঝুঁকে জিনিসটা হাতে নিলাম। আরে, এ দেখি আমার ব্যবহার করা লাইটার! কদিন আগে যেটা আমি রউফকে দিয়ে দিয়েছিলাম!
রউফের ব্যাপারে আমি কদিন এখানে সেখানে খোঁজখবর নিলাম। সে একজন প্রফেশনাল কিলার। থানায় ওর নামে অনেকগুলো মামলা ঝুলছে। আর যে কিনা ছিল আমার এত দিনের বিশ্বস্ত সহচর!
আমি পকেট থেকে লাইটারটা বের করলাম এবং রউফের হাতে দিয়ে বললাম, আজ আমার সামনেই একটা সিগারেট খাও। অবাক হচ্ছ আমাকে দেখে? তুমি মনে হয় ঘটনাগুলো ঘটানোর সময় কারও মুখ দেখো না! তবে হ্যাঁ, শুনেছি আমার মতোই দেখতে আরেকটা লোক ছিল এ শহরে। তার সঙ্গে আমার আর কখনোই দেখা হবে না!

Disconnect