ফনেটিক ইউনিজয়
আরিফুর রহমানের চিত্রকর্ম
মাসুদ রানা

মানুষের চোখের তারায় হরহামেশাই বন্দি হয় নানা দৃশ্য। আবার তা মুছেও যায়। তবে এমন কিছু দৃশ্য আছে, যা ব্যক্তি হৃদয়কে আলোড়িত করে। আর তা হয়তোবা আজীবন চিরসজীব হয়ে থাকে ব্যক্তির স্মৃতিপটে। তবে মনের ফ্রেমে আঁকা চিত্র একান্তই নিজের। অন্য কারও সঙ্গে এই চিত্রের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, কষ্ট, ঘৃণা, ভালোবাসা, আবেগ-অনুভূতি ভাগ করা যায় না। কারণ, সে চিত্র কাউকে দেখানো যায় না। তবে শিল্পীরা কি ব্যক্তিমনের ছবিই আঁকেন? এ নিয়ে সাধারণ মানুষ চির কৌতূহলী।
চিত্র যেমন ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে তেমনি মানুষের আবেগ-অনুভূতিও জাগ্রত করে। এমনকি মানুষের চিন্তাচেতনা, বোধবুদ্ধিকেও পাল্টে দিতে পারে। তবে এমন কোনো বস্তু, ঘটনা বা কাহিনি, যা ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক বা মানবীয় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এমন চিত্র ক্যানভাসে ধারণ করার জন্য চাই অনুসন্ধিৎসু, সৌন্দর্যপিপাসু ও সৃজনশীল চোখ ও মন। আর এসব যার মধ্যে আছে, তিনিই কেবল হয়ে ওঠেন চিত্রশিল্পী। মন্ট্রিয়লে বসবাসরত চিত্রশিল্পী আরিফুর রহমানের চিত্রকর্ম দেখে ওপরের কথাগুলো বারবার মনে পড়ে।
১৯৭৪ সালে নারায়ণগঞ্জে জন্মগ্রহণকারী আরিফুর রহমান স্নাতক ডিগ্রিধারী। ছোটবেলা থেকেই খুব আগ্রহ ছিল আর্ট বিষয়ে। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না তাকে আর্ট স্কুলে কিংবা কলেজে ভর্তি করার। কিন্তু হাল ছাড়েননি।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, যখন আমি কলেজের ছাত্র তখন ভর্তি হই এমন একটি প্রাইভেট আর্ট স্কুলে, সেখানে ছবি আঁকা শেখার পর সামান্য আয় করতে শুরু করলাম ছবি এঁকে। কিন্তু আমার সরকারি চাকরিজীবী বাবা এবং আমার ভাইয়েরা চাইতেন আমি যেন বাবার চাকরিটা করি। কিন্তু এসবে মন বসত না। আমার মধ্যে সব সময় কাজ করতÑচিত্রশিল্পী হব। তাই একসময় ঠিক করলাম, চিত্রকলার ওপর উচ্চশিক্ষা নিতে হবে। কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না ঢাকায় গিয়ে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার। তাই স্থানীয় আর্ট স্কুলের শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে আমরা ১২ জন ছাত্র মিলে শুরু করলাম কোচিং সেন্টারের মতো করে আর্ট স্কুল। সেই শিক্ষক আমাদের যতœ সহকারে আর্ট শেখান। আমরা ১২ জনে মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম একটা প্রতিষ্ঠান করব। সে জন্য জায়গা দরকার। প্রাথমিকভাবে আমরা শ্রমকল্যাণ সংস্থার একটি অফিস ব্যবহার করলাম ক্লাসরুম হিসেবে। দুই বছর পর ১৯৯৪ সালে আমরা ১২ জন মিলে ঠিক করলাম প্রদর্শনী আয়োজনের। একেকজনের ৪টি করে ছবিসহ ৪৮টি ছবি নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো প্রবাসী বাঙালি শিশুদের বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচয় করার প্রয়াস হিসেবে।
এ প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল তহবিল সংগ্রহ, যা আমাদের স্বপ্নের কলেজ নির্মাণে ব্যয় হবে। আমাদের প্রদর্শনীতে অনেক গুণীজন উপস্থিত হলেন। তাঁদের কাছে আমরা আমাদের কলেজ নির্মাণের কথা বলি। তাঁরা সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে জানালেন। আমরা সেই ১২ জন ছাত্র আমাদের নিজ নিজ পরিবারে আমাদের একটি করে চিত্রকর্ম বিক্রি করি এক হাজার টাকা করে। বারো হাজার টাকা দিয়ে আমাদের কলেজের যাত্রা হয়। এতদিন পর আজও আমার মনে পড়ছে সেদিনের কথা। আমার বন্ধুরা ১০ টাকা দিলে আমি ২০টা ইট কিনতাম। এভাবে ইট জমাতাম স্বপ্নের ভবন তৈরি করার জন্য। নারায়ণগঞ্জের মানুষরা যে যেভাবে পেরেছেন সহযোগিতা করেছেন, তাই চারুকলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।
২০১০ সালে কানাডায় আসার আগে ২০০৩ সালে ‘শিশু চারু নিকেতন’ নামে একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। শিশুদের মেধা-মনন বিকাশে আর্ট বিশাল অবদান রাখে। মন্ট্রিয়লে প্রায়ই গ্রুপ প্রদর্শনীতে অংশ নিই মূলধারার শিল্পীদের সঙ্গে। বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনীর পাশাপাশি আমার চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয় জাপানের চুয়া আর্ট গ্যালারি, লন্ডনের স্টুডিও ৯৫-তে। এ ছাড়া লিবারেল পার্টি নেতা জাস্টিন ট্রুডোর অফিসে আমার চিত্রকর্ম শোভা পাচ্ছে।

Disconnect