ফনেটিক ইউনিজয়
বই আলোচনা
‘বধূ কোন আলো’ : পাঠ প্রতিক্রিয়া

রকমারির কল্যাণে বিজয় প্রকাশ থেকে প্রকাশিত মোস্তফা সোহেলের নতুন উপন্যাস বধূ কোন আলো সম্প্রতি  পড়লাম। লেখক এত সহজ করে মধ্যবিত্ত জীবনযাপন, যাপিত স্বপ্ন আর সম্ভাবনার কথা বলেছেন যে নিমেষেই মুগ্ধ হয়েছি। উপন্যাসটি ভালো লাগার কারণ হলো, খুব সহজ ও সাবলীল গদ্য, কাহিনির গতিময়তা, মধ্যবিত্তদের জীবনযাপন আর বিচিত্র সব বয়সের মানুষের অভিজ্ঞতার সম্মিলন। একটু বিস্তৃতভাবে বললে, একজন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার মধ্য-বয়সেও এসে একজন সিনেমার নায়িকার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠা এবং কার্যত সেই প্রক্রিয়া থেকে জীবনকে আবার নতুন করে খুঁটিয়ে দেখার প্রবণতা বেশ অবাক করেছে।
অন্যদিকে, একজন নায়িকা সাধারণ মানুষের ভালোবাসাকে চাইলেও যে ট্রান্সফর্ম করতে পারেন না, কিংবা সামাজিকভাবে সেও যে কখনো কখনো সাধারণ চেতনার বাইরেও নিজেকে প্রোথিত করতে পারেন নাÑতার একটি প্রেক্ষিত বর্ণিত হয়েছে খুব চমৎকারভাবে।  একদম শেষ পর্যায়ে এসে সিনেমার নায়িকার মধ্যেই এক স্বপ্নের আলো দেখতে পেলেন ভদ্রলোক।
সেই আলোই বধূর চোখের স্বপ্নের আলো। যে আলো কখনো ম্লান হয় না কোনো দিন। এই সুন্দর এক সত্যকে নিয়ে বোধ করি বধূ কোন আলো উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। এখানে মানুষের আচরণগত দিকগুলো, মোরাল, এথিকস, সামাজিক দায়, তার চরিত্রের ডিনামিক্স খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মোস্তফা সোহেলের লেখা উপন্যাসগুলো প্রকাশিত হতে থাকে আরও বছর পাঁচেক আগে থেকে। তবে মূলত প্রেমনির্ভর এই লেখকের লেখার ভিন্নতা, স্টাইল, ম্যানারÑএসবই পাল্টে গেছে বধূ কোন আলো উপন্যাসে। এত চমৎকার বর্ণনা, বিন্যাস, চরিত্রের উপস্থিতি-সবকিছুই বেশ প্রাসঙ্গিক। গল্পটি এ রকম : চলচ্চিত্রজগতের শীর্ষ নায়িকা সাবরিনা। শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার জন্য বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয় তাকে। আবার কারও সঙ্গে অন্য রকম সম্পর্ক। অন্যদিকে, ষাট বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মোহসীন সাহেব ও তার সাংবাদিক ছেলের সঙ্গে ঘটনাক্রমে সাবরিনার পরিচয় ঘটে। চলচ্চিত্রের শীর্ষ এক নায়িকার জীবনের সংগতি, অসংগতি আর সামাজিক টানাপোড়েনের টুকরো টুকরো চিত্র নিয়ে বধূ কোন আলো উপন্যাস।
আসলে বাংলা উপন্যাস নতুন মাত্রা লাভ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত ও কমলকুমার মজুমদারের হাতে। এদের হাতে উপন্যাস বড় মাপের পরিবর্তে মানবিক অস্তিত্বের নানা দিকের ওপর আলোকপাত করে বিকশিত হয়। বস্তুত রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্ভবত সবচেয়ে কুশলী উপন্যাসশিল্পী। এরপরই আমরা দেখতে পাই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এঁরা উপন্যাসকে মানবিক অস্তিত্বে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক জটিলতার ওপর নিবিড় আলোকপাত করেছেন! লেখনীশৈলীর জোরে উপন্যাসকে সাধারণ পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন এবং একই সঙ্গে উপন্যাসের শিল্পশৈলীতে এনেছেন গদ্যের দারুণ এক সক্ষমতা।
তবে উপন্যাস এখন শুধু কাহিনিনির্ভর নয়, একদিকে যেমন যুক্তি, ভাষা, সময়কে নির্দেশ করে, অন্যদিকে সে নানা ধরনের চরিত্র আবিষ্কারে মত্ত থাকে। এ এক অদ্ভুত খেলা। সেই খেলাটা দক্ষভাবে খেলতে পারাটাই সক্ষমতা। মোস্তফা সোহেল সেই লক্ষ্যেই আছেন-পরিষ্কার বোঝা যায়।
-আসাদ মিজান

Disconnect