ফনেটিক ইউনিজয়
আবিদ আজাদের কবিতা
রাকিবুল রকি

‘চায়ের দোকানে ওরা কারা আড্ডায়?/ -ঐ বসে আছে আবিদ শিহাবও যে।/ ওদের দশক জানা আছে তোমাদের?/ -কেন জানব না, ওরা সব সত্তর।’ (আবদুল মান্নান সৈয়দ, ‘দশকের পর দশক’)
সত্তরের কালপর্বে কবিতার মায়াবী ভুবনে আবিদ আজাদের (১৯৫২-২০০৫) আবির্ভাব। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঘাসের ঘটনা (১৯৭৬) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তরুণতম কবি হিসেবে পাঠক ও বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। ষাটের দশকের সংগ্রাম, সংঘাত, আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সত্তরের কবিদের মানস গঠনে ক্রিয়াশীল ছিল। তাই স্বভাবতই তাদের কণ্ঠস্বর ছিল উচ্চগ্রামে বাঁধা। অন্যদিকে, আবিদ আজাদের কবিতা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, গীতিময়, নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত। কণ্ঠস্বর স্বভাবতই ছিল নমিত। আবিদ আজাদের কবিতার ভূম-ল গড়ে উঠেছে শৈশবে দেখা বাংলার সবুজ প্রকৃতি, লোকজ জীবনকে ঘিরে। তিনি যেন প্রকৃতিরই একজন; তাই তাঁর জন্মলগ্নে প্রকৃতিও আনন্দে বরণ করে নেয় তাকে-‘সেই প্রথম আমি যখন আসি/ পথের পাশের জিগাগাছের ডালে তখন চড় চড় করে উঠেছিল রোদ/ কচুর পাতার কোষের মধ্যে খণ্ড খণ্ড রূপালি আগুন/ ঘাসে-ঘাসে নিঃশব্দ চাকচিক্য-ঝরানো গুচ্ছ গুচ্ছ পিচ্ছিল আলজিভ/ এইভাবে আমার রক্ত প্রহর শুরু হয়েছিল’ (জন্মস্মর : ঘাসের ঘটনা)
আবিদ আজাদ এক নান্দনিক কবি সত্তার অধিকারী। প্রথম কাব্যতেই তিনি এর স্বাক্ষর রেখেছেন। চিত্রের পর চিত্র এঁকে তিনি রচনা করেছেন শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিভারাক্রান্ত গীতিমুখর কবিতা; যা তাকে সত্তরের অন্য কবিদের থেকে শুরু থেকেই স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করেছে। আবিদ আজাদের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ আমার মন কেমন করে (১৯৮০)-তেও পাই এ স্মৃতিভারাতুর এক কবি সত্তাকে। এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘দুঃখ’তে বেজে উঠেছে ফেলে আসা দিনের জন্য বুকের অন্তর্লীন হাহাকার-‘আজ মনে পড়ছে সেইসব মুঠোবন্দি জোনাক পোকার দুঃখ/ হাওয়ার হাওরে ছই নৌকার মতো এক রত্তি পাখি/ গলার নিচের দিকে অদ্ভুত নরম নীল রোঁয়া/ উঠোনমণির মুখ, ভোরবেলাকার হিমভেজা কার চোখ/ আগডুম বাগডুম চারিদিক, বাক দিচ্ছে সুন্দর মোরগ।’
আবিদ আজাদের কবিতায় এই চিত্রের পর চিত্র আঁকা, চিত্রকল্প নির্মাণ শুধু প্রথম বা দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ নয়, শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আবিদ আজাদের কবিতা যে যে কারণে পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছে, তার মধ্যে সার্থক চিত্রকল্পের ব্যবহার একটি। তিনি যখন বলেন, ‘বৃষ্টি এলে চাল বেয়ে নেমে যায় দিন’ (দূরে নয়, কাছেই কোনোখানে : হাসপাতালে লেখা) অথবা, ‘জার্সি-ছেঁড়া আকাশ আমার তোমায় আমি পেলাম না...’ (পেলাম না : শীতের রচনাবলি) কিংবা, ‘জ্যোৎস্নারাতে কলার পাতা ছিঁড়ছে যন্ত্রণা/ হৃদয়কালা তোমাকে আর না দেয় যেন মরার মন্ত্রণা’ (ভাটিয়ালি গানের নায়িকা : ঘাসের ঘটনা) তখন তা পাঠক চিত্তে কল্পনার জাল বিস্তার করে এবং চিত্ররূপে মূর্ত হয়। একটি সার্থক চিত্রকল্পের যে তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হয় (এক. প্রাণময়তা, দুই. আন্তরিকতার বেগ, তিন. উদ্দীপনশৈলী বা উদ্ভাসন ক্রিয়া) তার সব কটিই আছে উপরিউক্ত পঙ্ক্তিগুলোতে। বলাবাহুল্য আবিদ আজাদের কবিতায় এ রকম সার্থক চিত্রকল্পের ব্যবহার আরও অনেক। যার ফলে কবির ব্যক্তিক অনুভূতি ও হৃদয়াবেগ পাঠক নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে, আবিদ আজাদের কবিতা পৌঁছে গেছে পাঠকের আরও কাছাকাছি।
আবিদ আজাদের কবিতা শুধু আত্মনিমগ্নতা, স্মৃতির কোটরেই বন্দি থাকেনি, ক্রমে বেরিয়ে এসেছে বৃহৎ জীবনের দিকে। ধারণ করেছে সমাজের বিভিন্ন সমস্যাকে-‘পারে, আমাদের কবিতা এখন সবই পারে, সবই গ্রহণ করতে পারে-/ টিন, সিসা, দস্তা, ঝামা-ইট, নিকোটিন, অস্তপ্রায় জুতোর সুকতলি/ বুড়োদের চোখের গোধূলি, বিমর্ষ রোগীর কফ/ স্কুল-শিক্ষিকার ভোর, মৃত্যুন্মুখ কিশোরের চোখ/ দুর্ধর্ষ বিকেলবেলা অগ্রজ কবির ভণ্ডামি, সুবিধাবাদ/ গুপ্তহত্যা, রাজনীতি, গুণ্ডামি, চরমপন্থীদের শোভাযাত্রা, মিছিল, স্লোগান, বোমাবাজি’ (আমাদের কবিতা : বনতরুদের মর্ম)
আবিদ আজাদ সমাজের এসব সমস্যা, অবক্ষয়, অধঃপতনকে দেখেছেন নিরাসক্ত, নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাঁর কবিতায় রাজনীতি আছে, তবে তা কখনোই সরাসরি বা প্রত্যক্ষ নয়, পরোক্ষ। আবিদ আজাদের কবিতায় এই পরোক্ষভাবে রাজনীতি উঠে আসা সম্পর্কে আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘আমার তো ধারণা, আবিদ আজদকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এই পরোক্ষতা-যখন সত্তর দশকের অধিকাংশ কবির ভরাডুবি ঘটেছে।’
আবিদ আজাদের কবিতায় ব্যক্তিপ্রেম ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দেশপ্রেমে। তাঁর কবিতায় ওঠে এসেছে দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা শকুনের নখ, চঞ্চুর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে বারবার। তাঁর কলমে স্বাধীনতার এই দৈন্য-দুস্থ অবস্থা আমরা অবলোকন করি-‘একটা রুটি দেন আম্মা’-অস্পষ্ট স্বরে কেঁদে ওঠে স্বাধীনতা/ ‘একটা টাকা দেন বাবা’-পিছন থেকে ডেকে ওঠে স্বাধীনতা’ (সাত পঙ্ক্তির স্বাধীনতা : আমার অক্ষমতার গল্প)
যে স্বপ্ন, আশা নিয়ে আমাদের এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল তা কি পূরণ হয়েছে? সহজ উত্তর-না, পূরণ হয়নি, আমরা পাইনি যথার্থ বিজয়। চারিদিকে শুধু স্বার্থবাজ, রক্তপাত আর অস্ত্রের ঝনঝনানি গিলে খাচ্ছে আমাদের সব সুন্দরকে, ‘শিশিরের ভিতরে এখন শুধু রক্ত শুধু বারুদ শুধু ক্ষুরের ঝলকানি-’। তাই কবি বলে ওঠেন, ‘বিজয়, ফিরে আয় বাবা,/ তোর জন্য কাঁদতে-কাঁদতে আম্মা তোর/ দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন/ বিজয়, বাবা ফিরে আয় তুই।’ (বিজয় ফিরে আয় : ঐ)
আবিদ আজাদ কবিতায় যখন বর্তমান সময়ের অবক্ষয়ের কথা, অধঃপতনের কথা বলেন, বারুদ আর অস্ত্রের ঝনঝনানির কথা উচ্চারণ করেন, তখনো তা থাকে শিল্পের ডুরিতে বাঁধা, নান্দনিক সৌকর্যমণ্ডিত। এর কারণ কবিতাই আবিদ আজাদের আরাধ্য। তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন শুধু কবিতার জন্য। তাই তো বলেন, ‘কবিতা লিখতে না পারলেই অসুখ হয় আমার/ কবিতা লিখতে না পারলেই ব্যধিগ্রস্ত হয়ে পড়ি আমি/ কবিতা, কবিতাই আমার ভালো থাকার একমাত্র উপায়/ এ ছাড়া আমার আর কোনো দ্বিতীয় যন্ত্রণা নেই’ (যদি কবিতা লিখতে পারি : আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো)
কবিতা তাঁর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী, বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাঁর সুখ-দুঃখের, আনন্দ-বেদনার নান্দনিক প্রকাশ কবিতা। তাঁর ‘সব পথই গেছে কবিতার দিকে’। তাই তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো যখন কেটে যাচ্ছে হাসপাতালের বেডে, যদি সুস্থ হোন, তিনি কামনা করেছেন, ‘যখন খুশি কবিতা লিখব আমি/ কবিতা বিক্রি করে খাব’ (কবিতা বিক্রি করে খাব : হাসপাতালে লেখা) কবিতার জন্য ঘোরাক্রান্ত এ রকম উচ্চারণ বাংলা কবিতায় অভিনব।
বাংলাদেশ চিরকালই কবিতার দেশ। তবু এর মধ্যে কেউ কেউ আছেন কবিতাগ্রস্ত; যারা কবিতায় ডুবে থাকেন আপাদমস্তক। আবিদ আজাদ সেই অতি অল্পসংখ্যকদেরই একজন। আবিদ আজাদ পেয়েছিলেন মাত্র তিপ্পান্ন বছরের পরমায়ু। এই স্বল্প সময়টুকুতে তিনি বাংলা সাহিত্যে কবিতার যে সৌধ নির্মাণ করেছেন বাংলা কবিতার, পাঠক সেই সৌধের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেবে অনেক দিন।

Disconnect