ফনেটিক ইউনিজয়
বিচারবহির্ভূত হত্যার রিপোর্ট কেমন হবে?
কদরুদ্দীন শিশির

‘পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে যুবক নিহত’ কিংবা ‘র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ডাকাত নিহত’-এমন সংবাদ আমরা পত্রিকা-টিভিতে হরহামেশাই দেখছি। বলতে গেলে এগুলো বর্তমানে প্রতিদিনের সংবাদ আইটেম। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, সর্বশেষ আপনি কবে, কোথায় বাংলাদেশি কোনো সংবাদমাধ্যমে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ শব্দ দুটিকে পাশাপাশি দেখছেন? অথবা গত কয়েক বছরে আদৌ শব্দ দুটিকে একসঙ্গে দেখেছেন কি না?
মোটামুটি নিশ্চিত করে বলা যায়, ‘হ্যাঁ’-সূচক উত্তর আসার সম্ভাবনা কম। মানুষ দেখবে কীভাবে? সংবাদমাধ্যমগুলোই বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া এখন এসব শব্দ এড়িয়ে চলছে। নিত্যদিনই কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম থেকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ শব্দ দুটি আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে!
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, কোনো বিচারিক আদালতের রায় ছাড়া নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের হাতে ঘটা হত্যাকা-ই ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’।
এ ধরনের হত্যা মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘনগুলোর একটি। ফলে এ-সংক্রান্ত খবর পরিবেশনে সংবাদমাধ্যমকে খুবই উচ্চমাত্রার সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা অবলম্বন করতে হয়। হত্যার মাধ্যমে ভিকটিমের লঙ্ঘিত অধিকার যাতে নতুন করে আবারও সংবাদমাধ্যমের দ্বারা লঙ্ঘনের শিকার না হয়, সেদিকে তীক্ষ্ণ খেয়াল রাখতে হয়। একদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলো প্রভূত ক্ষমতা ও প্রভাবের অধিকারী এবং অন্যদিকে ভিকটিম তুলনামূলকভাবে অনেক দুর্বল (ব্যক্তি) সত্তা হওয়ায় বিভিন্ন তথ্যপ্রাপ্তি ও সংবাদমাধ্যমে তা পরিবেশনের ক্ষেত্রে বৈষম্য হওয়ার শঙ্কা থাকে। এমন বৈষমের কারণে ভিকটিম যেন ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর শিকার না হন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব।
কিন্তু বাংলাদেশে কোনো এক অজানা কারণে বর্তমানে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংবাদ পরিবেশনে এসব সচেতনতা এবং সংবেদনশীলতাকে মোটেও তোয়াক্কা করা হয় না। যাদের হাতে বিচারবহির্ভূতভাবে কেউ হত্যার শিকার হচ্ছে তাদের দেওয়া ভাষ্যকেই বিনা প্রশ্নে একপক্ষীয়ভাবে হুবহু তুলে ধরার প্রবণতা দৃষ্টিকটু মাত্রায় লক্ষণীয়। বেশির ভাগ সংবাদ প্রতিবেদনেই দেখা যায়, পুলিশ বা র‌্যাব ঘটনার কী বর্ণনা দিয়েছে তা তুলে ধরেই ক্ষ্যান্ত দিচ্ছেন সাংবাদিকেরা। নিহতের স্বজন বা তৃতীয় কোনো পক্ষেরও যে একটি ভাষ্য থাকতে পারে, তা আমলেই নেওয়া হচ্ছে না। (কোনো কোনো বিশেষ ঘটনায় দু-একটি সংবাদমাধ্যমকে অবশ্য এই অনুশীলনের ব্যতিক্রম হতে দেখা যায়।)
এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ পাঠকদের সচেতনতার জন্য ‘বিচারবহির্ভূত হত্যার ওপর একটি আদর্শ প্রতিবেদন কেমন হতে পারে’, সে সম্পর্কে কিছু আলাপ-আলোচনা হতে পারে। এমন একটি রিপোর্টে কী কী থাকা সঙ্গত, তা সংক্ষেপে কয়েকটি পয়েন্টের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়। যেমন,

পুলিশের ভাষ্য
যেহেতু কথিত সব বন্দুকযুদ্ধই গভীর রাতে ঘটে থাকে, এবং ঘটনার দুটি পক্ষের মধ্যে একপক্ষের সবাই হয়তো নিহত কিংবা পলাতক থাকেন, ফলে প্রত্যক্ষদর্শী বলতে শুধু পুলিশ বা র‌্যাবই অবশিষ্ট থাকে। অতএব, পুলিশ-র‌্যাবের বয়ানই ঘটনার মূল সূত্র হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটাকে ‘একমাত্র সূত্র’ হিসেবে নেওয়া সাংবাদিকতার জন্য ভালো অনুশীলন নয়।
 
ঘটনাস্থল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য
আগেই বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী বলতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছাড়া আর কাউকে পাওয়ার সুযোগ থাকে না বললেই চলে। তারপরও কোনো ঘটনা ব্যতিক্রম হতে পারে। ঘটনাচক্রে আশপাশের এলাকার কেউ গভীর রাতে দেখে ফেলতেও পারে। এ ধরনের কেউ আছে কি না, তা জানার চেষ্টা করা  সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব। যদি না পাওয়া যায়, তাহলে ঘটনাস্থল-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা রাতের বেলা গুলি কিংবা গোলাগুলি অথবা চিৎকার-চেঁচামেচি ইত্যাদির আওয়াজ শুনেছেন কি না, তা অন্তত একজনকে জিজ্ঞেস করে রিপোর্টে উল্লেখ করা যেতে পারে।

চিকিৎসকের বক্তব্য
নিহত ব্যক্তিকে অবশ্যই কোনো না কোনো সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা এবং ময়নাতদন্ত ইত্যাদি করেন। চিকিৎসকেরা লাশকে কীভাবে পেলেন, শরীরের কোন অংশে কয়টি গুলি লেগেছে, অন্যান্য আঘাত আছে কি না ইত্যাদির বিস্তারিত চিকিৎসকের বরাতেই সংবাদ প্রতিবেদনে থাকতে পারে। বাংলাদেশে কদাচিৎ তা থাকে।

নিহতের স্বজনের বক্তব্য
যেহেতু আমাদের দেশে যাদের হাতে কেউ নিহত হচ্ছে, সেই নিরাপত্তা বাহিনীর বক্তব্যকেই মূল হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে, ফলে তার বিপরীতে যে ব্যক্তি নিহত হলো, তার স্বজনের বক্তব্য তুলে ধরা সাংবাদিকতার জন্য একটি সাধারণ কর্তব্য  বিষয়। স্বজন বলতে পরিবারের সদস্য, যেমন স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, ভাইবোনকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। তাদের কাউকে না পাওয়া গেলে কাছের আত্মীয়দের কারও বক্তব্য নিতে হবে। জ্ঞাতব্য যে, বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহতের স্বজনের বক্তব্য ছাড়া কোনো প্রতিবেদন ‘সংবাদ প্রতিবেদন’ হয়ে ওঠে না, প্রোপাগান্ডা হতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে নিহতের পরিচয় উদ্‌ঘাটিত না হওয়া বা অন্য কোনো কারণে স্বজনের বক্তব্য পাওয়া না গেলে ‘কেন পাওয়া যায়নি’ প্রতিবেদনে তাও উল্লেখ করা যেতে পারে।

অসংগতি তুলে ধরা বা প্রশ্ন করা
উপরিউক্ত বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে বা তথ্যে অসংগতি ধরা পড়লে বা প্রশ্নযোগ্য কোনো বিষয় থাকলে তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। কিছু প্রশ্নের উত্তর নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে খোঁজা যেতে পারে। যেমন অভিযান কেন সব সময় রাতে হয়? সন্দেহভাজন আসামিকে সঙ্গে নিয়েই কেন অভিযানে যেতে হয়? অভিযানে কেন শুধু আটক ব্যক্তিরা হতাহত হন? কথিত ওত পেতে থাকা হামলাকারীদের কেন কখনোই ধরা যায় না? সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা যেহেতু থাকছেই তাহলে কেন যথেষ্ট প্রস্তুতি এবং বহর নিয়ে অভিযানে যাওয়া হয় না?

মানবাধিকারকর্মীর বক্তব্য
বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্পর্কে অন্তত একজন মানবাধিকারকর্মীর বক্তব্য তুলে ধরতে হবে।

পরিসংখ্যান
এ ধরনের সংবাদ প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমানে দেখা যায়, প্রতিটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয় সংবাদমাধ্যমে। আজকের বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংবাদে গতকাল এবং পরশু যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের কোনো প্রসঙ্গ থাকে না। ফলে সার্বিকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়টি ধীরে ধীরে গা সওয়া বিষয় হয়ে পড়ে। একটি আদর্শ সংবাদ প্রতিবেদনে অতিসাম্প্রতিক ঘটা একই ধরনের হত্যাগুলোর প্রাসঙ্গিক উল্লেখসহ চলতি মাসে নিহতদের সংখ্যা এবং চলতি কিংবা সদ্য সাবেক বছরে একই ধরনের ঘটনায় নিহতদের পরিসংখ্যান থাকা উচিত।

ভাষা ব্যবহারে সচেতনতা
বর্তমানে এ ধরনের সংবাদে কিছু সংবাদমাধ্যম সূক্ষ্ম অর্থপূর্ণ ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে পুলিশের বক্তব্যের দায় থেকে নিজেরা দূরত্ব বজায় রাখছে (অনেকে অবশ্য সেটাও করছে না!)। যেমন, ‘পুলিশ/র‌্যাবের দাবি/ভাষ্য/বক্তব্য’ ‘কথিত’ ইত্যাদি শব্দ বা ঊর্ধ্বকমার ব্যবহার। ‘পুলিশ কর্মকতা জানান’ না লিখে ‘পুলিশ কর্মকতা বলেন’ লেখা। কিন্তু সাধারণ পাঠকের পক্ষে এসব সূক্ষ্ম বিষয় বুঝে সংবাদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেওয়া সহজ নয়।

ছবি ব্যবহারে সাবধানতা
অনেক সময় দেখা যায় ভোর রাতে হওয়া বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাস্থলের ছবিতে সংবাদমাধ্যমগুলো নিজেদের লোগোর ছাপ মেরে প্রকাশ করছে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রেস রিলিজের সঙ্গে কোনো ছবি সরবরাহ করা হলে সেগুলো তাদের বরাতেই প্রকাশ করা উচিত।
এভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর পরিবেশনে সংবাদমাধ্যম নিজেদের সচেতনতার পরিচয় দিয়ে মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

আরো খবর

Disconnect