ফনেটিক ইউনিজয়
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে রোহিঙ্গা
কদরুদ্দীন শিশির
ফাইল ছবি
----

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধধর্মীয় সংগঠনগুলো ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে আবারও নিপীড়ন শুরু করেছে। ঘটনার সূত্রপাত দেশটির পুলিশের বেশ কিছু চেকপোস্টে বিদ্রোহীদের হামলার মধ্য দিয়ে। সংবাদমাধ্যমে এসেছে, আরাকান রোহিঙ্গা সেলভেশন আর্মি নামক একটি সশস্ত্র সংগঠন ওই হামলা চালায়। তবে বাস্তবতা আসলে কী, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। সাবেক বাংলাদেশি কূটনীতিক ও মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক হেড অব মিশন মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, পুলিশ চেকপোস্টে হামলার ঘটনা পুরোটাই সাজানো নাটক (সূত্র : যমুনা টিভি)। তাঁর মতে, কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের এক দিন আগে এমন নাটক সাজিয়ে কমিশনের বিভিন্ন পরামর্শকে উপেক্ষা করার চেষ্টায় আছে মিয়ানমার সরকার। তারা রোহিঙ্গাদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে।
পেছনের কারণ যা-ই হোক, চেকপোস্টে হামলার অজুহাতে আবারও পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের স্টিমরোলার চালিয়েছে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকার। ২৮ আগস্ট আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্রিটেন ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের’ প্রধান তুন কিন জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে চার শতাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। ঘরছাড়া হয়েছে ৪০ হাজারের বেশি। এর প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ সীমান্তে। সেখানে গত কয়েক দিনে জড়ো হয়েছেন নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ হাজার হাজার রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা তাদের ঢুকতে বাধা দিলেও অমানবিক আচরণ করছে না। স্থানীয় মানুষজন আশ্রয়প্রার্থীদের খাবার ও চিকিৎসা দেওয়ার সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।
এই কয়েক দিনে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে কাভারেজ পেয়েছে। প্রতিদিন বেশির ভাগ পত্রিকার প্রথম পাতায় এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও প্রথম দিকে থাকছে রোহিঙ্গাদের কষ্টযাত্রার খবর। তবে হাজারো নারী ও শিশুর খোলা আকাশের নিচে দিনযাপন, না খেয়ে থাকা ইত্যাদি নিয়ে যথেষ্টসংখ্যক মানবিক প্রতিবেদন চোখে পড়েনি। উল্টো দু-একটি সংবাদমাধ্যম এই সময়টিকেই বেছে নিয়েছে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য।
২৭ আগস্ট দৈনিক কালের কণ্ঠ ‘গলার কাঁটা রোহিঙ্গা’ শিরোনামে লিড নিউজ প্রকাশ করে। বেশ আক্রমণাত্মক ভাষায় রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তাতে বলা হয়, ‘মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এখন বিষফোঁড়ার মতো হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারে দিনে দিনে বাড়ছে অনুপ্রবেশকারীর বোঝা। রোহিঙ্গারা ছলে-বলে-কৌশলে ভোটার তালিকাভুক্ত হচ্ছে। অনেকে ইউনিয়ন পরিষদের নিবন্ধনও জোগাড় করে নিচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভুয়া নিবন্ধনে ভর্তি হয়ে পড়ালেখা করছে। এমনকি কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে উচ্চতর শিক্ষার জন্য কলেজ স্থাপনেরও চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতিয়ে নিয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে।’
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এবং শরণার্থী ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের একাংশের বিষয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক, সামাজিক, মানসিকভাবে নিপীড়িত অবস্থায় বাস করা যেকোনো মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেশি থাকে। রোহিঙ্গা বা বাঙালি কিংবা অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী-সবার ক্ষেত্রেই তা সমান। বস্তিতে বেড়ে ওঠা বাঙালির সন্তানেরাও বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে। এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতে পারে সংবাদমাধ্যম। কিন্তু এভাবে একপক্ষীয়ভাবে একটা জনগোষ্ঠীকে দোষারোপ করা, তা-ও আবার বিশেষ একটি মুহূর্তে, এটা সংবাদমাধ্যমের নৈতিকতাবিরোধী।
কালের কণ্ঠ-এর প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়, ‘মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, দুবাইসহ আরও কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে রয়েছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে সাগরপথে বিশ্বজুড়ে আলোচিত মানব পাচারের যে ঘটনা ঘটেছিল, এসবের নেপথ্যেও জড়িত ছিল রোহিঙ্গারা। পরে মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশি ভিকটিমদের মুখে রোহিঙ্গাদের নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের ভয়াল কাহিনির কথা এখনো ভুলতে পারছে না স্থানীয়রা।
‘অনুরূপ সৌদি আরবেই রয়েছে পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে সেনাদের নির্যাতনের শিকারকে স্রেফ পুঁজি করে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গারা সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষের কাছে একটি অবস্থান সৃষ্টি করে নিয়েছে। এর জোরে রোহিঙ্গারা সৌদি আরবের বাংলাদেশিদের ওপর কথায় কথায় চড়াও হয়ে থাকে বলে খবর রয়েছে।’
বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে সাধারণভাবে দায়ী করে বলা হচ্ছে, তারাই নাকি বাংলাদেশিদের ওপর নিপীড়নকারী ‘খবর রয়েছে’ বলে এসব গুরুতর অভিযোগ কোনো সংবাদমাধ্যম প্রচার করতে পারে না। গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের প্রতি যখন সহানুভূতি প্রদর্শন দরকার, তখন তাদের নিয়ে এমনভাবে দায়সারা সূত্রের বরাতে বিদ্বেষমূলক খবর প্রচার সাংবাদিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এর বাইরে দুয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ‘রোহিঙ্গা’ নামের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটাও যোগ করতে দেখা গেছে। যেমন এনটিভি অনলাইনে ২৫ আগস্টের শিরোনাম ছিল, ‘রাখাইনে হামলায় ২১ “রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী” ও ১১ নিরাপত্তাকর্মী নিহত’। সার্বিকভাবে বললে, বেশ ভালো কিছু প্রতিবেদন হলেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের কাভারেজ যথেষ্ট মানবিক নয়।

আরো খবর

Disconnect