ফনেটিক ইউনিজয়
এরদোয়ান ‘একনায়ক’ বিন সালমান ‘সংস্কারক’
কদরুদ্দীন শিশির

২০১৬ সালের জুলাইয়ে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দেয় তুরস্কের জনগণ। মূলত প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের রাজনৈতিক ক্যারিশমায় তা সম্ভব হয়। নিশ্চিত অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর এরদোয়ান হয়ে ওঠেন আরও আগ্রাসী। আগে থেকেই তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ছিল বিরোধীদের বলপ্রয়োগে দমনেচষ্টার। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর যেন শাপেবর পেলেন এরদোয়ান। এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে চালান গণগ্রেপ্তার অভিযান। দেড় লাখের বেশি রাজনৈতিক বিরোধী ব্যক্তি, যাঁদের বেশির ভাগই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বন্দি করা হয়। ঘটনার দেড় বছর পরও সেই গ্রেপ্তার অভিযান চলছে।
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে ব্রিটেনের খ্যাতিমান সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। ৯ জুলাই প্রকাশিত নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল, ‘One year on from the failed coup, Recep Tayyip Erdogan is more autocratic than ever’। পুরো নিবন্ধটির বার্তা শিরোনামেই স্পষ্ট। ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধীদের গণহারে গ্রেপ্তার ও নিপীড়ন চালানোর বিষয়টিকেই এরদোয়ানের ‘একনায়ক’ হয়ে ওঠার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেছে গার্ডিয়ান। ব্রিটিশ পত্রিকাটি খুব মুনশিয়ানার সঙ্গে দেখিয়েছে, কোনো কিছুকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের চেষ্টা খুবই গর্হিত ও গণতন্ত্রবিরোধী একটি কাজ। এ ছাড়া সর্বক্ষেত্রে নিজের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এরদোয়ানের চেষ্টার, বিশেষ করে সংবিধান পরিবর্তন করে নির্বাহী প্রেসিডেন্সি ব্যবস্থা কায়েম করার কড়া সমালোচনা রয়েছে নিবন্ধটিতে।
এরপর এক লাফে আমরা চলে আসি ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে। এবার ঘটনাস্থল সৌদি আরবের রিয়াদ। ঘটনার নায়ক সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। নভেম্বরের শুরুতে ক্রাউন প্রিন্স হুট করে ‘দুর্নীতিবিরোধী কমিটি’ নামে একটি সংস্থা তৈরি করলেন। আর এক রাতের মধ্যে রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য, বর্তমান-সাবেক মন্ত্রী ও বড় বড় ব্যবসায়ীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে ধরে রিয়াদের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বন্দি করে রাখলেন। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবতে থাকা সৌদি রাজপরিবার ও সরকারের মধ্যে থেকে দুই ধরনের ব্যক্তিদের বেছে নিলেন ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান। প্রথমত, যাঁরা তাঁর ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দন্দ্বী বা বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচক। দুর্নীতির কথা বলে রাজপরিবারে নিজের বিরোধী রাজকুমারদের দমনের চেষ্টা করে নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করলেন ক্রাউন প্রিন্স।
দ্বিতীয়ত, যাঁরা প্রচুর পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাঁদেরও ধরলেন। পশ্চিমা আরেক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর অনুসন্ধান মতে, আটককৃত ধনী ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিজের উচ্চাবিলাসী ভিশন ২০৩০-তে কাজে লাগাতে চান বিন সালমান! ব্যক্তিগত সম্পদ সরকারিভাবে জবরদখল করে ‘দেশের উন্নয়ন’! পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এক অদ্ভুত চিন্তা।
তো দুর্নীতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নিজের বিরোধীদের দমন এবং উন্মুক্ত বাজারব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কাজে লাগানোর অদ্ভুত ‘রাজকীয়’ চিন্তাকে কীভাবে তুলে ধরল দ্য গার্ডিয়ান?
৭ নভেম্বর গার্ডিয়ান-এর একটি নিবন্ধের শিরোনাম : ‘This is a revolution : Saudis absorb crown prince’s rush to reform’। নিজের পছন্দের বিশেষজ্ঞের কথা ধার করে পত্রিকাটি শিরোনামে ক্রাউন প্রিন্সের উপরিউক্ত কার্যক্রমকে ‘বিপ্লব’ আখ্যা দিল! শিরোনামের নিচে একলাইনে যে বিন সালমানের কর্মকা-ের সারাংশ করেছে এভাবে : ‘Consolidation of power in Mohammed bin Salman’s hands has upended all aspects of society, including previously untouchable ultra-elite’। ‘Consolidation of power’ বা ‘ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ’কে এখানে ইতিবাচকভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। কারণ এটির মাধ্যমে ‘ultra-elite’ সমাজ, যেটি আগে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল, সেটিকে ওলটপালট করে দেওয়া যাচ্ছে!
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এরদোয়ান ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে বিরোধী দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন, এটিকে গার্ডিয়ান ‘একনায়কসুলভ আচরণ’ বলেছে। মানে, এটি খারাপ কাজ। এরদোয়ান নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাহী প্রেসিডেন্সি কায়েম করতে চেয়েছেন। এটিকেও ‘একনায়কি আচরণ’ বলে মনে করে গার্ডিয়ান।
কিন্তু অনির্বাচিত বিন সালমান যখন দুর্নীতির অভিযোগকে হাতিয়ার করে রাজপরিবারে তার বিরোধীদের জেলে পুরেন বা কোনো আইনকে তোয়াক্কা না করে শুধু সরকারি ক্ষমতার জোরে অন্যের ব্যক্তিগত সম্পদ জবরদখলের চেষ্টা করেন, অথবা একের পর এক সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে থাকেন, তখন এসবকে ‘বিপ্লব’ ও ‘সংস্কার’ হিসেবে দেখায় দ্য গার্ডিয়ান!
অন্য আরও বহু সম্পাদকীয়, নিবন্ধ, সংবাদ প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে না গিয়ে কিছুদিন ধরে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সকে নিয়ে গার্ডিয়ান-এর কিছু ইতিবাচক শিরোনাম তুলে ধরছি। ৫ নভেম্বরের একটি শিরোনাম, ‘Royal Purge Sends Shockwaves Through Saudi Arabia’s Elites: Move Consolidates Power of Prince Mohammed Bin Salman as He Attempts to Reform Kingdom’s Economy and Society’। পত্রিকাটির দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদিতে ‘সংস্কার’ চলছেই। একই দিনের আরেকটি শিরোনাম, ‘Saudi Arrests Show Crown Prince Is a Risk-Taker With a Zeal for Reform : Mohammed Bin Salman Is Confronting Some of the Kingdom’s Richest and Most Powerful Men in His Anti-Corruption Drive- but Is He Taking on Too Much Too Fast??’ অর্থাৎ ‘সংস্কারক’ বিন সালমান যা করছেন ঠিকই আছে। শুধু তিনি একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলছেন, এ জন্য উদ্বিগ্ন দ্য গার্ডিয়ান!
গার্ডিয়ানকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ‘উদারবাদী’ সংবাদমাধ্যম মনে করা হয়ে থাকে, যেটিতে আদর্শিক দ্বিচারিতার মাত্রা অনেক কম। কিন্তু এই পত্রিকাটিও এরদোয়ান ও বিন সালমানের একই ধরনের যাত্রায় ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে দ্বিচারিতার পরিচয় দিয়েছে। অন্যান্য পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের অবস্থা আরও করুণ। উদাহরণ দেওয়া যাক, নিউইয়র্ক টাইমস-এর দুটি শিরোনামের। ৫ নভেম্বর টাইমসের একটি শিরোনাম ছিল, ‘Saudi Crown Prince’s Mass Purge Upends a Longstanding System’ ১৪ নভেম্বরের শিরোনাম ছিল, ‘The Upstart Saudi Prince Who’s Throwing Caution to the Wind’। অর্থাৎ, সৌদিতে চলা গণগ্রেপ্তারকে নেতিবাচকভাবে দেখছে না পত্রিকাটি। অথচ, এই পত্রিকাই এরদোয়ানের ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণের চেষ্টা এবং আইনের জোরে বিরোধীদের দমনের চেষ্টাকে ‘একনায়কি আচরণ’ বলেছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ১০ নভেম্বর টাইমস-এর একটি নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, ‘Turkey’s Authoritarian Drift’ বা ‘একনায়কতন্ত্রের দিকে তুরস্কের যাত্রা’।

আরো খবর

Disconnect