ফনেটিক ইউনিজয়
ভুয়া সংবাদের পক্ষে এত সমর্থন আতঙ্কজনক
কদরুদ্দীন শিশির

‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া সংবাদের বিপক্ষে বিশ্বব্যাপী লড়াই চলছে। ভুয়া সংবাদ ছড়ানো বন্ধে বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন রকমের কথা বলছে বা উদ্যোগ নিচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ বিভিন্ন সংস্থার জন্ম হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মতো করে ফেক নিউজের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন। যদিও তিনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে যাওয়া সংবাদকে ‘ফেক নিউজ’ বলে অভিহিত করে থাকেন, অভিযোগ রয়েছে। সে যা-ই হোক, ভুয়া তথ্য ও সংবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এখন সর্বত্র। কিন্তু মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশে অনেকে ফেক নিউজের পক্ষেই দাঁড়াচ্ছেন! সম্প্রতি বাংলাদেশে ছড়িয়েছে এমন দুটি ভুয়া সংবাদের পক্ষে সামাজিক মাধ্যমে এবং বাস্তব জীবনের অনেকের প্রতিক্রিয়া দেখে এমনটাই মনে হয়েছে।
প্রথমে বলা যাক পোপ ফ্রান্সিসকে নিয়ে ছড়ানো ভুয়া খবরটির কথা। গত ৩০ নভেম্বর পোপ বাংলাদেশে আসেন। তিনি বিদায় নেন ২ ডিসেম্বর। ওই দিনই অনলাইনে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিও নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয় সময় টিভির অনলাইনে। শিরোনাম ছিল, ‘বারে উদ্দাম নাচলেন পোপ, ভিডিও ভাইরাল!’ ওই রিপোর্টে লেখা হয়েছে, ‘তিনি পোপ হলে কী হবে, তাঁর কী আর শখ নেই। পোপের ট্যাঙ্গো নাচ খুবই পছন্দের। ট্যাঙ্গোর সঙ্গে মিলঙ্গা নামে আরেকটি নাচের প্রতিও তাঁর আগ্রহ আছে। তাই বলে একবারে বারে বসে উদ্দাম নাচ দিয়ে দিলেন। বর্তমান সময়ে কোনো কিছু তো আর অজানা থাকে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় তা ভাইরাল হতে সময় লাগে না। পোপের এই উদ্দাম নাচের ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে সে ভিডিও। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, পোপ একটি সাদা পোশাক পরিহিত নারীর সঙ্গে ট্যাঙ্গো নাচের আকার দিচ্ছেন। সেখানে খুব প্রফুল্লভাবে নাচতে দেখা গেছে পোপকে।’
লেখার এই ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে রিপোর্টার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েই লিখেছেন যে এটি পোপের নাচের ভিডিও। এই রিপোর্টের পর হু হু করে ছড়াতে থাকে ভিডিওটি। কিন্তু ভিডিওটিকে বিভিন্নভাবে যাচাই করে দেখা গেছে, সেটি ভুয়া। এ নিয়ে যমুনা টিভির অনলাইনে ‘পোপকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর ভিডিও’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।
প্রথমে দেখা যাক, ভিডিওটিকে কেন ভুয়া বলা হচ্ছে। ইউটিউবে মাত্র দুটি সূত্রে ভিডিওটি পাওয়া যায়। ১৯ নভেম্বর আপলোড করা এক একাউন্টে শিরোনাম করা হয়েছে, ‘POPE FRANCIS DANCE GOES VIRAL ON SOCIAL MEDIA’। তাতে দেখা যাচ্ছে, একটি বারে কয়েকটি যুগল নাচছেন। তারও আগে ৮ নভেম্বর আপলোড করা অন্য একাউন্টে একই ভিডিওর শিরোনাম ‘Dance: A Pope - Pope Francis lookalike during Haloween in dancing mood-le Pape François en mode danse’। ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষা মিলিয়ে করা শিরোনামের অর্থ হচ্ছে, ‘নাচের মুডে হ্যালোয়ীন উৎসবের সময় পোপ ফ্রান্সিসের মতো দেখতে এক ব্যক্তি।’
প্রথমত, দুটি একাউন্টের কোনোটিই কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। এদের একটির সাবস্ক্রাইবার ৬০০ অন্যটির ৩০০-এর কিছু বেশি। এর মধ্যে আবার দুটিতে দুই ধরনের দাবি করা হচ্ছে। একটিতে বলা হচ্ছে, নাচনেওয়ালা ব্যক্তিটি পোপ, অন্যটিতে ‘পোপের মতো দেখতে এক ব্যক্তি’। কোনো একাউন্টেই নাচের অনুষ্ঠানের স্থান-কাল কিছুরই উল্লেখ নেই, যার সূত্র ধরে এটিকে আরও যাচাই করা যাবে। দুই অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পরস্পরবিরোধী পরিচয়-সংবলিত একটি ভিডিওকে ভিত্তি করে সংবাদ পরিবেশন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বহীনতারই পরিচয়।
দ্বিতীয়ত, পোপের পোশাক পরা ব্যক্তিটির শারীরিক বাচনভঙ্গি (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) খেয়াল করলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, এটি কোনো ৮০ বছরের ব্যক্তির নাচ নয়। পোপ ফ্রান্সিসের বর্তমান বয়স ৮০। তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন তিন বছর আগে, ৭৭ বছর বয়সে। যদি ভিডিওটিকে তিন বছর আগের বলেও ধরে নেওয়া হয়, তাহলে নাচনেওয়ালা ব্যক্তিটির বয়স ৭৭। কিন্তু ভিডিওতে ওই ব্যক্তিকে যেভাবে একজন পাক্কা ড্যান্সারের মতো মিউজিকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত গতিতে শরীর নাড়াতে দেখা যাচ্ছে, তা ৭৭ বছর বয়সী কোনো মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
তৃতীয়ত, পোপ এভাবে কোনো বারে গিয়ে নাচে অংশ নিলে এবং সত্যিই সেটির ভিডিও প্রকাশিত হলে তা নিয়ে দুনিয়ার কোনো না কোনো সংবাদমাধ্যমে গত এক মাসে অন্তত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হতো। চতুর্থত, পোপের মতো ব্যক্তির দৈনিক প্রতিটি কাজ নির্দিষ্ট সূচি মেনে হয়ে থাকে। সেখানে দৈনন্দিন সূচির বাইরে গিয়ে কোনো ড্যান্স বারে আলো-আঁধারির নিচে তরুণীদের সঙ্গে নাচে অংশ নেওয়া শুধু কল্পনাতেই সম্ভব!
যমুনা টিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রিপোর্টে এসব বিষয় তুলে ধরে ভিডিওটিকে ভুয়া বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই সংবাদটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে শেয়ার করার পর সেখানে পাঠকদের প্রতিক্রিয়াগুলো। শতাধিক ব্যক্তি মন্তব্য করেছেন, যাঁদের সবাই মনে করেন, ভিডিওটিতে দেখা যাওয়া লোকটি অবশ্যই পোপ এবং যমুনা টিভি পোপকে ‘বাঁচানোর জন্য’ ‘ভুয়া’ সংবাদ প্রকাশ করেছে! একই চিত্র সময় টিভির ফেসবুক পেজেও। সেখানে কয়েক শ মন্তব্যের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ভিডিওটিকে ভুয়া বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এত অসংগতিওয়ালা ভিডিটিওটিকেই বাকি সবাই মনে করেন শতভাগ সঠিক!
নিজের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় ভুয়া সংবাদের প্রতি গণহারে এভাবে সমর্থন প্রকাশ একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও আতঙ্কজনক।
দুনিয়াজুড়ে সবাই যখন ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যখন ভুয়া তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়ানো হচ্ছে, তখন শুধু নিজের পক্ষে যাওয়ার কারণে একেকটি ভুয়া সংবাদকে এভাবে পাঠক এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংস্থার মাধ্যমে সাদরে গ্রহণ করে তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে কি আমরা ভবিষ্যতে আরও ভুয়া তথ্য ছড়াতে উৎসাহ দিচ্ছি না?

আরো খবর

Disconnect