ফনেটিক ইউনিজয়
‘বিনোদন সাংবাদিকতা’ না ‘মলম বিক্রি’?
কদরুদ্দীন শিশির

সকালবেলা নাশতা সেরে ফেসবুকে ঢুকতেই নিউজ ফিডে ভেসে উঠল শিরোনাম, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় অভিনেত্রী অপর্ণা ঘোষের মর্মান্তিক মৃত্যু’। কেউ একজন শেয়ার করেছেন খবরটি। সঙ্গে অপর্ণা ঘোষের ছবি। দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভালো ও বেশ নামকরা অভিনেত্রী। কয়েকটা নাটকে তাঁর অভিনয় ভালো লেগেছিল। সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা এভাবে প্রতিদিন কত মেধা, কত প্রাণ হারাচ্ছি! ফেসবুকে যেকোনো সংবাদ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে নিচে পত্রিকাটির নাম দেখে নিই। তারপর ইচ্ছা হলে বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করি। অপর্ণার সংবাদটির শিরোনাম দেখেও অভ্যাসবশত পত্রিকার নামের দিকে তাকালাম। একজন ‘নামকরা’ সাংবাদিকের সম্পাদিত অনলাইন পত্রিকা। রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রোপাগান্ডামূলক, এমনকি ভুয়া সংবাদ প্রচারে এটির দুর্নাম আছে তা জানি। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যু নিয়ে মশকরা করা যায়, এমনটা ধারণা করতে না পেরে ‘খবর’টিকে সত্য ধরে নিয়েই ক্লিক করলাম। লিংকটি ‘লোড’ হওয়ার পর পড়তে শুরু করি, ‘রাজধানীর উত্তরায় ১৩ নম্বর সেক্টরে অভিনেত্রী অপর্ণা ঘোষের চলমান বাইককে পেছন থেকে পরিকল্পিতভাবে ধাক্কা দেয় একটি ট্রাক এবং ঘটনাস্থলে অপর্ণা ঘোষের মৃত্যু ঘটে। পরিকল্পিত এই মৃত্যুর দৃশ্যটি নিপুণভাবে ধারণ করা হয় মেধাদীপ্ত নবীন নির্মাতা সেলিম রেজা রচিত এবং পরিচালিত নীল কাদা আবরণ নাটকে।’
এটুকু পড়ে আবার শিরোনামের দিকে তাকালাম। আমি কি ভুল লিংকে ক্লিক করেছি? শিরোনাম দেখে নিশ্চিত হলাম, ঠিক জায়গায়ই ক্লিক করেছি। অনুধাবন করতে পারলাম, বাংলাদেশের ‘বিনোদন সাংবাদিকতা’ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অবলীলায় নাটকের স্ক্রিপ্ট আর দৃশ্যকে ‘খবর’ আকারে পরিবেশন করা হচ্ছে। তাও আবার যেই সেই খবর নয় কিন্তু। একেবারে স্ক্রিপ্টে থাকা অভিনয়শিল্পীদের মৃত্যুর ‘খবর’ও!
‘নামকরা’ সাংবাদিকের সম্পাদিত পোর্টাল যে ‘সংবাদ’ দিয়েছে, সেটি ‘কপি-পেস্ট’ করতে বেশিক্ষণ নেননি অনলাইনে ‘জাল পেতে’ বসে থাকা ভুঁইফোড় বহু পোর্টালে কর্মরতরা। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে অপর্ণার মৃত্যুর ভুয়া খবর। এদিকে মালয়েশিয়ায় শুটিংয়ে থাকা এই অভিনেত্রী নিজের চোখে নিজের ‘মৃত্যুসংবাদ’ পড়ে নিজের ফেসবুকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি এই কাণ্ড ঘটানেওয়ালাদের আহ্বান করেছেন, ‘দয়া করে আপনারা সাংবাদিকতা ও মলম বিক্রিকে এক করে ফেলবেন না।’
অপর্ণার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও আহ্বানকে মূলধারার গণমাধ্যম গুরুত্বসহকারেই প্রকাশ করেছে। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যম, বিশেষ করে পত্রিকাগুলো কি এই ধরনের ‘মলম বিক্রি’ করে না? আমরা এখানে কিছু উদাহরণ দেখব। যেদিন (১২ ডিসেম্বর) অপর্ণাকে নিয়ে ভুয়া সংবাদ ছড়ায়, তার তিন দিন আগে দৈনিক যুগান্তর-এর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘চাঁটি রইসে রাণীকে বিয়ে করলেন মারজুক’। ওই একই রকম ‘বিনোদন সাংবাদিকতা’। অর্থাৎ নাটকের স্ক্রিপ্ট আর দৃশ্যকে ‘সংবাদ’-এর উপজীব্য করা। ‘চাঁটি রইস’ যে একটি নাটকের নাম, তা বেশির ভাগ সংবাদ পাঠকেরই জানা থাকার কথা নয়। ফলে তারা এটিকে অন্য কিছু ধরে নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই ‘রাণীকে বিয়ে করলেন মারজুক’ শিরোনামের এই অংশেই বেশি মনোযোগ দেবেন এবং ধরে নেবেন ‘ঘটনা সত্য’! অন্তত যতক্ষণ পুরো সংবাদটি না পড়ছেন, ততক্ষণের জন্য বিভ্রান্ত হবেন। পাঠককে বিভ্রান্ত করা গণমাধ্যমের কাজ হতে পারে না।
এই সপ্তাহেরই (ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ) আরেকটি নাটকের স্ক্রিপ্ট কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় কীভাবে এসেছে, খেয়াল করার মতো। ৯ ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক-এর শিরোনাম ‘মোশাররফ করিমের ঘরে তিন বউ!’ দৈনিক কালের কণ্ঠ ৮ ডিসেম্বরের একটি প্রতিবেদন ‘মোশাররফ করিমের কান্না’। ইন্ট্রোতে লেখা হয়েছে, ‘জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিমকে দেখা যায় নানা চরিত্রে। এবার তিনি হাজির হচ্ছেন নতুন ধারাবাহিকে নতুন চরিত্রে। সেখানে তাঁর চরিত্রের নাম হেলাল। তিন-তিনটি বউ নিয়ে তাঁর সংসার। বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের সন্তান হেলাল।’ ইত্তেফাক-এর প্রতিবেদনটিও এই একই নাটকের স্ক্রিপ্ট নিয়ে। একই নাটক (শুকনো পাতার নূপুর) নিয়ে ১৫ অক্টোবর যুগান্তর-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দুই বউ নিয়ে বিপাকে মোশাররফ করিম!’
ভুঁইফোড় অনলাইন পোর্টালের কথা বাদ, প্রতিদিন জাতীয় পত্রিকাগুলোতে এই ধরনের প্রতিবেদনের ছড়াছড়ি। শিরানামে খুবই সিরিয়াস তথ্য, কিন্তু ভেতরে আসলে নাটক/সিনেমার স্ক্রিপ্টের বর্ণনা। শুকনো পাতার নূপুর নাটকটি নিয়ে আরও কয়েকটি শিরোনাম তুলে ধরছি, ‘মায়ের মর্জি রাখতে মোশাররফ করিমের দ্বিতীয় বিয়ে!’, ‘পরিবারের চাপে তৃতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছেন মোশাররফ করিম!’, ‘আবারও বিয়ে করতে যাচ্ছেন মোশাররফ করিম!’
মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এই অনুশীলনের আরও কয়েকটি প্রমাণ দেয়া যায় সাম্প্রতিক সময়ের এই শিরোনামগুলোর মাধ্যমে। যুগান্তর-এর গত বছরের একটি শিরোনাম, ‘অবৈধ অস্ত্রসহ ধরা পড়লেন মোশাররফ করিম’। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন, ‘আপনি কি জানেন, শততম বিয়ের দ্বারপ্রান্তে রিয়াজ!’, বাংলানিউজের প্রতিবেদন, ‘তিশাকে বিয়ে করে বিপদে রিয়াজ!’, যুগান্তর-এর প্রতিবেদন, ‘প্রেম করে বিয়ে, অতঃপর দ্বন্দ্বে রিয়াজ-প্রভা!’, আরটিভি অনলাইনের প্রতিবেদন, ‘স্বামী-স্ত্রী হচ্ছেন রিয়াজ-অপু বিশ্বাস!’ এখানে হাতে গোনা কয়েকটি শিরোনামই দেওয়া হলো। বাস্তবে প্রতিদিন পত্রিকাগুলোর বিনোদন পাতায় এ রকম বহু বিভ্রান্তিমূলক প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে। বলতে গেলে এখন এগুলোই বাংলাদেশে ‘বিনোদন সাংবাদিকতা!’ এ ধরনের চটকদার ও বিভ্রান্তিমূলক উপস্থাপনার পেছনে সংশ্লিষ্ট নাটক/সিনেমার প্রচারণামূলক উদ্দেশ্য থাকে, তা বলাই বাহুল্য।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের ২০১৫ সালের একটি লেখা থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করছি। তিনি লিখেছেন, ‘ছবির নির্মাণ, পরিচালকের বড় বড় কথা, নায়ক-নায়িকার সাক্ষাৎকার, নানা ধরনের খবর ও ছবি দিয়ে নতুন সিনেমার প্রচারের ডঙ্কা সংবাদপত্রে দেখতে পাই। কিন্তু সিনেমা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায় সংবাদপত্র আগ্রহী নয়। স্তুতিমার্কা আলোচনা মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে। এসব আলোচনা কীভাবে প্রকাশিত হয়, পাঠক তা মোটামুটি জানেন।’ শেষ বাক্যে এই বিশেষজ্ঞের ইঙ্গিত থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট। একই সঙ্গে এই মন্তব্য থেকে এখানকার বিনোদন সাংবাদিকতার মান সম্পর্কেও ধারণা মেলে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ অপর্ণার তুলনাটা খুবই জুতসই হয়েছে। মলম বিক্রেতারা বাসে বা অন্য কোথাও অনেকটা জোর করেই তাঁদের পণ্য বিক্রির চেষ্টা করেন। বাংলাদেশে বিনোদন সাংবাদিকতায় নিয়োজিতরাও কি এখন বিবিধ বিভ্রান্তির আশ্রয় নিয়ে জোর করে পাঠককে ‘সংবাদ’ গেলানোর চেষ্টা করছেন না?

আরো খবর

Disconnect