করপোরেটোক্রেসির কালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

করপোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যম আদতে একটা ব্যবসায়িক মডেল। আর দশটা ভোগ্যপণ্যের মতোই। বাজারে বিকোয়। যদিও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নানান গাল-গপ্পের রেশ এখনো কাটেনি। ডেমোক্রেসির এক রকমভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ছিল। রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য একটা আখ্যান তৈরি করা হতো। ডেমোক্রেসির প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। জনগণের অনুশাসন চলে গেছে করপোরেট শ্রেণির হাতে। নামকাওয়াস্তে ডেমোক্রেসির খোলসের আড়ালে চলছে করপোরেট শাসন। গণমাধ্যমের ওপর করপোরেট গোষ্ঠীর এ আধিপত্যের মূলে রয়েছে প্রযুক্তির বাড়-বাড়ন্ত।

উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত গণমাধ্যম স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশাল সংখ্যায় এবং পরিসরে জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। প্রাক-শিল্প বিপ্লব যুগে গণমাধ্যমে প্রকাশ প্রচার ও বিতরণ প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা ছিল ব্যাপক। মূলত ব্যক্তিগত সংযোগের মাধ্যমেই বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। তা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের প্রভাব বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বিস্তার লাভ করেছিল। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পুরোপুরি প্রতিফলন হয়ে উঠতে না পারলেও, ডেমোক্রেসির টিকে থাকার অন্যতম শর্ত হয়ে উঠতে পেরেছিল। করপোরেটোক্রেসির যুগে গণমাধ্যমের টিকে থাকার পুরনো শর্তগুলো এখন মৃতপ্রায়।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়কালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কবলে গণমাধ্যম মোকাবেলা করছে নতুন আরেক বাস্তবতা। ফিরে যাচ্ছে প্রাক শিল্পবিপ্লব যুগে। একে প্রযুক্তির এক চমৎকার রসিকতা বলা যায়। কিংবা আমরা বলতে পারি, গণমাধ্যম তার আবর্তন প্রক্রিয়া সমাপন করে ফিরে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমের যুগে। অর্থাৎ, গণমাধ্যমের মৃত্যু ঘটেছে, তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে সামাজিক মাধ্যম। এক সময় মানুষ যেমন মুখে মুখে খবর ছাড়াতো, হাট বাজারে নিজেদের মতো প্রকাশ করত, নিজস্ব সামাজিক একটা পরিম-ল তৈরি করে নিত। বর্তমান সময়কালে প্রযুক্তির সহায়তায় জনগণ একই কাজ করছেন। তফাৎ অবশ্য আছে। তা হলো- প্রাক শিল্পবিপ্লব যুগে সামাজিক মাধ্যম ছিল মানুষে মানুষে সংযোগ স্থাপনের বিনে পয়সার উপায়। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক মাধ্যম গণমাধ্যমের প্রতি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে- অন্যদিকে, তেমনি ভাগ বসাচ্ছে গণমাধ্যমের মুনাফায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, করপোরেটোক্রেসির এ যুগে গণমাধ্যমের শক্তি বা সক্ষমতার সত্যি কি কোনো বাস্তবতা আছে? ক্ষমতা কাঠামোকে প্রভাবিত করার কোনোরকম সমর্থ্য কি গণমাধ্যমের রয়েছে? নাকি গণমাধ্যমের শক্তি-সক্ষমতা-সামর্থ্য নিয়ে আপ্তবাক্য অতিরঞ্জন মাত্র। প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু বিচিত্র ও বহুমুখীন। ক্ষমতা কাঠামোর ভরকেন্দ্র যেমন রাজনীতি। তেমনি রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে করপোরেট ব্যবসায়িক মডেল। গণমাধ্যম রাজনীতির উপরাপর বিষয়াবলির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে, কদাচিৎ হয়তো গলিঘুঁচির সন্ধান খুঁজছে। কিন্তু করপোরেটোক্রেসির দাপটের সামনে তার শক্তি-সক্ষমতা-সামর্থ্য কেবল সীমিতই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে শূন্য। ফলে গণমাধ্যমকে সত্য প্রকাশের এক শূন্য গহ্বর হয়েই থাকতে হচ্ছে।

পরিস্থিতিভেদে রাজনৈতিক কার্যক্রমের নানান মাত্রা থাকে। সমাজে তার প্রভাবও সুদূর প্রসারী। গণমাধ্যমের পক্ষে রাজনৈতিক কার্যক্রমের এই ব্যাপক প্রভাব ধারণ করা অসম্ভবপ্রায়। গণমাধ্যম কেবল রাজনৈতিক কার্যক্রমের চলমানতাকে তুলে ধরতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে খুব সামান্য মাত্রায় ব্যক্তিগত মতামত বা রাজনীতি পরিচালনার উপায়কে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু করপোরেটোক্রেসির মোকাবেলায় গণমাধ্যমের অসহায়ত্ব-অসারতা এখন আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না। এটা এখন দিনের আলোর মতো বিদিত।

খ্যাতিমান মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়াল্টার লিপম্যান বলেছেন- গণমাধ্যম আয়নার বদলে টর্চলাইট দেখায়। ফলে জনগণ রাজনৈতিক দৃশ্যপটের একটা ঝলকানি পায় মাত্র। পরিপূর্ণ দৃশ্যের দেখা তারা কখনো পায় না। উপরন্তু করপোরেটোক্রেসির আবর্তে গণমাধ্যম ডেমোক্রেসি সম্পর্কে জনসাধারণকে যৎসামান্যই ধারণা দিতে পারে, কখনোই অনুপুঙ্খ বিবরণ হজির করতে পারে না।

গণমাধ্যমের পরিস্থিতি, বাস্তবতা এবং চরিত্র দেশভেদে আলাদা। করপোরেটোক্রেসির প্রভাবে গণমাধ্যম তার নিজস্ব বয়ান তৈরি করে। করপোরেটোক্রেসির উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজনমাফিক জনমত তৈরি করে। মজার ব্যাপার হলো, তারপরও অনেকেই গণমাধ্যমের শক্তিশালী ভূমিকার প্রতি আস্থা রাখতে চান। ডেমোক্রেসির কার্যকারিতা মাপেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিক্তিতে।

গণমাধ্যম তথ্যের সরবরাহকারী হিসেবে জনমতকে প্রভাবিত করে নিঃসন্দেহে। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অথবা ক্ষমতা কাঠামোর নাট-বল্টু কতটা নাড়াতে পারে, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ রয়েছে। ম্যাক্সওয়েল ই ম্যাককমস এবং ডোনাল্ড এল শ’র মতো প-িতদের মতে, গণমাধ্যম যদি জনগণের মনোযোগ নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে চালিত করতে পারে, তাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার জোরটাও তার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, করপোরেটোক্রেসি সেই জোরটার ওপরই আঘাত হানে।

গণমাধ্যমের ওপর করপোরেটোক্রেসির প্রভাব বুঝতে নিচের প্রবণতাগুলো সহায়ক হতে পারে-

বর্তমান সময়ে গণমাধ্যম তার ভোক্তার রুচি ও চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করছে

প্রযুক্তির বিস্তার জনসাধারণকে আরও বেশি তথ্যের উৎসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে গণমাধ্যম জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করতে গিয়ে আস্থাহীনতার জায়গা তৈরি করছে যে ব্যবসায়িক মডেলগুলো গণমাধ্যমের অর্থ জোগায়, তাদের চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

গণমাধ্যম আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠলেও তার ভূমিকা ঠেকেছে করপোরেটোক্রেসির তেলাওয়াতিতে। গণমাধ্যমের উপর্যুক্ত সীমাবদ্ধতার বিপরীতে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সামাজিক মাধ্যম আমাদের সামনে হাজির করেছে ভিন্ন বাস্তবতা। অকল্পনীয় দ্রুততা এবং দক্ষতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভবপর হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক মাধ্যমের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার জায়গাটি হলো, খুব স্বল্পসংখ্যক নির্বাচিত মানুষের হাতে রয়েছে এর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সংরক্ষিত হলেও সংযোগ দক্ষতা অপরিসীম। মানবিক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রথমবারের গণমাধ্যমের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিবেশিত একরৈখিক তথ্য প্রবাহের বাইরে জনগণের নিজস্ব তথ্যের জগতকে প্রসারিত করেছে। 

প্রযুক্তির কল্যাণে তথ্য প্রবাহের প্রাক শিল্পবিপ্লবের যুগে ফিরে এসেছে। ব্লগ, ফেসবুক এবং টুইটার, ক্যামেরা ফোন সামাজিক মাধ্যম হিসেবে নতুন মনে হতে পারে। তবে অতীতে যেভাবে তথ্য সংগ্রহ এবং বিনিময় করা হতো, এগুলো তারই প্রচ্ছায়া মাত্র। ক্রেগ নিউমার্ক বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া নতুন কিছু নয়। জন লক, থমাস পেইন এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে তিনি আধুনিক ব্লগারদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলছেন, ২০২০ সালের মধ্যে মিডিয়া এবং রাজনীতি হবে ভিন্নতর। কারণ ক্ষমতায় অভ্যস্ত লোকেরা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক নেটওয়ার্ক দ্বারা পরিচালিত হবে। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, উইকিলিকস ইংলিশ গৃহযুদ্ধের র‌্যাডিক্যাল পুস্তিকা প্রচারকারীদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে কাজ করছে। অ্যাসাঞ্জ জনগণের সামনে শোষকগোষ্ঠীর সমস্ত রহস্য এবং গোপনীয়তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।

প্রাক শিল্পবিপ্লবের আগে জার্মানিতে মার্টিন লুথারের (১৫১১) ধর্মীয় প্রচার পুস্তিকা প্রায় ষাট লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়েছিল। গোটা জার্মানিতে এ প্রচার পুস্তিকাগুলো বিলি হতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই সপ্তাহের মতো। লুথারের সমর্থকরা এ পুস্তিকাগুলোর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ‘নিউজ ব্যালাডস’ (১৫৮৮) স্প্যানিশ আর্মান্দার পরাজয় সংবাদ এবং জনপ্রিয় সংগীত আকারে প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। থমাস পেইনের প্রচার পুস্তিকা ‘কমন সেন্স’ (১৭৫৭) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপনিবেশীকরণ বিরোধী আলোচনা প্রচার করত। কিন্তু এর প্রচার সংখ্যা ছিল খুবই সামান্য। হাজার খানেকের বেশি নয়। সামান্য সংখ্যায় প্রচারিত হলেও তা জর্জ ওয়াশিংটনের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল।

বিগত কয়েক দশকে হাফিংটন পোস্ট, উইকিলিকসের বিস্ময়কর উত্থানের মাধ্যমে তথ্য প্রবাহ আরও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠছে। উত্থান ঘটেছে লক্ষ লক্ষ ব্লগের। কিন্তু একই সঙ্গে করপোরেট নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের তথ্য প্রবাহ আরও বেশি বিতর্কিত, এবং পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে উঠছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, বিগত পৌনে দুইশ’ বছরে বেড়ে ওঠা গণমাধ্যমের যুগ দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে। করপোরেটোক্রেসি তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় শরণ নিচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। করপোরেট নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ভাবনা-চিন্তাও হয়তো আগামী দিনে নতুন বাঁকমোড় নেবে। 


লেখক : সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh