ফনেটিক ইউনিজয়
অবিস্মৃত স্মৃতি কথা
শওকত আলী

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক  জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়িত করেছেন তিনি। তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়েন

কি আর করা, বাঁধা বিছানাপত্র আবার খোলা হলো। সেদিন রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছিল। সবাই ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছিল। পুন্নিমাসী জানালা দিয়ে এসে ডাকাডাকি করে বলে, ও সালমা দিদি, শুনেছ, কবিগুরু আর নেই, মারা গেছেন। মা খবরটা শুনে বিছানা থেকে উঠে দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন অনেকক্ষণ।
আমাদের বাড়িতে খবরের কাগজ আনা হতো দুপুরের দিকে। বাবা ফার্মেসিতে যে খবরের কাগজটা দেওয়া হতো, সেটা দুপুরে নিয়ে আসতেন। সেদিন মা আমাকে বড় রাস্তার মোড়ে পাঠান একটা খবরের কাগজ কিনে আনতে। আমার মা-বাবা দুজনই রবীন্দ্রনাথভক্ত ছিলেন। আমি নিজেও আমার বড় বোনের বই থেকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা-গল্প পড়েছিলাম। আমার দাদাও তাঁর গল্পের বই পড়েছিলেন। এককথায় রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে আমাদের পুরো পরিবারের খারাপ লেগেছিল।
আমরা বাড়িতে যেতে না পারলেও বাবা ঠিকই তার পরের দিন ট্রেন ধরে রায়গঞ্জ চলে গিয়েছিলেন। হীরালাল নামের এক ভদ্রলোক বাবার ফার্মেসিতে  বসেন, ওষুধ বিক্রি করেন। রোজ বিকেলে মা বড় ভাইকে ফার্মেসিতে পাঠাতেন দেখাশোনা করার জন্য।
বাড়িতে যাওয়ার সময় বাবা বলে গিয়েছিলেন, দুই-তিন দিন পরেই তিনি ফিরবেন। কিন্তু তাঁর দেরি হয়। আমাদের খাওয়াদাওয়ার একটু কষ্ট হয়। যে মুদি দোকান থেকে সারা মাসের বাজার করা হতো, সে দোকানের মালিক পোদ্দার বাবু বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। তাই চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনি এতগুলো জিনিস নগদ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছিল। মা এ অবস্থায় তাঁর হাতের সোনার দুটি চুড়ি স্বর্ণকারের দোকানে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিলেন। কত দিনে বাবা টাকা নিয়ে আসবেন তার ঠিক আছে? কিন্তু বাবা পরের দিনই রায়গঞ্জ থেকে চলে এসেছিলেন।
এদিকে দিন দিন দেশের অবস্থা খারাপের দিকে চলে গেল। বহু লোকই শ্রীরামপুর ছেড়ে চলে গিয়েছে। অল্প কিছু লোক, যাঁরা স্থানীয় বাসিন্দা, বাড়ির মালিক, তাঁরাই আছেন। জিনিসপত্রও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছিল না। দামও চওড়া হতে যাচ্ছে। কেউ কেউ বলাবলি করছিল, এবার জাপানি সেনাবাহিনী আসাম দিয়ে ঢুকবে। বার্মা পর্যন্ত এসে পড়েছে। একদিন দিনের বেলায় সাইরেন বেজে ওঠে। হঠাৎ সাইরেন কেন? রাস্তা দিয়ে তো বাস-ট্রাক ঠিকই চলছে। আমরা আকাশের দিকে চেয়ে দেখি, দেখতে দেখতে ঘাড় বাঁকা হয়ে গিয়েছিল, কোনো প্লেনের নিশানা দেখা যায়নি। আমার বড় ভাইয়ের এসব ব্যাপারে উৎসাহ বেশি ছিল। সে ছাদে উঠে চিৎকার শুরু করে দিল-এই যে দুটি...তিনটি প্লেন। পরে জানা গেল, এগুলো শত্রুপক্ষের প্লেন ছিল না।
পাশে হাইস্কুলের হইচই একেবারেই মিইয়ে গিয়েছিল। ছেলেমেয়েদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেল। আমার মাকেও আর স্কুলে যেতে হচ্ছিল না। রেজাল্ট বের হওয়ার পর যদি পাস করেন, তাহলে স্কুলে যেতে হবে।
বাবা বাড়িওয়ালার সঙ্গে ঝামেলা শেষ করে ফিরে এসে বললেন, পরের দিনই রওনা দিতে। বিছানাপত্র বাঁধা হলো পরের দিন পর্যন্ত। হীরালালকে আসতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তিনি আসতে পারেননি। কারণ তিনি এরই মধ্যে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। বাবার ফার্মেসিতে বসে প্রায়ই আড্ডা দিতেন দুজন তরুণ, সম্ভবত কোনো জুট বা টেক্সটাইলে কাজ করতেন তাঁরা। তাঁদের ডেকে আনলেন, তাঁরা আমাদের বিছানাপত্র ও মালামাল স্টেশনে নিয়ে গেলেন। কিন্তু আরেকটি সমস্যা দেখা দেয়, ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড়। লোকজন বলাবলি করছিল, এভাবে আরও কিছুদিন ট্রেনে ভিড় থাকবে। সবাই দেশের দিকে ছুটছে, কিছুদিন পর ভিড় কমে গেলে বাড়ি যাওয়া যাবে। মালামাল নামানোর সময় তাঁরা বলল। দুই-তিন দিন পরই বাবা আবার দুজন জুট মিলের শ্রমিককে ডেকে আনেন, সম্ভবত তারা বিহার প্রদেশের লোক হবে। তাদের ভাষা শুনে কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। তাদের একজনের পরনে ছিল ধুতি, গলায় মালাও ঝুলছিল। অন্যজনের পরনে পাঞ্জাবি, মুখে দাঁড়ি। যে লোকটির মুখে দাঁড়ি ছিল, তাকে সঙ্গের লোকটি ‘রাম’ বলে ডাকল। মা কিছুটা বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি মুসলমান না, লোকটি হেসে উত্তর দিলÑমুসলমান। ওই যে আপনাকে রাম বলে ডাকল। ধুতি পরা লোকটি বলল-উসকা রাম বলে। আপনি ওকে রাম বলতে পারেন, ফির একরামও বলতে পারেন। মা এরপর তার বান্ধবীদের গল্পচ্ছলে বহুবার বলেছেন বনোয়ারী লাল ও একরামের গল্পটা। বলতেন, মানুষের আসল পরিচয় একটাই-সে মানুষ, এ মানুষটা রামও হতে পারে, একরামও হতে পারে।
আমাদের মালামাল ট্রেনে তুলে দিয়ে লোক দুটি ট্রেন থেকে বাবার সঙ্গে নেমে গেল। সন্ধ্যার অন্ধকারে জানালার পাশে বাবার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন, আবছা আলোয় তাদের মুখ কিছুটা দেখতে পেয়েছিলাম। এখনকার দিনে এমন পরোপকারী মানুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। আর তাঁদের চেহারা পুনরায় দেখতে পেলাম না। শ্রীরামপুরে আমরা আরও দুই বছর থাকি। অক্টোবরের শেষ দিকে, দুই বছর পর আবার অক্টোবর মাসে আমরা শ্রীপুর ত্যাগ করে রায়গঞ্জে চলে আসি। বেশি দিন থাকিনি, মাত্র দুই বছর। কিন্তু এই দুই বছরে বাল্যকাল ও শৈশবকালের স্মৃতি কম ছিল না।
আমার এখনো মনে আছে, বারাকপুর থেকে ট্রেন ছাড়ার পর মায়ের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরের দিন ভোরবেলা পার্বতীপুর জংশনে ট্রেন এসে থামলে মা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙান। চোখ মেলে দেখি, এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার ওভার ব্রিজ আছে। নানা ধরনের পোশাক পর লোক সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে, নামছে। তাদের কারও পরনে ফতুয়া-পাঞ্জাবি, পাজামা; কারও পরনে ধুতি-শার্ট পরা, তবে লুঙ্গি-শার্ট পরা লোকই বেশি। এদিকে দাদা ‘কুলি কুলি’ বলে ডেকে চলেছেন, কিন্তু কোনো কুলি তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। পরে মা কুটুকে আমার বড়বুর কোলে দিয়ে একটা অল্প বয়সী কুলিকে ডেকে আনলেন। অল্প বয়সী কুলিটা চিৎকার করে মাঝবয়সী আরেকটা কুলিকে ডেকে আনলেন। আমার দাদার তখনো দাড়ি-মোছ গজায়নি, হয়তোবা এ জন্যই কুলিরা তার ডাকে সাড়া দেয়নি। যা-ই  হোক, মাঝবয়সী কুলিটা কোনো কথা না বলেই বেডিংপত্র মাথায় তুলে নিল আর স্যুটকেসটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কোন কেলাসকো টিকট? অল্প বয়সী কুলিটা ট্রাঙ্কটা মাথায় তুলে নিয়ে বলল, ইন্টার মে চলো চাচা, ইন্টার মে। ব্রিজ পার হয়ে মা প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিলেন। কুলিকে মা জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক গাড়িতে আমাদের তুলে দেবে তো? কুলি বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ মাঈজি, কুনো চিন্তা করবেন না (বয়স্ক কুলিটি বলল) ইয়ে টারিন পার্বতীপুর জংশন সে নিলকর সিধা চলে যাবে কাটিহার জংশন, দিনাজপুর, রায়গঞ্জ।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect