ফনেটিক ইউনিজয়
স্মৃতিপটে রক্তাক্ত বাংলার স্বাধীনতা
আল মুজাহিদী

স্বাধীনতা হীনতায়    কে বাঁচিতে চায় হে,
             কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব শৃঙ্খল বল    কে পরিবে পায় হে
             কে পরিবে পায়?
কোটি কল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে
             নরকের প্রায়।
দিনেকের স্বাধীনতা,    স্বর্গ-সুখ তায় হে,
             স্বর্গ সুখ তায়।’

রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়ের পদ্মিনী উপাখ্যান থেকে এই উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করতে চাই।
জীবন সমুদ্রের কোথায় ভেসে চলেছি। বিশাল বারিধির তরঙ্গমালা প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রম করে চলেছে কোন তরঙ্গতটের কিনারায় তার থেমে যাওয়া গন্তব্য?
অন্তহীন দিগন্তরেখার নিচে দিয়ে সমুদ্রের যাত্রা। নাবিক সেই ঊর্মিমালার ওপর দিয়েই ভেসে যায়। ভেসে যায়।
সমুদ্র-সময় এবং সময়-সমুদ্রই মানবজীবনের চক্রনেমি। এই চক্রনেমির ঘুর্ণনের কোনো থেমে থাকা নেই। মানুষের জীবনও থেমে থাকে না। যখন থেমে যায় অস্তাচল নেমে আসে জীবনের সব পঙ্কে।
হে পথিক! মানবপথিক তোমাকেও থেমে যেতে হবে। তোমার আকাক্সক্ষা, অনন্ত এষণা সহসাই থেমে যাবে কখন! একটুও টের পাবে না। সেই মুহূর্ত, সেই ক্ষণ-সময়ের দিনটি এসে তোমার ওপর আলিঙ্গনের শ্বেতবস্ত্র পরিয়ে দেবে। ক্ষণপ্রভ জীবনের ইতি টানবে। যবনিকাপাত ঘটাবে। প্রকৃতির ও মহাপ্রকৃতির শৃঙ্খল নেমে পড়বে জীবন-প্রপাতের ওপর। সেই স্তব্ধ জলধারা একদিন মিশে যাবে মহাসমুদ্রের মোহনায়।
আমি জীবনের চারদিকে শব্দ ধ্বনি শুনেছি। এ যেন আমার জীবন স্রোতের জলরাশির শব্দ। টেথিসের জলরাশির তরঙ্গমালার শব্দ। সেই শব্দের সিম্ফনি বেজেই চলেছে অলোকসামান্য আন্দোলিত, আলোড়িত স্পন্দনে, স্বননে-ক্বণনে। শব্দই জীবন স্পন্দন। শব্দই জীবন চক্রের মহাঘূর্ণন। এই চক্রনেমির চালক কে? এই সময়-ঘূর্ণনের অন্তঃস্রোতে জেগে আছে সমস্ত চরাচর, বিশ্ব-জগৎ। সৌর চক্রনেমিটাই সৌরবৃক্ষের উষ্ণ-শীতল ছায়ায় আবৃত করে রেখেছে আমাদের। এর বাইরে তো আমাদের জীবন নেই।
পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার শুভলগ্ন থেকে আমরা কত যে শুভ-অশুভ-শুভাশভের ওপর দিয়ে সাঁতার কাটছি, এর কোনো তল-সানুদেশ নেই যেন। অতলের অতল নিতল গর্ভেই আমরা আপতিত। এখান থেকে উজ্জ্বল উদ্ধার নেই কারোরই। এ কথাটি যেন কখনো আমরা ভুলে না যাই। বিস্মৃত হয়ে না পড়ি বিত্ত-বৈভব, বেসাতির আকর্ষণে।
ভেবে দেখুন তো প্রিয় পাঠকবৃন্দ। আমরা কি কখনও কোথায়ও এক মুহূর্ত থেমে থাকতে পেরেছি? পারিনি কস্মিনকালেও। অসম্ভব এই থেমে থাকাটা। শৈশব কেটে গেছে। কৈশোর কেটে গেল। তারুণ্য-বাহিত জীবন-যৌবন, পৌরুষের পরাক্রমও দিন দিনই নিস্প্রভ হলো। পৌঢ়তা, বার্ধক্যপীড়িত জীবন এসে কুব্জ-ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে এই তো জীবন। জীবন চক্রনেমি। জীবন-স্মৃতির উন্মুখর পত্রালি বৃক্ষবৃন্ত থেকে একটি একটি করে খসে পড়ছে দিন দিন-অর্থাৎ প্রতিদিনই। আমার সকল শব্দ-সমস্ত উচ্চারণ প্রতিদিন ক্ষীণ-ক্ষীয়মান হয়ে পড়ছে। তাই বলে কি থেমে যেতে হবে আমাকে? না, তা নয়। থেমে যাওয়া, থেমে থাকা চলবে না আমার একটুও। এখানে কোনোভাবে। রমাঁ রোলাঁর ভাষায় বললে ও রিষষ I will not rest-আমি থামব না। যাত্রাবিরতি নেই। এ যে চলার, সম্মুখে যাত্রার একটা শৃঙ্খলা। অভিন্ন, অচ্ছেদ্য সিম্ফনি। অচঞ্চল অর্কেস্ট্রা। এখানে বিশৃঙ্খলার কোনো অবকাশ নেই। হৃদয়তন্ত্রীর তারে তারে ঝংকার তুলেই তো আমাদের সবার যাত্রা-অভিযাত্রা। এ ‘যান্ত্রিকতার’ কোনোই অবকাশ নেই। জীবনের সব কানাগলি অতিক্রম করেই তো বিশ্বপরিক্রমা করতে হবে বৈকি আমাদের।
একটি বিষয় ভালোভাবে জানা বিধেয়। জীবনের সঙ্গে কোনো বৈরিতা চলে না। মানবজীবনে মৈত্রী প্রতিষ্ঠার মধ্যেই মুক্তি। জীবন তো কোনো অবহেলার নিঃসঙ্গ, বৈকল্যময়, স্বরাজ-রাজ্য নয়। এখানে সুস্থিতি, সুনীতি এবং সুসম্প্রীতি একান্ত আবশ্যক। এখানে আর কোনো দ্বৈরীতির দ্বৈরথ নেই।
সেই কবে যে জন্মেছিলাম মনেই পড়ে না। স্মৃতিকোষ হাতড়ানো নয়। বাবা-মা’র কাছে যেভাবে যা জেনেছি, শুনেছি, তাই দিয়ে আমার স্থান-কাল, জন্মসূত্র জেনে নেওয়া। কিংবা বলা যায় খুঁজে বের করা। সেই কবে নিজ গ্রাম নারুচীর ফ্রি বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে পড়া। সেই পাঠশালা। সেই পড়ালেখা। কলাপাতায় লেখা। লাউডুগির পাতা দিয়ে লেখার কালি বানানো। শ্লেট-পেনসিলে লেখা। সকালবেলার স্কুলে শিশিরভেজা সিক্ত শ্যামল মাটির ওপর দিয়ে নগ্নপদে হেঁটে যাওয়া। কখনোবা বাবার কলকাতা থেকে এনে দেওয়া চামড়ার স্যান্ডেল পরে ক্লাস করা। আমাদের সময়ে, শৈশবে কাঁধে কাঁড়ি কাঁড়ি বইয়ের বোঝা বয়ে বেড়ানো ছিল না। একালের ছোটোমণি-সোনামণিদের মতন। এত নির্দয়-নিষ্ঠুর ক্লাস রুটিন ছিল না। ‘সিলেবাসে’ শিক্ষকদের মাত্রা জ্ঞান ছিল। বইয়ের ‘কচকচি’, কিন্তু বিদ্যার বহর বা ‘বাহার’ নয়।
জীবনের প্রান্তিক পর্বের দিনগুলিতে অনেক স্মৃতি টুকরো টুকরো-খণ্ড স্মৃতি এসে ভর করে জীবনখাতায়। তবে যেটুকু ধারণ করতে সক্ষম আমার স্মৃতিকোষ, সেটুকুর কোনোই অতিশয়োক্তি নেই মোটেও।
গ্রামের পাঠশালার স্মৃতিটুকু মনের মণিকোঠায় স্বর্ণময় হয়ে আছে। সেই প্রাইমারি স্কুলের দক্ষিণ পার্শ্ব ছেপে স্রোতস্বিনী সরুখাল বয়ে যেত। সেই স্রোতস্বিনীর ওপর দিয়ে উঠে গেছে পাকা শানবাঁধা রাস্তা। সারি সারি দোকানপাট। ওই স্কুলের পূর্ব-প্রান্তে ছিল শামা চাচার টিনের ঘরবাড়ি। সৈয়দ শামসুল হুদা মানে আমাদের শামা চাচা, বস্তু মিয়া, গবামিয়া, কান্টু মিয়া, মীর শামসুদ্দোহা ভ্রাতৃপ্রতিম-আমরা সবাই বিকেলবেলার নরম আলোর ঘাসভরা মাঠে কত খেলা খেলতাম। আজও সে কথা আমাকে ‘হন্ট’ করে। খুবই ‘নস্টালজিক’! স্কুলের মাঠের পূর্ব পাশে শামা চাচার পুষ্পপল্লব বাড়িটি আজও আমার দৃষ্টিপথে ভেসে ওঠে। পশ্চিম পাশে ‘বলাই মামার’ বাড়ি। খালেক মিয়ার বাড়ি। বেলু-বাবুরা ছিল আমার ক্লাসমেট। খুরো মিয়ার ছেলে মযহারুল হক (ছানা) আমার অচ্ছেদ্য, অকৃত্রিম বন্ধু ছিল। ওর সহোদরা ‘পরী’র মতোই দেখতে ছিল। সব সময় ও সুসজ্জিতা, পরিপাটিতে ভরা থাকত। গ্রামে অমন দেহবল্লরীর এবং উন্নত গ্রীবার শ্যামল হৃদয় মেয়ে খুব কমই দেখেছি। আমার ফুফাতো ভাই গ্যাদন, তোতন, কান্তু দাদা এবং আমার মাতৃসমা ফুফুমার কথা আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। তারা আজ আর কেউ বেঁচে নেই। ভোলা-বালা-মালা-টুলু বেলি বুবু এদের স্মৃতিও ভুলে থাকার নয় একটুকুও। আমার বাবার বন্ধু খেলার সাথি খোন্দকার আবদুস সামাদ (একসময়ের মুসলিম লীগ সরকারের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি) স্মৃতিপটে মনের অজান্তেই কেমন করে ভেসে উঠছে। কানুমামা, চান মামা, তুলা মামা, তাঁদের স্মৃতি এখনো জাগরূক। আশ্চর্য বোধ হচ্ছেÑতাদের কারোর কথাই ভুলে যাইনি তো। খোন্দকার রইস নানা ও তার স্ত্রী হায়াতুন্নেসা নানাবুজির কথা ভুলে যাই কী করে! ভোলা যাবে না।
টাঙ্গাইলের সিংনা মীর বাড়ির ছেলে-মীর মজিবুর, মীর খোরশেদ, মীর আজহারুল (অটল), মীর লুৎফুর রহমান ফারুক (আমার সহোদর প্রতিম) তাদের কথা আমার স্মৃতির দিগন্তে এখনো উদ্ভাসিত। আজাদ, সুফিয়া, শেলী, নিলফা-ওরাও আমার ভাইবোন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মধ্যরাতে আকস্মিকভাবে হাঁটতে হাঁটতে শেলীদের আগ তেরিল্ল্যা গ্রামে পৌঁছাই। ১৯৭১-এর এপ্রিল মাস সম্ভবত। ওই রাতটি ছিল বৃষ্টিমুখর। সেই রাতেই আমাদের ৩৫ জন সহযোদ্ধাকে ‘আসুদা’ মিটিয়ে খাইয়েছিল। সে কত ধরনের আহার-খাবার বলে শেষ করতে পারব না। আশুধান্যের ভাত, ঘি, আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, বোয়াল মাছের দো-পেঁয়াজা। খোয়ার এক ডজন মুরগির বাচ্চা (চিকেন) আলু দিয়ে রান্না-কী স্বাদই না লেগেছিল জিবে। অমৃতের স্বাদই যেন। ওই শেলী এখন ঢাকায় থাকে। স্থানটির নাম হয়তো রোকেয়া সরণি কিংবা পর্বতা সেনপাড়া। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা দরকার। ‘আসুদা’ মিটিয়ে খাওয়া মানে পরিপূর্ণ তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া। প্রাচ্যভাষাবিদ পণ্ডিত, বহু ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধানে পূর্বোক্ত ‘আসুদা’ শব্দটির উল্লেখ আছে। এই মুহূর্তে আমার মামাতো বোন খোন্দকার রেবার কথা মনে পড়ছে। রেবা মাতৃসদন হাসপাতালের চিফ মেট্রন ছিল। আমার ছেলে বাপি (শাবিব জামিলী আল-মুজাহিদী) ওর তত্ত্বাবধানে ভূমিষ্ঠ হয়।
আমার লেখার ফাঁকে মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠে এসেছে। অন্য আরও অনেক কথা বাদ রেখে মুক্তিযুদ্ধের কিছু কথা বলব এখন। বাস্তবের নিরিখে-স্মৃতির আখরে উৎকীর্ণ সব বিষয় আশয় এখানে উঠে আসবে।
ষাটের দশক। অগ্নিঝরা কালের সাথি ষাটের দশকের দিনগুলো। মুক্তিযুদ্ধের আগুন দাবানলের মতো দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে এ সময়।
ষাটের দশকের ঊষালগ্ন। আমরা উন্মুখ এবং সর্বতো অর্থে উন্মুখর আমাদের স্বদেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য। আমরা উচ্চারণ করলাম শতকণ্ঠে বজ্রকণ্ঠে-
    জয় স্বাধীন বাংলা॥
    জয় মুক্ত স্বদেশ বাংলা॥
    পাকিস্তান এবং পাকিস্তানিরা বিশ্বাস করত-
ÒGovernment of Punjab”
    “Government of Sindh”
    “Government of N.W. Fontier Province”
    “Government Belutschistan.”
    অর্থাৎ “পাঞ্জাব সরকার”
    “সিন্ধু সরকার”
    “উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ সরকার”
    “বেলুচিস্তান সরকার।”
তাহলে কেন নয় “Government of Bangla” বাংলাদেশ সরকার। এই ঐতিহাসিক দাবিতে বাংলার মাটি ও মানুষদের-উদ্দীপিত, উজ্জীবিত-আলোড়িত-আন্দোলিত করেছি ষাটের আগ্নেয় দশকেই। উদ্বুদ্ধ, ক্ষুব্ধ, সংক্ষুব্ধ করেছি সর্বাত্মক অনুভবে, উপলব্ধিতে। এখানে উন্নাসিকতা ছিল না কোনো। Parochiasm বা অসম্পূর্ণ জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা ছিল না। ছিল শুধুই উদার, সামাজিক জাতীয়তাবোধ ও জাতীয়তাবোধের উদ্বোধন। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করার কারণে কারাবরণ করি ৯ বছরেরও অধিককাল। DPR (ডিফেন্স রুলস অব পাকিস্তান) পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে। পাকিস্তান হুকুমাতের প্রধান ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান দোর্দণ্ড প্রতাপে দীর্ঘ দুই দশকেরও অধিককাল হুকুমাত চালিয়ে গিয়েছে ওই পাকিস্তান ডিফেন্স রুলসের নামে। স্বৈরতন্ত্র, সর্বাত্মক একনায়কত্ব কায়েম করে। গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরে Basic Democracy (বনিয়াদি গণতন্ত্র) ভুয়া গণতন্ত্র চাপিয়ে দিয়েছিল তদানীন্তন পাকিস্তান ও পাকিস্তানবাসীর ওপর। আমরা সমগ্র জাতি সম্মিলিতভাবে যুঝলাম-লড়লাম। পাকিস্তানি সামরিক ব্যূহ ধ্বংস করলাম।
আমাদের কণ্ঠশিল্পী বন্ধু বাংলার স্বনামধন্য আবদুল জব্বার চারণের বেশে আমাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে গাইতে শুরু করলেন-

আগুন জ্বালো খামার ক্ষেতে
আগুন জ্বালো ভাই,
যে ফসলে তোমার কোনো
নাই অধিকার নাই,
সেই শস্যগুলো ভস্ম করো
এক সাথে সবাই;
আগুন জ্বালো খামার ক্ষেতে
আগুন জ্বালো ভাই॥

শিল্পী আপেল মাহমুদও গাইলেন-
ঘরে ঘরে আজ বিদ্রোহ
হাতিয়ার তুলে নাও,
শত্রু শিবিরে হানো আঘাত
বিজয় ঘোষণা দাও॥

অসুরের হাড় কাঠে তোর
লাগুক পায়ের ধুলি ঝড়
বিজলি-বারুদ চমকানো সে
প্রলয়-প্রলয়ংকর
ওরে লাগুক বালি ঝড়...

এই সমস্ত গানের কলিতে, বিপ্লবের, বিদ্রোহের বার্তাবহ বাণীই ধ্বনিত, রণিত হলো।
দিন নেই। রাত্রি নেই। বিরতিহীন আন্দোলন ও সংগ্রামে সারা দেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠল। বাংলার কোথাও-কোনো প্রান্তরে থেমে রইল না। বিপ্লব বহ্নি বহ্ন্যমান। ক্রোধে, ক্ষোভে, সংক্ষোভে ফেটে পড়ল সমগ্র দেশবাসী।
আমরা প্রায়ই কারাগারে বন্দিদশা কাটিয়েছি। অনলবর্ষী বক্তা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নূরে আলম সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, আবদুর রাজ্জাক, ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, আসমত আলী সিকদার, সওগাত-উল-আলম সগীর, আব্দুল আজিজ বাগমার, শহীদুল হক মুনশী, নারায়ণগঞ্জের মনিরুল, ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন, রেজা আলী, আইয়ুব রেজা চৌধুরী, বদরুল হক, হায়দার আকবর খান রনো, জগন্নাথ কলেজের এম এ রেজা আমরা সবাই তখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি। বছরের পর বছর কারাবাসে কেটে যাচ্ছে।
ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমাকে স্থানান্তর করা হলো। ১৯৬৯ সালের ১১ জানুয়ারি সম্ভবত। আমার ডান ঊরুতে একটা অপারেশন করার জন্য। ওটা নিউরো ফাইব্রোমা ছিল। কারাগার থেকে এখানে আসার পর বেশ ক মাস কেটে গেল। আমার সার্জন ছিলেন প্রফেসর নওয়াব আলী আর তাঁর সহযোগী ছিলেন সিলেটের আলী রেজা চৌধুরী।
প্রতিদিন আমার স্বাস্থ্য বুলেটিন ছাপা হতো তখনকার শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার-এ।
একদিন আকস্মিকভাবে আমার ৬ নং ওয়ার্ডে এসে পড়েছিলেন আইয়ুববিরোধী নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো, ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, আফাজউদ্দিন ফকির (এমএনএ) আওয়ামী অফিস সেক্রেটারি সিলেটের নজরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ব্যারিস্টার শওকত আলী খান, তদানীন্তন আওয়ামী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদিকা জননেত্রী আমেনা বেগম, বাংলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম রহমান অন্যান্য ছাত্রনেতা ও কর্মীরা।
জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আমি স্বাগত জানালাম। ভুট্টো স্থিত হাস্যে আমাকে তিনটি গোলাপ ফুল তুলে দিয়ে বললেন, My dear rebel student leader- one rose is for you, second is for revolutionary friends and the last one is of for your beloved| আমি হাসিমুখে বরণ করে নিলাম। ভুট্টো আরও বললেন, Long live Revolution! Inquilab Zindabad! বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।
কোলাকুলি শেষে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ব্যারিস্টার কামাল হোসেন সমভিব্যহারে ভুট্টো সাহেবকে নিয়ে প্রস্থান করলেন।
১৯৬৯-এর ২০ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন। ১১ দফার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। হিমালয়ের শীর্ষ চূড়ায়। প্রধানত ৪ ছাত্রনেতা এই আন্দোলনের অগ্রসেনানী-নূরে আলম সিদ্দিকী, তোফায়েল আহমদ, আ স ম আবদুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় বাংলা একাডেমি মঞ্চে কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। ‘আমার সার্বভৌম বাংলা বর্ণমালা’ কবিতাটি দর্শক-স্রোতাদের পাঠ করে শোনাই। কবিতাপাঠের পর সমাবেশে পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। অনেক অপরিচিত তরুণ-কিশোরদের সঙ্গে করমর্দন হয়। এরপর পুলিশ বেষ্টিত কর্ডন অবস্থায় আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ নং ওয়ার্ডে ফিরে আসি।
কারাগার থেকে মুক্তির আদেশ আসে ২৩ ফেব্রুয়ারি। কারামুক্তি ঘটে গেল। ভার্সিটি চত্বরে সংক্ষিপ্ত সংবর্ধনাও অনুষ্ঠিত হলো। অনেক দিন মায়ের মুখ দেখিনি। যদিও ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাক্ষিককাল অন্তর আমাকে দেখতে আসতেন। কবি সুুফিয়া কামাল এসেছেন বেশ কবার। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবদুল মান্নান ভাইয়ের পত্নীও আমাকে দেখতে এসেছেন কারাগারে-পাক্ষিক ইন্টারভিউয়ে।
ইন্টারভিউ এ বঙ্গবন্ধুর পাশে-শেখ ফজলুল হক মনির সঙ্গেও ইন্টারভিউ ঘটেছে। কারাগারে মাস্টার্স পরীক্ষার নোটস পৌঁছে দিয়েছেন আমার সহপাঠী দাউদুজ্জামান চৌধুরী ও ওবায়দুল ইসলাম।
এ ছাড়া আমার শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক অজিত কুমার গুহ, অধ্যাপক আবদুল কাদির, অধ্যাপক শওকত আলী (কথাশিল্পী), অধ্যাপক মির্জা হারুনুর রশীদ, অধ্যক্ষ সাহদুর রহমান কারাগারে এসে আমাকে দেখে গেছেন। এ আমার পরম সৌভাগ্য। কারাবন্দী জীবনে এ এক আলোকোজ্জ্বল উদার উদ্ধার। তদানীন্তন পাকিস্তানের কারাগারে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইপত্র পাঠ করার সুযোগ পেয়েছি। ব্রিটিশ আমলের অনেক মূল্যবান গ্রন্থ কারাগারের স্মৃতিকে সমৃদ্ধই করেছে বলব।

মানব জীবনে স্মৃতি বড় প্রিয় বস্তু-
সমস্তই স্মৃতি হয়ে যায়।
যে যায় সে যায় তাকে স্মৃতির পাহারা
বুকে তুলে রেখে দেয় যেমন জননী
এবং স্নেহে
সমস্ত শরীরে তার বুলায় দুহাত
স্মৃতি বড় প্রিয়বস্তু।

কবি কবিরুল ইসলাম সত্যি বিশুদ্ধ উচ্চারণ করেছেন। ‘সমস্ত স্মৃতি হয়ে যায়।’ স্মৃতিতে স্মৃতিতে জীবনপাতা যখন ভরে থাকে সে জীবনটাকেও সমৃদ্ধ বা সুন্দর বলা যাবে। সুন্দর স্মৃতি সত্যি সুন্দর জীবনের প্রতীক। জীবন যতটাই দুঃখে ভরে থাক, স্মৃতি কিন্তু দুঃখের অতীত-একরকম সুখময় অনুভূতি। তবে এ দুঃখ আনন্দাশ্রুর মতো করুণ, কাতর, মেদুর, বিহ্বল।
‘আমি যখন স্বাধীনতার কথা বলি, স্বজাতির কথাই বলি। আপন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে সকল জাতির স্বাধীনতায় বিশ্বাস স্থাপন করা যায়।’ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বলেছিলেন-

‘স্বাধীন জাত না হইলে স্বাধীনতার কদর বোঝে না।’
ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন :
‘স্বাধীনতাই স্বাধীনতার শেষ নয়
ধর্ম-শান্তি, কাজ আনন্দ এরা আরও বড়ো।
এদের একান্ত বিকাশের জন্যই তো স্বাধীনতা
নইলে এর মূল্য ছিল কোথা?
[শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-পথের দাবি]
A bean in liberty is better than a comfit in prison অর্থাৎ প্রকৃতিতে স্বাধীনভাবে থাকা ‘সীমের’ চেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত হলো মিষ্টির আবরণে ঢাকা অ্যালমন্ড। অর্থাৎ পরাধীনতা যতই চাকচিক্যময় হোক তা স্বাধীনতার চেয়ে ভালো নয়। যে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত হয় কিংবা সংগ্রামের বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত করে অর্জন করে সে স্বাধীনতার মূল্য অনেক এবং প্রভূত অর্থবহ। যে স্বাধীনতা হারায় সে সর্বস্ব হারায় ‘Who loses his liberty loses all.’ স্বাধীনতা একেবারে স্বর্ণমণিকান্ত এক অন্তহীন সম্পদ।
আমরা আজ স্বাধীনতাপ্রাপ্ত হয়েছি। অংশীদার হয়েছি জীবনের সর্বাংশে। স্বাধীনতা মানে অধিকতর সম্পদশালী হওয়া। এ জন্যই আমরা স্বাধীনতা প্রত্যাশা করি। স্বাধীনতার-পূর্ব শর্ত হচ্ছে সদা সতর্কতা। (Eternal vigilance is the price of liberty)
J. R, Lowel-এর সঙ্গে কণ্ঠে মিলিয়ে বলতে চাই, আমি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক; এর চেয়ে বড় আর কী সে হতে পারে?
Madame Jeanne Roland (ম্যাডাম জাঁ রোনাল্ড)-এর সঙ্গে উচ্চারণ করতে চাই Oh liberty! What crimes are being committed in thy names! ‘ও স্বাধীনতা! তোমার নাম ভাঙিয়ে কত নারকীয় ঘটনা সংঘটিত হয়।’ সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা কেউ কাউকে দিতে পারে না। স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। আমরা তো পাকিস্তানের উপনিবেশের কৃতদাস হতে চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম ওদের সামরিকতাবাদের লোহার শিকলটা পিটিয়ে চূর্ণবিচূর্ণ, দীর্ন-বিদীর্ন করে দিতে। কবি জন মিল্টন এভাবে কথাটা বলেছেন-

“Better to reign in Hell
Than serve in Heaven”
ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা,
তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা॥

আপন দেশকে, স্বদেশভূমিকে পবিত্র জ্ঞান করা সমীচীন। দেশের মাটি-মৃত্তিকার কথা আমরা যখন বিস্মৃত হয়ে যাই তখন দেশ আর দেশ জ্ঞান করা হয় না। দেশে জন্মালেই কিন্তু দেশেপ্রেমের বীজকণা উপ্ত হয় না। দেশপ্রেমিক হওয়া যায় না। দেশের মাটি, ধূলিকণা বুকের গভীরে তুলে নিতে হয়। এই চেতনা যখন জাগ্রত থাকে, দেহের শিরায় শিরায় অনুরণন, স্পন্দন তোলে, তখুনি শুধু দেশপ্রেম, ভালোবাসা, মায়ামমতা অঙ্কুরিত হতে থাকে দেহের প্রান্তরে। ভাঁজে ভাঁজে। স্বদেশের শ্যামলিমা, হরিনাভায় ভেতর স্নাত হতে হয়। অভিষিক্ত হতে হয় অন্তরে-বাইরে।
১৯৬৭ গেল।
১৯৭১ এল।
এই রক্তাক্ত বাংলায়।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা মঞ্চ।
অধুনা সোহরাওয়ার্দী ময়দান।
সূর্যের প্রখর রোদ্দুর। উষ্ণ-উত্তপ্ত আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়েছে মঞ্চের শামিয়ানার ওপর। নিচে, জনগণের সমতলে বিদ্রোহের বহ্ন্যুৎসব।
মহা জনসমুদ্রে উত্তাল তরঙ্গ বয়ে চলেছে। কখন নেতা আসবেন। কখন মহানায়ক মঞ্চে উঠবেন। আবির্ভাব হবে মহাসেনাপতির। মহানায়ক মুহূর্তেই মঞ্চে আবির্ভূত হলেন। এই মহেন্দ্র মুহূর্তের খানিকটা আগেই আমি মঞ্চে উপস্থিত হয়েছি। প্রধানত চার ছাত্রনেতা বাগ্মীপ্রবর নূরে আলম সিদ্দিকী, তোফায়েল আহমদ, আ স ম আবদুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন-তাঁরা যথাসময়ে সমাসীন এবং দণ্ডায়মান। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম নেতারা। মহানায়ক মঞ্চে আরোহণ করে মানুষের মহাসমুদ্রের দিকে হস্ত উত্তোলন করে উদাত্ত আহ্বান জানানোর পূর্বমুহূর্তে বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন-
জয় বাংলা! জয় বাংলা!
জনগণ প্রত্যুত্তর করলেন-
জয় বাংলা! জয় বাংলা!
জয় বাংলা ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকল। দিগন্তে দিগন্তে ভেসে যেতে থাকল মহানায়কের বজ্রবাণী ও ঐতিহাসিক ভাষ্য এবং অগ্নিগর্ভ ভাষণ। তিনি মাত্র ক মিনিটের মধ্যেই কুম্বকণ্ঠে, তীব্র তারস্বরে ঘোষণা করলেন-
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ॥”
বাংলার সংগ্রামের পটভূমি ও ইতিহাসের পরম্পরা পর্যালোচনা করে মাত্র ১৭ মিনিটের বক্তব্য সমাপ্ত করলেন। সেই জনসমুদ্রের বিপুল বিশাল উত্তাল তরঙ্গ-বিভঙ্গ ছড়িয়ে গেল আমার শ্যামল স্বদেশের সবখানে।
৭ মার্চের কালজয়ী স্রোতোধারা তীব্র বেগে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সর্বত্র-২৫ মার্চের রাতের আঁধারে। পাকিস্তানি হায়েনা-দস্যুবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরীহ নিরস্ত্র জনগণের ওপর। ওদের কালো বুটের তলায় পিষ্ট হতে থাকল মানবতা। উন্মত্ত হিংসা প্রতিহিংসার গনগনে আগুনে পুড়ে দাহ্য, ছাইভস্ম হতে থাকল বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের, মহান উত্তরাধিকারের পিতৃপুরুষদের ঘরবাড়ি। ভিটেমাটি। ওরা মানুষের ঐতিহ্যের উদার অবস্থান পোড়াল। ওরা সভ্যতার হৃৎপি-কে দগ্ধ-দলিত-মথিত করল ইসলামের দোহাই পেড়ে। কৃত্রিম-কপট-কুটিল কালপ্রবাহে!
২৫ মার্চ। মধ্যরাতে ওরা নিধনযজ্ঞ শুরু করল। ওরা ভার্সিটির অধ্যাপকদের হত্যা করল। উইমেন্স হলে বিস্ফোরণ ঘটাল। মধুর ক্যান্টিন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিল। সবার কাছে সুপ্রিয়-সজ্জন মধুদাকে হত্যা করল। হত্যা করল সাংবাদিকদের। বাংলার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, দৈনিক ইত্তেফাক-এর বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেনকে (সিরাজ ভাই) হত্যা করল, কবি মেহেরুন্নেসাকে, হত্যা করল কবি শহীদ সাবেরকে। আল বদর, আলশামস রাজাকাররা আঁধারের অশুভ-অসুরদের প্রেতাত্নারা হত্যা করল বুদ্ধিজীবীদের। কী শূন্যতা! মহাশূন্যতা সৃষ্টি করল সমাজের সমাজ-সংস্কৃতির প্রবাহের প্রবক্তাদের। ধিক নরাধম। ধিক ঘৃণ্য-গৃধগ্নু মানবপিশাচদের। প্রাগৈতিহাসের কাপালিকদের ধিক। অতি ধিক। ধিক জাহান্নামের খান্নাসদের।
ওরা বর্গী। ওরা লুটেরা। ওদের ক্ষমা নেই। একদিন গোরা সেনারা হানা দিয়েছিল আমাদের স্বদেশের ধানভরা গোলায়। ওরা হানা দিয়ে সব লুট করে নিয়ে গিয়েছিল।
আমি পাকিস্তানি জমানার গণদস্যুদের উদ্দেশে ছড়া লিখে প্রতিবাদ করেছিলাম-
ছেলে ঘুমোলো, বুড়ো ঘুমোলো
গোর্কি এলো দেশে
ঘুলঘুলিতে কাঁকড়া-কুমীর
ডাঙায় এলো ভেসে॥
মহাকবি ইকবাল বিশ্ববাসীদের দুর্দান্ত প্রতিবাদী শব্দপুঞ্জে আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক, মুটে-মজুর, দুনিয়ার মেহনতি মজলুম মানুষদের-
ওঠো! সারা দুনিয়ার গরিবদের জাগিয়ে দাও
ধনীদের বাড়ির দরোজা দেয়াল ভেঙ্গে দাও
যেই ক্ষেত থেকে কৃষকদের সংস্থান নেই
সেই ক্ষেতের গমের প্রতিটি জ্বালিয়ে দাও।
প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এ যেন এক ভৈরব ভেরী। উচ্চ নাদ হুঁশিয়ারি বার্তা।
নতুন যুগের ডাক।
পঁচিশে মার্চ!
পঁচিশে মার্চের কালরাত্রির বিভীষিকার কথা আমরা প্রায় সবাই জানি। জানি দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা। সেই নিশ্চিদ্র নিরন্ধ কালো অন্ধকারের ভেতর পথ চলতে চলতে, প্রথমে প্রায় রাত্রি শেষে পৌঁছালাম হাতিরপুলে সুধা মামার বাসায় আমি এবং অটল। চুপিসারে একা এবং নিঃসঙ্গ একাকী হেঁটে হেঁটে ওয়াইজ ঘাটের পথ ধরলাম। বুড়িগঙ্গার তীরে পৌঁছালাম। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে। এখানে কাউকে চিনি না। জানি না। সবাই অপরিচিত। পাশেই নবাব স্যার সলিমুল্লাহর প্রাসাদ। আহসান মঞ্জিল। কাছেই এডওয়ার্ড হাউস। এখানে থেকেছি অনেক কটা দিন। এখানে আমার বাবা হালিম জামালী চাকরি করেছেন। ডেপুটি ম্যানেজার পদে। পাশেই কোট হাউস স্ট্র্রিটে মামিদের বাসা। নানা ভাই সেরনিয়াবত বসবাস করতেন। ঢাকা নওয়াব কোর্ট ওয়ার্ডস অ্যান্ড ওয়াকফ এস্টেটসের ম্যানেজার ছিলেন তিনি, তখন সে সময়। ওদিকে আর পা না বাড়িয়ে যাত্রা করব অন্য কোথাও। অন্য কোনো দিকে।
আহসান মঞ্জিল। সম্মুখ সারির দিকে তাকালাম। পাম-ট্রিগুলো নিথর, নীরব নিষ্কম্প দাঁড়িয়ে। আমার দিকে যেন পামট্রির পত্রপল্লবগুলো বিষণ্ন বিদায় সম্ভাষণ জ্ঞাপন করছে। আমি আমার অন্তশ্চক্ষু দিয়ে দেখছি। অনুভব করছি ওই করুণ দৃশ্যগুলো আমার অন্তর্ভূমি থেকে।
বয়ে যায় নদী। নদীর স্রোতোধারা স্মৃতিও ধাবিত জীবন স্রোতের ধারাবাহিকতায়। আমি কোসা ডিঙিতে উঠে মাঝিদের বললাম, ভাই, নদীর ওপার নিয়ে চলো। কেরানীগঞ্জ নামব। কলাতিপাড়া দেওয়ান বাড়ি যাব। দেওয়ান শফিউল আলম আমাদের ছাত্রলীগের লিডার ছিলেন, ওই বাড়িটায়। ‘চেনো, তোমরা?’ চিনি, চিনি, স্যার। উনি তো ঢাকা থাকেন। গেন্ডারিয়া, রজনী বসাক লেন। ওই সামনের বাড়িটা ওনাদের। একটু এগিয়ে যান, সবাই বলে দেবে।’
আমি ওদিকে না গিয়ে, সোজা মানিকগঞ্জের পথ ধরলাম। ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম। কেউ তো আমাকে কোথাও চেনে না। ভয় আর কিসে? রাতের অন্ধকার ছাড়া। আবার নৌকা। আবার ওঠা-নামা। আবার পায়ে চলার পথে, পায়ে পায়ে হাঁটা। তুরাগ নদ দিয়ে সিঙ্গাইর থেকে ঘিওর হয়ে প্রবেশ করলাম টাঙ্গাইল বর্ডার। তারপর নাগরপুর ধলেশ্বরী নদী পাড়ি এলাসিন হয়ে টাঙ্গাইল সদর। আমার মা তখন খুবই অসুস্থ ছিলেন। শয্যাশায়িনী। ক্যানসারের পেশেন্ট। পাক বাহিনী আমাদের ভস্মীভূত করে। বিশ্বাস বেতকা একটা ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। রওশন-দুলালদের বাড়ি। তাঁরা আমাকে আপন জানত খুবই। নিকট আত্মীয়।
টাঙ্গাইল শহরে পৌঁছানোর আগে আটিয়ার আটিয়া মসজিদে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়েছি। এই আটিয়া মসজিদটি ১৬০৯ এ নির্মিত। সুলতানি ও মুঘল নির্মাণশ্বৈলীর অপূর্ব মেলবন্ধন। কুঁড়েঘরের আদলে এর ধনুক বাঁকা কার্নিশ টেরাকোটা ও খোদাই ইটের নকশা বাংলা ওস্তাগর শিল্পীদের অবদান সুস্পষ্ট। এই ইসলাম প্রচারক শাহ বাবা কাশিনুরীর সম্মানার্থে মুঘল সামন্ত সাইদ খান পন্নী মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর মহৎ পূর্বপুরুষ।
পরদিন সকালে বদি ভাইয়ের বাসায় গেলাম। বদিউজ্জামান খান টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি। আর শামসুর রহমান খান শাহজাহান সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের। আমরা একটা গোপন বৈঠক করে টাঙ্গাইল জেলার মুক্তিয্দ্ধুকে সামনে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে টাঙ্গাইল জেলা মুক্তিযুদ্ধ হাই কমান্ড গঠন করলাম। এতে খোন্দকার আসাদুজ্জামান উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব প্রদান করেন। হাই কমান্ডের প্রধান নির্বাহী ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য জননেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য জননেতা ফজলুর রহমান খান ফারুকও হাইকমান্ডের একজন প্রভাবশালী নেতা। সতীর্থ-বন্ধু শওকত আলী তালুকদার, বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম-বীর মুক্তিচঞ্চল গেরিলা কমান্ডার। আমার অনুজ বীর মুক্তিযোদ্ধা শামিম আল মামুন, রাজীব আল জামালী দেহলবীও হাইকমান্ডের অন্তবর্তী ছিল। হানাদার বাহিনীর সাঙাতরা ওকে আটক করে টাঙ্গাইল ডিস্ট্র্রিক্ট বধ্যভূমির সেলে বন্দী করে অকথ্য অমানবিক, বর্বরোচিত নির্যাতন করে ওর হাতে-পায়ে লোহার পেরেক ঠুকে অত্যাচার করে। দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আঘাত হানে। পিঠে গনগনে আগুনে পোড়া তামাক কলকি পিঠে চেপে ধরে সেঁকা দেয়। ক্ষতবিক্ষত হয়ে ওঠে ওর দেহ। দীর্ঘকাল ধুঁকে ধুঁকে সে কিছুদিন আগে অকাল মৃত্যুবরণ করে। ওর নির্যাতনের কাহিনি আমার ভাষায় এখানেই সীমাবদ্ধ থাকল। ওর সঙ্গী গ্রেনেড বাহিনীর অনেককেই হত্যা করেছিলে বর্বর রাজাকাররা। সারা দেশে যে নির্যাতন করেছিল ওই দস্যুরা, সেই তালিকার অধ্যায়ের সূচিতে এদের নামও আসবে প্রথমের দিকেই। প্রথম সারিতে। ওরা প্রত্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা।
একটা বিষয় এখানে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। আমার আম্মু আমার মামার বাড়ি থেকে টাঙ্গাইল এসে ছেলেকে দেখতে যান ওই ডিস্ট্র্রিক্ট ক্যাম্পের টর্চার সেলে। ওখানে পৌঁছাতেই গেইটে আমার আম্মুকে হল্ট করিয়ে দেয়। রাজাকার কমান্ডার ‘ছমছম’। কী বীভৎস নাম। কী পাষ- ধ্বংসাত্মক ওই শব্দটা। ইতিহাসের ‘ছেঁড়াপাতা’ পুড়ে ভস্ম ছারখার হয়ে গেছে ওই বীভৎস নাম।
আমার আম্মু গেটে নামলেন। থামলেন। এক পাকিস্তানি বুট পরা হায়েনা জিজ্ঞেস করল, ‘আপ কিয়া মাংতি হ্যায়। জি, হ্যা।’ আম্মু জবাব দিলেন। ‘কিয়া মাংতি? মেরি লাড়কা ইহা পে হায়। ইসমে শরিফ কিয়া?’ রাজীব খান জামালী (দেহেলবী)। দেহেলবী কেঁও? Some times back, My husband had been at Delhi. My son was born there. So my husband named him as Dehlevee. ‘কিয়া আপ সহি তরিকা সে বাতচিৎ কি?’ ‘I can speak a bit broken urdu’ নেহি, নেহি খুব আচ্ছি কিয়ে কি।’ ‘ঠিক হ্যায়, জরা বাদ আপকি লাড়কা কো মিল জায়েগা ইহা পে।’ আমার আম্মু বললেন,
‘ঠিক হ্যায়, আপকা মর্জি। শোকরিয়া।’
পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন হুকুম করল, ‘ওহ কালপ্রিট ইহা পে হাজির করো।’ দেহেলবীকে ডেকে আনল আম্মুর সামনে। ‘ইস কালপ্রিট কো পুরি নজর সে দেখখিয়ে মা।’ ‘আয়েন্দাহ কাল উসকা কতল হুকুম হ্যায়।’ দেখিয়ে বেটা, মা কি নজর কোয়ি বাচ্চা কালপ্রিট নেহি। মা আওর আল্লাহ সুবহানতা’লা নজর মে সব বাচ্চে বরাবর হ্যায়।’
এসব কথাবার্তার ফাঁকে ক্যাপ্টেনের চোখেমুখে কেমন একটা বিদ্যুৎরেখা ভেসে ওঠে। দেহেলবী আম্মুর সামনে হাজির হলো ওই বদমাশের বাচ্চাদের হুকুম হলো।
‘আম্মু কাল ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ওরা আমাকে কতল করবে। আমার লাশটা তুমি নিয়ে যেও।’ দেহেলবী বলল।
সম্মানিত সহৃদয় পাঠক। আমার স্বপ্নের এই খোয়াবের তাৎপর্য খুঁজে পাবেন। পরে জানলাম আমার সহোদর দেহেলবী হানাদারদের হাতে বন্দি। ইতিমধ্যে অনেক ঝড় উথাল-পাতাল করেছে। এই কথা শোনার পরপরই আমার আম্মু ডিস্ট্রিক্টের বন্দি ক্যাম্পের সামনে লুটিয়ে পড়লেন। কে তাকে ধরে? কে তাকে ওঠায়? কোন হাসপাতালে নিয়ে যায়! গলায় ঝোলানো কোরআন শরিফ দেখে থমকে যায় ক্যাপ্টেন কমান্ডার।
‘ইয়ে কিয়া হো গিয়ে? ওঠনা চাহিয়ে। আম্মা হাম আপকি লাড়কা কো ছোড় দে দিয়েঙ্গে। আপ মিট্টি সে উঠিয়ে। ওঠ জানা, ওঠ জানা, আম্মি। মাফ কিজিয়ে গা।’
আম্মুকে ধরাধরি করে রিকশায় তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে দিল, দেহেলবীর কয়েকজন নিকট সঙ্গী, সুহৃদ। আম্মু সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। ফাস্ট এইড দেওয়ার পর খানিকটা সুস্থ বোধ করেন তিনি।
পরের কথা হলো খোন্দকার আবদুস সামাদ উকিল সাহেবের বাসায় আম্মুকে নিয়ে যায়। পৌঁছে দেয় মামীর কাছে। আম্মুর এ করুণ দশা দেখে মামি ঘাবড়ে যান। মামি শক্ত নার্ভের মানুষ। তাহলে হবে কী? ধীরে, শান্ত মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন, খোকা বাবুর মা, আপনি এখন কেমন ফিল করছেন? মুখে একটুসা পানি দিই?
আম্মু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, জি ভাবি।
আল্লাহর হুকুম- সেটি অগ্রাহ্য করা যায় না। আম্মু সামাদ উকিল মামার বাসায় ফিরে এলেন মারাত্মক অসুস্থতা নিয়ে। এর পরপরই দেহেলবীর বন্ধুরা এসে খবর দিল, ‘দেহেলবীকে হানাদাররা ছেড়ে দিয়েছে। খালাম্মা, দেহেলবী ভাই এখন মুক্ত।’ তখন শহরে তেমন রিকশা দেখা যাচ্ছিল না। একটা ঠেলাগাড়িতে চেপে ওরা দেহেলবী ভাইকে নিয়ে আসার খবর শুনে আম্মু বিস্ময়ে হতবাক। আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে চোখের কোটর ছেপে। দুহাত তুলে শোকর গুজারি করলেন। ‘আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করো। যার যার মায়ের ধনকে তাদের কোলে ফিরিয়ে দাও।’
ঠেলাগাড়ি থেকে দেহেলবী নামল। ওর বন্ধুরা গা ঢাকা দিয়ে, সংগোপনে শহরে এসেছে। কখন কী ঘটে বলা যায় না তো। এই গভীর আশঙ্কার মধ্যে মফস্বলের গোপন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছে ওরা দেহেলবীর সন্ধানে। মামার বাসায় মা ও ছেলের সাক্ষাৎ ঘটল, আড়াই মাস পর। দেহেলবীর কান্নার রোল থানাপাড়ার ওই বাসার চৌহদ্দি পেরিয়ে সদর রাস্তায় আছড়ে পড়ল। সদরে শান্তিকুঞ্জ জমিদার বাড়ি। ওই বনকুঞ্জের শ্যামলতার পত্রে পত্রে দেহেলবী ও আম্মুর অশ্রুকণা ভাসিয়ে নিয়ে গেল। গুমোট, শোকার্ত বেদনাবিহ্বল বাতাসবালিকারা। দেহেলবীর দেহে ছিল সাদা আদি খদ্দরের চাদর। ও চাদরে লেগে আছে রক্তচিহ্ন। তামাকের কলকে পোড়া আগুন চেপে ধরেছিল শত্রু-হায়েনারা। পিঠের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। হাতের ফাঁকে-ফোঁকরে লোহার পেরেক ঠুকে দিয়েছিল। আর কাঠের বোর্ডের ওপর দাঁড় করিয়ে লোহার পেরেক ঠুকেছিল পায়ের পাতায়। এর ওপর বুট জুতার লাথির আঘাত। এই দৃশ্য দেখে সেদিন অন্তরিক্ষ  কেঁপে ওঠেছিল। আসমান ভেঙে পড়েছিল। মামি, মিনা, হালিমা দেহেলবীর গায়ের চাদর খুলে দিচ্ছিল আস্তে আস্তে। ব্যথাজর্জরিত দেহ। আহ্ উহ্ শব্দে অস্থি হয়ে পড়েছিল দেহেলবী। জানে বেঁচে এসেছে এটাই বড় কথা।
“আম্মু একটু আস্তে খোলো।” বরিক পাউডার গরমপানি মিশিয়ে ওর দেহে জড়ানো চাদর খুলতে মিনিট চল্লিশের মতো লেগেছিল। যুদ্ধ শেষে আমি কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরে এসে টাঙ্গাইল চলে আসি। আমি কলকাতা খোন্দকার আসাদুজ্জামান (মঞ্জুর ভাই)-এর বাসায়ই দেলেবীকে ক্যাপচার করার খবরটা প্রথম পাই। আগরতলা থেকে খসরু-মন্টু-সেলিম কলকাতা পৌঁছে দেহেলবীকে পাক বাহিনীর ক্যাপচার করার খবরটা আমাকে জানিয়েছিল। এক রাত্রিতে স্বপ্নে দেখলাম, আমার মা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছিলাম, রাত্রির শেষ প্রহরে। আমার সম্পর্কের এক নানাবুজির বাসায় (লতা নানি) রাত্রি যাপন করেছিলাম। আমার এমন অস্থিরতার আওয়াজ পেয়ে লতা নানি আমার হাতে একগ্লাস পানি তুলে দিয়ে বললেন, “নাতি ভাই খাও।” টাঙ্গাইলের হেমনগরের মোশাররফ নানা ভাই তখন আমার শয্যাপাশে দাঁড়াল। স্বপ্নের ঘোর কাটতে না কাটতেই ফজরের নামাজ আদায় করে কলকাতা শেকসপিয়ার সরণিতে চলে এসেছিলাম। এর পূর্বে মঞ্জুর ভাইয়ের (খোন্দকার আসাদুজ্জামান) বাসায় ‘কাসানা’তে ছুটে গিয়েছিলাম। পার্ক সার্কাস স্ট্রিটে ওই বাড়ি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) চাচা হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাসস্থান ছিল ওটা। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অর্থসচিব কে এ জামান ওই বাড়িতেই থাকতেন, প্রবাসকালীন। তিনি দেহেলবীর খবরটা ওখানে আমার পৌঁছানোর কিছুটা আগেই জেনেছিলে। আমার স্বপ্ন দেখার রেশটা দেহেলবীর দুঃসময়ের ওপর গিয়ে বর্তায় যেন। আমার ভেতর সহোদরের রক্তের ধমনীর মর্মস্রোত বয়ে যেতে থাকে। এই মর্মান্তিক খবরে মঞ্জুর ভাই দুঃখ প্রকাশ করলেন আন্তরিকভাবে। বললেন, ‘দেখো, আল্লাহ ওকে রক্ষা করবেন আমার বিশ্বাস’।
অতীত দুর্যোগ মুহূর্তের সমস্ত ক্লান্তি-অবসাদ মুছে ফেলে কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরে এলাম ১০ জানুয়ারি। যশোর বেনাপোল হয়ে ট্রেনযোগে। যদিও ‘ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি’ আমাকে একার জন্য ফ্লাইটের টিকিট দিয়েছিল। আন্তরিকভাবে অনুভব করলাম, আমি একা বিমানযোগে দেশে ফিরব না। বরং সবাই একসঙ্গে ফেরার আনন্দ ঢের। ফেরারি দিনের পর এই এক সুন্দর সুযোগ। প্রাণবন্ত মুহূর্তে একসঙ্গে ফেরা।
যুদ্ধের দিন রাত্রি বড়ই দীর্ঘ, দীর্ঘতর, সহসা শেষ হয় না। জামালপুরের ভাটারায় কিছু সময় ছিলাম। ওখানে প্রফেসর রাব্বানীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে। বোমা-বিশারদ ছিলেন। ওখানে আবার ফজলুল করিম মিঠু (ছাত্রনেতা, ভিপি সা’দত কলেজ, করটিয়া) আমার বিশেষ বন্ধু। কারাবরণকারী নেতা। বোনেরও শ্বশুরবাড়ি ভাটারা। গেনু, আমাদের এক বিশ্বস্ত সহোচর ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় স্ট্রাটেজিক খোঁজখবর এনে দিত। এখন বেঁচে আছে কি না জানি না। ওখানে গুলজার মামার বাড়ি এবং সনি চাচার শ্বশুরালয়। ভাটারা থেকে কয়েকবার নদীর সাঁকো পার হয়ে শ্যামগঞ্জ কালীবাড়ি গিয়েছি। নাহার ফুফুর বাড়ি। ছোট-মোটো বাড়ি। বাজারের ওপর। তার অন্তর ও আত্মার দুয়ারটা বড়, বিশাল ও প্রশস্ত ছিল। আদর-যত্ন, স্নেহের কমতি ছিল না কোনো। ফুফু আমাদের দোয়া করতেন।
একদিন খুব ভোরে হাঁটতে হাঁটতে জাফরশাহী রেলস্টেশনের দিকে যাই। অপরিচিতজন। অপরিচিত মুখ। কেউ কেউ সন্দেহের চোখেও তাকায় আমার দিকে। জিজ্ঞেস করল, “স্যার আপনার বাড়ি কোথায়?” জবাব দিলাম “এখানেই।”
“আপনি কি চাকরি করেন? ছাত্র? মাস্টার? ওই বাড়িটা দেখছেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের বাড়ি।”
জিজ্ঞেস করলাম “কী নাম?”
“খোন্দকার আশরাফ হোসেন। কবিতাও লেখেন। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল। কাজী নজরুল ইসলামের মতো। খুব ভালো মানুষ স্যার। সবার সঙ্গে মেশেন। হাসিখুশি কথা বলেন।”
“বলুন তো কোন বাড়িটা?”
“ওই যে দেখছেন কাঁঠালগাছ বেষ্টিত বাড়িটা। খুব আম-জাম কাঁঠাল ফলে।”
আমি লোকটাকে আর কোনো কথা জিজ্ঞাসা না করে সোজা খোন্দকার আশরাফ হোসেনের বাড়ির দহলিজের দিকে পা বাড়ালাম। দেখি, বাংলা ঘরের জানালাটা খোলা। আশরাফ ঘুমিয়ে আছে। নিশ্চিত হবার পর জানালায় হালকা নক করলাম। “ওঠো। ওঠো।”
“কে? কে?”
আমি, ‘মুজাহিদী ভাই’।
‘আপনি’?
‘হ্যাঁ, আশরাফ’।
‘কখন, কোত্থেকে এলেন’?
‘কাছেই, ভাটারা গুলজার মামার বাড়ি থেকে। বেশি কথা বলার সময় নেই’।
‘তুমি কবে এসেছ বাড়ি’।
২৬ মার্চ। ভোরের ট্রেনে। ওই রাতেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কবিতা লিখেছি। হন্তদন্ত হয়ে পড়েছিলাম। এখন কবিতার পা-লিপি ঝোলায় পুরে রাখো। স্বাধীনতার পর অনেক কবিতা লিখো। সঙ্গীন হাতে তোলো। এখন “ঘরে ঘরে আজ বিদ্রোহ/ হাতিয়ার তুলো নাও/ শত্রু শিবিরে হানো আঘাত/ বিজয় ঘোষণা দাও।”
‘আপনিও কবিতার শব্দই উচ্চারণ করলেন’।
‘উচ্চারণ করলাম ঠিকই। আবেগ আক্রান্ত হয়ে’।
‘হাত-মুখ ধোন। হালকা নাশতা করুন। কাঁঠাল-মুড়ি খান’,
গাছে গাছে কাঁঠাল আম ঝুলে আছে।
‘শর্টকাট কিছু আনো’।
‘আপনি জানালার পাশে টেবিল চেয়ারের বসুন। ব্যবস্থা করছি’।
আশরাফ ভার্সিটি জীবনে আমার সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। ছাত্রলীগ করত। ‘কালচক্র’ সাংস্কৃতিক সংস্থার সঙ্গেও সক্রিয় ছিল। খাজা নিজামউদ্দিন (বীর উত্তম) আশরাফের সহপাঠী ছিল। ইবরাহিম রহমান, কায়সার রিয়াজুল হক, তারেক ফজলুর রহমান এরাও ছাত্রনেতা হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর ড. খোন্দকার আশরাফ ঢাকা ভার্সিটির ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান হন। জীবনের শেষে কাজী নজরুল ইসলাম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর হন। চাকরিরত অবস্থায়ই লোকান্তরিত হন।
আমরা এপ্রিলে জামালপুর-ধানুয়া কামালপুর বর্ডার পার হওয়ার পথ খুঁজছি। রামরামপুর বর্ডার-সংলগ্ন কায়সার রিয়াজুল হকদের বাড়ি। ওখানে যাওয়ার পর সীমান্তের দিকে ছুটলাম আমরা কজন-সৈয়দ আবদুল মতিন (শ্রমিক নেতা), শামিম আল মামুন (ছাত্রনেতা), আমার ভ্রাতুষ্পুত্র খোন্দকার আশরাফুল ইসলাম (অধুনা আশরাফ মির্জা নামে কবিতা লেখে) সীমান্ত পার হতেই বিএসএফের হেলমেটধারী কজন পথ আগলে দাঁড়াল। বললাম, মহেন্দগঞ্জ যাব। আব্দুল গফুর সাহেবের বাড়ি। গফুর মামা ওখানে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, কংগ্রেসবাদী। তিনিও ওই মুহূর্তে আমাদের সামনে এসে হাত বাড়ালেন। আসলে গফুর মামা-রিয়াজুলের মামা। আমরা সবাই তাকে মামা বলি। ওখানে কয়েক রাত্রি কাটালাম। দু-তিনবার তিনি পালের খাসি জবাই করে আমাদের খাইয়েছেন। সে অনেক আদর-আত্তি করেছেন। বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। গফুর মামা ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন নেগীর সঙ্গে পরামর্শ করে মহেন্দ্রগঞ্জে ক্যাম্পের ট্রেনিং সেন্টারে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গেরিলা ওয়ারফেয়ার’-এর প্রশিক্ষণ দিতে বললেন। কয়েক দিন লেকচার ফোরামে বক্তৃতা প্রদান করতে থাকি।
এরপর কলকাতায় মঞ্জুর ভাইকে টেলিগ্রাম মেসেজ পাঠাই Reached Mohendraganj. Kindly arrange my passage to Calcutta. Ready to render my humble service for the nation|
মঞ্জুর ভাই কলকাতার এয়ার টিকিট অ্যারেঞ্জ করে পাঠান আমার জন্য। সাংসাংগিরি হয়ে কলকাতার পথে প্রথমে যাত্রা করি আসাম। ওখানে এক রাত আর্মি কোয়ার্টার্সে কাটাই। এক কর্নেল এসে আমকে জিজ্ঞাসা করলেন, Do you have any fire arms? Yes. I do জবাব দিলাম। উনি হ্যান্ডওভার করতে রিকোয়েস্ট করলেন। আমিও আমার অটো পিস্তলখানা তাকে দিয়ে দিলাম। ফ্লাইটে ওঠার বন্দোবস্ত করে দিলেন ওরা।
কলকাতা এয়ারপোর্টে পৌঁছলাম। তখন সন্ধ্যারাত। ওখান থেকে ট্যাক্সি কার যোগে থিয়েটার রোডে এসে পড়লাম। বাংলাদেশের প্রবাসী অফিসে।
প্রথমেই সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে মিলিত হলাম। কুশল জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি আবদুর মান্নান সাহেবকে ফোন করলেন। ‘মান্নান, মুজাহিদী তো আমাদেরই লোক, Try to utilize his talent’।
আমিও যথারীতি বালু হক্কক লেনে চলে গেলাম। সাপ্তাহিক জয়বাংলা কাগজের অফিসে।
মান্নান ভাই টাঙ্গাইল পরিস্থিতি-পরিজন সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমিও তাদের কুশলাদি জানালাম। উনি স্মিতহাস্যে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রাফিয়া আখতার ডলি কোথায়’? বললাম, ‘ভালো আছে, ওরাও আসছে’।
সাপ্তাহিক জয়বাংলা পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিলাম। প্রথম সম্পাদকীয় লিখলাম, ‘ইতিহাসের ন্যায়দণ্ডে ইয়াহিয়া খানের মুক্তি নেই’-শিরোনামে। পরে জেনেছি, রণাঙ্গনে এর প্রভাব পড়েছিল প্রবলভাবে। কলকাতা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সভা সেমিনারে প্রায়শই অংশ নিচ্ছি, বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান করছি। এসব অনেক সেমিনার আয়োজনে টাঙ্গাইলের কবি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিব তারাপদ রায়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল। কলকাতা আলীপুর সেন্ট্রাল জেলের পাশে এক বিশাল অডিটরিয়ামের সভা-সমাবেশে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তৃতা দিয়েছি। আলীপুর সেন্ট্রাল জেল-সংলগ্ন সেমিনারে কবি কাজী নজরুল ইসলামের পুত্র কাজী সব্যসাচী, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবি ও কথাশিল্পী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। ওখানে টাঙ্গাইল-নাগরপুর থেকে বাড়ি করেছেন জগদীশ সাহা। আমার বালক বয়সের বন্ধু সহপাঠী জগদীশ সাহা সঙ্গী-সাথী উদ্যোক্তাদের নিয়ে উলু ধ্বনিতে মুখরিত করেছিল আলীপুরের আকাশ-বাতাস। কী এক আনন্দমুখর, উদ্বেলিত পরিবেশ। আমার নামের ওপর সেøাগান হয়েছে-জয় বাংলার আল মুজাহিদী এসেছে, আলীপুর জেগেছে। পশ্চিমবঙ্গ ধন্য-পশ্চিমবঙ্গ জেগেছে। সেই সঙ্গে কাজী সব্যসাচীরও জয়ধ্বনি।
ভেবেছিলাম আমার এ লেখাটি আরও অনেক দীর্ঘ করব। কিন্তু ম্যাগাজিনের আয়তন পরিসরের কথা ভেবে সংক্ষেপেই শেষ করব।
পরদিন কলকাতা ফিরে এলাম, সবাই। নয়াদিল্লি All India International Youth Conference-এ যোগদান করব বিশেষ অতিথি হিসেবে। প্রস্তুতি নিচ্ছি। ট্রেনযোগে নয়াদিল্লি যাত্রা করলাম। আধনিক সুসজ্জিত ট্রেনের সেলুনে বেশ আয়াশেই কেটে যাচ্ছিল মুহূর্তগুলো। সঙ্গে কায়সার রিয়াজুল হক, শামিম আল মামুন এরা অনেকেই ছিল। দিল্লি স্টেশনে ট্রেন থামল। ব্যানার হাতে DUCSU-র অর্থাৎ Delhi University Central Students Union-এর ভিপি শ্রী ভগবান সিংহ, অন্য অফিস বিয়ারার শ্রী ললিত খান্না, অমৃসর ইউনিভার্সিটির হিন্দি ও সংস্কৃত বিভাগের প্রধান লক্ষ্মীকান্ত চাওলা-তারা আমাদের স্বাগত জানালেন। বিরাট ব্যানারে লেখা ছিল অ A fraternal Deligation Led by Sree Al Mujaheedy, Welcome, Welcome to Delhi.
এই মহাসম্মেলনের উদ্যোক্তা-আয়োজক ছিল অল ইন্ডিয়া বিদ্যার্থী পরিষদ। এই ছাত্র সংগঠনটি কংগ্রেসপন্থীই ছিল তখন। কোটলাশাহ গ্রাউন্ড প্যারেড ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য মহাসম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন ভারতের তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী সি সি তাগলা। সময়টা ১৯৭১ এর ২ ও ৩ অক্টোবর। প্রচণ্ড হাড় কাঁপানো শীত চলছে নয়াদিল্লিজুড়ে। মঞ্চে উঠলাম। চারদিকে তাকালাম। লাখো ডেলিগেটস ভরা ময়দান। উপচে পড়েছে তরুণরা, মানুষের ঢল। মহাসমুদ্র যেন তারুণ্যের।
আমি ঠায় মঞ্চে বসা। শীতও জেঁকে বসেছে আমার ওপর। সাঁতারু বন্ধু ব্রজেন দাস মোটা খদ্দরের একটা পাঞ্জাবি উপহার দিয়েছিলেন। জাকারিয়া স্ট্রিট থেকে পনেরো টাকায় খরিদ করেছিলেন। ওটা পরেই মঞ্চে উঠেছি। এর ওপর একটা ওয়েস্ট কোটও পরেছি। তবু শীত মানছে না।
একটা কথা আগেই বলে নেওয়া ভালো ছিল। দিল্লির ভার্সিটির তরুণ বন্ধুরা আমাকে ইংরেজি অথবা হিন্দিতে বক্তৃতা দিতে অনুরোধ করেছিলেন। বিশেষ করে ভগবান সিংহ এবং ললিত খান্না। একটা মজাদার শর্তে। শর্তটা এমন- ওরা আমাকে খোসকা খাওয়াবে, গাছগাছালি ভেজিটেবলের পরিবর্তে। ওরা হেসে রাজি হয়ে গেল।
“তুম সব জয় বাংলাওয়ালে হ্যায়, গোশত, মাছলি খাতে হ্যায়। হাম সব ইহা দিল্লিওয়ালে ভেজিটারিয়ান হ্যায়। ঠিক হ্যায় ইয়ার, হাম তুঝে খোসকা পিলাওঙ্গে। শাহী মসক কে বগল মে এক খোসকাওয়ালা হ্যায়। ওহা মিল জায়েগে”।
“No problem friend! We’ll arrange all these. It is hundred percent true.”
ভগবান সিংহর কথায় ভেতরটা চাঙা হয়ে উঠেছিল। বেশ কদিন হিন্দি মশক করতে শুরু করি। হিন্দি শব্দকোষ, লোগাত খরিদ করে এনে দিয়েছিল ললিতখান্না। ওরা পাঞ্চাবি শিখসম্প্রদায়ের। মাথায় পাগড়ি পরা।
মঞ্চ থেকে আমার নাম ঘোষণা করা হলো। Now Mr. Al Mujaheedly will be garlanded by Sree Vogoban Singh- আমিও উঠে দাঁড়ালাম। ফুলের মালায় পুষ্পিত হলাম। আমার গলার মালা খুলে ভগবান সিংহের গলায় পরিয়ে দিলাম। এই বলে জয় বাংলার পক্ষ থেকে দিল্লিবাসীদের গলায় তুলে দিলাম এই পুষ্পমাল্য। ওরা এও ঘোষণা দিয়েছিল আমাদের অতিথি ভারতীয় জাতীয় ভাষা হিন্দিতে কথা বলবেন। এই ঘোষণার পর মুহুর্মুহু করতালি।
আমি প্রথম ১ মিনিট বাংলা ভাষায়ই সম্ভাষণ জানালাম দিল্লিবাসীদের। কেননা আমাদের জাতীয় ভাষা রাষ্ট্র ভাষা বাংলা। শহীদ, রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের রক্তের উত্তরাধিকার- আমি তাই নিজ ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। আমি এখন সর্বভারতীয় হিন্দি ভাষায় ভাঙা ভাঙা শব্দে উচ্চারণ করছি আমার বলা কথাগুলো।
ভাইয়ো বহেনো। আপকি ভাষা হিন্দি হ্যায়। লেকিন মেরে ভাষা বাংলা হ্যায়। ইয়ে দোনো ভাষা মে এত্নে সম্মন্ধ হ্যায়, কে যেয়েসে শওহর আওর পত্নী মে হ্যায়, লেকিন ম্যায় নেহি বাতাউঙ্গা কোনসে ভাষা শওহর আওর পত্নী হ্যায়।
মোদ্দা কথাগুলি হলো এই-
দিল্লির অধিবাসী, প্রিয় ভাইবোনেরা :
আমি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপনাদের আন্তরিক সম্ভাষন জ্ঞাপন করছি। আমার মাতৃভাষা বাংলা। আমার জাতীয় ভাষা বাংলা। আমার রাষ্ট্রভাষাও বাংলা। এই মহান প্রাচীন ভাষার জন্য আত্মদান করেছেন শহীদ রফিক, সালাম, জব্বার বরকত। তাঁদের আত্মদান আমার মহান উত্তরাধিকার। তাই সর্বপ্রথম আমার ভাষায় ভারতবাসীদের সম্ভাষণ জানালাম।
আমি এখন আমার ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে আমার মুক্তিযুদ্ধের কথাগুলো বলব। আমি প্রথমেই ভারতবাসী এবং বিশ্ববাসীকে স্বাগত জানাতে পেরে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত এবং গর্বিত। আমি জানাতে চাই-দেখুন আপনাদের ভাষা হিন্দি। আর আমার বাংলা। বাংলা আর হিন্দিতে সম্বন্ধটা এমন নিবিড় যে স্বামী ও স্ত্রীর বন্ধনের মতোই। কিন্তু আমি বলব না কোন ভাষাটা স্বামী আর কোন ভাষাটাই বা স্ত্রী। এখন এটাই বলব উচ্চস্বরে- আপকে সামনে মেরে খেয়ানাত কে আগে ইয়ে মেরে পুছনা হ্যায় কেয়া, হামারে লিডার শেখ মুজিবকে মুক্ত করনে কে লিয়ে আপলোগ প্রস্তুত হয়, ইয়া তৈয়ারি হ্যায় তো মেহেরবানি করকে নারা দিজিয়ে। অর্থাৎ আপনাদের সামনে আমার চিন্তাধারা ব্যক্ত করার প্রথম লগ্নে জিজ্ঞাসা করব। আপনারা কি আমাদের শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করার জন্য তৈরি আছেন কি নেই? এই কথা সঙ্গে সঙ্গে শ্লোগান উত্থিত হলো-
আওর এক ধাক্কা দে দো, পাকিস্তানকে তোর দো, আরও একটা আঘাত হানো, পাকিস্তান ভেঙে চুরমার করো। এখন এটা আমার দু’নম্বর প্রশ্ন-বাংলাদেশ কে বারে মে, আপলোগ, ভাইয়ো, বাহেনো, সহায়তা দেনে কি প্রস্তত হ্যায় তোন নারা দিজিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপনারা প্রিয় ভাইবোনেরা তৈরি আছেন কি না জানতে চাই আমি। সমস্বরে ধ্বনিত হলো,  We want attom bomb, Destroy Pakistan আমি সব শেষে জানতে চাইলাম আমাদের সমরাঙ্গনে আপনারা সরাসরি যেতে প্রস্তুত? আমি হিন্দিতে বললাম, ‘ভাইয়ো, বাহেনো, কিয়া আপলোগো হামারে সমরাঙ্গন মে শামিল হোনে কি লিয়ে প্রস্তুত হ্যায়, ইয়া নেহি’।
ওরা স্লোগান দিলেন-
আলাগ্ ভাষা আলাগ দেশ
ফিরভি আপনা এক দেশ।
অর্থাৎ, আমাদের আলাদা ভাষা আলাদা রাজ্য
সর্বোপরি আমাদের একই দেশ।
দিল্লিতে, আমার একান্ত উচ্চারণে ভারতবাসীদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াস করেছিলাম। পরিশেষে আমি বলেছিলাম, Our liberation struggle will be crowned with success and there  is no power on earth which can undo our historical struggle.
চার দেয়ালের ভেতর মানবিক শক্তির সম্ভাবনা ও বিকাশকে বন্দি করে রাখা যায় না বেশি দিন। লাঞ্ছিত করা যায় না পবিত্র মানবাত্মাকে। আমরা জানি, মানবসভ্যতাকে পাকিস্তানের হায়েনাবাহিনী সেদিন কী বীভৎস কায়দায় লাঞ্ছিত করেছিল, এর কোনো নজির নেই দুনিয়ার কোথাও। তাজ্জব বনে গিয়েছে বিশ্বসম্প্রদায়। হতবাক হয়েছিল সমসাময়িক পৃথিবী। লাননত জানিয়েছিল পাকিস্তানের খুনি বর্বরদের। ধিক ওদের ধিক। ওরা মনুষ্যত্বের দুশমন।

আরো খবর

Disconnect