ফনেটিক ইউনিজয়
অবিস্মৃত স্মৃতি কথা
শওকত আলী

শওকত আলী এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখার মধ্যদিয়ে  বাঁক-বদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতী মানুষের দ্বান্দ্বিক  জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়িত করেছেন তিনি। তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালীর শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পরিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

আমাদের বাড়ির পাশের যে সব জমিতে সবজি চাষ করা হতো, সেগুলো একজন আধিয়ারকে দেওয়া হয়েছিল। তার নাম মনে পড়ছে না। একবার আমার বাবার শখ হলো সবজি চাষ করার। তিনি নিজ হাতে কুপিয়ে ও লাঙ্গল দিয়ে ভূমি প্রস্তুত করলেন। সীম, লাউ, পটল, ঝিঙে লাগালেন। প্রচুর ফলন হলো তাতে। এতো সবজি কে খাবে? তাই আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে দেওয়া হলো। আধিয়ার দিয়ে আমার দাদী কিছু সবজি বাজারেও বিক্রির জন্য পাঠালেন।
আমাদের যে তিনটি আম বাগান ছিল, তাতে একটা আম গাছ ছিল প্রকাণ্ড। ওই গাছটিতে আম পাড়তে হলে মই নিয়ে ওঠা লাগত, তাও সবাই ওঠতে পারতেন না। আম পাড়ার সময় বড় বড় টুকরি সাত-আটটি ভর্তি হয়ে যেত। যেদিন আম পাড়া হতো, তার আগেই আত্মীয়-স্বজনদের খবর দেওয়া হতো। তাদের মধ্যে যারা আসতেন, তারা যাওয়ার সময় কিছু সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। আর খুব কাছের যেসব আত্মীয় আসতে পারতো না, এমন আত্মীয়দের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হতো। প্রতি মৌসুমে তিনবার আম পাড়া হতো। প্রথমে বৈশাখ মাসের শেষে। তখন কম আমই পাকত। জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি ও জ্যৈষ্ঠের শেষ দিকে আরেকবার। কি যে হৈ-হুল্লোড় পড়ে যেত সারা বাড়িতে ফল পাড়ার মৌসুমে। ঝড়ের দিনে আম কুড়াতে আরো মজা লাগত। আমাদের একটা আম গাছ ছিল, বেশি বাতাস বইতে শুরু করলে ডুশ ডুশ শব্দ করে আম পড়া শুরু করত। আমি, আমার ভাই-বোনেরা আম কুড়াতে দৌঁড়ে যেতাম। আমাদের দু-তিনটি আম গাছ ছিল খুব ভালো জাতের, সুস্বাদু ও বড় সাইজের। সবগুলো আমের জাতের নাম মনে আসছে না; তবে মোহনভোগ, গোপালভোগ, ফজলি, কুয়া পাহাড়ী এসব জাতের আমগাছ ছিল। আমি গ্রীষ্মকালীন ফল- আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, বাতাবী খেতে পছন্দ করি, তবে তাজা ছিঁড়ে আনা বা কুঁড়ে আনা ফল।
আগেই বলেছি আমাদের বাড়িতে তিনটি পুকুর ছিল। বাড়ির দরজার পাশের পুকুরটা বড় ছিল। সাধারণত এটাতে বড় বড় মাছ চাষ করা হতো। বাড়ির ভেতরের দিকে একটা পুকুর ছিল, এটাতে বাড়ির বউ-ঝিরা ব্যবহার করত। বাড়ির পাশেই আরেকটি পুকুর ছিল- ওটাতে বিলের মাছ এসে জমা হতো। বিলের পানি যখন কমতে শুরু করত, বিশেষ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসে তখন প্রচুর মাছ আসত। আমার দাদী পোনা মাছ নিধন একেবারেই পছন্দ করতেন না। মা মাছ যখন পোনা ছাড়ত, তখন আমার দাদী ওইগুলোকে চোখে চোখে রাখতেন, যাতে অন্য কেউ ধরতে না পারে। বড় পুকুরে নিয়ে ছাড়তেন।
মাঘ-ফাল্গুন মাসে যখন পুকুরের পানি কমতে শুরু করত, তখন মাছ ধরা শুরু হতো আমাদের বাড়িতে। তবে উৎসব করে মাছ ধরা হতো চৈত্র ও বৈশাখ মাসের দুয়েক দিন। আত্মীয়-স্বজনদের খবর দেওয়া হতো মাছ ধরার দিন। সবাই মাছ ধরে এক জায়গায় রাখতেন। ছোট মাছ বলতে রুই, কাতল, মৃগেল জাতীয় মাছকে বোঝাত। তখন আধা কেজি বা আধা সেরের নীচে হলে ধরতে দিতেন না আমার দাদী। মাছ ধরার পর কাউকে আস্ত একটা মাছ বাড়িতে নিয়ে যেতে দিতেন না। কারণ এতে কোনো কোনো জন দুই/তিন কেজি ওজনের রুই-কাতল নিয়ে যেতে পারেন। আবার কারো ভাগে পড়বে এক সের ওজনের রুই। তাই সব মাছ কাটা হতো। কেটে ভাগ করা হতো। প্রত্যেক ভাগে ৩/৪ কেজি করে মাছ পড়ত। তখন পুকুরে অনেক মাছ পাওয়া যেত এবং বড় বড় মাছ। কাছের আত্মীয়রা কাটা মাছগুলো কলাপাতা মুড়ে বাড়িতে নিয়ে যেতেন। দূরের আত্মীয়রা মাছ ভাজা করে বাড়িতে নিতেন।
মাছ ধরা আমার ও আমার বড় ভাইয়ের একটা শখ ছিল। সাধারণত বড়শী ফেলে মাছ ধরতাম। বড়শীতে কেঁচো, আঠা, পিঁপড়ের ডিম ইত্যাদি গেঁথে ছিপ ফেলতাম। বড়-ছোট সব মাছই ধরা হতো। কোনো কোনো দিন বড় একটা রুই, কাতল, চিতল-২ কেজি, ৩ কেজি ওজনের মাছ আমার বড়শীতে ধরা পড়লে আমি নাচতে-নাচতে বাড়ির দিকে যেতাম, আর বড় ভাই আমাকে দেখে ঈর্ষা করতেন। ঈর্ষা করে বলতেন- কি যে গাঁথি বড়শীতে, যেন তা খেতে মাছগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে!
আবার বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় মাসে বৃষ্টি হলে পুুকুরগুলোতে বাইরের দিক থেকে বা বিলের পানি ঢুকতে শুরু করলে পুকুরের মাছ ওঠা শুরু হতো। একটাকে বলা হতো উজানির মাছ। আমি বৃষ্টিতে ভিজে মাছ ধরতাম। কি যে আনন্দ লাগত উজানির মাছ ধরতে। যখন বড় একটা শোল কিংবা গজার মাছ বা অনেকগুলো কৈ, মাগুর, শিং, পুঁটি মাছ ধরা হতো তখন বাড়ির দিকে দৌড়ে নিয়ে যেতাম। আমার মা প্রায়ই বকাবকি করতেন বৃষ্টির পানিতে ভেজার জন্যে। কিন্তু তাতে কী? আমার গায়েই লাগত না। আমি তখন মাছ ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। তখন পুকুরগুলোতে প্রচুর মাছ ছিল, সারি সারি মাছ পাওয়া যেতো। বিলের পানি যখন কমতে শুরু করে তখন একেকদিন একেক বিলের মাছ ধরা হতো। স্থানীয় জেলেরা নির্দিষ্ট তারিখ-দিন ঠিক করত। তবে জেলেদের মুখ থেকে গ্রামবাসীও জেনে যেত কোন বিলে কোন দিন মাছ ধরা হবে। বিলে তখন বড় বড় মাছ ধরা পড়ত, নয়-দশ কেজি এমনকি ২০/২৫ কেজি ওজনেরও রুই, কাতল মাছ ধরা পড়ত।  
একবার আমাদের বাড়ি থেকে দুই-তিন মাইল দূরে একটা বিলে মাছ ধরা শুরু হলে আমার বাবা সেই বিলের পাশের বাড়িতে রোগী দেখতে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ফেরার পথে দেখেন প্রায় ২০ কেজি ওজনের একটা রুই মাছ ধরা পড়ছে জেলেদের জালে। বাবা তখন ওই মাছটা কিনে নেন। জেলেরা কেটে-কুটে চার-পাঁচটি ভাগে কলাপাতা মুড়ে বেঁধে দিল। আমার বাবা তা সাইকেলে বেঁধে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এতো মাছ কী করব? তাই সেদিন কিছু মাছ আত্মীয়দের দিয়ে দেওয়া হলো।
আমার নানার বাড়ির দিকে এ ধরনের বিল ছিল না। আমার মা প্রথম প্রথম এইভাবে কাটা মাছ বাড়িতে আনা পছন্দ করতেন না। পরে বুঝে গেছেনÑ এটাই জেলেদের রীতি; বড় বড় মাছ জেলেরা কেটে দেয়, অবশ্য তার জন্যে মজুরি দিতে হতো।
আমাদের বাড়ির উত্তর দিকে বড় একটা বাঁশবন ছিল। তারই পশ্চিম পাশের একদিকে ছিল একটা পুকুর, অন্য পাশে ছিল আম বাগান। আর  দক্ষিণ পাশে ছিল বাড়ির দিকে ঢোকার রাস্তা, যার শেষ মাথায় ছিল গেট। বাঁশ বাগানের শেষ মাথায় এবং বাড়ির দিকে ঢোকার রাস্তার ফাঁকে যে ধানক্ষেত ছিল তার পাশে ছিল প্রতিবেশীদের বাড়ি। এই প্রতিবেশীদের অনেকেই বাইরের লোক, মানে অন্য জেলা থেকে এসে এখানে বাড়ি করেছেন। এরা প্রায় সবাই বাবার বন্ধুস্থানীয়- তাঁদের পিতারা কিংবা তাঁরা আমাদের জমি পত্তন নিয়ে বাড়ি করেছেন। অর্থাৎ তারা আমাদের প্রজা হয়ে বসবাস করছিলেন। প্রতিবছর খাজনা দিতেন। ৫ টাকা, ৬ টাকা, ৭ টাকা ছিল একেক জনের বার্ষিক খাজনা। আমার দাদু জীবিত ছিলেন যতো দিন, ততোদিন মাইনে করা পেয়াদা, মুন্সী ছিল, তারা খাজনা আদায় করে আনত।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect