ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-২২
অবিস্মৃত স্মৃতি কথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়িত করেছেন তিনি। তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়েন

দিনাজপুরে আমরা যে বাড়িতে বসবাস করতাম, স্থানীয় লোকেরা সে বাড়িটিকে সরকার বাড়িই বলে চিনত। যেহেতু আমার বাবার নাম ছিল খোরশেদ আলী সরকার। সেই অনুযায়ী আমরা ভাইবোনদেরও নামের শেষে ‘সরকার’ পদবি ছিল। যেমন আমার বড় ভাইয়ের নাম মোহাম্মদ আলী সরকার, আমার নাম শওকত আলী সরকার, আবদুর রউফ সরকার, মর্জিনা সরকার। তবে আমার নামের আগে ও পেছনে দুটি শব্দ বাদ দিয়ে আমি শুধু ‘শওকত আলী’ই লিখতাম। তার একটা কারণ আছে, তা হলো, আমি যখন উইলিয়াম কেরি প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশনারি স্কুলে পড়তাম, তখন আমাদের স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন যোগেশচন্দ্র ঘোষ। তিনি আমাদের বাবার বন্ধু ছিলেন। তিনি ক্লাসে একজন ছাত্রকে দিয়ে বাংলা বাক্য লেখাতেন। তারপর অন্য আরেকজন ছাত্রকে ডাকতেন ব্লাকবোর্ডে সেই বাক্যের ইংরেজি করতে। যদি কেউ ভুল করত, তিনি ছড়া কেটে বলতেন, শওকত আলী সরকার, কানমলা দরকার।
স্যারের কথাটা শুনে আমার ভেতর একটা প্রতিক্রিয়া হলো, আমার নামের শেষে ‘কানমলা দরকার’ লাইনটি যুক্ত হওয়ায়, আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার পদবি বাদ দিয়ে দিলাম। আর এদিকে নামের আগের মোহাম্মদ শব্দটিও বাদ দিয়ে দিলাম। কারণ, আমার বড় ভাইয়ের নাম ছিল মোহাম্মদ আলী।
তবে স্থানীয়ভাবে অনেকে আমাদের বাড়িটিকে ডাক্তার বাড়িও বলতেন, যেহেতু আমার বাবা পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন। আমাদের পুরো পরিবার পশ্চিম দিনাজপুর থেকে পূর্ব দিনাজপুর অর্থাৎ বাংলাদেশে চলে আসার পর পরিবারের আয় বলতে বাবার ডিসপেনসারিতে রোগী দেখা। যদিও তখন পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে বাবার যশ ও খ্যাতি দিনাজপুর শহরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বাবার রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়তেছিল। তবু বাবার দুটি সংসারের ছেলেমেয়েদের ভরণপোষণ করা ও লেখাপড়া খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
আমার মায়ের গর্ভে আমার ছোট দুই ভাই ওসমান আলী সরকার ও আবদুর রউফ সরকার তখন লেখাপড়া করছিল। বড় বোন মর্জিনা দিনাজপুর একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। বড় ভাই মোহাম্মদ আলী রংপুরে মাইগ্রেট হয়েছিলেন। তিনিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিলেন। আমার সৎমায়ের গর্ভে আগের স্বামীর ঔরসজাত একটি মেয়ে ছিল। তার নাম পুতুল ছিল। তাকে সঙ্গে করে সৎমা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। পরে আমার বাবার ঔরসজাত তিন ভাই, দুই বোনসহ তারাই ছিল সাতজন। তাই বাড়িতে রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়া সবই আলাদা হতো। তবে ঝগড়া-ঝাঁটি বলতে তেমন কিছু হতো না। আমার যমজ দুই বোন। যে তেমন কথা বলতে পারত না, তার নাম হলো সুফিয়া সরকার, সে-ই রান্নাবান্না করত। তবে সংসার ম্যানেজমেন্ট করতেন আমার বড় বোন মর্জিনা। তাই এই ভাইবোনদের খাওয়ানা-পরানো এবং লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে আমাকে আবার আয়-রোজগারে নামতে হলো। আমার বড় ভাই মোহাম্মদ আলীও মাঝেমধ্যে টাকা পাঠাতেন। আমি এমএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে দিনাজপুর চলে যাই এবং বীরগঞ্জ হাইস্কুলে শিক্ষকতার চাকরি করতে থাকি। ওই স্কুলে প্রধান শিক্ষক না থাকায় আমাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকও করা হয়। শিক্ষকতা করার সময় তেভাগা আন্দোলনের সাঁওতাল নেতা, ওঁরাও, মুণ্ডা, রাজবংশীদের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাদের আন্তরিকতা ও সহজ-সরলতা সহজে যেকোনো লোককে বন্ধুত্বে পরিণত করতে পারে। এই সময় আমার প্রথম উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ লেখা সমাপ্ত হয়, যা ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। পিঙ্গল আকাশ-এর বিষয় ও আঙ্গিকে চেনাজানা পরিবেশ থেকেই নেওয়া হয়েছে। তদুপরি উপন্যাস তো উপন্যাসই, বাস্তব ও কল্পনা দুটো মিশিয়ে একজন লেখক তাঁর শৈল্পিক রূপ দিয়ে আদর্শিক প্লট নির্মাণ করে থাকেন, এ উপন্যাসেও তা-ই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর উপনিবেশগুলোতে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষের ভোগ-বিলাস, রুচি ও সাংস্কৃতিক জীবনে যে বিকৃতি ঘটেছে এবং সমাজ বাস্তবতায় প্রতিকূল পরিবেশেও নিজেকে বিকিয়ে না দিয়ে টিকে থাকার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায়। কেউ কেউ এতে আশা-নিরাশার দোলাচলে নিজে দহন হয়। সেই রূপ চরিত্র পিঙ্গল আকাশ-এর মঞ্জু।
আমার মা কনে হয়ে যেদিন প্রথম পা রাখলেন আমাদের বাড়িতে, সেই বাবার বন্ধুদের স্ত্রীরা এবং আশপােেশর নারীরা আমার মায়ের শিক্ষা গ্রহণের বিষয় নিয়ে বিদ্রুপ-ঠাট্টা-মশকরা করেছিলেন। এতে মা নিজেকে অপমানিতবোধ করলেন এবং স্যুটকেস ছুড়ে ফেলেছিলেন উঠোনে। স্যুটকেট খুলে গিয়ে বের হয়ে এল কতগুলো বই, বাংলা ও ইংরেজি। তখন প্রমাণিত হলো আমার মা নিরক্ষর ছিলেন না। বই পড়া তাঁর অভ্যাস ছিল। তখনকার দিনে বউ-ঝিয়েরা দুপুরে খাবার পর বা ঘুমানোর আগে বই পড়তেন, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, মধুসূদন, শরৎ এমনকি ইংরেজি গল্প-কবিতাও পড়তেন। এখন মানুষের রুচি, অভ্যাস ও সাংস্কৃতিক মানের পরিবর্তন হয়েছে। ফেসবুক নিয়ে বসে থাকে, ফেসবুক ভালোর চেয়ে ক্ষতিই করেছে বেশি। তেমন লেখাপড়া জানে না, তবে মোবাইলে বিভিন্ন প্রোগ্রামে ঠিকই ঢুকতে পারে, বিশেষ করে ক্ষতিকর সাইটগুলোতে। পর্নো ছবি বা ভিডিও কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতীকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আজকে এমন হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল সম্পর্কেও এরা ভালোভাবে কিছু বলতে পারবে না। তাদের রচিত দু-একটি গল্প, উপন্যাস পড়ছে বলে মনে হয় না। ক্লাস নাইন-টেন বা একাদশ-দ্বাদশ, ডিগ্রির শিক্ষার্থী বা শিক্ষা শেষ করেছে তাদের জিজ্ঞেস করে দেখো রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পাঁচটি বইয়ের নাম বলতে কিংবা রবীন্দ্রনাথ কোন বইটির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন? বলতে পারবে না-হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া। আমার কথা বাদ দাও, আমার লেখা গল্প-উপন্যাস আমার নাতি-নাতনিরাও পড়ছে কি না সন্দেহ। আমার পাঁচটি উপন্যাসের নাম জিজ্ঞেস করলে এরা বলতে পারবে না। এটা শুভ লক্ষণ নয়। একটা দেশের শাসকশ্রেণি বা সরকারই নির্ধারণ করে সে দেশের সংস্কৃতি কী হবে, শিক্ষার পদ্ধতি কী, সাংস্কৃতিক মান কী? অপসংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার। এসব কি সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে? আকাশসংস্কৃতি বলতে যা বোঝায়, ভারতীয় জি বাংলা, জি সিনেমা, স্টার জলসা-এসব বন্ধ করছে না। ওই যে আকাশসংস্কৃতি বলতে, আরও কত কী। অনুষ্ঠান দেখে আমাদের দেশের দর্শকেরা কী আহরণ করে? কী এসব অনুষ্ঠানের বিষয়, চরিত্র ও কাহিনিÑগৃহবিবাদ আর পোশাকের ঝলকানি হলো এসব নাটকের বিষয়-চরিত্র। এত কথা বললাম, তোমরা তরুণেরা ‘বই পড়া’ নিয়ে আন্দোলন করবে, সুস্থ ও সুন্দর সংস্কৃতি নির্মাণে ভূমিকা রাখবে, স্বার্থপরতা হবে না, স্বার্থপর ও নিচ সমাজব্যবস্থা ভাঙার চেষ্টা করবে। মানবিক হবে ও মানবিক সমাজ তৈরি করার জন্য কাজ করবে। নতুবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়ী থাকবে।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect