ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-২৩
অবিস্মৃত স্মৃতি কথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়িত করেছেন তিনি। তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়েন

আমার মা-বাবা দুজনেই বই পড়তেন, বাবার ডিসপেনসারিতে পড়ার মতো অনেক বই থাকত, সেখান থেকে মা বই বাড়িতে নিয়ে আসতেন। আমার বড় ভাই পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে একটা লাইব্রেরি করেছিলেন। সেখান থেকেও বই সংগ্রহ করে আমরা পড়তাম। আমার মা যখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন-মায়ের শিয়রের পাশে বসে বই পড়ে তাঁকে শোনাতাম। বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশ নন্দিনী ও ইংরেজি বই চার্লস ডিকেন্সের দ্য স্টোরি অব টু সিটিজসহ আরও কত বই যে মাকে পড়ে শুনেয়েছি। এভাবে আমার ভেতরও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে এবং লেখক হয়ে ওঠার পেছনের প্রণোদনাও ক্রিয়া করেছিল। আমি কেন লেখক হলাম, তার কথা আগেই বলেছি। তাই এখানে বিস্তারিত কিছু বললাম না।
বীরগঞ্জ হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে ছেয়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে আমার ভূমিকা ও জেলখাটা লোক বলে সরকারি গোয়েন্দারা বারবার আমার খোঁজ নিতে থাকে। তাই আমি দিনাজপুরে থাকাটা সমীচীন মনে করলাম না। আবার ঢাকায় চলে এলাম।
সেই সময় কামাল লোহানীর গায়ের উজ্জ্বল শ্যামলা, নাক চিবুক ধারালো, কপাল চওড়া ও ভুরু দুটিও মানানসই ছিল। চোখের দৃষ্টি দীপ্ত, মাথার চুল সুবিন্যস্ত ছিল। লোহানীর সঙ্গে প্রথম দেখা পুরান ঢাকার কোর্ট বিল্ডিংয়ের পাশে একটা পুরোনো দোতলার ওপর তলায় দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার অফিসে। আমাকে ওখানে যেতে বলেছিলেন হাসান ভাই, মানে প্রয়াত হাসান হাফিজুর রহমান। ওই সময় অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের কথা বলছি, তখন ঢাকার শিক্ষিত তরুণরা তাঁকে ওই এক নামে চিনত। সমবয়সী দুটি তরুণ এক বেঞ্চে পাশাপাশি বসে কতক্ষণ মুখ বুজে থাকতে পারে। তা প্রায় ঘণ্টাখানেক ওইভাবে সময় কাটে। আমি তবু জানালা দিয়ে বাইরের দিকেও নজর রাখছিলাম চেনা কোনো লোককে দেখা যায় কি না? কিন্তু তিনি একইভাবে মাথা নিচু করে বসে ছিল, সম্ভবত গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে ছিলেন। শেষে আমিই  মৌনতা ভঙ্গ করলাম। একরকম গায়ে পড়েই নিজের নাম বললাম। কোথায় বাড়ি, ঢাকায় কেন এসেছি, কোথায় থাকি, কিসের জন্য দৈনিক মিল্লাত অফিসে এসেছি সবই গড়গড় করে বলে ফেললাম। বোকা লোকেরা যেমন করে বলে, তেমন করে আর কি। পরবর্তী সময়ে তিনিই হলেন বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক কামাল লোহানী। তাঁর সঙ্গে দৈনিক মিল্লাত-এ প্রথম পরিচয়ের বৃত্তান্ত ও বন্ধুত্ব সূচনাও তখন থেকেই।
১৯৫৮ সালে এমএ ফাইনাল শেষে আবার সাধ জাগে সাংবাদিকতা করতে। বিখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদের সঙ্গে প্রথম দেখা হাটখোলার ইম্পেরিয়াল প্রেসে। আমরা একদল বন্ধু তখন নিজেদের উদ্যোগে কষ্ট করে সচিত্র সন্ধানী পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলাম। সেটা ছিল সচিত্র সন্ধানীর প্রথম যুগ। সেলিম কোরেশী নামে এক যুবাবয়সী ভদ্রলোক তখন কলকাতা থেকে সদ্য এসেছেন। চিন্তাভাবনার দিক থেকে যথেষ্ট প্রগতিশীল, আচার-ব্যবহারও খুবই উদার ও আন্তরিক। পরে শুনি কালকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির তাঁর সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। ঢাকায়ও তাঁর বন্ধু ছিল। তাঁদেরই উৎসাহ ও সহযোগিতায় তিনি মিঠেকড়া নামে একটি ব্যঙ্গধর্মী রাজনীতিবিষয়ক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেন। সেই সময় কোরেশী সাহেব উৎসাহ দিলেন মিঠেকড়া বের করার জন্য। মিঠেকড়ায় সামাদ কাজ করত। মাঝে মাঝে আমাকে ও কামাল লোহানীকে প্রেসে থাকতে হতো। সামাদের সঙ্গে দেখা হতো বিশাল আকারের মুদ্রণযন্ত্রের পাশে। আবার কখন পাশের একটা কামরার এক টেবিলে, সেটাতে আমরা প্রুফ দেখতাম। মিঠেকড়া পত্রিকাটি ছিল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রচনা ও ছড়ায় ভর্তি। প্রতিটি লেখা ছিল চাবুকের মতো। মিঠেকড়া পত্রিকার অফিসে আবার আমরা দুজনে সহকর্মী হয়ে যাই এবং খুব মনোযোগের সঙ্গে কাজ আরম্ভ করি।
মূলত সমকালীন রাজনীতিই ছিল পত্রিকাটির প্রধান বিষয়। ওই সময়ের পাকিস্তান নেতাদের কথাবার্তা আর কা-কীর্তি নিয়ে রসালো ভাষায় তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হতো। বইয়ের মতো ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকাটি। সেলিম ভাইয়ের বন্ধুরা আসতেন প্রায়, তাঁদের কাছ থেকে নানা খবরাখবর পাওয়া যেত। তাঁদের মধ্যে কেউ ব্যবসায়ী, কেউ সাংবাদিক, কেউ সেক্রেটারিয়েটে চাকরি করতেন।  দেশের অনেক ভেতরকার খবরাখবর পাওয়া যেত এবং সেসব খবরের ওপর ভিত্তি করেই নানা ধরনের লেখা প্রকাশ করা হতো পত্রিকাটিতে। সঠিক মনে নেই, তবে আরও কিছু দিনের মধ্যেই পত্রিকাটির পাঠক সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। তরুণদের মধ্যে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেডিকেল কলেজের কয়েকজন ছাত্র প্রায় এসে কথা বলে যেত। নানা পরিচিত লোকদের কাছ থেকে আমরা মন্তব্য শুনতাম, ‘নাহ, পত্রিকাটি তো ভালো লেখা ছাপা হচ্ছে।’ প্রথম সংখ্যায় যত কপি ছাপা হয়েছিল, মাস শেষের আগেই তার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি দাঁড়ায়। পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবার মনে যখন আশা জাগতে শুরু করেছে, এ সময় একদিন শোনা গেল যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে নিয়েছেন। দেশের সবকিছু এখন চলবে সামরিক শাসকদের হুকুম মতো। এ সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করার পরপরই আমাদের এ নতুন পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। দুই দিন পর সম্পাদক সেলিম কোরেশী বলেন যে, গোয়েন্দা বিভাগের দুজন লোক অফিসে এসে জানিয়ে গেছেন, মিঠেকড়া পত্রিকার প্রকাশনা যেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। না হলে সামরিক আইন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কামাল লোহানী আর আমি দুজনে আবার ছিটকে পড়লাম। আমি চলে গেলাম দিনাজপুরে, আর কামাল ঢাকায় থেকে গেলেন, নাকি অন্য কোথাও গেলেন, সে খবর পাইনি। যাওয়ার সময় পাইনি তবে পরে ঠিকই খোঁজখবর করেছিলাম এবং খবর পেয়েছিলাম। আমি প্রায় তিন বছর ঠাকুরগাঁও কলেজে ছিলাম। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। ছিল, কিন্তু খুবই কম। কামাল লোহানীর সঙ্গে যে দীপ্তির বিয়ে হয়েছে, সে খবরও আমি পাই।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect