ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-২৮
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়িত করেছেন তিনি। তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়েন

লেখক কায়েস আহমেদ ছিল আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ছাত্র। তার আত্মহত্যার খবর আমাকে খুব কষ্ট ও দুঃখ দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের ঘটনাকে বলা হয় ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভ। এমন স্বাধীনতাই আমরা পেলাম শুধু প্রাণ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে আমাদের। যতটুকু জানি, কায়েস আহমদের বাবা কলকাতায় যে কোম্পানিতে চাকরি করতেন, দেশভাগ হওয়ার পর ভারত সরকার কলকাতায় সে কোম্পানিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমোদন দিচ্ছিল না। তাই কোম্পানিটি তল্পিতল্পা গুছিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিল। চাকরি বাঁচানোর তাগিদে তার বাবা এবং সঙ্গে পরিবারকেও নিয়ে এসেছিলেন। শৈশবেই মাকে হারায় সে। অভাব-অনটনও কাবু করেছিল তার পরিবারকে। তবে তার আত্মহত্যার পেছনে এসব কারণ হতে পারে না। কারণ সে এসবের মোকাবিলা করে বড় হয়েছে, সংগ্রামী হতে শিখেছে এবং এসবের পেছনে যে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চাৎপদতাই হলো মূল কারণ তা-ও সে জানত। তাহলে তার আত্মহত্যার পেছনে কোন হতাশাটা কাজ করেছিল, তা জানা যায়নি। হঠাৎ একদিন খবর এল গল্পকার কায়েস আহমেদ মৃত্যুবরণ করেছে। খবরটি শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম। আমরা একজন উদীয়মান সাহিত্যিককে তরুণ বয়সেই হারিয়ে ফেললাম।
১৯৬৭-১৯৬৮ সালের দিকে তার গল্প নিয়ে সে প্রায়ই আমার বাসায় আসত। গল্পের বিষয় চরিত্র, ভাষা ইত্যাদির বিষয়ক আলোচনা করত আমার সঙ্গে। মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ও উঠে আসত আলোচনা পর্বে। তার সঙ্গে বামপন্থী আন্ডারগ্রাউন্ড দলগুলোর একটা যোগাযোগ ছিল। যুদ্ধের আগে দুই বছর তাকে কম পাওয়া যেত। হঠাৎ দেখা করে সে আবার উধাও হয়ে যেত। খবর নিয়ে জানতে পারলাম, সে গোপন দলে কাজ করছে। যুদ্ধ শুরু হলে সে দেশের অভ্যন্তরে থেকেই যুদ্ধ করেছে।
তার সাহিত্যে, গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট, শ্রম, ঘাম, মজুরি শোষণ, নির্যাতন, বাস্তুচ্যুত, দেশান্তরের যন্ত্রণা ইত্যাদি স্থান পেয়েছে। শুধু স্থান পেয়েছে বললেই যথেষ্ট হবে না, শ্রমজীবী মানুষেরা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরা কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে ও মুক্তির পথ কী, তাও সে বলে দিয়েছে তার গল্পে। অকালে ঝরে যাওয়া এই শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক আমাদের অনার্স ক্লাসের ছাত্র ছিল। অন্ধ তীরন্দাজ তার প্রথম গল্পগ্রন্থ। দ্বিতীয় গ্রন্থ নির্বাসিত একজন, তৃতীয় গ্রন্থ জগদ্দলের সংকলন এবং এরপর প্রকাশিত হয় শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
অনেক ছাত্রছাত্রীরই নাম এখন আর মনে করতে পারছি না। কিন্তু একটু চোখ বুঝে স্মরণ করলেই আমার মনের ভেতর ভেসে ওঠে তাদের মুখ আর মুখ। আর মুখ ভেসে উঠলে নামের আখর পড়ে স্মৃতিতে। একসঙ্গে কয়েকজন তরুণ, তরুণ না বলে কিশোর বলাই সংগত। কেননা তারা সবাই কেবল ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছে। একদিন আমাকে এসে ধরল, স্যার আমরা আপনার একটা ক্লাস করব। তো কী হবে সেই ক্লাসে পড়ানোর বিষয়? সেটা আপনি জানেন স্যার-তারা একসঙ্গে জবাব দিয়েছিল। খুব বেশি দিন চলেনি সেই ক্লাস। তবে একসঙ্গে সেই উজ্জ্বল মুখগুলো এখনো আমার স্মৃতিতে ভাসে। সেই ক্লাসে ছিল দীনু বিল্লাহ, শাহরিয়ার কবির, আলী ইমাম, ফেরদৌস, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, ফারুক, ফেরদৌস জাহানসহ আরও অনেকেই।
আমি ইচ্ছেমতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। কখনো মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব, কখনো সাহিত্যের প্রকরণ স্ট্রিম অব কনসাসনেস কিংবা অস্তিত্ববাদী দর্শন। খুব ভালো বলতাম এমন দাবি করব না। তবে যা মনে হতো বলে যেতাম। আর আসত ইতিহাসের প্রসঙ্গ। কখনো উপমহাদেশের, কখনো ইউরোপের-ওরা শুনত, প্রশ্ন করত, আলোচনায়ও অংশ নিত। এখন কি এমন ছাত্র আছে? আমার আশঙ্কা যে এমন ছাত্র কোথাও বোধ হয় নেই আর। না কলেজে, না বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন নোট বই, গাইড বই, কোচিং ইত্যাদি আজেবাজে বিষয়গুলো ঢুকে তাদের সৃজনশীলতা নষ্ট করে দিয়েছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, নাট্যজগতের এই মানুষটিকে চেনে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। উচ্চ শিক্ষিত এই লোকটি নাটকের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে জড়িত। গ্রাম থিয়েটারের সে প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটারের সম্পাদক। নাটককে সুস্থ বিনোদনের হাতিয়াররূপে দর্শকদের সামনে হাজির করার জন্য তাঁর শ্রম, মেধা ও আন্দোলনের নেতৃত্ব সামনে থেকে দিয়ে আসছেন সে।
কবিতার জগতে আমাদের আরেক ছাত্রের নাম নাসির আহমেদ। সে ১০টিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছে। সে তার প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছে। তার মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড এডুকেয়ার স্বর্ণপদক, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিষ্ণু দে পুরস্কার এবং মঞ্জুষ দাস গুপ্ত স্মৃতি সম্মাননা ছাড়াও দেশ থেকে অনেক পুরস্কার পেয়েছে। তদ্রুপ এই কবি আত্মপ্রচারবিমুখ, সব সময় বিনয়ী ও মিষ্টভাষী।
আমাদের এক ছাত্রী নাসরীন জাহান, হালকা-পাতলা গড়নের ও উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের মেয়েটির কথা এখনো মনে আছে। সে নিজের একটা বই আমাকে দিল। বেশ চটপটে সপ্রতিভ ও বুদ্ধিমতী মেয়েটি যে আপসহীন হবে এবং অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াবে না, প্রতিবাদী হবে-তা বুঝতে পারলাম যখন সে এমএ ক্লাসে আমার ছাত্র ছিল। তার বইটি পড়ে বুঝলাম, সে সমাজের অচলায়তন ও কূপমণ্ডুকতাকে সরিয়ে দিতে চায়। মানুষের মানবিক সত্তা, দায়িত্ববোধকে জাগরিত করতে চায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণমানুষের যে সংগ্রাম, তা সামনে আনতে চায়। খোঁজ নিয়ে জানলাম সে এখনো তার লেখালেখি নিয়ে সরব রয়েছে-এটা শুনতে পেরে আমি খুশিই হলাম। সে তার উড়ূক্কু উপন্যাসের জন্য ফিলিপস পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল।
দাউদ হায়দার ও মাকিদ হায়দার দুই ভাই-ই জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিল। দাউদ হায়দার কমিউনিস্ট পার্টির কোনো এক গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সমাজ বদলের কথা বলত, দীক্ষা দিত কৃষকদের, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখত, তাই সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও তার গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিল এবং সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল।
অধ্যাপক অজিত কুমার গুহকে নিয়ে লেখা কাকাবাবুর টয়হাউস-এর প্রণেতা দিনুবিল্লাহ আমার জগন্নাথ কলেজের শিক্ষকতার প্রথম দিকের ছাত্র। অমর সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ ছিলেন তার ভগ্নিপতি। দিনু বিল্লাহর কৈশোরের ও যৌবনের একটা বড় পর্ব কেটেছে অজিত গুহর বাসায় তাঁর স্নেহ সান্নিধ্যে। বিক্রমপুরের এই ছেলেটি ছাত্রজীবনেই বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয় এবং রবীন্দ্রসংগীতচর্চায় আজীবন নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে কানাডাপ্রবাসী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এবং আগস্টে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তার পাঁচ ভাইসহ ধরা পড়ে। হানাদার বাহিনী দিনু বিল্লাহসহ তার ভাইদের নির্মম নির্যাতনের পর ছেড়ে দিলেও আলতাফ মাহমুদকে হত্যা করে।
দিনু বিল্লাহ সত্তরের দশকে সমমনা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলে ‘আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যানিকেতন’, ‘ঢাকা থিয়েটার’। এ ছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ, ছায়ানট ও ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে দিনু গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect