ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৩২
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়িত করেছেন তিনি। তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপোড়েন

১৯৬৮ সালের ১ আগস্ট জগন্নাথ কলেজকে সরকারীকরণ ঘোষণা করা হয়। অজিত বাবু সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করবেন না বলে ১৯৬৮ সালের ৩১ জুলাই চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খান ক্রোধের বশবর্তী হয়ে জগন্নাথ কলেজকে পূর্ণাঙ্গ সরকারি কলেজে পরিণত করেন। এতে কলেজের সব ছাত্র-শিক্ষক প্রবল ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। সরকারীকরণের পূর্বে সরকার পাঁচ মাস কলেজ বন্ধ রেখেছিল। কলেজ সরকারীকরণ করার ফলে বেশির ভাগ শিক্ষক একটা সমস্যার মধ্যে পড়ে যান। বিশেষ করে চাকরির চিন্তায়, কার চাকুরি থাকে কার চাকরি চলে যায়। অথচ কোনোরকম ভবিষ্যৎ চিন্তা না করেই ওই সময় চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছিলেন তিনি। কলেজের প্রিন্সিপাল আ ন ম বজলুর রহমান সাহেবও তাঁকে চাকুরিতে পদত্যাগ করতে নিষেধ করেছিলেন। অজিত বাবুু শুধু আমাদের বাংলা বিভাগেরই অভিভাবক ছিলেন না, তিনি কলেজের ছাত্র-শিক্ষক সবারই আপনজন ছিলেন। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে সবার খোঁজখবর রাখতেন। তাই তাঁর বিদায় বেলায় কলেজের সব ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক শোকাবিহ্বল হয়ে পড়েন।
চাকুরি ত্যাগ করে বিরাট এক অর্থকষ্টে পড়েন এই মহান শিক্ষক। বনেদি জমিদার ঘরের ছেলে, কিন্তু সেই জমিদারির তখন কোনো অবশিষ্ট ছিল না। নিজের পরিবারের কথা, আত্মীয়স্বজনদের কথা, জামিদারির কথা কোনো কথাই তিনি বলতেন না, আত্মগর্ব করতেন না। আত্ম-অহংকার বা আত্মপ্রচার দুটোকেই তিনি প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। ভবিষ্যতের জন্যও তিনি কোনো চিন্তা করতেন না, আত্ম গর্ব করতেন না। আত্মঅহংকার বা আত্মপ্রচার দুটোকেই তিনি প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। ভবিষ্যতের জন্যও তিনি কোনো চিন্তা করতেন না। তাই তিনি সঞ্চয়, অর্থ সম্পদ বানানো এসবের কোনোটাই করেননি।
মতিঝিল টিএন্ডটি কলেজের তখন অধ্যাপক ছিলেন আরেক মহান ব্যক্তিত্ব জনাব আলী হায়দার চৌধুরী। তিনি অজিত বাবুকে অধ্যাপক পদে বরণ করে নেন তাঁর কলেজে। কিন্তু এই প্রথিতযশা, মানবদরদি শিক্ষকের ওই কলেজেও শত্রু তৈরি হলো অচিরেই। টিএন্ডটি কলেজে অজিত বাবুর সমবয়সী বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষক ছিলেন মহিউদ্দিন আহম্মদ নামে এবং তিনি শিক্ষকদের মধ্যে  বেশ সিনিয়র ছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল অজিত বাবু ওই কলেজে প্রবেশ না করলে তিনি ভাইস প্রিন্সিপাল পদে অধিষ্ঠিত হতে পারতেন। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অজিত বাবুর একটি লেখা দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত হয়। সেই লেখাতে আপত্তিকর কিছু আছে বলে সেই শিক্ষক একটা গুজব ছড়ান এবং কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের খেপিয়ে তোলেন। এতে রাগ করে অজিত বাবু টিএন্ডটি কলেজের চাকুরি ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন।
এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চাকরি হয়। ১৯৬৯ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার কথা! সেই উদ্দেশ্যে ১২ নভেম্বর রাতে রওনা দিয়ে রাত দশটার দিকে কুমিল্লায় নিজ বাড়িতে কাকিমার কাছে গিয়ে ওঠেন। কিন্তু বিধাতার হুকুম, তিনি ওই রাতেই রাত সাড়ে দশটা কী এগারটার দিকে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই অকস্মাৎ মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তাঁর সহকর্মীরা, শিক্ষক, ছাত্র, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, বুদ্ধিজীবী মহল ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
মহান দেশপ্রেমিক, ভাষাসৈনিক, মানবদরদি দেশের এই কৃতী সন্তানকে সর্বকালীন শ্রদ্ধার আবরণে ধরে রাখার জন্য তাঁরই প্রিয় ছাত্র অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সাহেব ‘অজিত গুহ স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা পরিষদ’ গঠন করেন এবং দেশের জ্ঞানীগুণী ও অজিত বাবুর সুহৃদদের অনুরোধ করেন শ্রদ্ধা নিবেদন করে লেখা পাঠানোর জন্য। এতে সাড়া দিয়ে অন্তরের অন্তর শ্রদ্ধা জানিয়ে যাঁরা লেখা পাঠান, তাঁরা হলেন কবি শামসুর রাহমান, ড. আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, প্রবোধ দাস গুপ্ত, সালাউদ্দীন আহমদ, শওকত ওসমান, সরদার জয়েন উদ্দীন, বাসন্তী গুহঠাকুরতা, বজলুর করীম, সাজেদুল করিম, সরদার  ফজলুল করিম, নয়ীম গহর, আব্দুল গণি হাজারী ও আমি নিজে।
১৯৬২ সালের প্রথম দিক থেকেই পূর্ব বাংলায় আইয়ুববিরোধী মনোভাব চাঙা হতে থাকে। ছাত্র-শিক্ষক, সাংস্কৃতিককর্মী, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ জনগণও সরকারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে থাকেন। তখন সরকার তা মোকাবিলা করার জন্য হাতে উপযুক্ত অস্ত্র পাচ্ছিলেন না। এরই মধ্যে ১৯৬৪ সালে কলকাতায় নতুন করে দাঙ্গা শুরু হয়। আইয়ুব সরকারও হাতে মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে যায়। সে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে নানাভাবে উসকে দেয়। প্রথমে হিন্দু-মুসলিম, পরে বাঙালি বিহারী দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পূর্ব বাংলায় ঢাকায় ভয়াবহ রূপ না নিলেও ঢাকার বাইরে হিন্দু ও বিহারী-অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় দাঙ্গা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আদমজী-বাওয়ানী থেকে শুরু করে সৈয়দপরু, পার্বতীপুর, রংপুর, খুলনা ও চট্টগ্রামে বাঙালি বিহারী দাঙ্গা ভয়াবহ রূপ নেয়। ঢাকায় বনগ্রাম, ঠাটারী বাজার, ফরাশগঞ্জ, গোয়ালনগর, তাঁতীবাজার, শাঁখারী বাজার, রায়ের বাজার, কুমারটুলি, টিকাটুলী, দয়াগঞ্জ এলাকায় হিন্দুদের বসবাস বেশি ছিল। আবার কাপ্তান বাজার, ঠাঁটারীবাজার ও নবাবপুর রোডের দিকে বিহারীদের বাস বেশি ছিল।
দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়কে বাঁচাতে গিয়ে ঠাঁটারীবাজার এলাকায় বিশিষ্ট কবি আমির হোসেন চৌধুরী (নজরুল বিশেষজ্ঞ) নিহত হন প্রাদেশিক সরকারের পেশাদার গু-াবাহিনীর হাতে। একইভাবে নটর ডেম কলেজের বিদেশি অধ্যাপক ফাদার নোভাককে খুন করা হয়। ঢাকার প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ছাত্র-শিক্ষক, সাংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাংবাদিকেরা প্রতিটি এলাকায় দাঙ্গাবিরোধী কমিটি করে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় দাঙ্গা বেশি দূর এগোতে পারেনি। তারপরেও মোহাম্মদপুর এলাকার বিহারীরা ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে মেয়েদের হোস্টেল আক্রমণ করে মেয়েদের শ্লীলতাহানি করে। সে সময় বেশ কিছুদিন হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরিতে দুজন পুলিশ পাহারা দিত। এতে অজিত বাবুর টয় হাউসের পাহারাও হয়ে যেত। হরদেও গাস ফ্যাক্টরিতেও ষাট-সত্তর ভাগ শ্রমিক ছিল হিন্দু। এই হিন্দু শ্রমিকেরা অজিত গুহকে দেবতুল্য শ্রদ্ধা করত। শ্রমিকনেতারা টয় হাউসে এসে অজিত বাবুকে অভয়-আশ্বাস দিয়ে যেতেন। অজিত বাবুর বন্ধু স্থানীয়রা ও সুহৃদ ব্যক্তিরা সব সময় খবর নিতেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইত্তেফাক-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন, রোকন্জ্জুামান দাদাভাই, ড. ফজলে রাব্বি, অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান, অধ্যাপক বজলুর রহমান, শওকত ওসমান, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সৈয়দ আলী আহসান, মাহাবুব তালুকদার, মির্জা হারুনুর রশীদ ও আমি নিজে। যে কয়েক দিন অজিত গুহ কলেজে যেতেন না, সে কয়েক দিন আমি টয় হাউসে গিয়ে অজিত বাবুর খবর নিতাম। তখন আমরা গুলিস্তান এলাকা দিয়ে চলাফেরা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলাম। নারিন্দা এলাকা হয়ে টিকাটুলীতে তাঁর বাসা হয়ে ইত্তেফাক মোড়, মতিঝিল হয়ে আরামবাগ দিয়ে চলাফেলা করতাম। তখন আমার বাসা ছিল শাহাজানপুরে। ছাত্রনেতারাও এসে খোঁজখবর নিতেন। দাঙ্গায় উত্তেজনা ব্যাপকভাবে দেখা দিলে ছাত্রনেতারা কয়েকজন ছাত্রদের নিয়ে গ্রুপ করে টয় হাউসের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পাহারায় পাঠাতেন। আমরা আমাদের হিন্দু শিক্ষকদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছাত্রদের পাঠাতাম কয়েকটি দলে ভাগ করে। ছাত্রদের একা চলাফেরা করতে নিষেধ করে দিয়েছিলাম। কাপ্তান বাজারের একদল অবাঙালি কসাই, সংখ্যায় ২৫-৩০ জন হবে, ছোরা, তলোয়ার ও রড হাতে নিয়ে ইত্তেফাক অফিসের দিকে এগিয়ে আসছিল হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে। সেদিন সকাল থেকেই আর্মড পুলিশ ইত্তেফাক-এর গেটে পাহারা দিচ্ছিল। খবর শুনে মানিক মিয়া ছুটে এলেন। তিনি উত্তেজিত হয়ে পুলিশদের বারবার নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ফায়ার ফায়ার। পুলিশরা হাঁটু গেড়ে বসে বন্দুক তাক করে পজিশন নিয়েছিল। আর ভবন থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা ইট-সুরকি নিক্ষেপ করছিল। ওই দিনই মানিক মিয়া তাঁর ম্যানেজার ওয়াদদুকে (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক) নির্দেশ দিলেন কোনো ওজর-আপত্তি নয়, অজিত বাবুকে এই মুহূর্তে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসতে হবে। অজিত গুহ মানিক মিয়ার গাড়িতে ইত্তেফাক অফিসে এসে উঠলেন। মানিক মিয়া আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন তাঁকে পাঠানো হলো সাইদুল হাসান সাহেবের বাসায়। সাইদুল হাসান ভাসানী ন্যাপের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। দাঙ্গা প্রশমিত না হওয়া পর্যন্ত অজিত গুহ সেই বাসাতেই রয়ে গেলেন।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect