ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৩৬
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়ণ করেছেন তিনি। তাঁর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

ঢাকায় তখন মেয়েদের মাত্র একটি কলেজ ছিল- ইডেন কলেজ। হলি ক্রস কলেজটি ছিল অনেক দূরে। পুরান ঢাকার মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজন মেটাতে হলে নতুন কলেজ দরকার। যে চিন্তা সেই কাজ। এ নিয়ে বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা পাওয়া গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট ও অধ্যাপক ড. এমএন হুদার স্ত্রী কুলসুম হুদার কাছ থেকে। উৎসাহ নিয়ে আরও এগিয়ে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক ড. ফাতেমা সাদেকা, ড. আবদুস সাদেক। তদানীন্তন পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ আজিজুল হকের স্ত্রী আফিফা হকও এগিয়ে এলেন। তখন বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। তিনি যে শিক্ষানুরাগী ছিলেন, এটা কে না জানে? এই টিকাটুলীতেই তাঁর হাতে গড়া অনেকগুলো স্কুল-কলেজ আছে। সৈয়দ নান্না মিয়া তাঁর কাছে মতিন সাহেবকে নিয়ে গেলেন তাঁকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হবে এ আশায়। তিনি ভেবেচিন্তে বললেন, আমাকে প্রধান পৃষ্ঠক বানানোর কথা বাদ দাও। আমাকে তোমাদের কলেজ কমিটির প্রেসিডেন্ট বানাও। আমি কলকাতায় লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ তৈরি করেছিলাম। ঢাকায় আরেকটি লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ তৈরি করব। তারপর সেটি মেয়েদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হবে। সেদিনের সেই উক্তিই যে অনুপ্রেরণার শক্তি ও উদ্দীপনা এনে দিয়েছিল, আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হওয়ার মাধ্যমে শেরে বাংলার কথাটা সত্য প্রমাণ হলো।
ওই সময় জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন খান আবদুর রহমান। বেগমজাদীর পিতা। তাঁর কাছে কলেজ বানানোর কথা বললে তিনি আঁতকে উঠে বললেন, কাদের মাথায় কলেজ বানানোর এসব পাগলের চিন্তা এসেছে? মানা করো এসব করতে, টাকা-পয়সা নেই, কোনো কিছুই নেই, কলেজ করবে? কলেজ করতে হলে কী লাগে! আবদুর রহমানই কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রধান পরামর্শক হয়ে দাঁড়ালেন। প্রতিটি কাজে তাঁর সক্রিয় সহযোগিতা, পরামর্শ ও পরিচালনায় কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ তরতর করে এগিয়ে চলল। কলেজের নতুন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন তিনিই করলেন।
এ কলেজের জন্ম যেভাবে শুরু, সে কথাটা প্রফেসর আবদুল মতিনের জবানিতে শোনা যাকÑ ‘বাংলাবাজার গার্লস স্কুলে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের শুভ উদ্বোধন করলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। গভর্নর আসবেন, কিন্তু কোনো সাজসজ্জা নেই। টিনের ছাউনি স্কুলের অ্যাসেম্বলি হলে টিনের একটা সাইনবোর্ড লিখে ঢেকে রাখা হলো একটি শাড়ি দিয়ে। গভর্নর এসে শাড়িটা সরিয়ে দিয়ে নামের ফলক উন্মোচন করলেন। যেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সেখানে বাইরের চাকচিক্যের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। কলেজের পরম সৌভাগ্য ও গৌরব যে, অর্গানাইজিং কমিটির মিটিং বসত গভর্নমেন্ট হাউজে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সভাপতিত্বে। বাংলাবাজার স্কুলের হেড মিসট্রেস লুৎফুন্নেসা চৌধুরী সহানুভূতি দেখিয়ে তাঁর স্কুলে কলেজের সকালের ক্লাস করার সুযোগ না দিলে কলেজের অস্তিত্বই থাকত না। তার সর্বাত্মক সহযোগিতা কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
প্রথম বছর শেষে বাংলাবাজার স্কুল ছাড়তে হলো সরকারি নির্দেশে। যেতে হলো নারিন্দা এলাকার রেললাইনের ধারে। বাজারের পাশে শক্তি ঔষধালয়ের বড় বাড়িতে, যার মধ্যে অসংখ্য কুঠরি আর বাস করে অসংখ্য লোক। উপরের তলায় দুটি কামরা এক রকম দখল করা হলো আর ছোট একটা ঘরে কাঠের পার্টিশন দেয়া হলো। সব মিলিয়ে ওপরতলার এক-তৃতীয়াংশে মেয়েদের কমন রুম করা হলো ঘরের চুলা ভেঙে চুনকাম করে। রান্নাঘরে অন্য রুমের বাসিন্দাদের রান্নার ঝাঁজে মেয়েরা ক্লাসে কাশতে শুরু করত। চারদিকে দুর্গন্ধময় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। রেলগাড়ি যাতায়াতের সময়ে কানে তালা লাগত। হাইবেঞ্চ বা টেবিল ছিল না লেখার জন্য। মেয়েদের হাঁটুর ওপর খাতা রেখে লিখতে হতো, কিন্তু কোনো অভিযোগ ছিল না। কত অসুবিধা, তবুও কোনো অভিযোগ ছিল না।
সেদিনের ছাত্রীদের কথা মনে হলে গর্বে বুক ভরে ওঠে। প্রথম বছর ভর্তি হলো ৩৪ জন ছাত্রী। কেউ প্রথম অথবা দ্বিতীয় বিভাগে স্কুল ফাইনাল পাস করেনি। শুধু তৃতীয় বিভাগ আর কম্পার্টমেন্টালের দল।
ঢাকা কলেজের ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ ড. আলী আহম্মদ তখন ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি প্রস্তাব করলেন, তাঁর স্ত্রীকে কলেজে ভর্তি করবেন। ১৯৫৬ সালে সেন্ট্রাল ইউমেন্স কলেজের জন্ম হলো তাঁর স্ত্রীর ভর্তির মাধ্যমে। কলেজের প্রথম ছাত্রী (রোল নম্বর ১) জেবুন্নেসা আজ আর ইহজগতে নেই। কিন্তু এ কলেজের প্রথম ছাত্রী হওয়ার গৌরবের অধিকার তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।’ (স্মৃতিকথা, আবদুল মতিন, কাকলি সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা জুলাই ২০০৬। সম্পাদনায় মেরিনা আখতার, রাজিয়া খাতুন, মনোজ কুমার সেন ও বেগম পারভীন)
জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল খান বাহাদুর আবদুর রহমান সাহেব আজীবন সেন্ট্রাল ইউমেন্স কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। অধ্যক্ষ বেগমজাদী মাহমুদা নিয়মকানুনের প্রতি কঠোর ছিলেন। পান থেকে চুন খসলেই তিনি তাতে খুঁত ধরে বসতেন। কিন্তু মানুষ মনে করে না যে, মানুষই আইন প্রণয়ন করে মানুষের প্রয়োজনে। আইন মানুষ তৈরি করে না। তাই আইন বড় না মানুষ বড়, এ রকম একটা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল বেগমজাদী মাহমুদা। কারণটা হলো, তখন ইংরেজি বিভাগ ছিল জগন্নাথ কলেজের নিচতলায় আর বাংলা বিভাগ ছিল দোতলায়। মতিন সাহেব প্রায়ই আসতেন অজিত গুহর সঙ্গে আলাপ করার জন্য। আবার আমি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও মির্জা হারুন, তাঁর ডিপার্টমেন্টে যেতাম তাঁর সঙ্গে আলাপ করার জন্য। একদিন একটি চিঠি পাঠালেন কবি শামসুর রাহমান আমার কাছে। আমি মতিন সাহেবকে খুঁজে বের করে বললাম, স্যার, সামান্য প্রয়োজনে আমি আপনাকে খুঁজছিলাম। সেটা হলো কবি শামসুর রাহমান সাহেবের মেয়ে সেন্ট্রাল উইমেন্সের ছাত্রী ছিল। একসময় মেয়েটি ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে চলে যায়, কিন্তু সেখানে তার ভালো না লাগায় সে আবার সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে চলে আসতে চায়। কিন্তু আপনার স্ত্রী কিছুতেই রাজি হচ্ছে না তাঁকে গ্রহণ করতে। কবি শামসুর রাহমান আমাদের সবার খুব সম্মানের পাত্র। তিনি আমার কাছে একটা অনুরোধ পাঠিয়েছেন এ ব্যাপারে একটু সাহায্য করার জন্য। স্যার, আপনি যদি বেগমজাদী ম্যাডামকে বলে রাজি করান, তাহলে খুব ভালো হয়। সব শুনে মতিন সাহেব বললেন, আমি বলে দেখব। তাতে আমার মনে হয়, সে রাজি হবে না। কারণ এ-জাতীয় কেস সাধারণত নেয়া হয় না।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect