ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৪১
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়ণ করেছেন তিনি। তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষক ছিলেন গোলাম কাদের। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রের ছাত্র থাকাকালীন সাইদুর রহমানের ক্লাসমেট ছিলেন। তার মাধ্যমে আরজ আলী মাতুব্বরের সাথে পরিচয় হয় সাইদুর রহমানের। যে সময় আরজ আলী মাতুব্বর মুক্তবুদ্ধিচর্চার জন্য হাজত খেটে এলেন, কিন্তু ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামি সম্পর্কে তার জিজ্ঞাসা থেমে থাকেনি; সে সময় পাকিস্তানি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর ড. বজলুর রহমানের ‘ইসলাম’, ‘জিজ্ঞাসা’, এইচজি ওয়েলসের ‘শর্ট হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’, ভ্যানলুমের ‘স্টোরি অব ম্যানকাইন্ড’ ইত্যাদি গ্রন্থ একে একে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। পুণ্যবান ধার্মিকরা উল্লিখিত ধর্ম গ্রন্থগুলোর বিরুদ্ধে মিছিল করে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। আর সে সময়েও সাইদুর রহমান ধর্ম সম্পর্কে অনেক কথা বলতে দ্বিধা করতেন না। বস্তুত সাইদুর রহমান হাস্যরসের সঙ্গে কথাগুলো এমনভাবে পরিবেশন করতেন, এতে উপস্থিত লোকেরা তেমন রাগ করতে পারতেন না। একদিন সাইদুর রহমানের সঙ্গে মির্জা হারুন-অর-রশীদ একটি বিয়েবাড়িতে তার প্রাইভেট কারে করে গিয়েছিলেন। বিয়েবাড়িতে হারুন সাহেব সাইদুর রহমান সাহেবকে একজন উচ্চশিক্ষিত ভদ্র লোকের সঙ্গে তার স্বভাব অনুযায়ী মুসলমান হিসেবে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। তখন এক ফাঁকে হারুন সাহেব তাকে বললেন, ‘স্যার, আপনি যখন কলকাতায় ছিলেন, তখন শুনেছি আপনি মসজিদে ইমামতিও করেছেন।’  সাইদুর রহমান সাহেব উচ্চকণ্ঠে হেসে বললেন, আরে মিয়া, সেজন্যই তো হগলডা জানি। আর বিয়ের ঘটকালি করা সাইদুর রহমানের আরেকটি নেশা ছিল। তিনি আমাদের কলেজের অনেক শিক্ষকের বিয়ে দিয়েছিলেন। একবার তিনি আমাদের কলেজের বাণিজ্য বিভাগের সহজ-সরল এক অধ্যাপকের বিয়ে দিয়েছিলেন। আমি ও মির্জা হারুন সাহেব বিভাগের এক কাজে প্রিন্সিপাল সাহেবের রুমে গেলাম। আমাদের আলাপের মধ্যেই সেই অধ্যাপক রুমে ঢুকলেন। তিনি তখন তাকে দেখেই উচ্চকিত হয়ে উঠলেন। তিনি তার স্বভাবসুলভভাবে রসিকতা শুরু করে দিলেন। উচ্ছ্বসিত হাসির সঙ্গে রস মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি মিয়া, নতুন বউ কেমন লাগতেছে? এরপর বউয়ের গোপন অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিয়ে এমন সব হাস্য-রসাত্মক কথা বললেন, আমরা দুজন প্রিন্সিপাল সাহেবের সঙ্গে জরুরি আলাপ শেষ না করেই উঠে আসতে বাধ্য হলাম। এক প্রকার দৌড় দিয়েই আমরা রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি বিস্মৃত হয়ে হারুন সাহেবকে বললাম, কি ভয়ঙ্কর লোক রে বাবা, তার মুখে কিছুই দেখছি আটকায় না। হারুন সাহেব আমাকে বললেন, এটা আপনার একটা গল্পে তুলে ধরবেন, তাতে খুব ভালো হবে।
শামসুজ্জামান খান সাহেব প্রায় সময়ই ঢুঁ মারতেন প্রিন্সিপালের রুমে (তিনি জগন্নাথ কলেজেরই ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন)। তিনি একদিন আমাদের সাইদুর রহমান সাহেবের দুটো মজার গল্প শোনালেন।
গ্রামের বাড়ি থেকে একজন সাধারণ স্বল্পশিক্ষিত সহজ-সরল এক লোক এসেছেন প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছে, পরনে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি। গ্রাম থেকে আসা এ লোক প্রিন্সিপাল সাহেবকে বললেন, স্যার, আমার একটা ছেলে আপনার কলেজে ভর্তি হয়েছে, আমার অনেকগুলো পোলাপান, আমি খুব কষ্টে আছি। আপনি যদি ছেলেটার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে আমার খুব উপকার হতো। প্রিন্সিপাল সাহেব তাকে একটা ধমকের সুরে তার টুপির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘মিয়া তোমার মাথার টুপিডা যদি ওইখানে (দুই পায়ের ফাঁকে গোপন অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে) লাগাইতা, তাহলে এতগুলো পোলাপান হতো না।’ এ কথা বলে হো হো করে হাসতে লাগলেন।
আরেকদিন তিনি বাংলা বিভাগের শিক্ষক অজিতকুমার গুহকে গল্পের ফাঁকে বললেন, অজিত বাবু, আমি তাকে (কলেজের এক ভট্টাচার্য শিক্ষকের নাম করে) নিয়ে তো আর পারছি না। রোজ সকালবেলায় আমি যখন ঘুমে থাকি, তখন তিনি আমার পা টিপেন। তারপর আমি উঠলে আমার সাথে মর্নিংওয়াকে যান। আবার প্রায়ই দেখি, আমার গরুর মাংস খাওয়া প্লেট ধুচ্ছে। আমি একদিন ধমক দিলাম, এই তুমি বামুনের পোলা, কী করতেছ? সে কলেজে ঢুকতে চায়। অজিত বাবু বললেন, কলেজে ঢুকিয়ে দিলেই তো পারতেন। তখন তিনি অজিতবাবুর কথার উত্তরে বললেন, কলেজে ঢোকা কি সোজা? হের রেজাল্ট তো ভালো না। তবে একদিন সত্যিই তিনি ভট্টাচার্যকে কলেজে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
তবে যে যা-ই বলুক, সাইদুর রহমান ছিলেন আপাদমস্তক ভালো লোক, পরোপকারী, দেশপ্রেমিক ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কারও ক্ষতি হোক, এমন কাজ তিনি করতেন না। ছাত্র, শিক্ষক-কর্মচারী যেকোনো বিপদে পড়ে তার সহযোগিতা চাইলে তিনি হতাশ করতেন না, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। বহু গরিব ঘরের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে না টাকার অভাবে। তিনি টাকা দিয়ে, কথা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। তিনি বলতেন, মুসলমানরা বহু টাকা খরচ করে সৌদিতে মক্কা-মদিনায় হজ পালন করতে যায়, কিন্তু এটাতে সওয়াব কম কিসের? আমি তার সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইংরেজিতেই কথা বলতাম। এর কারণ দুটি- প্রথম কারণ হলো তার আঞ্চলিক ভাষার কথা- কোনো কোনোটা বুঝতে অসুবিধা হতো। দ্বিতীয় কারণ হলো তিনি ইংরেজি বলতে পারতেন বিশুদ্ধভাবে এবং ইংরেজিতে কথা বলার সময় তার মুখ থেকে খিস্তিখেউড় কমই বের হতো।
একদিন অজিত গুহর বাসায় কালী পূজা উপলক্ষে আমরা কয়েকজন অধ্যাপক নিমন্ত্রিত হয়ে বসে গল্প করছিলাম। এমন সময় তিনি আরজ আলী মাতুব্বর, বরিশাল বিএম কলেজের কাজী গোলাম কাদের (দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক) মোস্তাফিজুর রহমান ও মেহেদী সাহেবদের (মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক) সঙ্গে নিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। টয় হাউজের রন্ধনশিল্পী অনিলদা এসে লুচি ও পাঁঠার মাংস পরিবেশন করতে লাগলেন। ‘খাবারদাবার ভালোই ছিল অজিত বাবুর দয়ায়’- কথাটা বললেন কোনো এক অধ্যাপক। কথাটা শুনেই তিনি উচ্ছ্বসিত হেসে বললেন, “মাতুব্বর সাহেব ‘দয়া’র কথাটডার একটা উত্তর দ্যান না, যেটা আমাকে পইড়া হুনাইলেন।” ঈশ্বর কী দয়াবান?
মাতুব্বর সাহেব তার দিকে এক নজর চেয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে স্পট ভাষায় বললেন, ঈশ্বর দয়াবান না নির্দয়বান, একেকজনের কাছে একেক রকম। যেমন আমরা পাঁঠার মাংস খাচ্ছি, আমাদের কাছে ঈশ্বর দয়াবান, আর নিরীহ পাঁঠাটাকে বলি দেয়ার জন্য যাঁতাকলে ঢোকানো হলো, তখন পাঁঠার কাছে ঈশ্বর নিষ্ঠুর প্রকৃতির, নির্দয়বান। ক্ষুধার্ত বাঘ যখন একটি হরিণকে শিকার করে, তখন বাঘের কাছে ঈশ্বর দয়াবান, আর যখন হরিণটাকে বাঘ থাবা দিয়ে ধরে, হরিণের শত চিৎকারেও ঈশ্বর সাড়া দেয় না, তখন ঈশ্বরকে কী বলব? আমাদের মধ্য থেকে আরেক শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, তাহলে মাংসাশি বাঘ খাবে কী? ক্ষুধায় তো মারা যাবে। আরজ আলী মাতুব্বর সাহেব শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, ঈশ্বর মাংসাশি সৃষ্টি না করে তৃণভোজীও তো সৃষ্টি করতে পারতেন। যেমন মহিষ বাঘের চেয়ে কম শক্তিশালী কি? কেঁচো মাটি ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। মানুষই মানুষের মূল ক্ষতির কারণ। সাইদুর রহমান যখন তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গভর্নর প্রায় নিয়েছিলেন, এমন সময় তার সেই ভাইপো গভর্নর সাহেবের সাথে দেখা করে সাইদুর রহমান যে কথায় কথায় ইসলাম ধর্মকে নিয়ে ও মুসলমানদের মোনাজাত নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক বাক্য ব্যবহার করতেন, তার টেপ নিয়ে গিয়ে শুনিয়ে এলেন। ব্যস, গেল খতম। অবশেষে সাইদুর রহমানকে বিদায় নিতে হয়েছে।
কিন্তু কথায় বলে, অন্যের ক্ষতি করে যে, তার ক্ষতি অন্যজনে করে। আর্থিক কর্মকা- থেকে শুরু করে প্রশাসনের সবকিছুতে তিনি প্যারালাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চালাতেন। একবার এক প্রিন্সিপাল ও তার ঘনিষ্ঠজন সম্ভ্রান্ত স্ত্রীকে জড়িয়ে অশ্লীল কথাবার্তা ছড়ান, কিন্তু সত্যের ঢোল আপনিই বাজে। পরিশেষে সবার ঘৃণা ও ক্ষোভ উল্টো সেই শিক্ষকের ওপরই বর্ষিত হতে লাগল। ছাত্রদের সঙ্গে বখরা নিয়ে গোলমাল বাধলে একসময় তারা তাকে কলেজ থেকে বের করে দেয়। তিনি আর এ কলেজে ঢুকতে পারেননি।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect