ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৪৫
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়ণ করেছেন তিনি। তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

যে কোনো দেশে যুদ্ধ সংঘটিত হলে শত্রু বাহিনী প্রথমেই ধ্বংসের তালিকায় রাখে লাইব্রেরিকে। আমাদের দেশেও একাত্তরের যুদ্ধে আর কিছুদিন সময় পেলেই পাক হানাদার বাহিনী আমাদের জগন্নাথ কলেজের লাইব্রেরিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলত। এর আগে পাক হানাদার বাহিনী ল্যাবরেটরির লাখ লাখ টাকার অ্যাপারেটাস সব রাইফেলের বাঁট দিয়ে ভেঙে চুরমার করে ফেলেছিল। এসব যন্ত্রপাতি কত যে দামি ছিল আর সংগ্রহ করাটা ছিল কঠিন বিষয়। যেসব দামি কম্পিউটার ছিল এবং অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করা হয়েছিল। অনেক বইও তারা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছিল। কার্টনে বাঁধা বা রাখা বইগুলোও তারা লাইন ধরে সাজিয়ে রেখে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। আবার আর্টের ওপর দুর্লভ বই, ইংরেজি বই কার্টনে ভর্তি করে তারা রেখেছিল পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সে সুযোগ তারা পায়নি, ১০ ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমা হামলা ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর হামলা পাক হানাদার বাহিনীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। তখন তারা জীবন নিয়ে পালাতেই ব্যস্ত, অন্য জিনিসের প্রতি খেয়াল রাখা তো দূরের কথা। ফলে জগন্নাথ কলেজের লাইব্রেরির কিছু দুর্লভ বই রক্ষা পেয়েছিল।
ইলিয়াস সাহেব মাথা খাটিয়ে একটা পথ বের করলেন। তিনি একদিন আমাকে ও হারুন-অর-রশীদকে বললেন, আমাদের বিভাগের বইগুলো যেহেতু অধিকাংশই পশ্চিম বাংলায় লিখিত ও মুদ্রিত, তাহলে আমরা একটা কাজ করতে পারি, কাজটা হলো ভারতীয় হাইকমিশন বরাবর একটি লিখিত অনুরোধপত্র দিয়ে দিতে পারি দরকারি বইগুলোর জন্য। তার প্রস্তাবটা আমরা দুজনেই শোনার পর বললাম কথাটা তো ঠিক। চেষ্টা করে দেখো না, তারা এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করে কিনা। আমাদের দিক থেকে তো অনুরোধ করতে অসুবিধা নেই। তবে একটা ভরসা হলো জগন্নাথ কলেজের বহু ছাত্র, শিক্ষক ও শুভাকাক্সক্ষী আছেন ভারতীয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন, বুদ্ধিজীবী-লেখকও আছেন। সবচেয়ে বড় কথা, সারা ভারতে জগন্নাথ কলেজের একটা ইমেজ আছে। এসব দিক দিয়ে বিবেচনা করে হয়তো বা  তারা কিছু বই সংগ্রহ করেও দিতে পারেন।
আমি ডিপার্টমেন্টের কাজগুলো সামলাতে থাকলাম, আর তাদের দুজনকে দায়িত্ব দিলাম প্রয়োজনীয় বইয়ের একটি তালিকা করতে। ইলিয়াস ও হারুন এক রকম খাবার-দাবার ছেড়ে দিয়ে রাত-দিন পরিশ্রম করে একটি বইয়ের তালিকা প্রণয়ন করল। শুধু বইয়ের নাম লিখে দিলে তো চলবে না, বইয়ের নাম ও প্রকাশকের নাম, প্রাপ্তিস্থান, সাল-তারিখ সবই তো নির্দিষ্ট করে দিতে হয়, তাই না? এতগুলো বইয়ের নাম ও প্রকাশকের নামসহ তথ্য সংগ্রহ করা তো সহজ ব্যাপার নয়। অনেক জায়গা থেকে সংশ্লিষ্ট লেখক বুদ্ধিজীবীদের ধরে তালিকাটা তৈরি করে তা ভারতীয় দূতাবাসে পাঠিয়ে দেয়া হলো। মাসের পর মাস যায় ইলিয়াস ও হারুন ডিপার্টমেন্টে এসে প্রায়ই তারা হতাশার কথা জানাত। ভারতীয় হাইকমিশন বই যে পাঠাবে আমি নিজেও সে আশা ছেড়ে দিলাম। হারুন একদিন বলল, ভুল করলাম। হাজার হাজার টাকার মূল্যের বইয়ের লম্বা তালিকা না পাঠিয়ে অতি প্রয়োজনীয় বইগুলোর তালিকা পাঠানোর দরকার ছিল। আমি তাকে বললাম, যা হওয়ার তো হয়েছে। এখন নগদ টাকা খরচ করে ভারতে গিয়ে দরকারি বইগুলো কিনে আনলে অন্তত পক্ষে অনার্স কোর্সটা চালানো যাবে, পরেরটা পরে দেখা যাবে। এ নিয়ে আমরা যখন ভিন্ন রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করছিলাম, তখন প্রিন্সিপাল সাহেব এসে খবর দিলেন, ভারতীয় হাইকমিশনার একটি চিঠি পাঠিয়েছে এবং চিঠিটা ইলিয়াস ও হারুনকে ডেকে তাদের হাতে দিলেন। চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে বলা হয়েছে, আমরা দুঃখিত যে, তোমাদের জবাব দিতে এত দেরি হলো।
আসল ব্যাপার হলো, তোমরা যে বইয়ের তালিকা দিয়েছ, তা সবই কলকতায় ছাপানো হয়। আমরা  তোমাদের চিঠি নিয়মমাফিক দিল্লিতে পাঠিয়েছি। দিল্লি থেকে আমাদের কলকাতা অফিসে যথারীতি চিঠির উত্তর দেয়া হয়েছে। সেখানে এসব বই সংগ্রহ করতে সময় লেগেছে। এজন্য তোমাদের কাছে আমাদের পৌঁছাতে এত সময় লেগেছে। এখন তোমরা এসে আমাদের অফিস থেকে তোমাদের বইগুলো নিয়ে নাও।
ইলিয়াস গিয়ে বই নিয়ে এলেন। বই পেয়ে আমরা মহা খুশি। কয়েক কার্টনভর্তি ঝকঝকে নতুন বই। জগন্নাথ কলেজের জেনারেল লাইব্রেরিতে বইগুলো না পাঠিয়ে বাংলা বিভাগের সেমিনার হলে কয়েকটি আলমারিতে সাজিয়ে রাখা হলো বইগুলো। যথারীতি অনার্স কোর্স চালু হলো। আমরাও ক্লাস ভাগ করে ছাত্রদের পড়াতে থাকলাম। কিন্তু একদিন কুচক্রী মহল আমাদের বহু কষ্টে অর্জিত আরেকটি দেশের দয়ায় পাওয়া বইগুলো পুড়িয়ে দিল। কোটি কোটি টাকার সম্পদ পুড়িয়ে দিতে একটা ম্যাচের কাঠিই যথেষ্ট ছিল। আর বিবেকহীন অমানুষরা কোনো প্রকার চিন্তা না করেই এরূপ ভয়াবহ ঘটনা ঘটাতে পারে! বাংলা ডিপার্টমেন্টে একদিন একজন বেয়ারা এসে খবর দিল আগুন লাগার কথা। খবর শুনেই ইলিয়াস ও হারুন দৌড়ে গেল দেখতে, তাদের পেছনে পেছনে আমিও গেলাম দেখতে। এখন প্রশ্ন হলো, আগুন লাগল, না লাগানো হলো! কিন্তু সেমিনার হলটিতে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এরপর পাশাপাশি সব আলমারিতেই আগুন যে লাগবে, সে সম্ভাবনাও নেই, কারণ কোনো কোনো আলমারি একটু দূরেই ছিল, দেখেই মনে হচ্ছিল কেউ ইচ্ছে করেই আগুন লাগিয়েছে। দুদিন পর বেয়ারা এসে খবর জানাল, ঘরে আলমারিগুলোর ফাঁকে কেরোসিন তেলের একটি কুপি পড়ে ছিল। প্রিন্সিপাল সাহেব সেটা জমা রেখেছেন। আমরা ভাবছিলাম, কে এমন সর্বনাশ কাজ করতে পারে। আগুন লাগাবে কে? তখন ছাত্রদের মধ্যে তেমন কোনো দলাদলি চলছিল না, আর যদি দলাদলি থেকেও থাকে, ওটা ওদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ছাত্রদের মধ্য থেকে এ ধরনের সর্বনাশা কাণ্ড ঘটানোর সম্ভাবনা কম। প্রিন্সিপাল বজলুর রহমান সাহেব তার গোয়েন্দা বাহিনীকে কাজে লাগালেন। খবর বেরিয়ে এল জগন্নাথে কলেজের একজন অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচিত যোগদান করেছেন। কিন্তু তিনি ঠিকমতো ক্লাস করতেন না। প্রায় দিনই তিনি ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতেন। তিনি একটি ডায়েরি বই হাতে নিয়ে আসতেন, তারপর বিভিন্ন সরকারি অফিসে ঘোরাঘুরি করতেন। কোথাও এর চেয়ে ভালো পোস্টিং পাওয়া যায় কিনা। যদিও তিনি প্রমোশন নিয়ে এখানে এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তার গ্রামের বাড়িতে বহাল তবিয়তে থেকে চাষাবাদ করেছেন। পরবর্তীতে একটি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট জোগাড় করে সরকারি বিভিন্ন অফিসে ঢুকে নানা সুবিধা আদায় করেছেন। মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অফিসে প্রমোশন নেয়ায় জন্য ঘোরাঘুরি করায় তার ক্লাসগুলো ফাঁকা যাচ্ছিল। এ নিয়ে অনার্স ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে একটা অসন্তোষও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু দালালের দৌরাত্ম তো সব জায়গাতেই লেগে থাকে। ওই অধ্যাপক নিজের অপকর্মকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য ছাত্রদের মধ্য থেকে একটা গ্রুপ তৈরি করেছিলেন। তার এ গ্রুপের জন্য মাঝে মধ্যে কিছু টাকা খরচও করতেন। এ গ্রুপের মধ্যে একদিন হাতাহাতিও হয়েছিল। এ আগুন তারই ফল। এমনকি কোন কোন ছাত্র এতে জড়িত, এসব ছাত্রের কার বাড়ি কোন এলাকায়, আগুন দেয়ার পরিকল্পনা কে করেছিল, প্রিন্সিপাল সাহেবের গোয়েন্দা বাহিনী সব খবর বের করে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রিন্সিপাল সাহেব এ বিষয়ে আর বেশি দূর এগোয়নি। কেননা জগন্নাথ কলেজ সরকারি কলেজে রূপান্তর হওয়ার পর সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে ওই মুক্তিযোদ্ধা নামধারী অধ্যাপকের ও কিছু দালাল অফিসার সরকারি উচ্চ মহলে পদবীধারী ছিল, যারা তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে গেলে বাধা হয়ে দাঁড়াত।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect