ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৪৬
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়ণ করেছেন তিনি। তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

আমরা দালাল বলতে মোটাদাগে ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যারা বিরোধিতা করেছিল অর্থাৎ আলবদর, রাজাকার বা পাকহানাদার বাহিনীর সহযোগীদের বুঝি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা নামধারীরা এত বড় সর্বনাশ করে ছাড়ল! আমি ছাত্রদের বড় বড় আন্দোলন দেখেছি, মারামারি, খুনোখুনিও দেখেছি, কিন্তু ছাত্রদের দ্বারা এমনভাবে বই পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা এর আগে শুনেনি। সুতরাং ১৯৭৩-৭৪ সালেই কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারছিলাম, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন দিকে যাচ্ছে। একদিন পরই খবর এল, ওই অধ্যাপক সাহেব এর চেয়ে ভালো একটা জায়গায় চলে গেছেন।
জগন্নাথ কলেজ সরকারি কলেজে রূপান্তর হওয়ার পর থেকে মফস্বল কলেজগুলো থেকে যেসব প্রভাষক-অধ্যাপক বদলি হয়ে এসেছিলেন, তাদের কেউ এসেছেন ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে, কেউ এসেছেন ডিগ্রি পাস কোর্স কলেজ থেকে। অনার্স ক্লাসে কিংবা মাস্টার্স কোর্সে ক্লাস চালানোর মতো যোগ্য ও অভিজ্ঞতা বলতে তাদের তেমন ছিল না। কাজেই তাদের ওপর নির্ভর করা যায় না। তাই এসব কোর্সের ক্লাস আমাকে, ইলিয়াস ও হারুনকে ভাগাভাগি করে চালাতে হতো। আমরা বাংলা সাহিত্যের একাধারে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ, প্রাচীন যুগ ছাড়াও পুথিসাহিত্য, বৈঞ্চব পদাবলি আবার আধুনিক যুগের কবিতা, উপন্যাস, ছোট গল্প ইত্যাদি সবই পড়াতাম। আমার একটি বাড়তি সুবিধা ছিল সংস্কৃতি বিষয়ে অভিজ্ঞতা, স্কুলে পড়ার সময় আমি সংস্কৃতি বিষয় নিয়েছিলাম এবং লেটার মার্কস নিয়ে পাস করেছিলাম।
ইলিয়াস শুধু ছাত্র পড়াতেন যে তা নয়, দক্ষ শিক্ষকও  তৈরি করে দিতেন। ছাত্র পড়ানোর সময় কোন পজিশনে দাঁড়াতে হবে, কোন অ্যাঙ্গেলে দাঁড়িয়ে লেকচার দিতে হবে, গলার স্বর কেমন হতে হবে, পোশাক-পরিচ্ছদ কেমন হবে, তা বুঝিয়ে দিতেন।
জগন্নাথ কলেজে তখন তিন-চারজন পুরুষ অধ্যাপক বাদ দিয়ে অন্যরা সবই ছিলেন অধ্যাপিকা। এদের উপযুক্ত শিক্ষিকা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে যখন ইলিয়াস বলতে থাকতেন, এ মহিলা শিক্ষিকা আপনাদের মধ্যে সবাই কি ভালো পড়ান, সবাই কি সুন্দরী, আবার সুন্দরীর মধ্যেও পার্থক্য আছে, গায়ের রঙ ফর্সা হলেই চলবে না, অনেক শ্যামলা মেয়েও দৈহিক গড়ন ও সৌষ্ঠবে ও পোশাকে ম্যাচ হলেও অপরূপ সুন্দরীর রূপ ধারণ করে। এভাবে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাদের কপালের টিপ থেকে শুরু করে পরনের শাড়ি-ব্লাউজ, পায়ের আলতা ইত্যাদি সব সাজগোজ সম্পর্কে বলতেন। জগন্নাথ কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে নানা সুযোগ-সুবিধার পথ ধরে অনেকেই চলে গেছেন। শেষ পর্যন্ত যারা থাকলেন, তাদের সবার নাম মনে পড়ছে না। মনে পড়ছে- নার্গিস আনোয়ার, শাকিনা খাতুন, সাহানা আজীম, বেগম রোকেয়া, বেগম গুলবাহার, অনামিকা হক লিলি, সায়েরা খাতুন, ড. সেলিমা সাইদ, সুচিত্রা রানী ও শামসুন নাহার।
বেগম গুলবাহার ১০-১২ বছর জগন্নাথ কলেজে ছিলেন। পরে বদলি হয়ে ইডেন কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ, সংগীত মহাবিদ্যালয় হয়ে পরে তেজগাঁও কলেজ থেকে অবসর নেন। এ অধ্যাপিকার সঙ্গে ইলিয়াস বেশ ঠাট্টা-মশকরা করতে পারত। তার শারীরিক গড়ন খুবই ভালো ছিল। বয়স বোঝা যেত না, তিনি তার মেয়ের সাথে থাকলে বোঝাই যেত না, ওটা যে তার মেয়ে। অনেকেই ভাবত তারা দুই বোন। আমরা তাকে ঠাট্টা করে বলতাম এভার গ্রিন। তিনি শুধু শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে নয়, পোশাক-আশাক, সাজগোজ, কথাবার্তায়ও ছিলেন স্মার্ট।
আমাদের বাংলা বিভাগে তানি নামে একটা মেয়ে শিক্ষকতা করত। সে পড়াশোনা করত, কবিতাও লিখত। তখন তার কবিতার জন্য সুনাম ছড়িয়ে পড়ছিল। আধুনিক বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তার বেশ দখল ছিল। তার স্বামী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু ওই শিক্ষক তাকে রেখে আরেকটি বিয়ে করেন। ফলে মেয়েটি চরম বিপদে পড়ে যায়। তবে মেয়েটি ছিল অসম্ভব রকমের মোটা, চলতে-ফিরতে তার যথেষ্ট কষ্ট হতো। আমরা মেয়েটিকে দেখেশুনে রাখতাম। কেননা মেয়েটি ছিল সরল ও সাদাসিধা টাইপের। ইলিয়াস সাহেব প্রায় সময় খোঁজখবর রাখতেন। যদিও সে বিশেষ কারণে ক্লাস করতে পারত না, তার জন্য অসুবিধায় যাতে পড়তে না হয়, ইলিয়াস সাহেব নিজে সে ক্লাসটা চালিয়ে আসতেন অথবা অন্য শিক্ষক দিয়ে তা ম্যানেজ করতেন। সেলিমা বেগম নামের অন্য এক অধ্যাপিকা যশোর থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসতে চান। তিনি ছিলেন খুবই চালাক। তিনি এই সরল ও বোকা মেয়েটিকে টার্গেট করেন। মেয়েটিকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে টাঙ্গাইলের একটি কলেজে বদলি করিয়ে দিয়ে নিজে জগন্নাথ কলেজে চলে আসেন। যেদিন রিলিজ অর্ডার নিয়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসে, সেদিন আমরা সবাই হায় হায় করে উঠলাম। ইলিয়াস তো পারে তাকে মারই দিতে যায়।
অজিত গুহ থাকাকালীন আমরা বাংলা বিভাগের পাঠদান একটা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। বিশেষ করে ইলিয়াসের মতো যোগ্য সাহিত্যিক, হারুন আমি- সে সময় আমাদের এ তিনজনকে বাংলা বিভাগের ট্রয় বলা হতো। অজিত গুহর চলে যাওয়ায় পর সরকারের উপরিমহলে অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্তা বাবুদের ম্যানেজ  করে অনেক অযোগ্য অধ্যাপক বিভাগীয় প্রধান হয়ে বসলেন এবং সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকায় তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং ছকমাফিক বিভাগ চলতে শুরু করল। নবাগত এ বিভাগীয় প্রধান তার পদমর্যাদার মর্যাদা রক্ষার্থে অনার্স ক্লাসের সর্বাপেক্ষা জটিল বিষয় ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনিতত্ত্ব তার রুটিনে শামিল করে নিলেন। তার ধারণা, তিনি বিভাগীয় প্রধান, তিনি ভাষাতত্ত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না পড়ালে তার সর্বোচ্চ পদের গৌরব রক্ষিত হবে  না। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, বিভাগীয় প্রধান সাহেব ভাষাতত্ত্ব তো দূরের কথা, ক্লাসই করতেন না। আসল কথা হলো, ভাষাতত্ত্বের মতো একটি জটিল ও মৌলিক বিষয়ে তার জ্ঞান তো থাকতে হবে। কিন্তু ছাত্রদের মাঝে যেন তার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা না জন্মে, তার জন্য তিনি মাঝে মধ্যে ক্লাসে যেতেন এবং কিছু তরল ও চটুল হাস্যরসাত্মক কথা বলে ছাত্রদের রসের খোরাক দিতেন এবং এই ফাঁকে নিজের ব্যর্থতার দায়ভারমুক্ত হতেন।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect