ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৪৯
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়ণ করেছেন তিনি। তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

১৯৬৮ সালের দিকে ইলিয়াস আমার কেএম দাস লেনের বাড়িতে ভাড়ায় থাকতে শুরু করেন। আগেই বলেছি, ইলিয়াস শিক্ষকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি বাম রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। মিছিল-মিটিংয়ে অনেক সময় স্বশরীরেও উপস্থিত থাকতেন। বামপন্থী বহু নেতা ও কর্মীদের দেখা যেত তার রুমে বসে গল্প ও আলোচনা করতে। যুদ্ধ শুরু হলে ইলিয়াস মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহযোগিতা করেন। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা, গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে দেয়ার কাজও তিনি করতেন। বঙ্গভবনে সশস্ত্র হামলা যাতে করা যায় তার জন্য আমার বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় মর্টারগান বসিয়ে মর্টার হামলা চালানোর পরিকল্পনাও তিনি করেছিলেন। জগন্নাথ কলেজে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল, কাঁধে বন্দুক নিয়ে সবসময় আমাদের সামনে দিয়ে পাক আর্মিরা চলা ফেরা করত। তখন বজলুর রহমান ছিলেন প্রিন্সিপাল, ভালো আরবি জানতেন, উর্দুও তিনি মোটামুটি জানতেন। তিনি বামপন্থী ও সাহিত্যমনা শিক্ষকদের তীক্ষ্ণ নজরে রাখতেন, যাতে আমাদের ওপর কোনোরূপ বিপদ না আসে। আমাদের বিরুদ্ধে হানাদার বাহিনীর সন্দেহ উদ্রেক না হয়, ইলিয়াস উর্দু ভাষায় শিক্ষকদের ধরে প্রয়োজনীয় কিছু সংলাপ শিখিয়ে দিতেন। টিচার রুমে বসে সংলাপগুলো নাটকের মতো করে অভিনয় ও মুখস্থ করিয়ে দিতেন। নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমরা কলেজে সপ্তাহে এক-দুদিন যেতাম। পরিস্থিতি বুঝে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। যুদ্ধের পরও পাঁচ-ছয় বছর ইলিয়াস আমার বাসায় ছিলেন। বগুড়া গিয়ে বিয়ে করে নতুন বউকে নিয়ে আসেন আমার বাড়িতে। সম্ভবত ১৯৭৬-৭৭ সালের দিকে ইলিয়াস আমার বাড়ি ছেড়ে হুমায়ুনের রোজ গার্ডেনের সামনের এক ডাক্তারের বাসা ভাড়া নিয়ে ওঠেন। ওই এলাকাটা কেএম দাস লেনের ভেতরে পড়লেও মূলত স্বামীবাগ এলাকাই ধরা হতো। তখন স্বামীবাগে বিখ্যাত সব লোকদের বসবাস ছিল।
মির্জা হারুনও তখন স্বামীবাগে থাকতেন। ওই একই বিল্ডিংয়ের দোতলায় কথা সাহিত্যিক দিলারা হাশিম তার বাবা ও পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন। আমি মাঝে মধ্যে হারুনের বাসায় যেতাম। দু-একবার দিলারার বাবা বজলুর রহমানের বাসায়ও গিয়েছিলাম ভদ্রলোকের সানন্দে আগ্রহে। বজলুর রহমান সাহেব পেশাগত জীবনে ডেপুটি সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক ছিলেন। ইংরেজিতে অনুবাদ কোরআন শরীফকে তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বজলুর রহমান সাহেব ওই বাড়িটি কিনে নেন। কিন্তু ১৯৭৮ সালের দিকে তিনিও বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে চলে যান। বর্তমানে আবাসন কোম্পানি বাড়িটি কিনে নিয়ে বহুতল ভবন তৈরি করে ফ্ল্যাট বিক্রি করেছে।
এই ৫৪ নং বাড়ির পাশেই ৫৫ নং বাড়িতে খ্যাতিমান দুই প্রয়াত শিল্পী গহর জামিল ও রওশন জামিল ‘জাগো আর্ট সেন্টার’ প্রতিষ্ঠিত করেন। তখন প্রখ্যাত এ দুই শিল্পীর পদচারণায় মুখর থাকত আর্ট সেন্টারটি। লেখক-শিল্পী, সাহিত্যিক, গায়ক, নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, আবৃত্তিকার, ছড়াকার, কবি সব রকমের শিল্পীদের আনাগোনা হতো এ আর্ট সেন্টারে। আজকে সেই জৌলুশ ও গৌরব অনেকটা মলিন হয়ে গেছে। তবুও বলা যায়, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এ বেহাল দশার যুগে এ আর্ট সেন্টারটি যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এতেও কম গৌরব কিসের? এ সেন্টারের ঠিক বিপরীত পাশে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সফিউদ্দিনের বাড়ি। সম্ভবত অজিত বাবুর মাধ্যমে আমার সঙ্গে এ মহান শিল্পীর পরিচয় ঘটে। আমি অজিত বাবুর সঙ্গে দু-তিন দিন তার বাসায় গিয়েছিলাম। অজিত বাবুকে সফিউদ্দিন সাহেব খুব শ্রদ্ধা করতেন এবং অজিত বাবুর কল্যাণে আমারও যথেষ্ট কদর হয়েছিল তার বাড়িতে। এমনকি তার পরিবার, বাড়ির কাজের লোকেরা আমাদের সাধ্যমতো আদর ও আপ্যায়ন করাতেন।
প্রায় ১০ কাঠা ভূমির ওপর শিল্পীর বাড়িটিতে ঢুকলে যেকোনো লোকের মনে হবে এটা একটা সিনেমার শুটিং প্লেস। পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল বাড়িটি। একপাশে বাস করার জন্য একতলা বাড়ি দুটি। তবে বাড়ি দুটি লাগোয়া মনে হবে। বাকি সব জায়গাজুড়ে বাগান তৈরি করা। সবুজ বনভূমিতে ভরা এ বাড়িতে ঢুকলে মনে হবে, আপনি প্রকৃতির কাছাকাছি চলে গেছেন। আগের মতোই এখনো বাড়িটি সবুজ গাছগাছালি ঘেরা এ বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতা ভবানীপুরের অধিবাসী এ বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সাতচল্লিশে দেশভাগ কালে এ দেশে চলে আসেন এবং ঢাকার এ স্থানটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। তিনি তার সময়ে আর্ট শিল্পী হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। লন্ডন, প্যারিস প্রভৃতি স্থানে তার শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েছিল। সফিউদ্দিন আহমদের বাড়ির পাশেই উত্তর দিকের বাড়িতে বিখ্যাত সাংবাদিক প্রয়াত আবদুল ওহাব সাহেবের বাড়ি। ওহাব সাহেব প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান সাহেবের শ্বশুর। ওহাব সাহেবের পাঁচ মেয়ে ও দুই পুত্র। জ্যেষ্ঠ কন্যার সাথে ড. আনিসুজ্জামানের বিয়ে হয়। নিজেদের পছন্দমতো তাদের বিয়ে হয়। তাই কোনো রকমের ঝামেলাঝক্কি পোহাতে হয়নি অভিভাবকদের।
সফিউদ্দীনের বাড়ি থেকে ১০০-২০০ গজ পশ্চিমে দুজন পার্লামেন্টারিয়ান থাকতেনÑ একজন আবদুল আউয়াল ও একজন আবদুর রব। দুজনই প্রয়াত। তবে তারা দুর্নীতিবাজ ছিলেন না।
আবদুল ওহাব সাহেবের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে ঢাকার এককালের বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী ডালিয়া সালাহউদ্দিনের বাসা। ডালিয়ার মা কাজী রওশন আরা বেগম বিখ্যাত বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের খালা শাশুড়ি। বিচারপতি মোরশেদের পিতা বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী প্রয়াত একেএম জাকারিয়া সাহেব কাজী রওশন আরার ভগ্নিপতি। জাকারিয়া সাহেব ছিলেন অত্যন্ত তেজোদীপ্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি একসময় কলকাতা করপোরেশনের মেয়র ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক ছিলেন। তিনি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি তার নিজ দল থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছিলেন। কেননা তার যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি ছিল। তিনি নিরহঙ্কার ও মিশুক ছিলেন। দুর্নীতিকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দিতেন না। ডালিয়ার বড় মামা হাফিজুর রহমান ছিলেন কংগ্রেসের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতা। তার সঙ্গে আমার বাবা খোরশেদ আলী সরকারও পরিচিত ছিলেন। তা আমি বাবার মুখে বহুবার শুনেছি।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect