ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৫০
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়ণ করেছেন তিনি। তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

এখন নমিনেশন পাওয়ার জন্য দলের প্রধানের হাতে কোটি কোটি টাকা  ডোনেশন দিতে হয়। অর্থাৎ টাকা দিয়ে নমিনেশন পেপার কিনে নেয়া হয়। আরেকটি প্রক্রিয়া হলো, দল থেকে নমিনেশন দেয়া না হলে নিজের অনুগত সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করা হয়। খুন পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু তখনকার দিনে রাজনীতিবিদরা এত নোংরা ছিলেন না। একবার ঠিক করলেন কাজী সাহেব আর রাজনীতি করবেন না এবং নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। কিন্তু তার নিজ এলাকায় জনগণ তার বাড়িতে এসে তাকে ঘেরাও করে বসল এবং তারা বলতে থাকল তাকে অবশ্যই নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। জনগণের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত কাজী সাহেব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন। বিপুল ভোটের ব্যবধানে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে নির্বাচনে জিতেছিলেন।
ডালিয়ার সেজো মামা কাজী আবু নাসেরের সঙ্গে শেখ মুজিবের বন্ধুত্ব ছিল। শেখ মুজিব যখন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র তখন ডালিয়ার সেজো মামা কাজী আবু নাসের শেখ মুজিবের সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন। খান বাহাদুর সাহেবের এ পরিবার কলকাতায় তখন যথেষ্ট পরিচিত। একদিকে জাকারিয়া সাহেবের শ্বশুরবাড়ি, অন্যদিকে খান বাহাদুর সাহেবেরও যথেষ্ট পরিচিত ছিল। তিনি ইনকাম ট্যাক্সের অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন। পরোপকারি ও সাদাসিধা ব্যক্তি হিসেবে তার জনপ্রিয়তা ছিল। কাজী সাহেবের সঙ্গে শেখ মুজিবের বন্ধুত্ব এমন গাঢ় ছিল যে, দেশ বিভাগের পর শেখ মুজিবের প্রভাব ও পরোচনায় কাজী নাসেরসহ আরও কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ঢাকাতে চলে আসেন ও স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কাজী নাসের গুরুতর অসুস্থ হয়ে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসলে শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় দিন তাকে তার তেজগাঁওয়ের বাসায় দেখতে যেতেন।
এ এলাকার গোপীবাগ থার্ড লেনে বসবাস করছিলে মার্ক্সীয় চিন্তাবিদ বুদ্ধিজীবী, লেখক ও বাম রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমর। তার পিতা আবুল হাশিম পাকিস্তান আমলেই মুসলিম লীগের দায়িত্ব পালনকালে এ এলাকায় বসবাস করছিলেন। পুরান ঢাকার বিখ্যাত লোকদের বসবাস ছিল। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সুভাষ দত্তও গোপীবাগে বসবাস করছিলেন। তিনি তখন প্রয়াত হয়েছেন। এককালের নিউক্লিয়াস সদস্য ও পরবর্তীতে জাসদ নেতা কাজী আরেফও এ এলাকায় বসবাস করতেন।
১৯৬৮ সালে পুরানো ঢাকার কেএম দাস লেনে আমি প্রায় আড়াই কাঠার প্লট কিনি সাড়ে  ৭ হাজার টাকায়। তবে শেষ পর্যন্ত খরচ পড়ে ৯ হাজার টাকার মতো। সচিবালয়ে চাকরি করতেন এক ভদ্রলোক, তার ছেলেকে লন্ডনে পড়াবেন বলে জায়গাটি বিক্রি করেছিলেন। রেজিস্ট্রি করার সময় একটা জটিলতা দেখা দেয়, মূল মালিক হিন্দু ভদ্রলোক থাকতেন কলকাতায়। আমার সঙ্গে আরও চার-পাঁচজন ব্যক্তি এ ভদ্রলোক থেকে জায়গা কিনেছিলেন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত একটু বেশি খরচ দিয়ে রেজিস্ট্রি সমাপ্ত করা হয়। আমি এ জমিটি কিনেছিলাম সম্পূর্ণ বইয়ের রয়েলটির টাকায়। বাড়িটি তৈরি করার সময় আমার এক ছাত্র ১০ হাজার ইট বাকিতে দিয়ে যায়, আমি নগদ মাত্র ২ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। ইটের ব্যবস্থা তো হলো, রড, সিমেন্ট, মিস্ত্রির খরচ কীভাবে সংগ্রহ হবে?
যাই হোক, আমার বন্ধুদের অনেকেই আমাকে পরামর্শ দিলেন হাউজ বিল্ডিং ফিন্যান্স থেকে ঋণ নেয়ার জন্য। আমি ঋণের জন্য আবেদন করি। প্রথমবার আমাকে ২০ হাজার টাকা ঋণ দেয়। অর্থাৎ দুই ধাপে মোট ৪০ হাজার টাকা ঋণ দেয়। এভাবে দ্বিতীয় তলার কাজ সমাপ্ত করা হয়।
কেএম দাস লেন, অভয় দাস লেন, রামকৃষ্ণ রোডসহ এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। এ হিন্দুদের অনেকেই দেশভাগের সময় ভারতে চলে যায়। ১৯৬৫ সালে দাঙ্গার পর আরও অনেকে ভারতে চলে যান তাদের সহায় সম্পত্তি ফেলেই। এর দুই-তিন বছর আগেও সেই  আমলের বহু পরিত্যক্ত বাড়ি পুরান আমলের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল।
কিন্তু সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই এসব পরিত্যক্ত সম্পত্তি নিয়ে। ফলে সরকারি দলের ভূমিদস্যুরা এসব বাড়ি-ঘর দখল করে নিয়ে বহুতল ভবন তৈরি করে ভাড়া দেয়। অথচ সরকার বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করার জন্য সবসময় তৎপর থাকে। এ টিকাটুলি এলাকাতেও ছোট ছোট কয়েকটি বস্তি ছিল, এখন সেসব বস্তি নেই, উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে।
টিকাটুলিতে হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরির কারণে ওই এলাকাটি কিছুটা জমজমাট ছিল। পাশে মেথররা ছিল। কিন্তু গ্লাস ফ্যাক্টরির পেছনে গোলাপবাগ, মানিকনগর, ধলপুর পুরো এলাকাটিতে তেমন বসতি ছিল না। দূরে দূরে কয়েকটি বাড়িঘর ছিল। পুরো এলাকাটিতে বিল-ডোবা, ধানক্ষেত ও জঙ্গল ছিল। দিনে-দুপুরে শেয়াল দৌড়াত। বানর ও হনুমান গাছে ঝুলত। তখন বৃষ্টি হলে পানি জমত না, চারদিকে খাল-বিল থাকায় বৃষ্টি হলে পানি দ্রুত নেমে যেত।
আজকে ২/৩ ঘণ্টা একটানা বৃষ্টি হলেই বাসা থেকে বের হওয়াটা মুশকিল হয়ে পড়ে। ভারি বর্ষা হলে ঢাকার অবস্থা এমন হয় যে, যেন সিরাজগঞ্জ এলাকার যমুনাপাড়ের এলাকা, বন্যার পানিতে ঢাকা ভাসছে। আমার বাসাতেই বর্ষায় কয়েকবার পানি উঠেছে।
আজকে ঢাকা বলতে কতটুকু এলাকাকে বুঝাবে। শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা? আমি তো দেখেছি ঢাকা উত্তর দিকে যেতে যেতে গাজীপুর ছেড়ে ময়মনসিংহ জেলা পর্যন্ত চলে গেছে। পশ্চিম দিকে সাভার-নবীনগর হয়ে ধামরাই, এদিকে নরসিংদী-নায়ায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। এই যে আজকে  ঢাকার যে রূপ বিস্তৃতি ঘটেছে, এতে কী হয়েছে? খাল-বিল, নদী-নালা, কৃষিজমি, জলাশয়, বিল, বনভূমি সব ধ্বংস ও ভরাট করে ইট-পাথর দিয়ে বিল্ডিং আর বিল্ডিং বানানো হয়েছে। আজকে মানুষ মুক্ত বাতাসে যে নিঃশ্বাস ফেলবে, সে জায়গাটুকু নেই। ঢাকা আজ গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়ে, বাতাসে অক্সিজেনের কালো ধোঁয়া, ধুলা-বালি ও সিসা মিশে আছে। পানি নোংরা হয়েছে। অনেক সময় খাওয়ার পানি পাওয়া যাচ্ছে না, নগদ টাকা দিয়ে পানি কিনে খেতে হচ্ছে। টাকা দিয়েও যে বিশুদ্ধ পানি কিনে খাবে, সে নিশ্চয়তা কে দেবে? দূষিত ও নোংরা পানি খেতে হচ্ছে। চীন আমাদের দেশের মতো জনবহুল দেশ। সে দেশের সরকার কৃষিভূমি, বনভূমি রক্ষায় একটি পরিকল্পনা নিয়ে বাড়িঘর গড়ে তুলেছে। সরকার নিজের উদ্যোগেই আবাসন তৈরি করে দিচ্ছে। একটি ভবন তৈরি করে ভবনের ভেতর বাসিন্দাদের টেনে আনছে। পড়ে আছে বিশাল কৃষিভূমি ও বনভূমি, নদী। আমাদের এমন একটা দেশ, সুন্দর পৃথিবীতে অন্যতম ভূমি, নদী, বিল, বনভূমি কোনোটিরও কমতি ছিল না। কিন্তু ভূমিদস্যুরা সব ধ্বংস করছে। ভূমিদস্যুরা সবসময় সরকারের ভেতর থেকে ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এসব ধ্বংসযজ্ঞে কাজ করে যাচ্ছে।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect