ফনেটিক ইউনিজয়
পর্ব-৫২
অবিস্মৃত স্মৃতিকথা

শওকত আলী, এক শক্তিমান কথাসাহিত্যিক। তার লেখার মধ্য দিয়ে  বাঁকবদলের একটি সুবর্ণরেখার উত্থান ঘটেছে। মেহনতি মানুষের দ্বান্দ্বিক জীবন শিল্পিত আকারে রূপায়ণ করেছেন তিনি। তার স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বাঙালির শাশ্বত সংগ্রামী প্রহরের রোজনামচাসহ সাহিত্য, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের টানাপড়েন

এরই মধ্যে খবর শোনা গেল, অধ্যাপকের চারটি পদের জন্য কয়েকজন সরকারের কাছে সারেন্ডার করেছেন। কিন্তু পাঁচ বছরের অধিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আরও অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও চারজনকে দেয়া হয়নি। এখানে মূল কাহিনি হলো মি. ব্রিফকেস অধ্যাপকের হিংসা-বিদ্বেষ কাজ করছে। আরেকজনকে দিলেই মি. ব্রিফকেস যে একজনকে সহ্য করতে পারতেন না, তাকেও যে দিতে হবে, তাই। সেই কাক্সিক্ষত প্রমোশনটি পেতে হলে ওই অধ্যাপককে কম করে হলেও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এ থেকে বোঝা যায়, ওই শিক্ষকের হীন মনোবৃত্তি কেমন ছিল। তখন কলেজে শিক্ষকের পদমর্যাদার দুটো স্তর ছিল- ১. লেকচারার ২. প্রফেসর। আমরা এতদিন সবাই ছিলাম শিক্ষক। কলেজ সরকারীকরণ হওয়ায় আমরা সবাই হয়ে গেলাম অফিসার। আগে মাসের শুরুতেই প্রথম সপ্তাহের ১/২ তারিখে বেতন পেয়ে যেতাম। এখন বেতন দেয়া হয় চেকের মাধ্যমে। তাই চেকের সন্ধানে দৌড়াতে হয়, হিসাবরক্ষক মানে এজিবি অফিসের অডিটর সাহেবের কাছে। সেখানে তার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত কাঁচুমাচু করে বিনয়ের সঙ্গে বলতে হয়, স্যার, আমার বিলটা কি পাস হয়েছে? অন্যথায় ডিপিআই বা বর্তমানে ডিজি অফিসে দৌড়াতে হতো। এ ডিজি অফিসে থাকেন বিভিন্ন ধরনের যতসব দেবতা, এ দেবতারা ঘুষ খান না। তবে তাদের পদতলে, পুষ্প অপর্ণ করতে হয়, নতুবা দেবতারা খুশি হন না। আর দেবতাদের তুষ্ট না করলে আপনার পূজাও তারা গ্রহণ করবেন না। আর পাকিস্তান আমলে তো একবার পূজা দিলেই কাজ হতো। বর্তমানে বাংলাদেশে আপনাকে পূজাসামগ্রী দেয়ার পরও অপেক্ষা করতে হবে। দেবতারা কখন আপনার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। এ অফিসে পিয়নের এক রেট, লোয়ার ডিভিশন সাহেবের আরেক রেট, আর আপার ডিভিশন সাহেব তো খুব শক্তিশালী। শিক্ষা অফিস এত বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, কোনো সরকারই এ অফিসটাকে ঝাঁট দিয়ে ঠিক করতে পারল না।
জগন্নাথ কলেজে বহু বিখ্যাত অধ্যাপক তার আসনে অলঙ্কৃত করে গিয়েছেন, তা সবাই জানে। তারা সবাই ছিলেন অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী বিদ্বান ব্যক্তি। এসব অধ্যাপকের সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশ গিয়েও ছড়িয়েছে। বহু শিক্ষক জগ্ননাথ কলেজ ছেড়ে ভারতের নামিদামি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু সরকারি কলেজ হওয়ার পর আমরা যেসব বলবান বীরপুরুষ পেয়েছি, এসব বিদ্যার সাগরেরা ওদের ধারেকাছেও যাওয়ার ক্ষমতা রাখতেন না। তবুও তাদের মতিগতি ভাবসাব এমন দেখাত, যেন ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরও কিছু না। জগন্নাথ কলেজ বড় কলেজ হওয়ায় বানের পানির মতো সমানে ঢুকছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মফস্বলের এক কলেজ থেকে এক স্বাধীন বীরপুরুষ এলেন জগন্নাথে। তার মুখ থেকে তার বন্ধুরাই শুনে আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে, তিনি মানুষ খুন করে মফস্বল ছেড়ে ঢাকায় এসেছেন। ঢাকায় এসে বাধ্য হয়ে আরেকটি বিয়ে করেছেন, কারণ বউ তো গ্রামে পড়ে আছে, এই যদি হয় একজন শিক্ষকের নৈতিকতা! তাহলে এ শিক্ষকের থেকে ছাত্ররা কী শিখবে? এরা হলো শিক্ষক নামের কলঙ্ক, একজন শিক্ষক তো দূরের কথা, যেকোনো উন্নত রুচিবান নীতিনৈতিকতাসম্পন্ন মানুষের এ ধরনের অপরাধমূলক কাজ করতে বিবেকে বাধা দেবে।
কিন্তু ভাগ্য খারাপ, সরকার তার প্রমোশন আটকে দিয়েছে, তার গোপন রিপোর্ট খারাপ। এখানে এসে তিনি তার প্রিন্সিপাল সাহেবকে তেল মাখতে লাগলেন, প্রিন্সিপাল সাহেব যেন ডিজি সাহেবকে বুঝিয়ে প্রমোশনের ফাইলটা ছেড়ে দেয়ার ব্যাবস্থা করে দেন। কিন্তু ডিজি সাহেব কোনো কথা না বলে ফাইলের গোপন রিপোর্টটা তার চোখের সামনে তুলে ধরে বললেন, আপনি পড়ে দেখুন, যদি আপনি বলেন, তাহলে আপনার মন্তব্যসহ ওপরে পাঠিয়ে দেব। প্রিন্সিপাল সাহেব রিপোর্টটা পড়ে দেখে লাফ দিয়ে ওঠে দুই হাত ধরে নিষেধ করলেন।
বিভিন্ন স্থান থেকে জগন্নাথ কলেজে বদলি নিয়ে আসেন তাদের অল্পসংখ্যক ছাড়া সব শিক্ষকই, কেবল ঢাকা শহরে থাকার উদ্দেশ্য নিয়েই তারা আসতেন এবং শহরের অভ্যন্তরেই অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে বা কলেজে অধিকতর ভালো সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। সুযোগ পাওয়ামাত্রই তারা বসন্তের কোকিলের মতো পাড়ি দিতেন। ফলে কলেজের প্রতি বা ডিপার্টমেন্টের প্রতি তাদের কোনো আন্তরিকতা গড়ে উঠত না। কাজেই কোনো অধ্যাপক, অধ্যাপিকা বিভাগ ছেড়ে চলে গেলে তাকে বিদায় সংবর্ধনা জানানোর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতেন না শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এ কলেজ যখন বেসরকারি শাসন ব্যবস্থায় পরিচালিত হতো, সব অধ্যাপক, অধ্যাপিকা, ছাত্রছাত্রী-কর্মচারীর মধ্যে এমন একটা আন্তরিকতার বাঁধন অক্ষুণœ ছিল, যেন সবাই একই পরিবারের সদস্য!
আজকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান সাহেবের জীবনপথের যাত্রা এ জগন্নাথ কলেজে থেকেই। ১৯৬৪ সালের নভেম্বরের কোনো একদিন আমি মির্জা হারুন-অর-রশীদকে নিয়ে রুটিন কাটাছেঁড়া করছিলাম, তখন দেখি রুমের সামনের দরজা দিয়ে একজন তরুণ তড়াক তড়াক করে লাফাতে লাফাতে আমাদের কাছে এসে হাজির। তিনি বললেন, আমি এসে গেছি, আমরা সচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। আপনি এসে গেছেন তো খুব ভালো কথা। কিন্তু আপনি কে, কোত্থেকে এসে গেছেন? কোন মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন, তো তা কিছুই জানলাম না। তিনি চটপট উত্তর দিলেন, আমি শামসুজ্জামান খান, বাংলায় এমএ। এ ডিপার্টমেন্টে আমার চাকরি হয়েছে, ছাত্র পড়াব। দেখবেন, ভালোই পড়াব। এ কথা শোনার পর রুটিন কাটাছেঁড়া রেখে আমরা দুজনই সন্ধানী দৃষ্টি ফেলে তার আপাদমস্তক একবার দেখে নিলাম। কিন্তু ধার তো খুব দেখছি।
এই শামসুজ্জামান জগন্নাথ কলেজের শিক্ষকই ছিলেন না। এ কলেজের ছাত্র ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। তার মনোজগতের গঠন প্রক্রিয়ায় বা ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনা প্রণয়নে এ জীবন নিশ্চয় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি এ কলেজে কিংবদন্তিতুল্য বহু শিক্ষক পেয়েছিলেন। এছাড়া সেই ষাটের দশকে দেশের সামগ্রিক পরিবর্তনে যত আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে, জগন্নাথ কলেজের ছাত্ররা সেসব আন্দোলনে যথেষ্ট সক্রিয় ছিল এবং শামসুজ্জামান খান এসব আন্দোলনের সঙ্গে কমবেশি যুক্ত ছিলেন। ফলে তিনি একাধিকবার তার কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করে দেশের উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণকাজে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে অধিষ্ঠিত হয়ে বহু কাজে পরামর্শক হিসেবে আমার সহযোগিতা কামনা করেছেন। আমিও তার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে গেছি। তাকে পাশে থেকে সহযোগিতা করেছি। এখানে বলতে হয়, জগন্নাথ কলেজে শিক্ষক হিসেবে তাকে আমি সাড়ে তিন-চার বছর সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। শিক্ষকতা পেশায় তিনি যথেষ্ট অনুরাগী ছিলেন। শত ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে তিনি কলেজে যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
চারিগ্রাম মানে চার গ্রাম নয়। এটি একটি গ্রামের নাম। যেমন নারায়ণগঞ্জে আড়াইহাজার থানা মানে ২৫০০টি থানা নয়, একটি থানার নাম। চারিগ্রাম মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার একটি সমৃদ্ধ ও আদর্শ গ্রাম। এ গ্রামেই এ কীর্তিমান পুরুষ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে জগন্নাথে ঢোকেন, জগন্নাথ কলেজ সরকারীকরণের আগেই তিনি বিদায় নেন। জগন্নাথ কলেজ থেকে প্রথমে তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হন, তারপর বাংলা একাডেমি, এরপর শিল্প একাডেমি, এরপর জাতীয় জাদুঘর, তারপর ঘুরেফিরে আবার বাংলা একাডেমির দায়িত্বে আছেন। তরুণ শামসুজ্জামান খান আসাতেই আমরা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম, যাক বাঁচা গেল। ফুল সেশনে আমাদের কাজের চাপ অর্থাৎ ক্লাসের সংখ্যা এত বেশি হতো যে, আমরা ঘায়েল হয়ে যেতাম। তখন জগন্নাথ কলেজে দিবা-নৈশ দুই শিফটে ক্লাস চলত, আর দুই শিফটে ক্লাস নেয়াটা ছিল আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কেউ ইচ্ছা করলেই ক্লাস বাদ দিত পারতাম না।
শ্রুতিলিখন : আব্দুস সাত্তার

আরো খবর

Disconnect