ফনেটিক ইউনিজয়
মার্চ ১৯৭১ এবং একটি ডায়েরি
আনু মুহাম্মদ

১ মার্চ ১৯৭১-এ আমার যথারীতি স্কুলেই যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘটনাক্রমে গেলাম এমন জায়গায়, যেখানে গিয়ে দেখলাম নতুন ইতিহাসের সূচনা। আম্মার আকস্মিক মৃত্যুর পর প্রায় তিন বছর ধরে স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুব অনিয়ম হচ্ছিল। পড়তাম সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুলে, এই অনিয়মের জন্য সেখানে নামই কাটা গেল। ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। নিয়ম ফেরার বদলে অনিময় আরও বাড়তে থাকল।
সেদিনও আমার স্কুলে যাওয়ার এমনিতে কোনো সমস্যা ছিল না। পাকিস্তান আমলে সপ্তাহের ছুটি ছিল রোরবার, ছুটির পর সপ্তাহের শুরুতে স্কুলের যাওয়ার আগ্রহই বেশি থাকার কথা। বাসা থেকে একটু হেঁটে ভিড় ঠেলে বাসে উঠে একটা দীর্ঘ যাত্রা করে যেতে হতো স্কুলে, খিলগাঁও থেকে সদরঘাট। সেদিনও স্কুলের উদ্দেশে বাসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু স্কুলে আর যাওয়া হলো না। নামলাম পথে, ঢাকা স্টেডিয়ামে। আমি যে খুব ক্রিকেটভক্ত ছিলাম তা নয়, কিন্তু সেদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান-নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট খেলার আয়োজনই টানল বেশি।
খেলা খুব ভালো হচ্ছিল। সে সময় খুব সম্ভব হানিফ মোহাম্মদ, দুই পাকিস্তানেই তখন খুব জনপ্রিয় খেলোয়াড়, তার ধরনেই সমানে ৪ আর ৬ পেটাচ্ছিলেন। পুরো স্টেডিয়ামভর্তি দর্শক। পাকিস্তান দল খেলে এবং স্টেডিয়ামভরা ঢাকার মানুষ হইচই করে নিউজিল্যান্ড দলকে নাস্তানাবুদ করছিল।
বেলা ১২টা। আমার পেছনেই এক দর্শক ওই হুলস্থূলের মধ্যে রেডিও খুলেছিলেন। সম্ভবত ধারাবিবরণীর জন্য। তখন খবর হচ্ছে। আমিও শুনলাম। ২৫ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এর তাৎপর্য যে কতটা গভীর, সেটা উপলব্ধি করার ক্ষমতা তখন আমার ছিল না। কিন্তু দেখলাম মিনিট ১০-১৫-এর মধ্যেই স্টেডিয়ামের বিভিন্ন প্রান্তে অন্য রকম হইচই শুরু হলো। তার কয়েক মিনিটেই মধ্যে স্টেডিয়ামের বিপরীত প্রান্তে আগুন দেখলাম। খেলার জন্য যে প্যান্ডেল লাগানো হয়েছিল তাতে আগুন। মানুষ উঠে পড়েছে, অনেকেই প্যান্ডেলে আগুন দেয়া আর বাঁশ টেনে নামানোয় ব্যস্ত। সাথে হইচই স্লোগান। খেলার মাঠে খেলোয়াড়রা অনেকক্ষণ পর্যন্ত এগুলোকে দর্শকদের খেলার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ভেবেছিলেন। আসল পরিস্থিতি তাদের জানা বা বোঝার কথাও নয়। তারা যখন বুঝতে পারলেন, তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত।
মানুষ যখন মাঠের মধ্যে ঢুকে পড়তে চাচ্ছে, চিৎকার করছে, তখনই খেলা থামল। একপর্যায়ে দেখলাম, যে পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা এতক্ষণ পুরো স্টেডিয়ামের দর্শকদের প্রাণঢালা সমর্থন নিয়ে খেলছিলেন, তারা প্রাণভয়ে ব্যাট হাতে দৌড়াচ্ছেন আর পেছনে মানুষ দৌড়াচ্ছে তাদের আক্রমণ করার জন্য। কয়েক মিনিটের মধ্যে খেলা নিয়ে উচ্ছ্বসিত মানুষের স্থানে পুরো স্টেডিয়াম ক্রুদ্ধ রাজনৈতিক জনতার অঞ্চলে পরিণত হলো। স্লোগান, মিছিল শুরু হলো। বাঁশ ভেঙে ভেঙে বিভিন্নজন হাতে নিচ্ছে। তখন বেলা ১টা হবে। খেলাপাগল মানুষ তৈরি করল বিক্ষুব্ধ জনসমুদ্র। আমিও ওই স্রোতেরই অংশীদার হলাম। কাঁধে একটা বাঁশ। এরপর সারাদিন মিছিলে, সভায় কোথায় কোথায় গেলাম কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে, যখন আমি বাসায় ফিরেছি তখন সন্ধ্যা। আমার কাঁধে বড় একটা বাঁশ ছিলই।
পূর্ব পাকিস্তানের শেষ কার্যত সেদিনই হলো, শুরু হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যাত্রা। এর পরও পাকিস্তান টিকে থাকার সম্ভাবনা যতটুকু ছিল, সেটা শেষ হলো ইয়াহিয়া খান নেতৃত্বধীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার একের পর এক নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা এবং সর্বশেষ গণহত্যার রাস্তা গ্রহণের ফলে। প্রশ্নটা খুবই সাধারণ, কেন একটি সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা যাবে না?
এ মিছিলই আমার জীবনে প্রথম ছিল না। এর আগে নানা মিছিল, সভায় গেছি। গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ঢাকা শহরজোড়া মিছিলের কোনো কোনোটিতে গেছি, কৃষ্টি গ্রন্থ নিয়ে স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে শামিল হয়েছি। স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার জনসভায় গিয়ে মওলানা ভাসানীর বক্তৃতা শুনেছি, সেটাও মনে আছে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে একা একা কোনো মিছিলে শরিক হওয়া এটাই প্রথম।
যা-ই হোক, ১ মার্চ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত পরিবেশে এভাবে সারাদিন ঘরের বাইরে থাকার কারণে বাসা থেকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হলো। তবে পাড়ায় পল্লীমা সংসদে আমার বড় ভাই ময়না ও তার বন্ধুদের নানা কর্মসূচি চলছিল। এ দেশের গণসংগীতের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব নিজামুল হক তখন ফকির আলমগীরসহ ওদের সবাইকে গণশিল্পীগোষ্ঠীতে সমবেত করেছিলেন। উত্তেজনা আর সক্রিয়তায় আমরা নানাভাবে জড়িত হয়ে পড়লাম।
সেনাবাহিনী ছাড়া পাকিস্তানের আর কোনো প্রতিষ্ঠানই তখন এই অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের কথামতো কাজ করছিল না। সেনাবাহিনীর মধ্যেও বাঙালি অফিসার ও কর্মকর্তারা তখন শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে তাদের কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করছেন, সেভাবে যোগাযোগও করছেন তারা তখন। রেডিও পাকিস্তান ও পাকিস্তান টেলিভিশন তখন শেখ মুজিব ঘোষিত কর্মসূচি, দেশাত্মবোধক গান ইত্যাদিই প্রচার করছিল বেশি। এখন বোধ করি, স্বাধীনতার আনন্দ সে সময়ই মানুষের মধ্যে ছিল বেশি। কিন্তু পাকিস্তাান বাহিনী তখনো ব্যর্থ চেষ্টা করছিল নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরোপের। ৩ মার্চ আমাদের বাসার কাছেই, বর্তমান মৌচাক মার্কেটের বিপরীতে একটি মিছিলে গুলিতে শহীদ হলেন ফারুক ইকবাল ও তসলিম। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গাতেই এগুলো চলছিল।
৭ মার্চ শেখ মুজিবের ভাষণ নিয়ে সারা দেশের মতো আমাদেরও উত্তেজনা আগের দিন থেকেই। রেডিওতে বারবার বলা হচ্ছিল, ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। আমরা তার পরও তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার নানা সুযোগ খুঁজছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ধরা পড়ে যাওয়ায় আর যেতে পারলাম না। বড় রেডিও নিয়ে আমরা সবাই বসলাম। কিন্তু সম্প্রচার হলো না। তার বদলে হতে থাকলো দেশাত্মবোধক গান। মুখে মুখে খবর এল, রেডিও পাকিস্তানে শেখ মুজিবের ভাষণ সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ভাষণ প্রচার করা গেল না, কিন্তু এর প্রতিবাদে সব কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মবিরতি পালন শুরু করলেন। কর্তৃপক্ষ মাথানত করতে বাধ্য হলো। ঠিক মনে নেই, সেদিন রাতেই কিংবা পরদিন সকালে সেই রেকর্ডকৃত ভাষণ প্রচার করা হলো কয়েকবার। রেকর্ড করা সম্ভব হয়েছিল, কারণ সম্প্রচারের জন্য পুরো প্রস্তুতি নিয়েই গিয়েছিলেন রেডিও অফিসের লোকজন। আমাদের বাসায় টেপরেকর্ডার ছিল, তাতে সেই ভাষণ রেকর্ডও করে রাখলাম।
এর পরের দিনগুলো খুব দ্রুত পার হচ্ছিল। সেই বয়সে আমি কীভাবে এসব রাজনৈতিক বিষয় চিন্তা করতাম, মনে নেই। কিন্তু এলাকায় তরুণদের তৎপরতা, আশঙ্কা আর উত্তেজনার সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম। পল্লীমা সংসদের উল্টোদিকে এসব কাজ সমন্বয়ের জন্য একটি অফিসও করা হয়েছিল। এলাকায় মওলানা ভাসানীর অনুসারী, নকশালবাড়ীর পক্ষে স্লোগান দেয়া কর্মী, বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী তাদেরও বেশ প্রভাব ছিল। বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা দেলোয়ার হোসেন পারভেজ এর বাসা ছিল এই পাড়াতেই। তাদের মুখে শেখ মুজিবের ‘অহিংস আন্দোলনের’ সমালোচনা শুনতাম। এসব সমালোচনা সত্ত্বেও শেখ মুজিবকেই সবাই নেতা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা তখন সবার চিন্তার কেন্দ্রে।
ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো এলেন। আলোচনা চলছে। বাসায় টেলিভিশন ছিল, সেখানে এসব চিত্র দেখি। নানামুখে শুনি পাকিস্তানি সেনাপ্রস্তুতির খবর। পাড়ার বিপ্লবী অগ্রজদের মুখে শুনি কোনো আপস নয়, সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে হবে। এভাবেই একে একে দিন পার হয়ে এলো ভয়াবহ ২৫ মার্চ।
সেদিন বিকাল থেকেই পাড়ায় সাজসাজ রব। নানামুখ ঘুরে ঘুরে খবর আসছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিভিন্ন জায়গায় পজিশন নিচ্ছে, আজ রাতেই হামলা করতে পারে, ব্যারিকেড তৈরি করতে হবে। কিন্তু কীভাবে হবে ব্যারিকেড? কেউ বলে রাস্তা কাটতে হবে, কেউ নানা পাইপ টানাটানি করে রাস্তায় নিয়ে আসার পক্ষে। দুটোই করলাম। আমাদের সবারই দৃঢ় বিশ্বাস এগুলো করে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে ঠেকাতে পারব।
এসব করতে করতে রাত ১০টা বেজে গেল। আমরা রাস্তাতেই। রাতের জন্য কাজ বণ্টন হলো। আমার এবং আমার বড় ভাইয়ের ওপর দায়িত্ব পড়ল যখন পাকিস্তান বাহিনী এলাকায় ঢুকবে, তখন সবাইকে সজাগ করার জন্য সাইরেন বাজাতে হবে। হাতে ঘোরানো একটা ছোট সাইরেন আমাদের দেয়া হলো। সম্ভবত আনসার বাহিনীর কাছ থেকে আমরা ওটা পেয়েছিলাম। দেখে নিলাম, ঘোরালে সাইরেনের আওয়াজ হতে থাকে।
পাকিস্তানি বাহিনী এলাকায় ঢুকল না, কিন্তু গোলাগুলির আওয়াজ ক্রমে বাড়তে লাগল। মনে হচ্ছিল, আমাদের কাছেধারেই সেনাবাহিনী চলে এসেছে। আমাদের দায়িত্ব আমরা পালন শুরু করলাম। পাড়ার ভেতরের রাস্তায় হেঁটে হেঁটে কিছুক্ষণ সাইরেন বাজাতে পারলাম। কিন্তু এর মধ্যেই ভয়ঙ্কর গোলাগুলির আওয়াজ শুরু হলো। এরকম আওয়াজ আগে কোনোদিন শুনিনি। আমাদের মনে হচ্ছিল, পাশেই কোথাও ভয়ঙ্কর সব অজানা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ হচ্ছে। পরে জেনেছি, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকেই এ আক্রমণের শব্দ আসছিল। আমাদের সাইরেনের শব্দ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, গুলিতে, বোমায়, ট্যাংকের শব্দে। কারও তখন সাইরেনের শব্দ দিয়ে আক্রমণ বোঝার দরকার নেই। একসময় আমরা আবিষ্কার করলাম, আমরা দুজনই শুধু রাস্তায়। কিন্তু সাইরেন বাজিয়েই যাচ্ছি। একটুপর দেখলাম বিপরীত দিক থেকে পারভেজ ভাই আসছেন, হাতে দোনলা বন্দুক। বললেন, ‘এখন আর এগোনো যাবে না। বাসায় যাও। পরে দেখা যাবে।’ বাসা খুব কাছেই। কিন্তু তখন বাসায় ফেরা অসম্ভব মনে হচ্ছিল। রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন বাসার ভেতর দিয়ে, দেয়াল টপকে ফিরলাম কোনোমতে।
বাসায় তখন আব্বা নেই, কদিন আগেই গ্রামে গেছেন। মুরব্বি একমাত্র নানা। অস্থিরভাবে দেয়ালের পাশ দিয়ে পায়চারি করছেন। আমরা পৌঁছতেই খপ করে এমনভাবে আমাদের ধরলেন, যেন আমরা এখনই আবার দৌড় দিতে পারি। বিদ্যুৎ নেই ঘরে। অন্ধকারেই বুঝলাম, বিছানায় পাঁচ-ছয় বছরের ছোট ভাই শুয়ে আছে, গুনগুন শব্দ হচ্ছে। কাছে কান নিয়ে শুনি ও ত্রস্ত হয়ে সমানে যা জানে সেইমতো সুরা বলে যাচ্ছে। বুক উঠছে, নামছে। আমি নানাকে লক্ষ করে বললাম, ‘দেখলেন, অহিংস পথে কি কোনো আন্দোলন হয়?’ নানা ধমক দিয়ে বললেন, ‘এখন আবার এসব কী কথা?’
২৬ তারিখ পুরো কারফিউ। ঢাকার অবস্থা কোথায় কী হলো কিছুই জানি না। ২৭ তারিখ সকালে কারফিউ বিরতি হলো। সকাল থেকে দেখি, দলে দলে বাসার সামনে দিয়ে মানুষ যাচ্ছে। নানা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বলতে বলতেই যাচ্ছে মানুষ। এরকম মানবযাত্রার মধ্য থেকে আবার কিছু কিছু সাহসের কথাও শুনলাম। কেউ বললেন, ‘মুজিবকে ধরতে পারেনি। যুদ্ধ চালাইয়া যাইতে বলছে।’ কেউ বললেন, ‘মেজররা বিদ্রোহ করছে, অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আগাইয়া আসতেছে।’ কেউ বললেন, ‘বাঙালি আর্মি অফিসার রেডিওতে স্বাধীনতার পক্ষে বক্তৃতা দিচ্ছে। আর কোনো চিন্তা নাই, তারা একজোট।’ গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, বন্দিদশার খবরাখবরের মধ্যে এগুলোই ছিল সবার সাহসের উৎস।
সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা, কারফিউ আর কিছুটা বিরতির মধ্যে কোনোমতে নাক উঁচু করে বেঁচে থাকা। টাকা-পয়সা, খাওয়া-দাওয়া সবকিছু নিয়েই সংকট শুরু হলো। এর মধ্যে শুরু হলো পাড়ায় পাড়ায় সামরিক বাহিনীর হামলা, ধরপাকড়। সবরকম অনিশ্চয়তার মুখে মুরব্বিরা কুলাতে না পেরে আমাদের নিয়ে গ্রামের দিকে এক স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। শহরেরই এক প্রান্তে আরও হাজার মানুষের সাথে একটা স্কুলঘরে মাটিতে থাকলাম গাদাগাদি করে। সেদিনও গোলাগুলি ছোটাছুটি হলো।
এরপর সবার সিদ্ধান্ত ঢাকায় থাকা যাবে না। কী হয় বলা যায় না। আপাতত গ্রামের বাড়ি গিয়ে উঠি। কিন্তু যাওয়ার পথ তো ঠিক নেই। আমাদের কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে। আমাদের পরিবারে আমরা সাত ভাইবোন। সবার বড় বোন, বয়স ১৭ বছর। আর সবার ছোট ছয় বছর। আমি মাঝে। সাথে আছেন দাদি। আমাদের অভিভাবক তখন নানা। আর যে কয়টি পরিবার ছিল তাদের মধ্যে একটি পরিবারে একজন ছিলেন পাঞ্জাবি-পাজামা পরা, ঘাড়ে একটি ঝোলা। লেখক-কবি বলতে আগে যেরকম চেহারা বোঝাতো সেরকম। পথে, নৌকায়, গাছের নিচে তাকে দেখতাম লিখছেন। তখনই জেনেছি, তিনি নিয়মিত ডায়েরি লেখেন।
এ যাত্রা শেষে আমরা যার যার পথে চলে যাই। ১৯৭১ সালেও নয়, পরেও বহু বছর আর তার সাথে দেখা হয়নি। বহুবার মনে হয়েছে তার এবং সেই ডায়েরির কথা। দেখা হলো মাত্র গত দুই বছর আগে বইমেলায়। তিনি একটি বই উপহার দিলেন। এর মধ্যে তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। বিভিন্ন পর্যায়ে। তিনি শাহ খায়রুল বাশার। তিনি সেই ডায়েরিটি যত্ন করেই রেখেছিলেন। আমাদের যাত্রাপথের সেই সময় ও পরিস্থিতি সেই ডায়েরি থেকেই কিছুটা পাওয়া যায়।

শাহ খায়রুল বাশারের ডায়েরি
২৬ মার্চ ১৯৭১

আজ সারাদিন সান্ধ্য আইন জারি করা হলো। ঘর ছেড়ে বাহির হতে পারলাম না। খেতে ইচ্ছে হলো না কিছুই। জানি না শেখ মুজিব ও অন্য নেতাদের অবস্থা কী হলো।

২৭ মার্চ ১৯৭১
আজ ৬ ঘণ্টার জন্য কারফিউ উঠিয়ে নেয়া হলো। বাহির হলাম। বাজার করলাম। ১০ টাকা চালের জন্য মনজুকে দিলাম। তারপর দেখলাম জনতার মিছিল। এ মিছিল সংগ্রামের নয়। এ মিছিল পলায়নের। নিরীহ বাংলার নিরীহ জনতা মেশিনগান আর কামানের মুখে বলি হতে চায় না। শহরে এমনি বিভীষিকার সৃষ্টি করা হয়েছে যে, লাখে লাখে লোক শুধু পরিবার-পরিজন নিয়ে শহর থেকে দূরে গ্রামে চলছে। আবার গ্রাম থেকে দূর গ্রামে হেঁটে হেঁটে তারা চলছে অনির্দিষ্ট পথে জীবন বাঁচানোর প্রয়াসে।
পুলিশ ব্যারাকে গেলাম। দেখলাম সমস্ত কিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়েছে। ঘরগুলিতে বিবর্ণ হয়ে পড়ে আছে লোহার টুপি আর তাদের ট্রাংকগুলো। কোমর বন্ধনিগুলো আধাপোড়া হয়ে আছে। কোনো কোনো প্রকোষ্ঠে দুদিন পরও আগুন জ্বলছে। মৃত পুলিশের অনেকগুলো দেহ ভস্মীভূত হয়েছে। এখানে যুদ্ধ। এখানে বাংলার পুলিশ বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে পশ্চিমা শাসকের লেলিয়ে দেয়া কুকুরগুলোর সাথে। বাঙালি পুলিশ ভাইয়েরা প্রাণ দিল। সৃষ্টি করল নয়া ইতিহাস। বস্তুত এ যুদ্ধ কেবল আরম্ভ হলো। সমগ্র রাজারবাগ এলাকাটা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে বলে মনে হয়। পথের আশপাশে অনেকগুলো বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। বহু দালান ঘরের জানালা ও দেয়ালে মর্টারের আঘাতে ফাটল ধরেছে।

২৮ মার্চ ১৯৭১
আজ মহররম মাস অবসান হলো। সফরের নতুন চাঁদ উঠল। রাতের প্রথমেই অন্ধকারে রাতের বুকটা আঁধারে ছেয়ে যায়। সন্ধ্যা হলেই শহরটা জরাগ্রস্ত রোগীর মতো হাহাকার করতে থাকে। সারাটা রাত উন্নিদ্রায় কাটে। বালিশে কান ঢেকে আরামের শয়ন যেন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ডেকে উঠে আশপাশে কুকুর আর মোরগগুলো। কোথাও খুট করে একটু শব্দ হলেই আত্মাটা ছ্যাঁত করে উঠে। মনে হয়, এখনি বুঝি সেনাবাহিনীর বুলেটে বিদ্ধ হলাম। অবশ্য সারারাত ধরেই পথে পথে সেনাবাহিনীর লোকেরা টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। কোথাও পাল্টা আক্রমণের সংবাদ পাচ্ছি। আরও শুনলাম মুনীর চৌধুরীসহ পাঁচজন প্রভোস্ট এবং কতিপয় অধ্যাপককেও হত্যা করা হয়েছে। স্টেডিয়ামের আশপাশে এখনও মরা দেহগুলো ফুলে পচে বিরাজ করছে। সদরঘাটের পথে লাখো যাত্রীদের অমানুষিক অত্যাচার করা হয়েছে। তাদের ধরে ধরে লাশ পরিষ্কার এবং রাস্তার ব্যারিকেডগুলোকে সরানো হয়েছে। মেয়েদের ওপর গুলি করা হয়েছে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে রাজপথে শোয়ায়ে বেয়োনেট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সুন্দরী মেয়েদের এবং মালপত্র, টাকা-পয়সা, গহনা ইত্যাদি লুট করা হয়েছে। সদরঘাটে তারা ঘাঁটি করেছে। টার্মিনালটাকে বিধ্বস্ত করা হয়েছে। তবু পাল্টা আক্রমণ চলছে। সংগ্রামী জনতা তাদের সর্বশেষ অস্ত্র দিয়ে গেরিলা যুদ্ধে প্রাণপণ করে মেতে আছে। রাস্তাটা খাঁ খাঁ করছে। শুধু কিছু কিছু পথযাত্রী নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর সন্ধানে তটস্থ হয়ে চলাচল করছে।

২৯ মার্চ ১৯৭১
অফিসে যাইনি। অবশ্য গেল শনিবারে গিয়েছিলাম। মাত্র ১০-১২ জন লোক এসেছিল। অফিসের উপস্থিতিগুলোর হিসাব নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছে মার্শাল ল’ সাব-অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দফতরে। বেতারে বারবার ঘোষিত হচ্ছে যে, শহরের অবস্থা স্বাভাবিক এবং অফিস-আদালত নিয়মিত চলছে। এটা সর্বৈব মিথ্যা। মিথ্যার রাজত্ব চলছে টিক্কা খানের।
হাজার হাজার লোক শহরের ঘরবাড়ি, ধন-সম্পদ সবকিছু পরিত্যাগ করে একমাত্র জীবন বাঁচানোর অর্থে ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছে। শান্তিনগর বাজারটা পুড়িয়ে দেয়া হলো। নয়াবাজার ও ইংলিশ রোডের কাঠের দোকানগুলোতে পেট্রলের আগুন দেয়া হয়েছে। ‘স্বাধীন বাংলার বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি দেয়া হলো। চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী এসব এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রকাশ করল। চট্টগ্রামের লালদীঘিতে সব জনতাকে তাদের যা কিছু আছে, সব হাতিয়ারগুলো নিয়ে সমবেত হওয়ার জন্য আদেশনামা জারি করল এবং আমি স্থির ভাবনায় পৌঁছলাম যে, বেতার কেন্দ্রটি চট্টগ্রামের কোথাও স্থাপিত করা হয়েছে। অদ্য রাতেও প্রচ- গোলাবর্ষণ হলো। টিয়া নানারা লুলু খালার বাসায় এল। তারাও মুক্তাগাছা যাবে। রব্বানী খালু খালাম্মার বাসায় প্রথমে সুটকেস রেখে গেল। এভাবে প্রত্যেকেই বিভিন্ন স্থানে কিছু কিছু জিনিসপত্র রেখে দিচ্ছে, যাতে সবগুলো একই সময়ে ধ্বংস না হয়।
 
৩০ মার্চ ১৯৭১
অদ্য অফিসে গেলাম এবং গতকালের হাজিরাসহ আজকের হাজিরাও দিলাম। ইত্তেফাক অফিসে গেলাম। বোমা মেরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। জার্মানি থেকে আমদানিকৃত ১১ লাখ টাকার টাইপ আর অফসেট ক্যামেরাদ্বয় একদম ভস্মীভূত হয়েছে।
 
৩১ মার্চ ১৯৭১
আজ অপরাহ্ণে বাহির থেকে এসেই দেখি বাসার সবাই প্রস্তুত হয়েছে বাড়িতে যাওয়ার জন্য। সামান্য কিছু খেলাম। তারপর বাঁধাছাদা করে তিনটা রিকশা ঠিক করে গ্রামের পথে পা বাড়ালাম। প্রথমে মেরাইদদা নামক স্থানে আমরা নৌকা ঠিক করে কায়েত পাড়া অভিমুখে রওনা দিলাম। ঘাটে দুপশলা ভীষণ বেলে মেঘ ঝরল। আমরা পাশের এক খুদে বাটিতে আশ্রয় নিলাম। হাজার হাজার লোক এ পথ দিয়ে চলছে। এটাই একমাত্র নিরাপদজনক পথ, যে পথ দিয়ে ঢাকার অধিকাংশ নাগরিক জীবন রক্ষার্থে পালিয়ে যাচ্ছে। নদীটা ছোট্ট হলেও বেশ খরস্রোতা। গভীর। দুপাশে ঘনবসতি। যখন পুবদিকে তাকাই তখন পল্লীর নিরবচ্ছিন্ন শ্যামল রূপই দেখতে পাই। আর যখন পশ্চিম দিকে দৃষ্টি ফেলি তখন ঢাকা নগরীর ভয়াল মূর্তিই দেখতে পাই। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা ঢাকা শহরতলিকে ছাড়িয়ে বহুদূরে না পৌঁছতে পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের নিঃশ্বাস প্রমুক্ত হাওয়ায় বইতে পারে না। রাতে আমরা কায়েত পাড়ার এক ভাঙ্গা জীর্ণকায় বিদ্যাপীঠে আশ্রয় নিলাম। ভাত রান্না হলো। হোসনাই রান্নার কাজটা সেরে নিল। অসম্ভব ক্ষুধা নিয়ে সামান্য এক থালা ভাত গোগ্রাসে খেলাম।

১ এপ্রিল ১৯৭১
৩০-৪০ মাইল পথের জন্য ১০০ টাকায় একটা নৌকা ভাড়া করে আমরা গন্তব্যস্থলের দিকে অনির্দিষ্ট পথে পা বাড়ালাম। নৌকা অবশ্য দুটো ছিল। একটা ছইবিশিষ্ট। অন্যটা উম্মুক্ত। আমি ছইবিশিষ্ট নৌকাটায় আধাশোয়া হতে চেষ্টিত হলাম। এ নৌকাটায় সমস্ত মহিলারা অবস্থান করছে। আমরা পাঁচটি পরিবার। তিনটি পরিবারই প্রায় আমাদের আত্মীয়। অন্যরাও সুহৃদ ব্যক্তি। যখন আমরা নৌকাপথে পা বাড়ালাম তখন সবাই আমরা একাত্ম না হয়ে পারি না। তরতর করে তরী বয়ে চলছে। দুপাশে ঘন সবুজ ক্ষেত। পশ্চিম পাশটাতেই বাড়িঘর চোখে পড়ে। দুই ফার্লং দূরে দূরে পানি সরবরাহের কল ভটভট আওয়াজ করে তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। সরু নলওয়ালা কলগুলো দেখে অবিকল মনে হয়, ওগুলো যেন সেনাবাহিনীর লোকদের দূরপাল্লার কামান। যেগুলো নিস্তব্ধ হয়ে আছে সেগুলো দেখে মনে হয়, এখনই পাকিস্তানি সৈন্যদের আঙুলের ইশারায় বিকট মেঘের আওয়াজ নিয়ে সামনের প্রান্তে ওর মুখ থেকে আগুনের গোলা বের হবে। আমরা বারবার আকাশের দিকে তাকাই। আশপাশে দৃষ্টি দেখি। গত রাতে অবশ্য কায়েতপাড়া থেকেই ঢাকা নগরীর আর্তনাদ শুনতে পেয়েছি। দিবালোকে আমরা প্রচুর সাহস পাই। কিন্তু রাতের অন্ধকারে আমরা সবাই জড়সড় হয়ে বসে ঈশ্বরের গুণগান করি।
আমরা ১২টায় পুবাইল স্টেশনের পাঁচ মাইল পশ্চাতে নামলাম। পেছনে পড়ে রইল ইছাখোলা, সরদি উলুখোলা, হারাইদ ইত্যাদি। নৌকা ছেড়ে দিয়ে মালামাল মাথায় নিয়ে শক্ত মাটির ওপর দিয়ে পথ চলা শুরু করলাম। অমানুষিক কষ্ট করে অবশেষে বান্দাখোলায় কাজী বাড়িতে পৌঁছলাম।
 
২ এপ্রিল ১৯৭১

নলছাটা আর বান্দাখোলার মতো প্রাকৃতিক বস্তুসমৃদ্ধ শ্যামল সুন্দর এলাকা ইতিপূর্বে কোথাও দেখিনি। এখানে এক ক্রিশ্চান ছেলের সাথে পরিচয় হলো এবং তার ঠিকানা নিলাম। অধিক পথ চলার পর আমাদের কোনো সামর্থ্য ছিল না রান্না করে খাওয়ার। কিন্তু কাজী সাহেবের বাড়ির লোকেরা আমাদের অভূতপূর্ব আতিথ্য দেখাল। তিনটি ডাব খাওয়ার পর ক্লান্তি কিঞ্চিৎ উপশম হলো। রাতে এ গ্রাম দিয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রায় ৫০০ রাইফেলধারী অতিক্রম করল।
ভোরে আমরা রিকশাযোগে কালীগঞ্জ ঘাটে এসে পৌঁছলাম। তারপর সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘোড়াশাল থেকে নৌকা আনিয়ে জামালপুরের পথে রওনা দিলাম। কালীগঞ্জে পাইলট বিদ্যালয়, বাজার ও কারখানাগুলো দেখলাম। বাজারে আমার সহচর মি. সফির সাথে দেখা হলো। প্রথমে ঢাকা থেকে পুবাইল ঘুরে রাজেন্দ্রপুর হয়ে টাঙ্গাইলের পথে জামালপুরে যাওয়ার কথা ছিল; তার পরিবর্তে নৌকা আমাদের চলল ব্রহ্মপুত্র নদ বেয়ে ময়মনসিংহ হয়ে। ঘোড়াশাল রেলওয়ে সেতুর পশ্চিম দিকের রেললাইন তুলে ফেলা হয়েছে। তার নদের দুই পাশে অনেকগুলো কারখানা দেখলাম। আমিন জুট মিল, সার কারখানা, জনতা জুট মিল, কোঅপারেটিভ জুট মিল ইত্যাদি। এলাকাটা বেশ সমৃদ্ধ। দুই পাশে নদের ভাঙন নেই। শীতকালে নদী খরস্রোতা না হলেও বেশ গভীর। আমাদের নৌকার পাশ দিয়ে তিনটা স্পিডবোট ভটভট করে চলে গেল। আর আমরা অসহায়ের মতো তার গতির দ্রুততার দিকে চেয়ে চেয়ে অতৃপ্তির নিঃশ^াস ছাড়লাম।

৩ এপ্রিল ১৯৭১
নৌকায় রেডিও না থাকায় সংবাদ থেকে বঞ্চিত থাকছি। ব্যাপারটা অবশ্য ইচ্ছাজনক। কেননা, খালাম্মার রেডিওটা হাতে নিয়েও ওটাকে ফেলে রেখে এলাম। এমন পরিস্থিতিতে একখানা বেতার যন্ত্র অবশ্যই প্রয়োজনীয়। আমরা যুদ্ধে জড়িত। আমরা সাতকোটি বাঙালি পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছি। একথা বিশ্বাস করতে পারি- বিশ্বজনমত আমরা পাব, তবে ভারতকে অবশ্যই আমাদের সর্বাগ্রে স্বীকৃতি দিয়ে যথাযথ সাহায্য করা উচিত। আমরা চাই না, ভারত স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করুক। আমরা ভারতের ফড়সরহরড়হ হয়েও বাঁচতে চাই না। একটা নির্জলা স্বাধীন সার্বভৌম জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন করাই আমাদের লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
চার পাশে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। আমরা নৌকার নোঙর ফেললাম। নৌকা বড় শ্লথগতিতে চলায় মনে হচ্ছে ময়মনসিংহ পৌঁছতেই আমাদের চার-পাঁচদিন সময় লাগবে।

৪ এপ্রিল ১৯৭১
বর্মি ঘাটে পৌঁছলাম। শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পুবদিকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে। বাজারটি বেশ বড়। অনেকগুলো মিষ্টির দোকান দেখতে পেলাম। কোনো এক মিষ্টান্নভা-ারে ক্ষুদ্র ভাষণ দিতে হল। দেড় টাকা দরে ক্যাপস্টান সিগারেট কিনলাম। সিগারেট সপ্রচুর। পানের দরও কম নয়। খালাম্মার জন্য পান কিনলাম। এখানে আমাদের যাত্রীদের খাবার সম্বন্ধীয় বাজার সওদা করা হলো। যখন যাত্রারম্ভ হবে, ঠিক তখন আরও চার ব্যক্তি আমাদের নৌকায় সহচর হবার জন্য আবেদন করল। তন্মধ্যে একজন মহিলা ছিল। মহিলাটি ছিল বলেই আমরা ওদের নৌকায় উঠিয়ে নিলাম, নতুবা নয়। এক ভদ্রলোক কিছু কাঠখড়ি সাহায্য করল। প্রায় দেড় ঘণ্টা বিলম্বের পর আমাদের নৌকা ঠিক বেলা ১১টার দিকে ছাড়ল। খালাম্মা আজ সোৎসাহে রান্নার কাজে বসে গেলেন, যাতে চারদিন পর খাবারটা একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুস্বাদু হয়। ক্ষুধায় আমার এবং সবার পেট কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ভালো খাবার হবে আঁচ করে পাহাড়িয়ার স্ত্রীও সামান্য একটু মসলা বেটে দিল। এই হলো তার একমাত্র কাজ এই কদিনে। ময়নার নানার রসিকতা আমাদের ক্ষুধাকে নিবৃত্ত করে রাখছিল। কিন্তু ক্ষুধা কী শূন্যমুখে নিবৃত্ত হয়। বিকাল প্রায় ৩টা প্রথম বৈঠকে টিফিন বক্সে আধা সিদ্ধ ভাত ভক্ষণ করা শুরু করে দিলাম।

৫ এপ্রিল ১৯৭১
দীর্ঘ পাঁচদিন নৌকায় অতিবাহিত হওয়ার পর মন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ল। উন্নিদ্রায় কৃশকায় হতে লাগলাম। অপর্যাপ্ত আহারে শক্তিহীন প্রাণীতে পরিণত হচ্ছিলাম। তন্মধ্যে স্নান করাও নিষিদ্ধ। যেহেতু এমন বিপজ্জনক পথ পরিক্রমণে গোসল, ঘুম, আরাম একেবারেই অনুচিত নয় কী? প্রথম রাত্রে শুধু একদণ্ড দেহখানাকে শুইয়ে রেখেছিলাম মাত্র। বাকি সব রাত কাটছে নৌকার গলুইয়ে পিঠ রেখে, বাহির পাটাতনে অর্ধশায়িত হয়ে কিংবা ছইয়ের ওপর কুকুরের মতো কুঁকরে চাদর মুড়ি দিয়ে। বাতাসও বইছে খুব ঠাণ্ডা গরম গেঞ্জিটা আর খদ্দরের বেদম মোটা পাঞ্জাবিটাও কিছুই করতে পাছে না। নৌকায় পাল ধরল। তর তর করে বয়ে চলল তরী। আমাদের দলের একজন মোটাসোটা ছেলে নৌকার গতি দেখে একে slow boat  বলে আখ্যা দিল। পাড়ের লোকেরা মিষ্টি আলু, কাঁচামরিচ ও চাল থেকে রান্নার সমগ্র দ্রব্যাদি সরবরাহ করল। অর্থাৎ আমাদের সাহায্য করল মাত্র। জায়গাটার নাম হোসেনপুর। সামনেই পাকুন্দিয়ায় পৌঁছলাম। এবং আমরা কিশোরগঞ্জ মহকুমার অধীন এলাকা দিয়ে পরিক্রমণ করছি। আলু সিদ্ধ হলো। খেলাম। অর্থাৎ যা কিছুই খাচ্ছি না কেন, সবকিছুই অনায়াসে পাকস্থলিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। নদীর মুক্ত আবহাওয়াই হজমশক্তির সহায়তা করছে। তারপর আমরা গলাকাটা এলাকা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে নৌকার নোঙর ফেললাম। এ স্থানে নদীর পানি খুব কম। কোনোখানে হাঁটু পানি। সব যাত্রীকে পাড়ে অবতরণ করে নৌকা ঠেলেও নিতে হচ্ছিল। আশপাশে বাড়িঘর দেখতে পাচ্ছি না। ধূ ধূ বিস্তীর্ণ এলাকা। আমরা ৩২ জন আদম সন্তান রাতের অন্ধকারে পড়ে রইলাম।

৬ এপ্রিল ১৯৭১
যাহোক আমরা আজ ভোরে গফরগাঁওয়ে পৌঁছলাম। এখানে দুধ-খিরাই এবং আরও কিছু আলু পেলাম। কলেজের সামনে একদল পুলিশ অতন্দ্র প্রহরীর মতো কর্তব্য পালন করছে। বস্তুত এখানে এসেই স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীন দেখলাম। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংঘ, সাংবাদিক সংঘ, বিদ্যালয় দেখলাম। বাজারে কিছু কেনাকাটা করলাম। তারপর ৬০ জন আনসার রাইফেল নিয়ে মার্চপাস্ট করল, তাও দেখলাম। রেলওয়ে স্টেশনে গেলাম। সব বন্ধ হয়ে আছে। এলাকাটা বেশ ভালো। স্বাস্থ্যপ্রদও বটে। এখানে ক্যাপস্টান সিগারেট এক টাকা অর্থাৎ যথার্থ মূল্যেই কিনলাম। সারাদিন নৌকা চলার পর যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে আমাদের ঝড়ের কবলে পড়তে হলো।
সন্ধ্যার পর পরই প্রবল ঝড় ওঠে। উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে ঝড়ের ঝাপটা এসে আমাদের নৌকা প্রায় উল্টে ফেলেছিল। আকাশে বজ্রনিঘোর ধ্বনি। দিকচক্রবাল নিকষ আঁধারে আচ্ছন্ন। ঝড় আর সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি। পাড়ের অধিবাসীদের চিৎকার আর আজান ধ্বনিও শুনেছি। আমরা ভয়ে তটস্থ হলাম। মাল্লারা শক্ত করে তরীর খুঁটি বাঁধল। আমি, খালাম্মা, ময়না, নানা নৌকার ছইয়ের সম্মুখস্থ আবরণীটা ধরে রাখতে পারছিলাম না। বৃষ্টির ঠাণ্ডা জলে ভিজে গেলাম। কাঁপতে লাগলাম এবং ভিজে কাকের মতো বিনা আহারে সারারাত ঝিমুয়ে কাটালাম। পাকিস্তানি নরপশু সেনাবাহিনীর চেয়ে অদ্যকার ঝড়ের লীলা অধিকতর ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল।

৭ এপ্রিল ১৯৭১
সকাল ১০টায় ময়মনসিংহ পৌঁছলাম। অমানুষিক ক্ষুধা আর ভ্রমণপীড়ায় ভুগছিলাম। নৌকায় আর পথচলা অসহ্য। সুতরাং শহরে গেলাম জামালপুরের কোনো বাস বা যানবাহনের সন্ধানে। পেলাম না। শুধু রিকশা চলতে পারে অধিক ভাড়ায়। একটি পরিচ্ছন্ন হোটেলে পেটভরে গোস্ত দিয়ে ভাত খেলাম আমরা চারজন। তারপর বহু দরকষাকষির পর মাত্র ১০ টাকা ভাড়ায় রিকশা ঠিক করা গেল। আমি ভাবতেই পারিনি এত কম মূল্যে রিকশা পাওয়া যেতে পারে। ঘাট থেকে ১০টা রিকশায় আমরা রওনা দিলাম। নতুন বাজারের ওখানে একটি ভালো রেস্তোরাঁয় সবাইকে ভাত খাওয়ানো হলো। তারপর আওয়ামী লীগ অফিস থেকে প্রয়োজনীয় ‘পাসপোর্ট’ নিয়ে আমরা শহর ত্যাগ করলাম। খালাম্মা পথিমধ্যে কন্ট্রোলরুমে গেলেন যদি বাস পাওয়া যায়। কিন্তু ব্যর্থ হতেই হলো। আমরা মুক্তাগাছা হয়ে জামালপুরে পৌঁছলাম রাত ৭টায়। পথে ইপিআরদের গাড়ি দেখলাম। ময়মনসিংহ সম্পূর্ণ মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এখানে পশ্চিমা সৈন্যদের খতম করা হয়েছে। এবং তাদের চরে উম্মুক্ত ময়দানে ফেলে রাখা হয়েছে। শকুনিরা মৃতদেহ খাচ্ছে। ইপিআর ব্যারাকে গোলাগুলির ক্ষতবিক্ষত চিহ্ন দালানের বুকে পিঠে দেখলাম। ময়নারা খালাম্মার কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার করল সর্বসমেত।
এখানেই আমাদের একত্রিত যাত্রা শেষ। আমরা সেই ধার করা টাকা নিয়ে আরেক দফা রিকশা ভাড়া করে নানাবাড়ি চললাম। যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্রে। কিছুদিন পর সেখানেও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হামলা শুরু হলো। তারপর অনেক কথা। তা পরে কখনো বলব।

Disconnect