ফনেটিক ইউনিজয়
পথ ছাড়ো আমরা আসছি
মনোরঞ্জন ব্যাপারী

মনোরঞ্জন ব্যাপারী আনুমানিক ১৯৫০ সালে বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিন বছর বয়সে দেশভাগের কারণে তাঁর পরিবার পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। বাঁকুড়া, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার ঘুটিয়ারী শরীফ ইত্যাদি নানা জায়গায় উদ্বাস্তু শিবিরে বসবাস করেন ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। আসাম, লক্ষৌ, এলাহাবাদসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় স্বল্প মজুরিতে কাজ করেছেন। এক সময় জীবিকার খোঁজে তিনি মধ্য ভারতের দণ্ডকারণ্যে চলে যান। সেখানে তিনি শ্রমিক নেতা শংকর গুহ নিয়োগীর সাক্ষাৎ লাভ করেন।
নকশাল আন্দোলনে জড়িত হবার কারণে জেলে যেতে হয় মনোরঞ্জন ব্যাপারীকে। সেখানে নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন তিনি। জেলমুক্তির পর জীবিকার তাগিদে রিকশা চালানোর সময়ে যাত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন বরেণ্য সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীকে। কথা প্রসঙ্গে তিনি মনোরঞ্জন ব্যাপারীর পড়াশোনার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তাকে লিখতে উৎসাহ দেন। তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় মহাশ্বেতা দেবী সম্পাদিত পত্রিকা ‘বর্তিকা’য়। শ্রমিক, কুলি ও মজুরের কাজ করতে করতে চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই সাহিত্য সাধনা করেন এই দলিত সাহিত্যিক। দক্ষিণ কলকাতার মুকুন্দপুরে হেলেন কেলার বধির বিদ্যালয়ে বর্তমানে রান্নার কাজ করেন তিনি।
বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে মনোরঞ্জন ব্যাপারীর লেখা গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। দলিত জীবনের আত্মকথা ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ তাঁর অন্যতম বিখ্যাত সৃষ্টি।
তাঁর প্রকাশিত বইগুলো হলো - ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন ১ম ও ২য় পর্ব, অন্য ভুবন, বৃত্তের শেষ পর্ব, জিজীবিষার গল্প, চণ্ডাল জীবন, বাতাসে বারুদের গন্ধ, অমানুষিক, মতুয়া এক মুক্তি সেনা, মরণ সাগর পারে তোমরা অমর ইত্যাদি।

জয়পুর লিটারারি ফেস্টিভ্যাল ২০১৮। গোটা শহরটাই আজ সেজে উঠেছে উৎসবের মেজাজে। সাড়ে তিন লক্ষ শ্রোতা-দর্শক সমাগম হয়েছে। প্রায় দুশোটা দেশ থেকে এখানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছে বিদ্বান বিদ্বজ্জন বক্তারা। সেই জয়পুরের সম্ভ্রান্ত সম্মানীয় মঞ্চের উপর যে দাঁড়িয়ে আছে- কালো বেটে অনাকর্ষক চেহারার, গলায় গামছা জড়ানো, আধবুড়ো ওই লোকটা কে?
সারা পৃথিবী থেকে নামীদামী পত্র-পত্রিকা টিভি চ্যানেলের হাজার হাজার সাংবাদিক এসেছে, তারা মুহূর্তে এখানকার সব খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বময়। তাদের কৌতূহলী চোখ বিদ্ধ করছে কাকে? তাদের হাতের ক্যামেরা কামানের নলের মতো তাক করে আছে কার দিকে? মাঝে মাঝে যা থেকে ঝিলিক দিয়ে উঠছে গোলা দাগার মতো আলোর ঝলক। যে ঝলকানিতে লোকটার চোখ মুখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।
লোকটা জানতো সে আজ আর কোনো মানুষ নয়, সে আজ এই সময় সমাজ মানুষের কাছে একটা বিষয়- একটা বিস্ময়। তাই তাকে নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন লেখা যায়, টিভির পর্দায় পরিবেশন করলে নাম যশ খ্যাতি অর্থ আসে। তাই মাঝে মাঝেই তার ওপর ঝাঁপায় দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরা।
মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে বসানো হয় বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে, বহু সভা-সেমিনারের মঞ্চে। তখন অবাক হয়ে কেউ কেউ তার ছবি তোলে। তবে সে তো আজকের মতো এতো ক্যামেরা, এতো আলোর ঝলক আগে কখনো দেখেনি। এতো উঁচু মঞ্চে আগে কখনো ওঠেনি।
সত্যি বলছি, সেদিন নিজের গায়ে নিজে চিমটি কেটে পরখ করেছিলাম মঞ্চের রাজ সিংহাসন তুল্য চেয়ারে যে বসে আছে সেই লোকটা আমিই তো? নাকি এটা আমার এক মিথ্যা ভ্রম, মাত্র একটা অলীক দিবাস্বপ্ন? এই রকম সম্ভ্রান্ত সম্মানীয় মঞ্চে তো তাদের বসে থাকার কথা, যারা জ্ঞানী-গুণী কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী। আমার মতো মানুষের এখানে স্থান কোথায়?
ওই তো দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদ ইউনূস সাহেবকে। কফি খাচ্ছেন তিনি। তার আর একটু দূরে বিখ্যাত চিত্র পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ। অভিনেতা নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী। গায়ক কৈলাস খের। যেদিকে তাকানো যায় চারদিকে যেন নক্ষত্র সমাবেশ। কাকে ছেড়ে কার কথা বলি সবার নাম জানি না, সবার মুখ চিনি না, কিন্তু এটা জানি, আমার চারপাশে এই থিক থিকে ভিড়- এরা কেউ আমার মতো অখ্যাতনামা নয়। যে যার জায়গায় মহৎ আর শ্রেষ্ঠ। এই মহতী ভিড়ে আমা হেন তুচ্ছ আর নগণ্য- পেটের ভাতের জন্য নিয়ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলা মানুষ কেন? আর আমি তো আনপড় অশিক্ষিত গবাঁর। যে জীবনে কোনোদিন স্কুলেই যেতে পারেনি। যে বয়সে বাচ্চারা বগলে বই নিয়ে পাঠশালায় যায়- আমাকে যেতে হয়েছে পাচন বাড়ি হাতে ছাগল গরু চড়াতে। যে বয়সে যুবারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান আহরণ করে, আমি টেনেছি জেলখানার ঘানী।
জন্মসূত্রে আমি এক দলিত- দরিদ্র পরিবারের সন্তান, সমাজে যারা অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য। যাদের এই উচ্চবর্ণ বাবু সমাজ তাদের পাশে চেয়ারে বসার কোনো যোগ্যতার কথা স্বীকার করে না। তাহলে আমি এই মঞ্চের উপর কেন কী করে এলাম এখানে? আর কিছু নয় অন্য কোনো যোগ্যতাই নেই। এখানে আসার পিছনে স্রেফ একটা ‘বিড়ম্বিত বিশ্রী’ জীবন আছে আমার। যে আমাকে ঠেলতে ঠেলতে এখানে নিয়ে এসেছে।  
আমার এই জীবনের কথা বলতে হলে আমাকে শুরু করতে হবে ‘জ’ এই অক্ষরটা দিয়ে। ‘জ’ মানে জন্ম / ‘জ’ মানে জেল/ ‘জ’ মানে জিজীবিষা / ‘জ’ মানে জীবন। আবার ‘জ’ থেকে জেদ / হিন্দিতে জঙ্গ শব্দের অর্থ যুদ্ধ / ‘জ’ থেকে জয় শব্দও লিখতে পারা যায়। আজকে যার মানে দাঁড়িয়ে গেছে জয়পুর জয়।
আমি স্কুলে যাইনি সেটা যেমন সত্য, তেমনি বিস্ময়কর সত্য- আমি একটা বই লিখেছি। আনপড়, অশিক্ষিত লোকের লেখা যেমন হয় তেমনই আর কী সেই বইয়ে সাহিত্য কতটা আছে তা কে জানে, তবে সত্য আছে। নির্মম নিরাবরণ উদোম উলঙ্গ সত্য। যে সত্যকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো নেই। সেই বইয়ের কারণেই আজ আমি এখানে পৌঁছে যেতে পেরেছি।  
তাই মোটামুটি এইভাবে চিহ্নিত করা যায় যে, আমার আত্মজীবনী ‘নতিবৃত্তে চ-াল জীবন’- বইখানা বিবৃত হয়েছে ‘জ’ মানে জঘন্য এক জন্ম থেকে আর এক ‘জ’ অর্থাৎ জয়যুক্ত হবার লক্ষ্যের দিকে যাত্রা।
আমি দেশভাগের বলি এক রিফিউজি সন্তান, জাতিতে নমঃশূদ্র। যাদের আগে চণ্ডাল বলা হতো। চণ্ডাল অচ্ছুৎ অস্পৃশ্য এক জাতি গোষ্ঠীর নাম, আবার চণ্ডাল মানে ক্রোধী। যাকে নিয়ে এই বই- সেই আমি একাধারে দুটোই। দেশভাগের বলি- সব রকম সরকারি সহায়তা বঞ্চিত রিফিউজি পরিবারের এক বালক, যার জীবন শুরু হচ্ছে ছাগল গরু চড়িয়ে। তারপর শীতে কাঁপতে কাঁপতে চায়ের দোকানের গেলাস ধোয়া, হোটেলের বাসন মাজতে মাজতে হাজায় হাত পায়ের আঙ্গুল পঁচিয়ে ফেলা। একটু বড় হয়ে মুটে মজুর, রিকশাওলা, খিদের জ্বালায় জীবনের এক পর্বে কুকুরের মুখ থেকে খাবার কেড়ে খাওয়া, আবার এক পর্বে হাতে চাকু বোমা নিয়ে দৌঁড়ানো- এই যে জীবন তা সমাপ্ত হয়- পোস্টমর্টেমের টেবিলে, আর নাহয় জেলখানার কালো কুঠুরিতে। সেই মানুষের কথা লেখা হয়েছে এই বইয়ে। আমি সেই অভাগা মানুষ।
তাই ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ বইখানা একজন জেদি হার না মানা মানুষের জীবন-যুদ্ধের ইতিবৃত্ত- এভাবেও বলা যেতে পারে। যে মানুষটার আজ পর্যন্ত বেঁচে থাকার কোনো কথাই ছিল না। জন্মের কয়েক বছর পরেই যার মরে যাওয়ার কথা জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত বার বার যাকে আঁকড়ে ধরেছে মরণের অক্টোপাস আটবাহু- বেঁচে থাকার প্রতিটা মুহূর্তে যাকে লড়তে হয়েছে অনাহার-অত্যাচার দারিদ্র্যের প্রবল প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে। যে জীবন তাকে পিষে মারতে চেয়েছিল কারাগারের কালো কুঠুরিতে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো, জেলখানার মাটিতে ২৪ বছর বয়সে কাঠির আঁচড়ে অক্ষরজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া, আর সেই জেল থেকে যে নবজীবনের যাত্রা শুরু- সেটা হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, মহারাষ্ট্রের মহাত্মাগান্ধী আন্তঃরাষ্ট্রীয় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, বারাসত বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লির জেনএনইউ,  পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, টাটা সোশ্যাল সায়েন্স, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, আরও বহু নামীদামী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে পশ্চিমবঙ্গ ‘বাংলা আকাদেমি পুরস্কার’, ‘২৪ ঘণ্টা অনন্য সাধারণ পুরস্কার’ প্রাপ্তি পর্যন্ত পৌঁছাবার যে সুকঠিন যাত্রা- সেই যাত্রাপথের বিবরণ রয়েছে এই বইয়ে।
জেলখানার মাটিতে কাঠির আঁচড়ে অ আ ক খ লিখতে শেখা একটি জীবনযাত্রা আর আজকে সাহিত্যিক হিসাবে নিজের জন্য একটি স্থান প্রাপ্ত করা, যা রসদবিহীন অভিযাত্রীর এভারেস্ট জয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
আমার জীবনকাহিনী পাঠ করলে পাঠকের স্কুল-কলেজের পরীক্ষা পাশের রসদ মিলবে কিনা সেটা বলা একটু শক্ত, তবে জীবনের পরীক্ষায় মুখোমুখি দাঁড়াবার অনেক উপাদান যে মিলে যাবে, সাহসী হবার- পরাজয়ের দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে অসীম সাহসে ঘুরে দাঁড়াবার- এমনটা অনেকেই জোর দিয়ে বলে থাকেন।
বহু পাঠক লেখককে এমনটা জানিয়েছেন। এক অল্পবয়স্ক পাঠক তো এমন বলেছেন- ‘দাদা, জীবনে হতাশ-নিরাশ হয়ে আত্মহত্যা করে নিতে চেয়েছিলাম। সেই সময় এই বইখানা হাতে পেয়ে পড়ে ফেলি। তখন আমার মনে হয়- এভাবেও বেঁচে থাকা যায় এতো দুঃখ-কষ্ট যন্ত্রণা সয়েও একজন মানুষ যদি বেঁচে থাকতে পারে- আর একটি সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে এই উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারা- তাহলে আমি কেন পারবো না? আমি কেন হার মেনে নেবো? দাদা, আপনার বই পড়ে বেঁচে থাকার আর লড়াই করার মতো মানসিক জোর খুঁজে পেয়েছি।’
১৯৮০ থেকে ২০১৮, সময়ের হিসাবে প্রায় ৩৭ অথবা ৩৮ বছর লেখালিখির জগতে আছে এই লেখক। ১২ অথবা ১৩ খানা বই ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত আরও খান কয়েক উপন্যাস পড়ে আছে। সব প্রকাশিত হলে বইয়ের সংখ্যা ২০ অথবা ২১ হয়ে যাবে। তবে এই লেখক নিজেকে ‘লেখক’ বলে পরিচয় দিতে মোটেই রাজী নন, তাঁর মতে, তিনি এক ‘লেখোয়াড়’। সেই যেমন লোকে খেলতে খেলতে খেলোয়াড় হয়ে যায়, আমি লিখতে লিখতে লেখোয়াড় হয়ে গেছি, তার বেশি আর কিছু নয়। আমি শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়, অবিচারের শিকার, দলিত দরিদ্র আর প্রতিবাদী মানুষের প্রতিনিধি। তাদের পক্ষ থেকে লিখতে ও বলতে এসেছি। কলম ধরলে তাদের জন্য ধরবো, মিছিলে হাঁটলে তাদের জন্য গলা ফাটাবো। জেলে যেতে হলে তাদের জন্যই যাবো।
এই সমস্ত কাজ আমার একটা উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে- আমি একটা শোষণমুক্ত, দমন-দলনমুক্ত, শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি। যেখানে সব মানুষ সমান, সবাই সমান সম্মানীয়। কেউ ছোট নয় কেউ বড় নয়। সবার নাগালে আছে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসার সুযোগ। মানুষ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিয়ে মানুষের নাগালে এসব প্রয়োজনীয় উপাদান পৌঁছে দিতে দায়বদ্ধ থাকবে।
আমি জাত মানি না, ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় মানি না, কোনো সীমাবন্ধন, বর্ডার মানি না। সারা পৃথিবী আমার দেশ। সারা পৃথিবীর শ্রমিক, কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ আমার আপনজন। আমি মনে করি, জগতে দু- ধরনের মানুষ আছে- মন্দ মানুষ আর ভালো মানুষ। মন্দ মানুষের সংখ্যা খুব কম, কিন্তু তারাই ভালো মানুষদের জীবন অসহ্য নরকতুল্য বানিয়ে দিয়েছে। ভারতে মাত্র এক শতাংশ লোকের হাতে কুক্ষিগত হয়ে গেছে দেশের তিয়াত্তর ভাগ সম্পদ। চাইছে একশো শতাংশ কুক্ষিগত করে নিতে- তারাই শাসক, শোষক, অত্যাচারী, দলক।
আমার জীবন বিপরীত শিবিরের শাসিত, শোষিত, অত্যাচারিত, দলিত মানুষের প্রতি সমর্পিত। বিশেষ কোনো অস্ত্র নেই আমার- মাত্র হাতে আছে একটা সস্তা দামের ছোট্ট কলম। সেই নিয়ে আমি লড়ছি, লড়তে থাকবো- যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকবে। আমার জীবন চর্চার প্রতি পরতে আছে সেই দৃপ্ত অঙ্গীকার।
জন্ম থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, অনেক অপমান, অত্যাচার, অভাব, অনাহার সয়ে; অকথ্য উপহাস উপেক্ষা করে; অনেক মাঠ, ঘাট, পাহাড়, জঙ্গল পার হয়ে; উবর-খাবর অনেক পথ হেঁটে; পথের পাথরে আঘাতে, ঠোক্করে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত পা; অবসন্ন আহত দেহমন নিয়ে বেলাশেষে এখানে এসে পৌঁছাতে পেরেছি।
জয়পুর সাহিত্য উৎসবের আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে আমার কাছে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে যাবার পর মনে হলো- যদি বড় রকম কোনো বিপর্যয় না ঘটে, তবে আমি সেই বর্ণময় অভিজাত মহার্ঘ অনুষ্ঠানে অবশ্যই যেতে পারি। কোনোভাবে এর অন্যথা হবার নয়। ওরা আমাকে নিয়ে যায় কারণ আমি আজ আর কোনো ব্যক্তি নই, একটা বিষয় মাত্র। আর এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অবশ্যই একটা বিক্রয়জাত পণ্য।
আমি সেই কাক, যে কোকিলের মতো ডাকতে জানে, এটা বিশ্বের কাছে একটা বড় বিস্ময়। আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন লিখলে- টিভিতে দেখালে, তার জন্য কিছু আর্থিক মূল্য পাওয়া যায়। আর এর জন্য কোনো খরচাও নেই। একটা পয়সা আমাকে দিতে হয় না।
অনেকের মনে আছে হয়তো যে, লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে রাজ্যসভা চ্যানেল [আরএসটিভি] আমাকে নিয়ে একটা তথ্যচিত্র বানিয়েছিল আমাকে, আমার স্ত্রীকে প্রায় এক মাস খাটিয়ে নিয়েও পাঁচটা পয়সা দেয়নি। ধূর্ত পরিচালক খালি প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ হাসিল করে চলে গেছে। টাটা সোশ্যাল সায়েন্স, যাদের ডাকে মুম্বাই গিয়েছিলাম, লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান। কিন্তু আমার জন্য পাঁচ পয়সা বরাদ্দ ছিল না। সমাজসেবী প্রভা খৈতান, তাঁরা অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিল দিল্লি। হেবিটেট সেন্টারে অনুষ্ঠান শেষে আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে সেই খালি হাতেই। তাই এবার ভেবেছিলাম আর যাবো না। তখনই মনে এলো- ওইসব ‘বাবু ভদ্দোর লোক’, ওদের মঞ্চে বসে ওদেরই প্রাণ খুলে গাল দেবার এতো সুখ কিছুতেই ছাড়া উচিত হবে না।
গাল তো আমি সারাজীবন দিচ্ছি। হাটে মাঠে ঘাঁটে সে গালের কোনো মূল্য ছিল না। সব যেন হাওয়ায় উড়ে গেছে। কিন্তু ওই মঞ্চ থেকে দিলে তা অনেক দূরে দূরে পৌঁছে যাবে, সারা পৃথিবীর বহু মানুষ শুনতে পাবে। যা অনেকের বুকে তীরের মতো বিঁধবে। সবাই দেখেছেন, পশ্চিমবঙ্গের এক নম্বর পত্রিকা, দিল্লির এক নম্বর সাংবাদিক আমার জয়পুর যাবার খবর লিখতে গিয়ে কী ধরনের কদাকার শব্দ ব্যবহার করেছিল একবার তিনি দিল্লিতে আমার বক্তৃতা শুনেছেন- সেদিনের সেই রাগ সুযোগ পেয়ে ঝেড়ে দিয়েছেন। এই জ্বলুনি আমি বেশ উপভোগ করি। আমি আরও জ্বালাতে চাই। ওদের জ্বালাবার জন্যই বেঁচে থাকতে চাই। তাই মনঃস্থির করি যে, অবশ্যই জয়পুরে যেতে হবে।
আমি সেই মানুষের প্রতিনিধি, যে অপমানে অত্যাচারে বিধ্বস্ত- খালি পা, খালি গাঁ, খালি পেট নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকে। খিদের জ্বালায় ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খাওয়া খায়। বিনা চিকিৎসায় রাস্তার পাশে শুয়ে কুকুরের মতো মারা যায়। গাছতলায়, ফুটপাতে রোদে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, শীতের কামড়ে কুঁকড়ে যায়। গরু, ঘোড়ার মতো গাড়িটানা, মাথায় পাথর বওয়া শ্রমজীবী সেই মানুষ, যাকে বাপের বয়সী হলেও ‘ভদ্দোর বাবু ’ তুই তোকারি করে কথা বলে- আমি তাদের মানুষের কাছে তাদের কথা বলতে যাবো। তাই আমাকে যেতে হবে। জয়পুর আমার জীবনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না। কারণ আমি যে জাতিতে চ-াল। যদি আমি কোনো উচ্চবর্ণের সন্তান- চ্যাটার্জি, ব্যানার্জি, মুখার্জি হতাম- আমাকে নিয়ে খুব নাচানাচি হতো। কোনো ‘মহান’ এগিয়ে আসতো আমাকে সাহায্য সহয়তা দিতে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা হবার নয়, আগেকার দিন থাকলে ওরা শম্বুকের মতো আমার গলাই কেটে ফেলতো।
আজ আমি আমার মানুষদের কাছে খালি সেই বার্তাটাই আমার জয়পুর গমনের মধ্য দিয়ে দিতে চাইবো- লড়াই জারি রাখো। লড়ো নিজের জন্য, লড়ো মানুষের জন্যে। ওরা তোমাকে হারিয়ে মাড়িয়ে থামিয়ে দিতে চাইবে, কিন্তু তুমি হার মেনো না। যদি লড়তে থাকো, লড়তে থাকো, লড়তে থাকো- এই দেশ, এই সমাজ, এই পুঁজিবাদী-বর্ণবাদী ব্যবস্থা একদিন পরাভূত হবেই। সেদিন ওরা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হবে, তুমিও মানুষ তুমিও মহান। কারো থেকে ছোট নও, কেউ তোমার চেয়ে বড় নয়। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং সম্মান সবকিছুতে তোমার সমান অধিকার। ওরা সেদিন বাধ্য হবে ওদের পাশের সমমর্যাদার আসনে তোমাকেও বসতে দিতে।
আমি এক আপোষহীন যোদ্ধা। লড়াই ছাড়া আর কিছু পারি না। আমার এই ৬৮ বছরের দীর্ঘ যাত্রার একক লড়াইয়ে আপনজন, সহযোগী তেমন কাউকে পাশে পাইনি, যার নাম কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারি। এমন কারো নাম মনে পড়ে না যে, হাত ধরে এক পা এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। ক্ষুধার সময় মুখে তুলে দিয়েছে একমুঠো অন্ন, তৃষ্ণার সময় এগিয়ে দিয়েছে এক ফোঁটা জল। কেউ এক পা এগিয়ে যেতে সাহায্য করেনি, উল্টে যাদের আপনজন ভেবেছি, বন্ধু মনে করেছি, আশা করেছি বিপন্ন সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে- তারাই চলার পথের উপর কৌশলে কাঁটা বিছিয়ে দিয়ে প্রতিহত করতে চেয়েছে আমার অগ্রগমন। বড় অনাত্মীয়, অসহযোগী সময় আমাকে আঁকড়ে রেখেছে সারাটা জীবন। সেই যেমন হিমালয় অভিযাত্রীকে গাইতি শাবল চালিয়ে এক একটা পা রাখার জায়গা বানিয়ে নিতে হয় আমাকেও পাথর কেটে, বন- জঙ্গলের কাঁটা সরিয়ে বানিয়ে নিতে হয়েছে চলার পথ। সে যে কতো কষ্টকর, কতো কঠিন- বলে বোঝাবার মতো ভাষা আমার নাগালে নেই।
তবে আমি আজ আর কাউকে কোনো দোষারোপ অভিযোগ করতে চাই না। তারা যে যা করেছে, তা আমার জীবনে মঙ্গলজনক হয়েই এসেছে। একটা পাথর জানে না তার মধ্যে আগুন আছে। যে আগুন সময়-সুযোগ আর দাহ্যবস্তুর নাগাল পেলে বিধ্বংসী দাবানল হয়ে উঠতে পারে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দিতে পারে মহীরুহ শোভিত বিশাল বনাঞ্চল।  
পাথরে আগুনের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় তখন, যখন ভারি কিছু দিয়ে তাকে ঠোকা হয়। সময় সমাজ মানুষ জেনে অথবা না জেনে নিরন্তর সেই ঠোকার কাজটা করে গেছে, যার ফলে আমার মধ্যেকার নিভন্ত ঘুমন্ত আগুন জেগে ওঠবার অবকাশ পেয়েছে। এই অসহযোগিতা, অবজ্ঞা, অপমান, অনাহার না থাকলে আমার মধ্যের সেই আগুন হয়তো চাপা পড়েই রয়ে যেতো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে জন্ম হলে, পোলাও-বিরিয়ানি খেয়ে বড় হলে, কোনোদিন এমন উচ্চমঞ্চে আমার জন্য আসন পাতা হতো না।
মহাভারতে একটা গল্প আছে। সেটা অশ্বমেধ যজ্ঞের সময়কাল। যজ্ঞের অশ্ব কার অধিকারে থাকবে তাই নিয়ে যুদ্ধ-কুরুক্ষেত্র বিজয়ী বীর অর্জুন আর বালক বব্রুবাহনের মধ্যে। কেউ কাউকে হারাতে পারছে না, দুজনের মধ্যে ঘোর যুদ্ধ হচ্ছে। এমন সময়ে অর্জুন বালক বব্রুবাহনের রথে একটা শক্তিশালী বান মারলো। বালকের রথ রণাঙ্গন থেকে চল্লিশ যোজন দূরে ছিটকে গিয়ে পড়লো। কী আর করে বালক সে ধীরে ধীরে রণাঙ্গনে ফিরে এসে একটা বান মারলো অর্জুনের রথে। রথটা তিন পা পিছনে সরে গেল। তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন কৃষ্ণ। তিনি হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন- সাবাস বালক বব্রুবাহন। ধন্য তোমার অস্ত্র শিক্ষা।  
তখন কৃষ্ণকে কাছে ডেকে বলে অর্জুন- তুমি আমার সখা, না ওই বালকের? আজকের এই যুদ্ধে তুমি কাকে বিজয়ী দেখতে চাও? আমাকে, না ওই বালককে? আমি ওর রথ চল্লিশ যোজন দূরে ফেললাম, অথচ তুমি আমাকে কোনো ধন্যবাদ দিলে না ধন্য বলছো ওকে- যে আমার রথ মাত্র তিন পা সরিয়েছে।
তখন বলেন কৃষ্ণ, ওই যে বালক- ওর পিছনে কে আছে, কী আছে? শোলার মতো হালকা পলকা সে রথ তুমি চল্লিশ কেন, ইচ্ছা করলে চারশো যোজন দূরেও ছুড়ে ফেলতে পারো। আর তুমি? তুমি কুরুক্ষেত্র বিজয়ী বীর মহাধনুর্ধর কৃষ্ণসখা অর্জুন। তোমার রথের উপর মহাভার নিয়ে বসে আছে পবননন্দন মহাবলী হনুমান। তোমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছি আমি জগতের সবশক্তি নিয়ে। সেই রথ তিন পা সরানো কোনো সোজা কথা নয় তাই ওকেই আমি অভিনন্দন যোগ্য মনে করেছি।
জয়পুরে যারা ছিলেন, দেখেছেন- কিছু তালি আমিও পেয়েছিলাম। দেশি আর বিদেশি সাংবাদিকদের ঘিরে ধরা আর প্রশ্নের পর প্রশ্ন করা, তার মধ্যে গোপন ছিল তালির আওয়াজ ওই তালি আমার কানে বেজেছে কৃষ্ণের তালি হয়ে।
আমার চেয়ে হাজার গুণে বড় হাজার হাজার গুণে ভালো লেখক এই ভারত ভূমিতে অসংখ্য আছেন। তারা ভালো খায়, ভালো পরে, ভালো বাড়িতে থাকে, অনেক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শিখেছেন। তারা মহান সাহিত্যিক হবেন, কালজয়ী সাহিত্য রচনা করবেন, তাদের পায়ের কাছে নাম-যশ-খ্যাতি-অর্থ-সম্মান এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে- সেটাই তো অতিস্বাভাবিক।
বালক বব্রুবাহন মহাবীর অর্জুনের কাছে পরাভূত হবে- প্রাণ যাবে তার বানের প্রহারে। এটাই তো তো চিরকালীন সত্য। কিন্তু এক বালক এক অসম যুদ্ধে সাহিত্যের রথ তিন পা সরিয়ে দিয়েছিল- ইতিহাসকে চিরদিন সে কথাও বলতে হবে। যে জয়পুরে এতোকাল ‘টাইপরা বাবুদের’ আধিপত্য চলেছে, সেই ভিড়ে গামছা গলায় একজন ‘ছোটলোক’ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে সগর্বে উঠে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে এতো সহজে ভুলতে পারবে না। এটাই তার ব্যক্তি জীবনের চরম আর পরম প্রাপ্তি।
আর একটা কথা, যেটা বলেছিলেন নীল আর্মস্টং সেই চাঁদের মাটিতে পা রাখার প্রাক-মুহূর্তে। বলেছিলেন- আমার মতো তুচ্ছ মানুষের পক্ষে এটা একটা ক্ষুদ্র পদক্ষেপ। কিন্তু সমগ্র মানবজাতির পক্ষে একটা বৃহৎ উল্লম্ফন।
আমিও আজ সেই কথাটাই বলতে চাই, আমার দলিত-দরিদ্র, চির অবহেলিত অপমান-অনাহারে নুয়ে বেঁকে যাওয়া মানুষের কাছে জয়পুর মঞ্চে উঠে দাঁড়ানোটা একটা অতি ছোট্ট ঘটনা মাত্র। এতে জীবনের তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। কাল আমি যা ছিলাম, আজও তাই আছি। সেই যে এক কুমার খড় মাটি রঙ দিয়ে মূর্তি বানায়। কেউ তাকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বসায়। পূজা শেষে টান মেরে ফেলে দেয় আদারে পাদারে। মাটির প্রতিমা আবার মাটিতে বিলীন হয়ে যায়। ব্যক্তি জীবনে তার চেয়ে বড় কিছু ঘটেনি, কিন্তু সমগ্র দলিত দরিদ্র মানুষের কাছে এতে একটা বার্তা অবশ্যই গেছে- এখন আর তোমাদের ক্ষমতা-দক্ষতা-যোগ্যতাকে কেউ অস্বীকার করতে পারছে না। সম্ভ্রান্ত সম্মানীয় মঞ্চে তোমাদের জন্যও একটা আসন পাতা হচ্ছে। সাহস ভরে এগিয়ে যাও আর পায়ের উপর পা তুলে ওঁরা যেমন বসে, স্বাধীকারে তুমিও বসে পড়ো।
আমাকে অনবরত এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়- ‘আপনি কেন লেখেন?’
কথাটা নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি, সত্যিই তো আমি কেন লিখি? আমার তো লেখার কথা ছিল না, তাহলে কেন এলাম এমন এক কর্মে, যেখানে আমার মতো অজ্ঞ মূর্খ মানুষ সম্পূর্ণ বেমানান। যে কাজ বিদ্বান বুদ্ধিজীবীদের মানায়, সেখানে আমার মতো নির্বোধ-অবোধের কী দরকার তখন মনের মধ্যে আতিপাতি খুঁজে যে উত্তর উঠে আসে আর আমি সবার কাছে যে জবাব দিই এবারও তাই দিচ্ছি।
বিশ্বাস করুন- আমি কিছু মানুষের নিয়ত মৃত্যু কামনা করি। যাদের মরণ আর্তনাদ আমার কানে সুরেলা সঙ্গীতের মতো বাজে। তাদের খতম করে দিতে ইচ্ছা করে। যদি তা পারতাম, আর লিখতাম না। পারি না তো, তাই লিখি। আমার লেখায় আমি তেমন একটা ঘৃণ্য চরিত্রের নির্মাণ করি, আর নির্মমভাবে মেরে ফেলে একটা মানসিক সুখ পাই।
দুপুর বেলার তীব্র দাবদাহ। একজন মানুষ চলেছে পথে- তার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। চলতে চলতে সে দেখতে পেলো, পথের পাশে একটা কুয়া আছে। জল তোলার বালতিও রয়েছে সেখানে। বেচারা সামান্য জল তুলে খেয়ে নিলো। মাত্র ওই অপরাধ উচ্চবর্ণ পাঁচ-সাতজন ছুটে এসে ধরলো তাকে। এই তোর কি জাত রে? মুচি? চামার? ব্যাস লোহার রড পুড়িয়ে তার হাতে ছেঁকা দিয়ে বানিয়ে দেওয়া হলো গভীর ক্ষত।
এক অসহায় গরীব মা তার শিশু কন্যাটিকে একলা ঘরে রেখে কোথাও গেছে দু মুঠো অন্নের সন্ধানে। দীর্ঘ অনাহারী দিন রাক্ষুসে হা মেলে গিলতে আসছে- বাছা আমার খিদের জ্বালায় কাঁদবে। যেখান থেকে পাই, যেভাবে পারি, কিছু খাবার জোগাড় করে আনতে হবে। এই সুযোগের অপেক্ষায় ওত পেতে ছিল ‘শয়তান’। মা চলে যাওয়া মাত্র তার সেই ভাঙাঘরের পলকা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়ল ধর্ষক। যাদের সংখ্যা দুই-তিন-চারও হতে পারে। বাচ্চাটার কোমল অনাহারী মুখ দেখেও তাদের মনে দয়ার উদ্রেক হলো না- জাগলো কদাকার বিকৃত কাম।
তারা শুধু কি ধর্ষণ করে রেহাই দিল ছোট্ট মেয়েটাকে? না, তাতে তাদের আত্মা শান্ত হলো না। শিশি বোতল মোমবাতি আরও কী সব ঢুকিয়ে দিল তার অপরিণত দেহের মধ্যে একটা ছোট্ট প্রাণ, নিঃসহায় নিরপরাধ- অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে তাকে তিলে তিলে মেরেই ফেললো।
আপনাদের কী এখন কাশ্মীরের সেই ছোট্ট মেয়ে আসিফার মুখ মনে পড়ছে? ছয় বছরের ছোট্ট ফুলের মতো মেয়েটাকে আট দিন ধরে আটকে রেখে ছয়জন নরপশু অনবরত ধর্ষণ করে। মেরে ফেলার পাঁচ মিনিট আগেও সেই নিথর নিস্পন্দ দেহের উপর হামলে পড়েছে এক শয়তান।
আমার খুব ইচ্ছা করে এগুলোকে নাগালে পেলে ধরে নির্মমভাবে কোপাই। যতক্ষণ নড়বে, ততোক্ষণ কোপাবো। এক গরীব বাবা সেই গ্রামবাংলা থেকে দুটো খেয়ে-পরে বাঁচবে মেয়ে, সামান্য একটা দুটো পরবার কাপড় পাবে, পাবে মাস গেলে অল্প কিছু মাইনে- সেই আশায় বুকে পাথর বেঁধে রেখে যায় শহরের কোনো বাবু ভদ্রঘরে ঝিয়ের কাজে। আর কয়েক মাস পরে এসে দেখে তাঁর সেই মেয়েকে বাবুরা ধর্ষণ করে মেরে পাখার হুকে ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
তবে বাবুকে অপরাধী প্রমাণ করা যায় না। বাবুদের টাকার বান্ডিল আছে। সেই বান্ডিলের জোরে প্রমাণিত হয় বাবু একেবারে নির্দোষ, গোমুত্র দ্বারা ধোয়া, পবিত্র তুলসী পাতা। অপরাধী অন্য কেউ, যে সরল সোজা গ্রাম্যমেয়ে পেয়ে কথায় ভুলিয়ে সহবাস করেছিল। যার ফলে মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। আর লোক লজ্জার ভয়ে নিজেই মেয়েটি আত্মঘাতী হয়েছে।
কেউ এমন গরীব সরল মেয়েকে কথায় ভুলিয়ে বিয়ে করে নিয়ে চলে যায়। তারপর সেই মেয়েকে বাধ্য করে দেহ ব্যবসায় নামতে। শিশু পাচার, নারী পাচার এইসব জঘণ্য অপরাধকে কী ক্ষমা করা যায়? যায় না, সে আপনিও জানেন, আমিও জানি। কিন্তু অপরাধী ধরা পড়ে না। ধরা পড়লেও কোনো সাজা হয় না। কারণ তাদের যে শিকার- তাঁরা গরীব, দুঃস্থ, অসহায়। আমাদের দেশের আইন এসব মানুষের মঙ্গলের কথা ভেবে বানানো হয়নি। সে রক্ষা করে বিত্তবানের স্বার্থ।
একটু খোঁজ করলেই দেখা যায় যে, অপরাধে এক গরীব জেলখানায় পচে মরছে, তাঁর চেয়ে হাজার গুণ বড় অপরাধ করে বিত্তবান হাসতে হাসতে ছাড়া পেয়ে চলে যাচ্ছে। আর যদিও বা থাকতে হয় জেলে, জেলকেই বানিয়ে নিচ্ছে প্রমোদ কানন। জেলেই সেই সুখ পেয়ে যাচ্ছে যা বাইরে থাকতে পেতো। তাই বিত্তবানরা অন্যায় অপরাধ করতে কোনো ভয়ও পাচ্ছে না।
আপনাদের মনে আছে, বিহারের বাথানিটোলা নরসংহার? বাথানিটোলা একটা দলিত মানুষের বস্তি। পঞ্চাশ-ষাট ঘর হতদরিদ্র মানুষের বাস। যাদের আশেপাশের উচ্চবর্ণ বাভন রাজপুতরা জোর করে ধরে নিয়ে যায় তাদের জমিতে বেগার খাটাতে। ইচ্ছা হলে দু টাকা মজুরি দেয়, ইচ্ছা না হলে কিছুই দেবে না। বহু বছর ধরে চলে আসছে এই নিয়ম।
সেটা সেই সত্তরের দশক। বিশেষ পরিস্থিতিতে তখন বোবা মানুষের মুখেও বুলি ফুটতে শুরু করেছে। একদিন সেই দলিত মানুষরা চিরকালের চলে আসা বিধান পাল্টে দিতে চাইলো। বলল তাঁরা- আমরা কাজে যাবো। কাজ না করলে যখন আমাদের খাওয়া জোটে না, কাজ আমরা করবো, তবে তাঁর নগদ মজুরি দিতে হবে। আর তা দিতে হবে সরকার দ্বারা নির্ধারিত মজুরি। ন্যায্য মজুরি না পেলে কাজ করবো না।
মাত্র এই ছিল সেই দলিত, দরিদ্র ক্ষেতমজুর মানুষগুলোর অপরাধ। তাই তাদের সমুচিত শিক্ষা দিতে রাতের আঁধারে গোটা গ্রামকে ঘিরে নিল বন্দুকধারী উচ্চবর্ণ সামন্ত প্রভুরা আর এলোপাথারি গুলি চালিয়ে মেরে ফেললো ১০৬ জন মানুষকে। সেই অপরাধের বিচার চললো। ধরা পড়া ৫৬ জন অপরাধীর মধ্যে হাইকোর্টে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ১৬ জনকে ফাঁসি আর ৪০ জনকে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা শোনালো।
মামলা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রীম কোর্টে গেলো, যেখানে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে বিচার কিনতে হয়। গরীব ক্ষেতমজুর মানুষদের ক্ষমতা ছিল না ওখানে পৌছাবার। পঁচিশ বছর মামলা চলার পর জানা গেলো- হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুল। এই ৫৬ জন একেবারে দুধে ধোয়া নিরপরাধ। আগে জামিনে বাইরে ছিল, এখন পুরোপুরি খালাস পেয়ে গেল তারা। ন্যায়বিচার নাগালের বাইরে রয়ে গেলো দরিদ্র, দলিত মানুষগুলোর।
এখন প্রশ্ন একটাই- হাইকোর্টের যে বিচারক রায় দিলেন, উনি যে আইনের বই পড়ে পাস করেছেন, সুপ্রীম কোর্টের বিচারকও তা-ই। তবে দুজনের চোখে দু রকম দৃশ্য ধরা পড়লো কেন? ফাঁসি থেকে একেবারে নিরপরাধ তাহলে কী হাইকোর্টের বিচারক নির্বোধ? গাঁজাখোর? যদি তা-ই হয়, তাহলে তিনি এতো বড় পদে আসীন হলেন কী করে? নিশ্চয় ঘুষ দিয়ে? আর তো কোনো যুক্তি আসে না। তাহলে যে তাকে নিযুক্তি দিয়েছে তাঁর বিচার হোক- ওই বিচারকের বিচার হোক। আর তা না হলে সুপ্রীম কোর্টের যে বিচারক ঘুষ খেয়ে রায় উল্টে দিয়েছেন, তাঁর বিচার হোক।
এই যে নিপীড়িত মানুষগুলো বিচার পেলো না, অপরাধীর কোনো সাজা হলো না, তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা বা কোনো বিচারকই এর জন্য দায়ী। ওরা যখন মারেনি, ওই ১০৬ জন মানুষকে কেউ তো মেরেছে? এমনিতে তো লোকগুলো মারা যায়নি কেন তাকে খুঁজে বার করা হলো না? সাজা দেওয়া হলো না?  
কারনার নামে এক বিচারক- সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হয়ে যিনি দাবি করেছেন যে বিচারকও ঘুষ খায়- সত্য উচ্চারণের জন্য যাকে জেল খাটতে হয়েছে। কিন্তু তা বলে সত্য তো মরে যায়নি।
বাথানিটোলা কা-ে হাইকোর্ট না হয় সুপ্রীম কোর্ট- কেউ তো সেটা খেয়েছে, তাই তো দু জনের রায় দুরকম এবার এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন, সেই ঘুষখোরকে কে সাজা দেবে? এই দেশ-দেশের শাসন-প্রসাশন, আইন-কানুন সব তো পুঁজিপতি, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিজের লোক কব্জা করে বসে আছে।
আপনাদের মনে পড়ে গুজরাতের সেই বিভৎস দাঙ্গা একদল বর্বর জল্লাদ কাটা মু-ু নিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে পথে পথে। মায়ের পেট চিরে বাচ্চা বের করে বল্লমে গেঁথে উল্লাসে সারা শহর প্রদক্ষিণ করে বেড়াচ্ছে। কেন তারা এটা করতে পারলো? কেন তাদের ভয়ে বুক কেঁপে গেল না? তারা জানতো তাদের পেছনে ধর্মনেতাদের, রাজনেতাদের সমর্থন আছে। কেউ তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারবে না।
আমার মনে হয় ওই হত্যাকারীদের হত্যা না করাটাই পাপ। ওদের এক মিনিটও বাঁচতে দেওয়া মনুষ্যত্বের চরম অপমান। ওরা বেঁচে থাকলে বার বার দাঙ্গা হবে, মান-সম্মান ধনজন হানী হবে। মানব সভ্যতা- যা হাজার হাজার বছরের চেষ্টায় গড়ে উঠেছে, তা আবার হাঁটা দেবে উল্টোদিকে।
একজন সরল সোজা আদিবাসী মানুষ- সে বাস করে ‘সভ্য জগত’ থেকে বহুদূর জঙ্গলে- তাঁর নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি নিয়ে নিরাপদ শান্তিতে। সে বলছে- হে সভ্যতা, আমি তোমার কাছে কিছু চাই না। তুমি তোমার মতো থাকো, আমি তোমার শান্তি বিঘ্নিত করছি না। আমাকে আমার মতো নিরাপদে বাঁচতে দাও।
কিন্তু তাদের কাতর আর্তনাদ কেন শুনবে লোভীরা কেন তাদের থাকতে দেবে শান্তিতে? একদল অর্থলোভী ঝাপিয়ে পড়েছে তাদের জীবন তছনছ করে দেবার জন্য। তাদের হাজার বছরের জল-জঙ্গল-জমিন থেকে উচ্ছেদ করার জন্য। কারণ তারা যেখানে বাস করে, সেই মাটির নিচে রয়েছে লোহা, তামা, ডিলিমাইট বক্সাইটের অপার খনিজ সম্পদ। আদিবাসী মানুষদের উৎখাত উচ্ছেদ করে যেভাবে হোক উদ্যোগপতিদের এই খনিজ সম্পদের দখল দিতে হবে। সরকারের এটাই একমাত্র উন্নয়ন পরিকল্পনা। কিন্তু আদিবাসী মানুষ তাদের হাজার বছরের জল-জঙ্গল-জমিনের অধিকার ছাড়তে নারাজ। এসব ছেড়ে যাবে কোথায় তাঁরা? বাঁচবে কীভাবে? তাই তাঁরা প্রবল বাধা দিচ্ছে- এই অপরাধে তাদের মাওবাদী বলে ঘর পোড়ান হচ্ছে, খুন করা হচ্ছে, নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। আমার মনে হয়, এদের ক্ষমা করা কোনো মতেই উচিত কাজ নয়। বিনাশ করা অতি যুক্তিসঙ্গত ন্যায়সঙ্গত কাজ।
বুড়ো হয়ে গেছি এখন। দেহে আর সেই শক্তি নেই। থানার লকআপে ‘থার্ডডিগ্রি’র জিজ্ঞাসাবাদ সহ্য করতে পারবো না। পারবো না কারাগারের যাতনাকে আহ্বান জানাতে। সে কাল পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে এসেছি। যতদিন দেহে তেমন ক্ষমতা ছিল দাঁড়িয়ে ছিলাম ওই আদিবাসী মানুষের লড়াইয়ের পাশে। আমার নেতা শংকর গুহ নিয়োগী। ছত্তিশগড়ের শ্রমজীবী দলিত দরিদ্র আদিবাসী মানুষ যাকে বলতো মসিহা- নিয়োগী ভাইয়া। রাতের আঁধারে যাকে পুঁজিপতিদের ভাড়াটে খুনি ঘরের খোলা জানালা দিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। যারা ওই খুনিকে নিযুক্ত করেছিল তাদের একজনেরও কোনো সাজা হয়নি। বুকটা বড় জ্বালা জ্বালা করে ওই অমানুষেরা আজও মুক্ত দুনিয়ায় ঘুরছে, আমরা তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে পারিনি।
আমার খুব ইচ্ছা করে ওদের ধরে এনে নিজ হাতে শাস্তি দেই। কিন্তু আমি তো তা আর পারবো না। চোখে কম দেখি, প্রেশার-সুগার-আর্থরাইটিস, একটা হাঁটুতে নি-রিপ্লেসমেন্ট হয়েছে, আর একটাতেও করাতে হবে। তাই কী আর করবো অক্ষম অসহায়তায় আর মনের দুঃখে কাগজ-কলম টেনে নিয়ে বসি আর আমার লেখায় ওই রকম একটা ‘ঘৃণিত চরিত্র’ সৃষ্টি করি, তারপর তাকে নির্মমভাবে মেরে ফেলি। এই করে একটা মানসিক আরাম পাই। অন্যকিছু আর করতে পারি না- তাই আমি লিখি। যদি কোনদিন লেখার চেয়ে সশক্ত কার্যকর অন্যকোনো মাধ্যম নাগালে পেয়ে যাই- সেদিন থেকে আর লিখবো না। যতক্ষন তা না পাই, আমাকে ঘাড় গুঁজে লিখে যেতেই হবে। ওটাই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমি বেঁচে থাকতে চাই তাই লিখি।

দুই.
আমি পূর্ববাংলার বরিশাল জেলার এক দলিত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। দেশভাগের কারণে ১৯৫৩ সালে আমাদের পশ্চিম বাংলায় চলে আসতে হয়। চলে আসার চাইতে পালিয়ে আসতে হয় বলাটাই যুক্তিযুক্ত। আমি এই দেশের মানুষ, এর প্রতিটি ধূলিকণায়-জল-বাতাসে আমার অধিকার। কে কোন রাজনেতা কলমের আঁচড় দিয়ে দিল আর আমার জন্মভুমি আমার জন্য বিদেশ হয়ে গেলো আমি সেই কলমের আচড়, টেনে দেওয়া বর্ডার মানি না।
আজ যদি আমার জীবন থেকে কোনো একটা জিনিস বদলে ফেলার সুযোগ আসে আমি সর্বপ্রথম বদলে ফেলতে চাইবো সেই ভয়ংকর দেশভাগের ঘটনা। কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা অস্তিত্ব বিনষ্ট করেছে ওই দেশভাগ। আজ কোটি কোটি মানুষের কাছে কোনো দেশ নেই- সব দেশ ভিখারী। ওদেশের তারা কেউ নয়, এদেশেরও তারা কেউ নয়। যে দেশভাগ আমার জীবন থেকে দেশ কেড়ে নিয়েছে, আমি সেই ঘটনা মুছে দিয়ে অখ- ভারতই চাইবো।
দেশভাগ নিয়ে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মত। কেউ কেউ দোষারোপ করে বলে যে মুসলিম লীগ আর জিন্নার জন্যই নাকি দেশটা ভাগ হয়েছে। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমার বিচারে মসুলিম নেতাদের চেয়ে অন্য অনেকের লাভের পাল্লা ছিল ভারি। তারাই দেশভাগের জন্য আকুল হয়েছিল জিন্নার চেয়ে বেশি। সে সময় ইংরেজ শাসকদের পক্ষ থেকে একটা প্রস্তাব দেওয়া হয় যে হিন্দু বা মুসলমান কোনো এক পক্ষের প্রতিনিধিরা যদি দেশ ভাগ চায় তবেই দেশ ভাগ হবে। নচেৎ হবে না। তো, তখন বাংলার দুপক্ষের সর্বমোট প্রতিনিধি ছিল দুশোজন। যার ৯৭ জন হিন্দু প্রতিনিধি ভোট দিয়েছিল বাঙলা ভাগের পক্ষে আর ১০৩ জন মুসলমান প্রতিনিধি ভোট দিয়েছিল বিপক্ষে। এতেই বোঝা যায় মুসলমান নয় হিন্দু নেতারাই বাংলা বা দেশভাগ চেয়েছিল বেশি একাগ্রভাবে।
ভাগ চেয়েছিল ভারতের অন্য প্রদেশের বাঙালি বিদ্বেষীরাও। এর কারণ কী? কারণ অখ- বাংলা থাকলে আজ ভারতের পার্লামেন্টে বাংলার সাংসদ থাকতো কমপক্ষে ১০০ জন। সংখ্যার জোরে দিল্লীর রাজনীতিতে বাঙালিদেরই আধিপত্য থাকতো। যার প্রভাব পড়তো সারা ভারতে। দেশজোড়া হিন্দিভাষীদের আজকের যে দবদবা সেটা চলতো না। বাংলাভাগের কারণে ‘গো-বলয়’ সেই বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য।
দেশভাগ চেয়েছিল ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। কারণ তখন হরি গুরুচাদ- নমঃশূদ্র সমাজে এই দুই মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। যাদের যোগ্য নেতৃত্বে বাংলার দলিত সমাজ সংঘবদ্ধ হচ্ছিল। সমাজদেহের উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁরা যেন যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন হিন্দুধর্মের ভিতে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পেরেছেন। পরবর্তী সময়ে আরেক নমঃশূদ্র নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, মহারাষ্ট্রের মাহার সন্তান বি আর আম্বেদকারের সঙ্গে যোগ দিয়ে সেই আন্দোলনকে আরও অগ্রসর করেন।
দেশভাগের ফলে সেই সংগঠিত শক্তিশালী নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠীকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলা গেল। কিছু থেকে গেল ওপাড় বাংলায়, কিছু পাঠানো হলো আন্দামানে, কিছু দণ্ডকারণ্যে, কিছু রয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গে। ফলে এই ছিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠী দ্বারা আর ব্রাহ্মণ্যবাদের আক্রান্ত হবার কোনো ভয় শঙ্কা রইলো না।
বলা হয় যে, মুসলমানদের জন্য দেশভাগ হয়েছে। তা যদি হয়, তাহলে মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো তো পাকিস্তানে যাবার কথা, আর হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো তো আসার কথা পশ্চিমবঙ্গে। দেখা গেল মালদা, মুর্শিদাবাদ মুসলমান প্রধান এই জেলাগুলো রেখে দেওয়া হলো ভারতে। মুর্শিদাবাদ তো পাকিস্তানে পড়েছে ভেবে সেখানের মানুষ পাকিস্তানি পতাকা পর্যন্ত তুলেছিল। পরে সেই পতাকা নামিয়ে তেরঙ্গা তোলা হয়।
আবার উল্টোদিকে বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা- হিন্দু, নমঃশূদ্র অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে ঠেলে দেওয়া হয় পাকিস্তানে। মুর্শিদাবাদের মতো খুলনা ভারতে পড়েছে ভেবে সেখানেও মানুষ ভারতের পতাকা তুলেছিল। সেটা নামিয়ে পরে তোলা হয় পাকিস্তানি পতাকা। কাজেই এটা বলা ভুল হবে না যে, ব্রাহ্মণ্যবাদীরাও বিপদমুক্ত হতে চেয়েছিল বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে।
দেশভাগ হয়ে যাবার জন্য আর একটা ভয় থেকে হিন্দু রাজনেতারা রক্ষা পেয়েছিল। জনগণনায় দেখা যায়, দুই বাংলা এক করলে হিন্দুর চাইতে জনসংখ্যায় মুসলমান বেশি। গণতন্ত্রে ভোট একটা বড় হাতিয়ার। ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট। ফলে দেশ ভাগ না হলে তখন জনসংখ্যার জোরে বাংলার শাসন ভার মুসলমানদের হাতেই থেকে যাবে। কোনো বামুন কায়েত বৈদ্যির আর রাজসুখ, মন্ত্রীর সুখ নাগালে আসবে না। তাই দেশভাগ করে মুসলমানদের একটা বড় অংশ ফেলে দেওয়া গেল ওপারে। মুসলমানদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, তারা সব থেকে গেল ওপাড় বাংলায় এতে হিন্দু উচ্চবর্ণ- উচ্চাকাক্ষীদেরও পথের কাঁটা সরে গেল। যাদের দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদ, হিন্দু উচ্চবর্ণ শঙ্কিত ছিল, সেই মুসলমান আর নমঃদের দুটুকরো করতে পেরে তারা লাভবান হলো।
এদেশে পালিয়ে আসার পর আমাদের রাখা হয় ডোল নির্ভর রিফিউজি ক্যাম্পে। সরকার থেকে রিফিউজিদের চৌদ্ধ দিন অন্তর কিছু চাল-ডাল দেয়া হতো। যা ছিল অতি নিম্নমানের- পচা, পোকা, কাঁকড়, পাথর, ধুলো-বালি যুক্ত অখাদ্য বিশেষ। ওই চালের ভাত খেয়ে সে সময় বহু মানুষ পেটের রোগে মারাও গিয়েছিল। বিশেষ করে শিশু মৃত্যুর হার ছিল অস্বাভাবিক রকম বেশি।
প্রায় ছয় বৎসর রাখা হয় সেই ক্যাম্পে তারপর সরকার থেকে বলা হয়- দণ্ডকারণ্যে চলে যেতে হবে, বাংলায় আমাদের পুনর্বাসন দেয়া হবে না। মজার ব্যাপার এটাই যে, দেশভাগের কারণে পূর্ববাংলা থেকে এদেশে যে রিফিউজি স্রোত এসেছিল- তার মধ্যে যারা উচ্চবর্ণ তাদের কিন্তু কলকাতা শহর এবং তার আশপাশে  জমিদারদের কাছ থেকে জমি কিনে প্রায় ২৫০ টা কলোনি বানিয়ে সরকারি উদ্যোগে বসবাসের সুন্দর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছিল।
আপনাদের অনেকের জানা আছে পশ্চিমবঙ্গে সর্বপ্রথম যে ‘জবরদখল’ কলোনি বসে তাঁর নাম বিজয়গড়। কলকাতা শহর এবং তার আশপাশে তাদের দেখিয়ে দেয়া পথ ধরে আরও ২৫০টা কলোনি স্থাপন করা হয় সেই সময়ে। এসব কলোনি স্থাপনার পূর্বশর্ত থাকে এই যে, কলোনিগুলো হবে ভদ্রলোকদের বাসস্থান। এখানে কোনো ‘ছোটলোক’ জায়গা পাবে না। এখানকার বাঙালিরা খুব চালাক। বিহারে বা ইউপিতে যেমন কোনো মানুষের পরিচয় দেবার আগে তাঁর জাত বলা হয়, ‘হামারে গাঁওমে এক আদমি রহে জাতকে চামার’ বাঙলায় তেমনটা করা হয় না। তাঁরা কাওরা, বাগদী, জেলে, মালো- সবার জন্য একটা নতুন নাম প্রচলন করে নিয়েছে- ‘ছোটলোক’। তাই এখানে অনেক লোককে বলতে শোনা যায় ‘আমাদের এখানে কোনো জাতপাত নেই’। জাত নেই কিন্তু ছোটলোক-ভদ্দরলোক আছে। ছোটলোক মানে যে গরীব, শিক্ষাহীন, মাটিরঘর বা বস্তিতে থাকে, ময়লা জামা-কাপড়, পেটভরে খেতে পায় না, গায়ের রঙ কালো, মেহনত মজদুরি করে পেট পালে। না বললেও জানা কথা-  এরা কোনো জাত।  
বলা হয়, বিজয়গড় নাকি পশ্চিমবঙ্গের প্রথম জবরদখল কলোনি। ‘জবরদখল’ বলায়  প্রাণে একটা ‘বীর বীর’ ভাব জাগে, তাই বলে। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, ওই কলোনির যে প্রতিষ্ঠাতা, সেই সন্তোষ দত্ত- তিনি ছিলেন কংগ্রেস দলের নেতা এবং বিধান চন্দ্র রায়ের একজন প্রিয়পাত্র। তিনি গিয়ে বিধান রায়কে বোঝান যে, নিজের চেষ্টায় একদল মানুষ বসতবাটি বানিয়ে নেবে খালি একটু জায়গা চাই। যাদের কথা তিনি বলেন সেই উচ্চবর্ণ বাবুশ্রেণি- তাঁরা কেউ নিম্নবর্ণদের মতো ‘হাতে খোলা পোঁদে মালা’ হয়ে এদেশে আসেনি। বেশ পুঁজিপাটা সাথে করে নিয়েই এসেছে, অনেকে তো ওদেশের চাকরি এদেশে বদল করেও এসেছে। ফলে তাদের একটু থাকার মতো জায়গা পেলেই চলে যাবে, আর সেটা যেন কলকাতা শহরের মধ্যেই হয়। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব তো শহর কলকাতাকেন্দ্রিক। কোনো জায়গায় কলোনি বসাতে চায়, সন্তোষ দত্ত সে কথাও জানান বিধান রায়কে। ওই জায়গাটা আগে ছিল ভূস্বামীদের, যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের শিবির বানাবার জন্য সরকার অধিগ্রহণ করেছিল। ওই জমির মালকানা ছিল সরকারের হাতে। আইনত জমিদারদের কোনো অধিকারই ছিল না ওই জমির উপর। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পরে ওই জমি ফাঁকাই পড়েছিল। সরকার যাকে ইচ্ছা দিতে পারে তাঁর জমি। সেই জমির কথাই সন্তোস দত্ত বলেন বিধান রায়কে। বিধান রায় রাজী হয়ে যান কলোনি স্থাপনায় এবং তিনি নিজে আসেন, আসেন জওহরলাল নেহরু, ত্রিগুণা সেন, মেজর জেনেরেল সত্যব্রত সিং, রাজ্যপাল কাটজু, সরোজিনী নাইডু আরো তাবড় তাবড় সব নেতারা। তাঁরা অভয় দেন- আমরা আছি, থাকো তোমরা, কোনো ভয় নেই। আচ্ছা, যে কলোনিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রদেশের মুখমন্ত্রী মিলিটারি জেনারেল সমর্থন জানান, কার বাপের ক্ষমতা আছে তাকে উচ্ছেদ করে? ফলে ওটাকে ‘জবরদখল কলোনি’ না বলে সরকার দ্বারা সরকারি লোকদের কলোনি বলাই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। এরপর আরও যে ২৫০ টা কলোনি স্থাপিত হয়, আপনারা জেনে অবাক হবেন যে, সেই সব জমি সরকার নগদ দামে কিনে নেয় জমি মালিকদের কাছ থেকে। প্রথমদিকে কিছু কলোনি জোর জবরদস্তি করে বসানো হলেও পরে মালিকরা তাঁর ভালো দামই পেয়ে যায়। ‘সজাতির’ মানুষের জন্য অনেক কিছু করা হয়েছে কিন্তু দলিত দরিদ্র মানুষের জন্য কোনো মানবিক উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কারণ সরকারের নেতা, মন্ত্রী বা সবদলের কর্তাব্যক্তিরা উচ্চবর্ণ। সজাতির মানুষের দুঃখে তাদের বুকে মোচড় মেরেছে, কিন্তু আমাদের অচ্ছুৎ অস্পৃশ্য ‘ছোট জাতের’ মানুষের জন্য ততোটা প্রাণ কাঁদেনি। তাই আমাদের জন্য তারা বাছাই করেছিল বাংলার মূল ভুখণ্ড থেকে বহু দূরের- আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের পাথর-পাহাড় বেষ্টিত প্রায় জলবিহীন ভুমি- দণ্ডকারণ্য।
আমাদের মানুষ সেই ভয়াল বীভৎস দণ্ডকারণ্যের গল্প জানে- তারা রামায়নে পড়েছে। যেখানে ‘অবতার পুরুষ’ রামচন্দ্র গিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছিলেন। তাই তারা সেখানে যেতে ভয় পেল। আমার বাবাকেও ওখানে যেতে বলা হয়েছিল। তিনি রাজি হলেন না। তাই আমাদের ক্যাম্প থেকে নাম কাটা গেল। বন্ধ হয়ে গেল সব রকম সরকারি সহায়তা। এর ফলে আমাদের সংসারে নেমে এলো চরম অনটন-অনাহার। খিদের জ্বালায় বাবা খুঁজতে লাগলেন, যেন কোথাও মজুর খেটে দুবেলার আহার যোগাড় করতে পারেন।
আমরা তখন বাঁকুড়ার রিফিউজি ক্যাম্প ছেড়ে কলকাতা শহরের কাছে ঘোলা দোলতলা নামক এক জায়গায় চলে এসেছি। এখান থেকে কলকাতা শহর সন্নিকটে বলে সেখানে গিয়ে কিছু কাজকর্ম করা যেত। তখন এখানে উচ্চবর্ণ বাবুদের অনেকগুলো কলোনি বসানো হয়েছিল। তাদের ঘরবাড়ি নির্মাণে প্রচুর মজুর লাগতো। তবে সবদিনই কর্মীর তুলনায় কাজের পরিমাণ কম। বাবার সবদিন কাজ হতো না। যেদিন কাজ হতো, বাবুদের কাছ থেকে কিছু পয়সা চেয়ে নিয়ে পাউরুটি আলুরদম কিনে খেতেন। ট্রেনে বিনা টিকিটে আসা যাওয়া, দিনের বেলা ট্রেনে চেকার থাকে বলে আসতে পারতেন না। ফলে যেদিন কাজ হতো না সারাদিন না খেয়ে স্টেশনে পড়ে থাকতে হতো।
এই কারণে বাবার পেটে আলসার হয়ে গেল। পেটের ব্যাথায় শুয়ে শুয়ে কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে থাকলেন। সংসারে নেমে এলো নিত্য অনাহার। আমার একটা বোন না খেতে পেয়ে আমাদের চোখের সামনে মরে গেল। আমার মায়ের পরিধেয় কাপড়খানা পচে গলে ছিড়ে গেল। একটা ছেড়া মশারির টুকরো অঙ্গে জড়িয়ে নিতে হলো। শত দরকারেও তার আর ঘরের বাইরে আসবার মতো বস্ত্র রইলো না।
এরপর আমরা ঘোলা দোলতলা থেকে যাদবপুরে চলে এলাম। মা আর আমার দিদিমাকে বাবুদের বাড়িতে বাসন মাজার কাজে লেগে যেতে হলো। মায়ের মাইনে মাসে দশ টাকা দিদিমার বারো টাকা। ওতে কী করে সবার অন্ন সংস্থান হবে!
বাধ্য হয়ে এই সময় আমি একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে গেলাম, কোথাও কিছু রোজগার করা যায় কি-না, সেই সন্ধানে। কাজ পেলাম এক বাড়িতে ছাগল গরু চড়ানোর। আর একটু বড় হয়ে চায়ের দোকান, হোটেলে টেবিল বয়। এতে যা পয়সা পাই তাতে কি হবে?
তাই একদিন বাংলা ছেড়ে বের হয়ে পড়লাম ভারত ভ্রমণে। এখানে নেই, কিন্তু কোনোখানে তো আছে আমাদের মতো মানুষের বেঁচে বর্তে থাকার স্থান, সেটা খুঁজে দেখতে। সারা ভারতের প্রায় অর্ধেকটা ঘুরেছিলাম আর দেখেছিলাম এক বিচিত্র দেশ আর সে দেশের মানুষকে। দেশের মধ্যেকার দুটো দেশকে। একটা ভারত আর একটা ইন্ডিয়া। ইন্ডিয়ায় যারা বাস করে তাদের নাম- হ্যাভ। সব কিছু আছে তাদের। আর যারা ভারতের বাসিন্দা তাদের নাম- হ্যাভ নটস। কোনো কিছু যাদের নাগালে নেই।
এই দেশে আমাকে বাচ্চা পেয়ে, অসহায় পেয়ে- যে যতটুকু সুযোগ পেয়েছে, নির্মম নির্দয়ভাবে ঠকিয়ে নিয়েছে, বঞ্চিত করেছে আমাকে আমার ন্যায্য পাওনা থেকে।
সেটা ১৯৬৭ সাল- আমি তখন শিলিগুড়িতে এক চায়ের দোকানে কাজ করতাম। তখন সেখানে নকশালবাড়ি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। আমি শিলিগুড়ি শহরে বসেই তার কিছু তাপ-উত্তাপ পেয়েছিলাম। চারদিকের যে আলোড়ন-আলোচনা কথোপকথন তা থেকে ধারণা হয়েছিল, আমি যেরকম ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করছি, ওদের লড়াইও সেই ক্ষুধা, শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে। আমি পারছি না আমার ন্যায্য অধিকার বুঝে নিতে, কিন্তু ওরা সেই বুঝে নেবার লড়াইটাই করছে প্রবলভাবে। এই ভাবনা থেকে আমি আত্মিকভাবে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।
এর কিছুদিন পরে আমি কলকাতা ফিরে আসি। যখন গিয়েছিলাম তখনও ছিল খালি হাত, দু বছরের অক্লান্ত চেষ্টার পরেও হাতে সেই শূন্যতা ছাড়া কিছু ছিল না। কলকাতা ফিরে এসে দেখলাম নকশালবাড়ির আন্দোলন কলকাতার বুকে আছড়ে পড়েছে।
ঘটনাচক্রে আমি সেই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়লাম। আমার জীবন যেভাবে কেটেছে- এই দেশ, সমাজ, মানুষ আমাকে যে যন্ত্রণা দিয়েছে, তাকে সহ্য করে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই পচা-গলা অমানবিক সমাজটাকে বদলাতে চেয়ে কিছু একটা নিশ্চয় করতাম। একে ভেঙে চুড়ে এক নতুন সমাজ নির্মাণ করার জন্য সেদিন না হলেও পরে অবশ্যই আমি নকশাল আন্দোলনে যোগ দিতাম।
আমি যখন ভারত ভ্রমণ করে ১৯৬৯ সালে কলকাতায় ফিরে এলাম- এসে দেখলাম এখানকার যুব সমাজ ভাবতে শুরু করেছে যে ‘নকশালবাড়ির পথই মুক্তির পথ’। শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা দেশের শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী মানুষের সমর্থনে সেই লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমি তখন একদিন কয়েকজন আমার বয়সী ছেলের কাছে নকশালবাড়ির গল্প করেছিলাম। আমি ছিলাম তো শিলিগুড়িতে কিন্তু তাদের কাছে মিথ্যে করে বলেছিলাম  আমি নকশালবাড়িতে গেছি। কানু সান্যাল জঙ্গল সাঁওতালকে দেখেছি। আমার গল্প দ্বারা একটি ছেলে ভীষণ প্রভাবিত হয়ে তৎক্ষণাৎ নকশাল হয়ে গেল। আমরা যেখানে বসেছিলাম আমাদের পেছনে একটা কালী মন্দির ছিল। সেখানে একটা যজ্ঞের কাঠ পড়েছিল। আমাদের সামনে ছিল একটা বড় দেওয়াল। সেই দেওয়ালের এক কোণে লেখা ছিল- সিপিআই (এম)। সেই ছেলেটা আবেগতাড়িত হয়ে সেই লেখার পাশে একটা ‘এল’ বসিয়ে দিলো। ছিল ‘সিপিএম’, ‘এল’ লেখার ফলে হয়ে গেল ‘সিপিআই (এমএল)’। অর্থাৎ নকশাল। পথে যেতে যেতে একজন সেটা দেখে ফেলে সিপিএম পার্টি অফিসে গিয়ে খবর দেয়, নকশালরা তাদের দেয়াল দখল করে নিয়েছে। তখন তারা এসে আমাকে ধরে পার্টি অফিসে নিয়ে যায়। যে লিখেছিল তাকে না ধরে আমাকে ধরার কারণ- সে ছিল অঞ্চলের যুব সমাজের কাছে খুব প্রিয়, খুব ভালো ফুটবল খেলতো। বাপের আলুর বড় আড়ত। আর আমি ছিলাম সবচেয়ে সহজ শিকার। একে তো আমরা এই এলাকার লোক নই। জাতিতে নিম্নবর্ণ, নিঃস্ব বিত্তহীন- ফলে দুর্বল। মা কাজ করে বাবুর বাড়িতে, বাপ রেশন দোকানের মোট বয়, আমি খাটি জনমজুর, চালাই রিকশা। আমাকে মারলে জনমনে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না। অথচ যুব সমাজের কাছে যে বার্তা দেয়া দরকার, তা দেয়া হয়ে যাবে। তাই আমাকে লাইটপোস্টে চোরের মতো বাঁধা হয়, আর খুব পেটানো হয়, খুব চেঁচানো হয়- যে নকশাল করবে তার এই অবস্থা হবে, সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়। তাদের বার বার বলেছিলাম- ‘আমি লিখতে পড়তে জানি না, আমি লিখিনি।’ কিন্তু তাদের কোনো উপায় ছিল না। আমাকে মারধোর করাটা ছিল তাদের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা।
সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত নটা- তিন ঘন্টা ধরে আমাকে থেঁতো করে একটা রিকশায় তুলে দেওয়া হয়- ‘যা এটাকে ফেলে দিয়ে আয়’। ওরা আমাকে মেরে এই লাভ পেল- এলাকায় একটা ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারলো। যুব সমাজের কাছে এই বার্তা গেল- যে নকশালদের সমর্থন করবে, তাকে এই রকম থেঁতো হতে হবে। আর আমার পক্ষে হলো এই যে, যারা সত্যিকারের নকশাল সেই মানুষদের কাছে আমার খবর পৌঁছে গেল। তখন তারা এসে আমার সঙ্গে দেখা করলো। বললো, আমাদের সঙ্গে ঘাঁটিতে চলো। এখানে থাকলে ওরা তোমাকে মেরে ফেলতে পারে। না মরতে চাইলে ওদের পতাকা বহন করতে হবে। মিটিং মিছিলে ভিড় বাড়াতে যেতে হবে। আমার তখন কিছু চিকিৎসারও দরকার ছিল। তাই হেঁটে গেলাম তাদের পেছন পেছন। এটাই ছিল আমার প্রথমদিকে নকশাল আন্দোলনে যুক্ত হবার কার্যকারণ।  
অনেক লড়াই, অনেক আত্মত্যাগ- তবু সমাজকে বদলানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সমাজ আমাদেরই বদলে দিয়েছিল। কয়েকজনকে বানিয়েছে মোড়ের মাথায় ইট-পথরের বেদী, কিছু পঙ্গু-বিকলাঙ্গ, কেউ বা পাগল, মদ্যপ। আর কয়েকজনকে জেল আবাসিক।
সরকারি প্রচারযন্ত্র জনমানসে তাঁদের যে ছবি তৈরি করতে চাইছে, তাঁরা ঠিক তার বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। একদিন সত্যি ইতিহাস লেখা হবে। সেদিন মানুষ আজকের শাসকদের মুখে থুতু ছেটাবে। আর তাঁরা সেই সম্মান পাবেন, যা ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম, বিনয়, বাদল, দীনেশ, মাস্টারদা পান।
মনে রাখা দরকার, যতদিন শোষণ-বঞ্চনা-বুভুক্ষা থাকবে, মানুষ তার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখবে। নকশালবাড়ি সৃষ্টির আগেও মানুষ লড়েছে, পরেও লড়েছে, লড়তে থাকবে। মানুষের যদি মনুষ্যত্ব বিলুপ্ত হয়ে না যায়, সে কোনোদিন অন্যায়-অত্যাচার মেনে নেবে না। সে লড়বেই।
আমি ছিলাম সেই শেষ দলের মানুষ যাদের জেলে যেতে হয়। তবে জেল আমার জীবনে অভিশাপ হয়ে আসেনি, এসেছিল পরম আশীর্বাদ হয়ে। জেলখানায় এসেছিলাম বলেই আমি খানিক অক্ষরজ্ঞান লাভ করতে পেরেছিলাম। যার ফলে আজ দুলাইন লিখতে পারছি। একটা অন্য পরিচয় গড়তে পারছি।
জেলে আমার জীবনে সবচেয়ে মনে রাখার মতো ঘটনা হলো- যিনি আমাকে জেলখানায় লেখাপড়া শেখান, সেই গুরুজি একবার জানালা দিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরি ভবনের কার্নিশে একটা ছোট্ট বটের চারা দেখিয়ে বলেছিলেন, ওখানে কোনো জল নেই, মাটি নেই, তবুও চারাটা বেঁচে আছে কী করে? বেঁচে আছে, কারাবরণ- সে বেঁচে থাকতে চায়। আর যে বেঁচে থাকতে চায়, তাকে মেরে ফেলার মতো ক্ষমতা কারও নেই। সেদিন সেই কথার মানে কতোটা বুঝেছিলাম, তা জানি না। কিন্তু আজ জানি যে, বেঁচে থাকতে চায় সেই দিশায় এগিয়ে চলে, হয়ত তার শারীরিকভাবে বিনষ্ট হতে পারে, কিন্তু তার কর্ম মানুষের মনে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। এটাই ‘জিজীবিষা’ শব্দের সঠিক অর্থ।
এটা সত্যি যে, আমি জেলে না গেলে লেখাপড়া শিখতে পারতাম না। যেভাবে আজ আমি আমার অপমান, অবহেলা, যন্ত্রণার কথা বলি- অক্ষর জ্ঞান না থাকলে তা বলতে পারতাম না। কিন্তু সারাজীবন ধরে যে নরক যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, তা আমাকে চুপ করে থাকতে দিতো না। কোনো না কোনোভাবে সমাজের এই অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একে ধ্বংস বা বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে কিছু না কিছু নিশ্চয় করতাম। সেটার রূপ কেমন হতো তা আমি জানি না। হতে পারে বন্দুক কাঁধে জঙ্গলে থাকতাম। হতে পারে এমন ঘৃণিত, অবহেলিত জীবন বহন করার চাইতে মৃত্যুকে অধিক আপন মনে হতো। কী হতো তা আমি জানি না। তবে এই ব্যবস্থাকে তখনও আমি মেনে নিতাম না, এটা হলফ করে বলতে পারি- এর বিরুদ্ধে আমার প্রহার জারি থাকতো। আমি লেখার মাধ্যমে আজ সেই কাজটাই করে চলেছি। ব্যবস্থা যখন হিংস্র, অসহনীয়, অমানবিক তখন তার বিরুদ্ধে যে আক্রমণ হবে, তাও কঠোর কঠিন হবে। নরম, মোলায়েম হতে পারে না। তাই আমার ভাষা এতো রুক্ষ, এতো কর্কশ। আর আমার এই ভাষা সমস্ত শ্রমজীবী মানুষের মুখের ভাষা। প্রাণের ভাষা। তাই তারা আমাকে এতো ভালোবাসেন। আমি এই লেখার মধ্য দিয়ে কতখানি খ্যাতি-যশ পেলাম, সেটা কোনো বড় ব্যাপার নয়। যদি আমার লেখা ব্যবস্থার গায়ে একটা আঁচরও কাটতে পারে, মনে করবো আমার কলম চালনা সার্থক হয়েছে।
জেল থেকে বের হবার পর আমার পুরাতন পেশা আবার সেই রিকশা চালাতে শুরু করেছিলাম। জেলে তো খাবার জন্য গরম ভাত পাওয়া যেত, থাকার জন্য ছিল পাকাবাড়ি, অসুখ-বিসুখ হলে একেবারে বিনা চিকিৎসায় মরা যেতো না, কিছু সাধারণ চিকিৎসা পাওয়া যেতো। কিন্তু নিরপরাধ গরীব মানুষের জন্য বাইরে তার কোনো ব্যবস্থা রাখা নেই। ওইসব ‘সুখ-সুবিধা’ পেতে হলে কোনো অপরাধ করে- অথবা না করে মাত্র ‘পুলিশের দয়ায়’ জেলে পৌঁছে যেতে হবে। এখন যেন স্বর্গ থেকে বিদায় হয়ে গেছে আমার। এসে পড়েছি বাইরের জগতে। এবার আমার নিজের খাবার নিজে জোগাড় করে খেতে হবে, না জোগাড় করতে পারলে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই নিরুপায় হয়ে আবার ধরলাম রিকশা চালানো। কিন্তু একটা মুশকিল হয়ে গেছে, জেল থেকে বহন করে নিয়ে আসা বই পড়ার নেশা কিছুতেই ছাড়তে পারছি না। পাগলের মতো যে বই সামনে পাই, পড়তে থাকি। ফুটপাতের লাইটপোস্টের নিচে, রেল স্টেশনের বেঞ্চি, রিকশার গদি, গাছতলা যেখানে যখন সময় পাই, বই খুলে বসে যাই। তখন এক বইয়ে একটা শব্দ পেয়েছিলাম- ‘জিজীবিষা’। যার কি অর্থ আমার জানা ছিল না। অথচ অর্থটা জানবার জন্য মনের মধ্যে একটা তাড়না তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় আমার রিকশায় সওয়ারি হয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। আমি ওনাকে চিনতাম না। জানতাম যে উনি জ্যোতিষ রায় কলেজে অধ্যাপনা করেন। আমি তখন উনার কাছে জানতে চেয়েছিলাম ‘জিজীবিষা’ শব্দের অর্থ। তিনি আমার মতো এক সাধারণ রিকশা চালকের মুখে এমন একটা কঠিন শব্দ শুনে অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন- ‘এই শব্দটা তুমি পেলে কোথায়?’ আমার জবাব ছিল- ‘বই থেকে।’ ‘তুমি বই পড়ো? কী বই?’- আবার জানতে চান তিনি। আমি বলি, ‘যখন যা হাতের কাছে পাই। গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী- সব।’ তখন আমার পড়া গোটা দশেক বইয়ের নাম বলেছিলাম। কে জানতো যে, সেই তালিকায় উনার লেখা চার অথবা পাঁচটি বইও আছে। আর যখন আমি এসব বলছি, তখনও আমার রিকাশার গদির নিচে রাখা আছে ওনার বই অগ্নিগর্ভ। ওটাই আমি খানিক আগে পড়ছিলাম। এরপর উনি আমাকে বলেন, ‘আমার একটা পত্রিকা বের হয়- বর্তিকা। যাতে তোমার মতো সাধারণ মানুষ লেখে। তুমি কী তোমার কথা লিখবে? লিখলে আমি ছাপাবো। আমি তখনও কিছু লিখিনি। তাই বলেছিলাম- আপনার ঠিকানা দিয়ে যান। যদি লিখতে পারি, আপনার ওখানে গিয়ে দিয়ে আসবো। উনি একটা চিরকুটে ঠিকানা লিখে আমার হাতে দেন। তখনই জানতে পারি ইনি সেই বিখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী। এরপর বহুচেষ্টায় আমি একটা লেখা তৈরি করতে পারি। লেখাটা বর্তিকায় ছাপার পর সেটা নিয়ে যুগান্তর পত্রিকায় রিভিউ হয়। ফলে বাংলার মানুষের দৃষ্টি আমার উপর এসে পড়ে। নিত্য-নতুন পত্রিকা থেকে লেখা চাওয়া হতে থাকে। আর আমি লিখতে থাকি। লিখতে লিখতে দেখলাম কখন যেন ‘লেখোয়াড়’ হয়ে গেছি।
আমি যা লিখি তাতে রাজনীতি এসেই যায়, আবার অনেকটা ভেবে-চিন্তে রাজনীতি ব্যাপারটাকে লেখায় প্রধান্য দিই। কারণ এই সমাজকে পরিবর্তন না করে মানুষের সামনে বাঁচার কোনো পথ নেই। সমাজ পরিবর্তন করতে হলে সমাজের যে মুখ্য চালিকা শক্তি সেই রাজনৈতিক শক্তিকে অধিকার করতেই হবে। যদি সেটা না পারা যায় কোনোভাবেই সমাজ পরিবর্তন সম্ভব হবে না। আমি আমার লেখায়, বলায়, যেখানে সুযোগ পাই মানবিক রাজনীতির নামে যে অমানবিক-শোষণবাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা চলছে তার উপর প্রহার করে থাকি। এটাই আমার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
অনেক সময় মঞ্চে বসে আমার এমন মনে হয়েছে- উদ্যোক্তারা মানুষের কাছে এমন একটা বার্তাই দিতে চান- সেই কারণেই আমাকে এখানে আনা হয়েছে- ‘দেখো, এই একটা কাঁকের বাচ্চা। কিন্তু এই কাঁকটা কোকিলের মতো ডাকতে পারে। সে ডাক মাঝে মাঝে কোকিলের চেয়ে মধুর হয়ে যায়।’
আমি যে জাতিতে একজন দলিত এবং দরিদ্র সে আজ কারো কোনো সহযোগিতা ছাড়া এই জায়গায় এটাই তাদের কাছে। বিস্ময় অবশ্যই আমি দলিত, এটা বলতে আমার কোনো লজ্জা নেই। মানুষের উপর হাজার বছর- সেই মনুসংহিতার কাল থেকে যে অন্যায় অত্যাচার দমন-দলন হয়ে চলেছে, মানুষ তার বিরুদ্ধে সেই সময়ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলন সংঘটিত করেছে, আর আজও করে চলেছে। আমি সেই আন্দোলনের একজন সৈনিক তো বটেই।
আজকে শিক্ষার হার কিছু বৃদ্ধি হয়েছে, নানাভাবে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে- অবশ্যই এর জন্য দলিত সমাজের বহু মানুষের বহু অবদান, ত্যাগ স্বীকার, কৃচ্ছ সাধন রয়েছে, তাই আজকের দিনে দলিতদের মধ্য থেকে প্রতিবাদী কণ্ঠ অনেক সোচ্চার হয়ে সামনে আসছে। আমার এই সাহিত্য চর্চা, এটাও সেই প্রতিবাদ আন্দোলনের একটা ফসল।
মনে রাখা দরকার যে, দলিত সাহিত্য একাধারে যেমন সাহিত্য- তেমন এটা একটা আন্দোলনও বটে। সাহিত্য সেই প্রতিবাদ আন্দোলনকে খানিক শক্তি যোগাচ্ছে, আবার আন্দোলনও সাহিত্যের অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করছে। বিচ্ছিন্ন বা আলাদা নয়- দুটোকে একে-অপরের পরিপূরক বলা চলে। আর দুয়ের যোগফলে সমাজে কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ সূচিত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, বাবা সাহেব আম্বেদকার যাকে দলিত বলে চিহ্নিত করেছেন, কার্ল মার্ক্সের ভাষায় তারাই প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা। রণাঙ্গন দুই, কিন্তু শত্রু সেই একই।
আমার কল্পনার জগতে অবস্থিত এমন এক দেশ, সমাজ- যেখানে সব মানুষ শিশুর মতো সরল। যে সমাজে চোর নেই, ভিখারি নেই, বেশ্যা নেই, ধনী-দরিদ্র নেই। মিথ্যা কথা কী করে বলতে হয় কেউই জানে না। নারী-পুরুষ সবার সেই সমাজে সমান অধিকার। কেউ কাউকে দমন-দলন-পীড়ন করে না। শাসক নেই, শাসিত নেই- শোষক নেই, শোষিত নেই, দলক নেই, দলিত নেই। সেই যে এক কবি বলে গেছেন- ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’। যেমন এক সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি আমি। বিশ্বাস করি, তেমন এক স্বদেশ একদিন আসবেই। আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা- যাকে আপনি পুঁজিবাদী বা ব্রাহ্মণ্যবাদী, যে কোনো নামে ডাকতে পারেন, তাতে কোনো ভুল হবে না। কিছু ধূর্ত মানুষের কূট-কৌশলে এমনভাবে বিনির্মিত হয়েছে, যাতে অতি অল্পকিছু মানুষকে ভালো রাখার জন্য অনেক মানুষকে খারাপ, ভীষণ খারাপ থাকতে হবে। ব্রাহ্মণ্যবাদ বা পুঁজিবাদ এ দেশে এমন ব্যবস্থাই কায়েম করেছে। আচ্ছা, আপনি আমি সবাই তো পৃথিবীতে একই রকমভাবে এসেছি। আসবার সময় তো কেউ কিছু সাথে করে নিয়ে আসিনি। তাহলে এখানে একদল মানুষ এমন নিঃস্ব রিক্ত- দুবেলা দুমুঠো খাবার মতো অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থাও নেই, আর একদল টাকার পাহাড়ের উপর বসে আছে- এটা কেমন করে হলো?
আমাদের কিছু ধর্মগুরু বোঝান যে, এটা তাদের পূর্বজন্মের পরম সুকৃতির ফল। তাহলে সে জন্ম নেবার সময় সেই ফল সাথে করে নিয়ে এলো না কেন? ভগবান কেন তখনই তাকে দিয়ে দিলো না? একমাত্র বোকা যারা, তাঁরা জানে না- যারা একটু সমাজবিজ্ঞান নিয়ে ঘাটাঘাটি করে সবাই জানে- এই টাকার পাহাড় তাঁরা মানুষকে ঠকিয়ে বঞ্চিত করে তবেই জমা করেছে। সে, না হয় তাঁর বাপ ঠাকুরদা, কেউ না কেউ মানুষকে না ঠকালে যা কখনোই জমতো না।
আপনারা যদি ছত্তিশগড়ের দূর-দুর্গম কোনো আদিবাসী গ্রামে যান, যেখানে এখনও সভ্য জগত থাবা বসাতে পারেনি। তো দেখবেন, সেখানে কোনো কুড়িতলা বাড়ি যেমন নেই, কেউ ফুটপাতে, গাছতলায় বাস করে না। হাজার বিঘে জমিও কারও নেই, তাই ভূমিহীন ক্ষেতমজুর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। একজন সেখানে চৌষট্টি ব্যঞ্জন দিয়ে যেমন উদরপূর্তি করে না, তেমন অনাহারেও কেউ থাকে না। সেখানে সুখ-দুঃখ সব সবাই সমানভাবে উপভোগ করে। প্রতারক নেই, তাই বঞ্চিতও নেই। এসব পাবেন আমাদের এই সমাজে- যেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ, পুঁজিবাদ বড় নির্লজ্জভাবে তাঁর দাঁত-নখ বসাতে পেরেছে।
ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র পনেরো ভাগ লোক দেশের পঁচাত্তর ভাগ জমি-ভূমি-সম্পদ দখল করে রেখেছে। আপনি যদি খোঁজ নেন, তো দেখবেন- তারা জাতি-বর্ণ পরিচয়ে সব উচ্চবর্ণ। আর পঁচাশি ভাগ মানুষের হাতে আছে মাত্র পঁচিশভাগ সম্পদ। যদি তাদের জাতি-বর্ণ পরিচয় তালাশ করেন, তো দেখবেন- তারা সবাই কাওড়া বাগদী নম, পোঁদ, জেলে, মাল রাজবংশী সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ- এক কথায় নিম্নবর্ণ-দলিত। তারাই কৃষক, মজুর।
সম্পদশালীদের সবার সবচেয়ে উপরে আছে মাত্র আশিটি পরিবার। এদের মধ্যে একমাত্র টাটারা বাদে আর সবাই উঁচুজাত। তাই আপনি যদি কার্ল মার্ক্স বর্ণিত শ্রেণিসংগ্রাম বা আম্মেদকার বর্ণিত দলিতসংগ্রাম- যেটাই সঞ্চালিত করতে চান- নামটাই শুধু বদলে যাবে, মানুষগুলো কিন্তু বদলাবে না। এদিকে বা ওদিকে পাবেন- সেই একই মানুষ। বলছি আশি পরিবার, সে জায়গায় হয়তো দুটো বাড়বে বা দুটো কমতে পারে। তবে তাতে মূল বক্তব্যের কোনো হেরফের ঘটবে না। আপনি আমি কল্পনা করতে পারবো না, কি বিশাল তাদের ধনসম্পদ এই দেশের সমাজব্যবস্থা অতি ধূর্ততার সাথে সেভাবেই গঠন করে রাখা হয়েছে। যেন বহু মানুষ নিঃস্ব, রিক্ত, হতদরিদ্র হয়ে থাকে। খারাপ থেকে প্রতিদিন তাদের অবস্থা খারাপতর হতে থাকে। তাহলেই আর একদল মানুষের পুঁজি ফুলে-ফেঁপে পাহাড় সমান হয়ে উঠবে।
ব্রাহ্মণ্যবাদ বা পুঁজিবাদ আসলে একটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু দুটোর কাজ একই- অনেক মানুষকে খারাপ অবস্থায় রাখা। সেটা হয়ে থাকে দুরকমভাবে- এক, তাদের আখের মতো ছিবড়ে খাটিয়ে নিয়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত রাখা- যাতে তাঁরা চিরকাল গরীবই থেকে যান। পুষ্টিকর আহার না পেয়ে রুগ্ন দুর্বল হয়ে থাকে। যথোপযুক্ত ব্যয়বহুল শিক্ষা, চিকিৎসা কিনতে না পারে। না খাওয়া মানুষ মানসিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে, ভেঙে বেঁকে নুয়ে যায়, পদানত হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। মাথা তুলে কোনদিন দাঁড়াতে না পারে। এটা তাঁরা জানে। তাই তাঁরা মানুষকে না খাইয়ে রাখে। পুঁজিপতিরা যেমন মানুষকে আইনের ভয়, সংবিধান এসব দেখিয়ে দমন-দলন-শোষণ করে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রাখে, ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তেমনটা করে পূর্বজন্ম পরজন্মের ভয়, পাপ-পূণ্য এইসব কিছু আজগুবি গল্প শুনিয়ে- মানুষকে ভীত ত্রস্ত করে, পুজাপাঠ মন্ত্রতন্ত্রের নামে। হাজার হাজার বছর ধরে এই অপকর্ম করে আসার পিছনে আছে আঁটোসাটো বর্ণবাদী সমাজ কাঠামো। যাকে উচ্চবর্ণরা টিকিয়ে রাখতে চায় এবং তাঁরা তা দীর্ঘকাল ধরে রাখতে সমর্থও হয়েছে।
বহু মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ যখন মানুষ কিছু যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক আর সমাজ সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করেছে ব্রাহ্মণ্যবাদ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন সংঘটিত করছে, তখনই সেই মানবতার শত্রুরা মানুষে মানুষে বিভেদ অনৈক্য আর দাঙ্গা বাঁধাবার চক্রান্ত শুরু করে দিয়েছে। ভয়ানক এক অরাজক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশ আর দেশের মানুষকে। পায়ে পায়ে দেশের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে সেই পরিস্থিতি। আবার লাশের পাহাড় জমবে। বহু মায়ের কোল খালি হবে, বহু সন্তান হবে অনাথ অভিবাবক শূন্য, বহু নারী স্বামীহারা হবে। মানুষে মানুষে লড়িয়ে দেবার দাবার চাল সম্পূর্ণ হয়েছে- খাদ্য নাই, বস্ত্র নাই, শিক্ষা নাই, বাসস্থান নাই, চিকিৎসা নাই, বেকার সমস্যা আকাশচুম্বী, দ্রব্যমূল্য নাগালের বাইরে- ভুলিয়ে দেওয়া গেছে সে সব সমস্যা। এবার রাম বড় না রহিম, সেই নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের গলা কাটবে, মুসলমান হিন্দুর গলা কাটবে। এই উপমহাদেশের যেন এটাই ভবিতব্য হয়ে আসছে।
দোষ ওদের নয়, হাজার বছর ধরে যে বিষবৃক্ষ লালন-পালন-পোষণ করা হয়েছে আজ মানবতার শত্রুরা সেই বৃক্ষে খানিক হাওয়া দিচ্ছে- লাভবান হচ্ছে। আর অক্সিজেনের বদলে সেই বৃক্ষ বাতাসে মেশাচ্ছে প্রাণঘাতী মারণবিষ। এই বিষের নাম ধর্ম, জাত, সম্প্রদায়। যতদিন মানুষ নিজেকে মানুষ না ভেবে হিন্দু-মুসলমান এইভাবে বিভাজন করে রাখবে, কারও ক্ষমতা নেই দাঙ্গা প্রতিরোধ করার। রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থে মানুষকে উসকে তুলবে আর যেখানে যার সংখ্যাধিক্য, ক্ষমতা বেশি- সে অন্য ধর্মের দুর্বলদের উপর হত্যা, ধর্ষণ, অত্যাচার করবেই। কারণ কোনো ধর্মই মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় না, শেখায় হিংসা-দ্বেষ-বৈরিতা। শেখায় অন্যের চাইতে নিজেকে উৎকৃষ্ট, উন্নত, মহৎ, শ্রেষ্ঠ ভাবতে। আর এখান থেকেই সূত্রপাত হয় একের সঙ্গে অপরের হানাহানি খুনোখুনি। কাজেই মানুষ যতদিন ধর্ম আঁকড়ে থাকবে, যতক্ষণ নিজেকে মহান অন্যকে নিকৃষ্ট ভাববে, কিছুতেই রক্তপাত বন্ধ হবে না। ভারতে হিন্দু বেশি- তাঁরা মারবে মুসলমানদের, তবে কুড়ি কোটির চেয়েও বেশি মুসলমান ছাগল-ভেড়ার মতো তো মরবে না, মরার আগে হিন্দুদেরও কুড়ি কোটিকে মেরে রেখে যাবে। আবার সেই দাঙ্গা-হত্যার বদলা নিতে প্রতিবেশী মুসলমান প্রধান দেশগুলোয় মুসলমানরা মারবে ওদেশের হিন্দুদের। ব্যাপক প্রাণহানি হবে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের লোকের। আজ যারা অন্য ধর্মের লোকের গলা কাটার জন্য আহ্লাদে ডগমগ, সে জানে না, অন্যের গলা কাটার আগে তাঁর গলাটা নেমে যেতে পারে। যারা তাদের উসকে দিচ্ছে, তাঁরা তখন থাকবে পুলিশি পাহারারম, নিñিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে। কিন্তু তোমাকে নিত্য দিনকার রুজি-রোজগার, পেটের তাড়নায় পথে নামতে হবে। তোমাকে কেউ পাহারা দেবে না। কোনদিক থেকে কে তোমার দিকে চাকু হাতে ধেয়ে আসবে, তা তোমার অজানা। তাই বন্ধু হে, বেশি উৎফুল্ল হয়ো না। রাজনৈতিক খেলায় দাবার বোড়ে হয়ো না। পারলে কে তোমার আসল শত্রু, কে তোমার মুখের অন্ন কেড়ে নেবার ষড়যন্ত্র করছে, তাকে শনাক্ত করো। লড়ার যদি খুব শখ থাকে তো তাদের বিরুদ্ধে লড়ো। না পারলে শান্ত হয়ে ঘরে বসে থাকো। হাজার হাজার মানুষের আত্মত্যাগ বহু কষ্ট স্বীকারের মধ্য দিয়ে মেহনতি মানুষের যে সংগ্রাম গড়ে উঠেছে, তাকে যারা স্তব্ধ করে দেবার শয়তানী খেলায় মত্ত, তাদের হাতে হাত রেখে নিজের ক্ষতি করতে চেও না। পাগলেও নিজের ভালো বোঝে। তুমি যদি না বোঝো, আগামী দিন তোমার জন্য ভীষণ ভয়ংকর।

Disconnect