ফনেটিক ইউনিজয়
জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি
কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ
গৌতম রায়

গত সংখ্যার পর
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবুল কাশেম কেবল বাংলাতেই নয়, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশ শতকের সূচনাপর্বে যে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছিলেন তাকে আরো প্রলম্বিত করে আতিকুল্লাহকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে তুলে ধরতে তাঁর আন্তরিকতা এবং উদ্যম ছিল। হিন্দু সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা প্রসূত ইতিহাসবিদরা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমান সমাজের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে খাটো করে ইতিহাসের একটা সাম্প্রদায়িক চিত্র তুলে ধরতে চায়। এই অপচেষ্টার জবাবে সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ পরিবারের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং অবদান একটি মোক্ষম জবাব।
যে সময়ে তিনি ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছেন সেই সময়ে তাঁর দাদামশাই আবুল কাশেম ছিলেন অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেসের একজন অতি বিশিষ্ট নেতা। গোটা বাংলার নেতা হলেও গোটা বর্ধমান জেলা ও শহরকে আবুল কাশেম একটি দিনের জন্যেও অবহেলা করেননি। বর্ধমান শহরে সেদিনের সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা এবং স্থানীয় রাজতন্ত্রের সামন্ততান্ত্রিক পরিকাঠামোর  ভেতরেও তুলনা করা হতো বর্ধমান রাজ্যের সঙ্গে। দাদামশাইয়ের এই জনপ্রিয়তার দিকটি কিন্তু তিনি ছাত্র জীবনের শুরু থেকেই পরম যতেœর সঙ্গে অনুশীলন করবার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তীতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সারির নেতা, ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্বদান, পাকিস্তানি পুলিশের হাতে ধরা পড়া, রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে পাকিস্তানি পুলিশের চরম অত্যাচার সহ্য করা, পাকিস্তানি পুলিশের গুলি খাওয়া থেকে শুরু করে, হাইকোর্টের দুঁদে আইনজীবী কিংবা সদ্য ক্ষমতায় আসা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে সুনীতি চট্টরাজ, রেণুলীনা সুব্বার মতো বেগ দেয়া বিরোধী বিধায়কদের সামাল দেওয়া স্পিকার বা পরবর্তীতে রাজ্যের আইন ও বিচার মন্ত্রী সব জায়গাতেই এই জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন একজন অবিসংবাদিত কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ব।
এক বিশেষ পারিবারিক আভিজাত্যের ভেতরে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, বর্ধমান টাউন স্কুলে, পরে স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তারপর মাত্র আঠারো বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান (১৯৩৫ সালে) করেন।  তারও আগে ১৯৩১  সালে কিশোর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন, ১৯৩৩ সালে দাদা   সৈয়দ শাহেদুল্লাহর সঙ্গে কৃষক সম্মেলনে যোগদান করেন। এই সময়েই সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি কলকাতায় একটি শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। পারিবারিক আভিজাত্যের একটা চরম অধিষ্ঠান থেকে যথার্থ ডিক্লাসড হওয়ার যে উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছিলেন তার সঙ্গে বুঝি তুলনা চলে তাঁরই বর্ধমান জেলার আর এক সহযোদ্ধা হরেকৃষ্ণ কোঙারের সঙ্গে। যাঁর সঙ্গে এই ডিক্লাসড প্রলেতারিয়েত কথ্যরীতিতেও একটা আশ্চর্য মিল ছিল তাঁর। তাই অশোক মিত্রর বহুচর্চিত বাক্যবন্ধÑ ‘আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট’ বোধহয় যথার্থই সার্থক হয়ে উঠেছিল তাঁর ভেতরে। কথার শব্দশৈলিতে কেতাদুরস্ততাতে সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ অভ্যস্থ ছিলেন না। কৃষক আন্দোলনের অভিজ্ঞতার নিরিখেই হয়তো শহুরে কথায় একটু বেমানান শব্দ ব্যবহারেই আঞ্চলিক কথাবার্তাতে তিনি অভ্যস্থ ছিলেন। আজকের দিনে তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো মিসেস গ্রান্ডির দল তাঁর আঞ্চলিক কথাবার্তা বা জনসভার বক্তৃতাকে চিহ্নিত করতো ‘ভাষা সন্ত্রাস’ হিসেবে।
মজার কথা হলো শহুরে কথাদস্তুর কলমচিদের কাছে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের ‘গ্রাম্যতার সংস্কৃতি’ যে একেবারেই অজানা, অচেনা একটি বিষয়। অথচ বিগত শতকের চার, পাঁচের দশক থেকে শুরু করে তাঁর জীবনাবসানের দশক অতিক্রম করে এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও সেটাই ‘গ্রাম্যতার সংস্কৃতি’, সেটাই প্রলেতারিয়েতের ভাষা। তাই জীবন-যাপনের সবক্ষেত্রে কমিউনিস্ট ভাবধারাকে নিজের জীবনে আত্মস্থ করে সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ হয়ে উঠেছিলেন একজন যথার্থ জীবনশিল্পী প্রলেতারিয়েত, যথার্থ কমিউনিস্ট। এমন একজন নিবেদিত প্রাণ সর্বহারা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় তাঁর আগে কখনো দেখা যায়নি আর আগামীতেও কোনোদিন দেখা যাবে না- এমন প্রত্যশা ক্ষীণ।
তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় ১৯৭৭ সালের বিধানসভায় তৎকালীন বিরোধীদল কংগ্রেসের সাংসদ সুনীতি চট্টরাজের গামছা পড়ে অধিবেশন কক্ষে ঢোকা বা গোর্খা লীগের রেণুলীনা সুব্বার মতো সাসপেন্ড হওয়া সদস্য বিধানসভা ভবনের গেট টপকে ঢোকা-  এই ধরনের অসংসদীয় আচরণের নিরিখে বিধানসভার স্পিকার হিসেবে তাঁর যে ঐতিহাসিক অবদান, তার কোনো সঠিক মূল্যায়নও হয়নি, সেই অবদান নিয়ে প্রচার বা চর্চাও বিন্দুমাত্র হয়নি। অথচ স্বাধীন ভারতের আইনসভার স্পিকার হিসেবে সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহর সঙ্গে একমাত্র তুলনা চলে প্রথম লোকসভার কিংবদন্তী স্পিকার গণেশ বাসুদেব মবলঙ্কারের। জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে মবলঙ্কারকে যে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, সংসদে তাঁর নামে হল আছে, কিন্তু স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সবথেকে উজ্জ্বল স্পিকার সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহকে তেমন কিছু করা হয়নি। অবিভক্ত বাংলার  স্পিকার চৌধুরী নওশের আলীর নামে কক্ষ আছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতে কিন্তু  শৈল মুখার্জী থেকে শুরু করে অপূর্বলাল মজুমদার, এমন কি বামফ্রন্টের আমলে সবথেকে বেশি প্রচার মাধ্যমের আলো পাওয়া স্পিকার হাসিম আবদুল হালিমের থেকেও সঙ্কট ও সমস্যাবহুল পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সুচারুভাবে বিধানসভা পরিচালনা করা স্পিকার সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাবার কোনো ব্যবস্থা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতে চোখে পড়ে না।
তাঁর আর একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তাঁর যথার্থ ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সম্যক বিকাশে তাঁর কমিউনিস্ট রাজনৈতিক চরিত্র বিশেষ ভূমিকা পালন করলেও তাঁর মননলোকের বেলাভূমিতে অতি শৈশবে এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল তাঁর পারিবারিক পরিবেশ। তাঁর বাড়ির কিছু মানুষজনের ভেতরে ধর্মীয় আচার-আচরণ ছিল। তা বলে ধর্মীয় আন্দোলনের বিন্দুমাত্র প্রভাব তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডলে ছিল না। তারপর কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিবেশের সঙ্গে চিন্তা চেতনার সাযুজ্য স্থাপন করা তাঁর পক্ষে অপেক্ষাকৃত অনেকখানি সহজ হয়েছিল। এখানে এই ‘অপেক্ষাকৃত’ শব্দটি এই কারণে ব্যবহার করা হলো যে, তাঁর অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ কমিউনিস্ট মননভূমি পরিনির্মাণের ক্ষেত্রে সময়কে বিচারের প্রশ্নে আমরা যেন বিংশ শতাব্দীর চার, পাঁচের দশকের পটভূমিকাকে ভুলে না যাই।
নোয়াখালীর দাঙ্গার আগুন গোটা বাংলাতে ছড়াতে পারেনি তেভাগার উত্তাপে। এই তেভাগার উত্তাপ নির্মাণে কমিউনিস্ট পার্টি তথা অবিভক্ত বাংলার  কৃষক সভার সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহর অবদান ছিল ঐতিহাসিক। প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে তৎকালীন রাজশাহীর নাচোল থানাতে ইলা মিত্রের উপর পাকিস্তানি পুলিশের বর্বরতা সর্বজনবিদিত। অথচ কৃষক সভার এ নেত্রী রংপুরের রেখা চৌধুরী (দেশহিতৈষী পত্রিকার প্রয়াত প্রবীণ সাংবাদিক কলকাতার অরুণ চৌধুরীর পত্নী) উপর পাকিস্তানিদের বীভৎস অত্যাচার এবং তেভাগা আন্দোলন উত্তরবঙ্গে কৃষকসভার ছত্রছায়াতে সংগঠিত করতে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানের কথা কয়েকজন গবেষক ছাড়া ক’জন জানেন? তেমনই বলতে হয় ইলা মিত্র থেকে কংসারী হালদার কিংবা অহল্যা, এঁদের প্রত্যেকের লড়াই, সংগ্রাম, ত্যাগের পিছনে কৃষক সভার সম্পাদক হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আত্মগোপন করে ও সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহর নেতৃত্বে গোটা তেভাগা আন্দোলন পরিচালনার কথা ক’জন জানেন? ক’জন কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসকার সেকথা তাঁদের চর্চার ভেতরে নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে পরিবেশন করেন?
ছেচল্লিশের দাঙ্গা গোটা বাংলায় ছড়াতে পারেনি তার সবথেকে বড় কৃতিত্ব ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের। সেই কৃতিত্বের সোপান নির্মিত হয়েছিল, ‘লাঙ্গল যার জমি তার’- এই ঐতিহাসিক স্লোগানের নেতৃত্বদানকারী কৃষক সভার অবিভক্ত বাংলার সম্পাদক সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহর। পাকিস্তানি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অকথ্য অত্যাচার তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল। ইলা মিত্রের উপর অকথ্য অত্যাচার করেছিল নুরুল আমীনের পুলিশ (অপরাধী নুরুল আমীন, অপরাধী তাহার ই পুলিশ- গোলাম কুদ্দুসের ‘ইলা মিত্র’ কবিতা)। সেই বীভৎসতা নিয়ে সেলিনা হোসেন উপন্যাস লিখেছেন ‘কাঁটাতারে প্রজাপতি’। মালেকা বেগম গ্রন্থ রচনা করেছেন ‘ইলা মিত্র’। সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ তেভাগা আন্দোলনের শীর্ষ নেতা হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ধরা পড়লেন। তাঁকে রাখা হলো রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে। সেখানে মূলত তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যেই বেপরোয়া গুলি চালালো নুরুল আমীনের পুলিশ। মারাত্মক আহত হলেন তিনি। আমৃত্যু তাঁর পায়ে গুলি বিঁধে ছিল। সেলিনা হোসেন তাঁর তিন খণ্ডের উপন্যাস ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ তে এই খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি চলার কথা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হলেন। যেমন অলিখিতই থেকে গেল কৃষক নেত্রী রেখা চৌধুরীর ঐতিহাসিক অবদানের কথা, তেমনই সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহর তেভাগা আন্দোলনে চে গুয়েভরার মতো রোমাঞ্চকর ভূমিকা এবং অবদানের কথাও অলিখিত থেকে গেল।
পরবর্তীতে রাজ্যের আইনমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক অবদান ভারতীয় সংবিধানের বঙ্গানুবাদ প্রকাশের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করা। ভাবতেও অবাক লাগে তাঁর আগে কতো বিশিষ্ট মানুষ পশ্চিমবঙ্গের আইন ও বিচার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের ভেতরে কি একজনও অনুভব করেননি ভারতের সংবিধানের বাংলা অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা আছে? তিনি না থাকলে আজও ভারতীয় সংবিধানের বঙ্গানুবাদ হতো কি না কে জানে! বিস্মৃতির অতল গর্ভ থেকে বেগম রোকেয়াকে পুনরুদ্ধার করে এপার বাংলায় নবরূপে রোকেয়া চর্চার পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। রোকেয়ার স্বপ্নের নারী একদিন ‘অবরোধবাসিনী’র অবগুণ্ঠন খুলে সম্পূর্ণ আকাশের নিচে এসে দাঁড়াবে এই স্বপ্ন দেখতেন তিনি। শেষ জীবনে শিক্ষা নিয়ে নিজের যন্ত্রণার কথা ব্যক্ত করতে কলম ধরেছিলেন ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকাতে। তাঁর সেইসব মহামূল্যবান প্রবন্ধগুলো তাঁর জীবদ্দশাতেই ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার সুযোগ্য সম্পাদক আবদুর রউফের ব্যবস্থাপনাতে ‘আধুনিক তোতাকাহিনী’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ সম্পর্কেও মার্ক্সীয় চেতনার আলোকে ইংরেজিতে একটি ছোট বই জীবনের একদম শেষপর্বে তিনি রচনা করেছিলেন। (সমাপ্ত)
 লেখক : ইতিহাসবিদ, কলকাতা

আরো খবর

Disconnect