ফনেটিক ইউনিজয়
পানি না দিলেও করিডোর চায় ভারত
আলতাফ পারভেজ

বাংলাদেশ-ভারত বহুল আলোচিত তিস্তা পানিচুক্তি সহসা হচ্ছে না। কারণ তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশন নতুন করে সমীক্ষা শুরু করেছে। কলকাতায় জল সংরক্ষণ বিষয়ক এক সেমিনারে এ তথ্য জানিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান অশ্বিন পান্ডে। কলকাতার গণমাধ্যম তিস্তায় নতুন এ সমীক্ষাকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিরাট বিজয়’ হিসেবে দেখাচ্ছে। কারণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্থানীয় বিজেপির নেতৃবৃন্দ প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছেন- তিস্তায় বাংলাদেশকে দেওয়ার মতো ‘বাড়তি জল’ নেই এবং নতুন সমীক্ষা ছাড়া কোনো মতেই বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার প্রবাহ নিয়ে কোনো চুক্তি করা যাবে না।
২০১১-এর সেপ্টেম্বরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মমতাকে দায়ী করে, তাঁর এরকম একগুঁয়েমিকে অগ্রাহ্য করার হুমকি দিলেও এখন নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন সমীক্ষা শেষেই কেবল ভারত সিদ্ধান্ত নেবে তিস্তার প্রবাহে ‘বাড়তি জল’ আছে কি না এবং বাংলাদেশকে আদৌ কোনো জল দেওয়া যায় কি না। তিস্তার প্রবাহ নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন এই দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ পড়েছে জল কমিশনের চেয়ারম্যান অশ্বিন পান্ডের বক্তব্যে। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে কলকাতায় রাজ্যের সেচ ও পানিপথমন্ত্রী রাজিব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের কতটা জল দরকার, বাংলাদেশের কতটা জল দরকার- তা প্রথমে নির্ণয় করা দরকার। এর জন্য কারিগরী ও আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা প্রয়োজন। সেই কাজ শুরু হলো।’
ভারতের নতুন এই কৌশলে বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বিস্মিত- কারণ সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া বিনিময়ের পর এখন নতুন সমীক্ষার কথা বলা হচ্ছে- যা পুরানো অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার কৌশল হিসেবে দেখছে তারা। তাদের শঙ্কা সমীক্ষার আগে যেমন তিস্তার পানি নিয়ে আর কোনো চুক্তি হবে না- তেমনি সমীক্ষার পরও ভারত এমন এক প্রস্তাব দেবে যা বাংলাদেশের তরফ থেকে চুক্তি স্বাক্ষর দুরূহ করে তুলবে। এদিকে, যদিও দুটি দেশের সরকারই এ মুহূর্তে গভীর বন্ধুত্বের অভিনয় করছে কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অমিমাংসিত সমস্যার তালিকা মোটেই কমছে না। বিশেষ করে স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান করতে না পেরে শেখ হাসিনা ও মনমোহন সিংয়ের সরকার প্রকৃতই কূটনীতিক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের ব্যর্থতার পাল্লা এক্ষেত্রে বেশি ভারী। কারণ তিস্তায় পানি পাওয়া যাবে এই আশায় বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতকে করিডর সুবিধাসহ তার চাহিদামত অন্যান্য সকল সুবিধাই দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মনমোহনের সফরকালে চূড়ান্ত মুহূর্তে ভারত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর না করে পিছু হটে যায়।
বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে ৫৪টি নদীর প্রবাহ থাকলেও গত ৪০ বছরে কেবল একটি নদী (গঙ্গা)-র পানি নিয়ে দু দেশ ৩০ বছর মেয়াদী সমঝোতায় পৌঁছতে পেরেছে। অথচ ১৯৭২ সাল থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি বিষয়ক আলাপ-আলোচনা চলছে, যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকও হয়েছে ৩৮ দফা। ফলাফল প্রায় শূন্য, প্রাপ্তিও সামান্য। দুই সরকারের মেয়াদও একদফা শেষ হলো। কেবল পানি প্রাপ্তিতে ব্যর্থতাই নয়- পানি বণ্টন আলোচনায় কূটনৈতিক বিবেচনায়ও বাংলাদেশ সম্প্রতি বেশ পিছু হটে গেছে। এতদিন সমঝোতায় পৌঁছতে না পারলেও দু দেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় পানির সংকটই থাকতো এক নম্বর বিষয়। সেই অগ্রাধিকার এখন পাল্টে গেছে। আলোচনার টেবিলে প্রথম ও দ্বিতীয় বিষয় হয়ে উঠেছে ট্রানজিট ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গ- যাতে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। দু’দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে গত ৬ বছরের বৈঠকগুলো অনুসরণ করলে দেখা যায়, সিদ্ধান্ত যা হচ্ছে তার সবই ট্রানজিট ও নিরাপত্তা বিষয়ে, আর পরবর্তী এজেন্ডাগুলোর ক্ষেত্রে (যেমন, পানি, বাণিজ্য ইত্যাদি) কেবল ‘আশাবাদ’ ব্যক্ত করা হচ্ছে- কূটনীতির ভাষায় যা কেবল একটি শূন্যগর্ভ শব্দ মাত্র।
২০১০ সালে শেখ হাসিনার সফরকালে বাংলাদেশ-ভারত যে যৌথ ঘোষণা প্রচারিত হয় তাতে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি ২৭ তম অনুচ্ছেদে স্থান পায়! গত দুই দশক ধরে ভারত চেষ্টা করছিল ‘পানির বিনিময়ে করিডোর’ সুবিধা আদায় করে নিতে। অতীতে গণমাধ্যমে এরূপ ‘প্যাকেজ ডিল’-এর কথা শোনা যেত। এখন বাস্তবতা এমন দাঁড়িয়েছে ভারত ‘জল না দিয়েই করিডোর’ সুবিধা পেয়ে গেছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এ পর্যন্ত পানি বিষয়ে একমাত্র চুক্তি হয়ে কেবল গঙ্গার পানি নিয়ে। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ বিষয়ে সর্বশেষ চুক্তি হয়। সেই ইতিহাসের আলোকেই কূটনীতিবিদরা ভেবেছিলেন, পানি আলোচনায় এবারের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বোধহয় এক ধাপ অগ্রগতি ঘটবে, বিশেষত তিস্তার পানি নিয়ে। কিন্তু ২০১০ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফর এবং ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পরও এইরূপ কোনো চুক্তি না হওয়ায় এবং এখন তিস্তার পানি নিয়ে নতুন ‘সমীক্ষা’ শুরু হওয়ায়- এটা স্পষ্ট, অভিন্ন নদীগুলোর পানিতে ভারত বাংলাদেশকে আর কোনোভাবে অধিকারের স্বীকৃতি দিতে চায় না।
কূটনীতিক সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালেই বাংলাদেশ সরকার তিস্তার পানির বিষয়ে সম্ভাব্য একটি চুক্তির খসড়া ভারতীয়দের কাছে জমা দিয়েছিল। ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী পাওয়ান কুমারও একই বিষয়ে তাদের তরফ থেকে সম্ভাব্য চুক্তির একটি খসড়া উপস্থাপন করেছিলেন। দু’দেশের কোনো সরকারই অবশ্য পেশকৃত চুক্তিগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বাংলাদেশকে তিস্তার প্রবাহের ৪৮ শতাংশ পানি দিতে চাইলেও অপর অংশ চূড়ান্ত পর্যায়ে তাতে আপত্তি তোলে এবং শেষপর্যন্ত দিল্লীতে আপত্তিকারীদেরই জয় হয়।
বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর মধ্যে তিস্তা বেশ খরস্রোতা। নীলফামারী দিয়ে এদেশে ঢুকে কুড়িগ্রামে যমুনার সঙ্গে মিশে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিস্তা প্রায় ৮৩ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে। বাংলাদেশ অংশে তিস্তা বেশি শাখা প্রশাখায় বিভক্ত নয়। বর্ষায় তার দৈর্ঘ্য কমে যায়। কারণ সরাসরি প্রবাহিত হয়। গ্রীষ্মে প্রবাহিত হয় একেবেঁকে। ফলে দৈর্ঘ্য তখন বেশি মনে হয়। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে তিস্তার প্রবাহ কখনো কখনো কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪-৫ শত কিউসেকে (কিউসেক = প্রতি সেকেন্ডে এক ঘনফুট)। অথচ পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে তিস্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে শুকনো মৌসুমে অন্তত ৩২০০ কিউসেক পানি বইতে দেওয়া জরুরি।
সীমান্তের প্রায় ৫০ মাইল উজানে গজলডোবায় নির্মিত ২১১.৫৩ মিটারের একটি ব্যারাজের মাধ্যমে একপাক্ষিক পানি প্রত্যাহারের কারণেই এই দুঃসহ অবস্থা। ব্যারাজ নির্মাণের পূর্বে সর্বনিম্ন পানি-প্রবাহ ছিল ন্যূনতম চার হাজার কিউসেক। গজলডোবার ব্যারেজের দুটি সেচ খালের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে প্রায় নয় লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ভারত তিস্তার পানি সরিয়ে নিচ্ছে পশ্চিমে মহানন্দা, মেচি, পুনর্ভবা, আত্রাই ইত্যাদি অববাহিকায় এবং সেটা শুষ্ক মৌসুমেও। তিস্তার পানি দিয়ে এভাবে দূরান্তের অববাহিকায় কৃষি কাজ চলছে। যা পুরোপুরি আন্তঃনদী সংযোগের মতো। যদিও বহুল আলোচিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মতো তিস্তার আন্তঃনদী খালগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে কখনো কোনো আলোচনা হয় না। ১৯৮৭ সাল থেকে এভাবে পানি প্রত্যাহার চলছে। শুষ্ক মৌসুমে ভারত প্রায় ৮৫ ভাগ পানি প্রত্যাহার করে নেয় তিস্তার প্রবাহ থেকে। এতে ভাটিতে কুচবিহারও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো, ভারতীয়দের তিস্তা সেচ প্রকল্পে জলঢাকা, তিস্তা, মহানন্দা ও ডাউক নদীকে খাল দিয়ে যুক্ত করার কথাও আছে। অথচ প্রত্যেক নদীর অববাহিকার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষা সেই নদীর অববাহিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এটাই পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক বিবেচনা। কিন্তু এ রীতি রক্ষায় আন্তর্জাতিক কোনো আইন নেই।
উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার সেচ প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া মাত্রই ভারত গজলডোবায় ব্যারেজ নির্মাণের কাজে হাত দেয় এবং মাত্র দু’বছরে তার কাজ সমাপ্ত করে ফেলে। আর বাংলাদেশ তার সেচ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করতেই সাত বছর সময় নেয়। তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ সরকারের। কিন্তু এখন কার্যত ৪০-৫০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের পানি দেওয়া যাচ্ছে। ১৯৯৮ সালে ব্যারেজের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়। সেই থেকে এখন পানির প্রবাহ কমে গেছে চার ভাগের এক ভাগ। এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে এই, পানি পাওয়া যাচ্ছে অন্তত চারগুন কম-আর সেচের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের হার মাত্র এক দশমাংশ। প্রকল্পের কেবল প্রথম পর্যায়ের এক লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের জন্য পাঁচ হাজার কিউসেক পানি দরকার। কিন্তু সর্বোচ্চ পাওয়া যায় দুই-আড়াই হাজার কিউসেক। এটাও আবার অনেক সময় কমে যায়। তখন কৃষক গভীর নলকূপ থেকে পানি তোলে। তার জন্য বিঘা প্রতি ধান আবাদের খরচ বেড়ে যায় ৩-৪ হাজার টাকা। অথচ তিস্তার পানির জন্য দিতে হয় বিঘা প্রতি ১৬০ টাকা। এই হিসাব থেকে দেখা যায়, কেবল তিস্তার পানি বঞ্চনার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকের শত শত কোটি টাকা ক্ষতির কারণ হয়েছে।
যেহেতু আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ভাটিতে সে কারণে কোনো ধরনের চুক্তি না থাকলে শুষ্ক মৌসুমে সম্ভাব্য প্রবাহ সম্পর্কে কৃষকরা কোনো অনুমান করতে পারে না এবং সে কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ পারের নদী অববাহিকায় চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অববাহিকা অঞ্চলে জনসংখ্যা ও কৃষি জমির চাহিদা বিবেচনায় পানি প্রাপ্তির যে অধিকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুরের মানুষের ভাগ্যে তা জোটেনি কখনো। ফলে পানি শূন্য পদ্মা পাড়ের মানুষদের মতো তিস্তা পাড়ের মানুষরাও এখন প্রায় পুরোপুরি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর সেখানেও ক্রমে নামছে পানির স্তর এবং তাতে মিলছে জীবনবিনাশী নানা জৈব উপাদান। ফলে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর বিপন্নতা পরোক্ষে বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রামে সৃষ্টি করছে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত নয়া এক দুর্যোগ। গণমাধ্যমে মাঝে মাঝে তিস্তা পাড়ের পানি সংকটের কথা শোনা গেলেও জনস্বাস্থ্যের বিপন্নতার কথা একেবারেই আসে না।
লেখক : গবেষক, altafparvez@yahoo.com

Disconnect