বিষয়ভিত্তিক নয়, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় চাই

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা চলছে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে। সরকার নিজেও যেমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছে, অপরদিকে আবার একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতিও দিয়ে চলেছে। একদিকে সরকার বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এবং অন্যদিকে একটা ভবনের কোনো ফ্লোরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়ে বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞাকে অস্বীকার করে সাধারণ মানুষের উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করেছে। সরকারের এই সদিচ্ছার ফলে দেশে উচ্চশিক্ষার পথ অনেকের জন্য সুগম হলেও লাভের লাভ কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। আমাদের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়কে বিশ্বের এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা তো বলে কোনো লাভই নেই। যদিও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এর একটা কারণ জানিয়েছে। র‌্যাঙ্কিংয়ে আসার জন্য যে ধরনের তথ্য-উপাত্ত হালনাগাদ করা প্রয়োজন তা নাকি গত কয়েক বছর ধরে পূরণ করার সময় পাওয়া যায়নি। এ তথ্য জানে না বলেই এখনো সাধারণ মানুষ বিশ্ব তালিকায় আমাদের নাম খুঁজে বেড়াচ্ছে। তবে শিক্ষা যদি মানসম্মত হতো তা হলে হয়তো এত খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন পড়তো না। বিশ্ববাজারে আমাদের শিক্ষার মান আজ সবার জানা। 

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত চরিত্র সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে কিনা সন্দেহ আছে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই যেখানে এ বিষয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে সেখানে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরতো কোনো কথাই নেই। আমাদের দেশে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা প্রকৌশল আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে। মজার বিষয় হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের প্রকৌশল ও কৃষি শিক্ষার কোনো দায় গ্রহণ করেনি। দেশের প্রকৌশল ও কৃষি শিক্ষার পুরা দায় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর। পরবর্তী সময়েও যে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেগুলোও অগ্রজদের পথ অনুসরণ করে কোনো দায় গ্রহণ করেনি। দেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে আর মেডিকেল কলেজগুলোর দায়িত্ব সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাড়ে বিষয়টি কতটা শোভন ভেবে দেখবার বিষয়। প্রকৃত অর্থে শিক্ষার উন্নয়নের চাইতে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যক্তিকে, গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করতে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এখন তো বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে। ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা মানুষরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে একটা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক হতে চায়। তাই আশা করাই যায় আগামীতে দেশের সাধারণ মানুষ আরও অনেক বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় পেতে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষানীতিও সে রকমই ইঙ্গিত দেয়। 

বিজ্ঞজনরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টি করে আর স্কুল-কলেজ সেই সৃষ্ট জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোর দায়িত্বই গ্রহণ করেন না, তাই তাদের সৃষ্ট জ্ঞান (যদি অবশ্য থাকে) শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেবার প্রশ্নই আসে না। সত্যি বলতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে অক্ষমতার কারণেই তারা কলেজগুলোর দায়িত্ব নিতে চায় না। কারণ কলেজগুলোর সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পার্থক্য নেই। ফলে পেশার যে মানের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ন্যূনতম যৌক্তিকতা সাধারণ মানুষের সামনে রাখতে উদ্যোগী হয়েছিল তার এক শতাংশও পূরণ হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। একটা বিষয়ের ওপর একটা বিশ্ববিদ্যালয় করা হলে পরিণতি এমনই হয়।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে একটা ভুলের খেসারত দিতে সরকার একটার পর একটা বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সন্তুষ্ট করে চলেছে। একসময়ে বাংলাদেশে সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার একক প্রতিষ্ঠান ছিল গণপূর্ত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ এই প্রতিষ্ঠানটা ছোট হয়েই চলেছে। কারণ সরকারের প্রতিটা মন্ত্রণালয় নিজেদের মতো করে নির্মাণ শাখা করে নিয়েছে। সরকার সবাইকে সন্তুষ্ট করার নীতি অবলম্বন করে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অবজ্ঞা করল। ফলে দেশের অধিকাংশ নির্মাণের জীবনকাল আজ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এতে সরকারের কিছু এসে যায় বলে মনে হয় না। সরকারি নির্মাণের ক্ষেত্রে যে ভুল করেছিল তাতে জনগণের প্রভূত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মাত্র। হয়তো এই ক্ষতি জাতি সময়ের ব্যবধানে পুষিয়ে দিতে সক্ষম হবে। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদার মানসিকতার পেশাজীবী তৈরির যে পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হলো এ ক্ষতি পূরণ হবে কোন উপায়ে? সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে যে লব্ধজ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ থাকে, সেই সুযোগ বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেই। শিক্ষকরাও এর বাইরে নয়। সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি জ্ঞানের অভাবে উপযুক্ত মানসিকতা লাভে বঞ্চিত এসব শিক্ষার্থীরা নিজেদের অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ ভেবে তৈরি হচ্ছে। তাই তারা দেশের উন্নয়ন, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখানো জনতা হতে পারছে না। সবাই নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সদা ব্যস্ত। সর্বত্র সমন্বয়হীনতা বিরাজমান। 

বাংলাদেশে সব উন্নয়নে ব্যক্তির প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা নিজ বা গোষ্ঠীর স্বার্থে দেশ ও জাতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে দ্বিধা করে না। ধারণা করা যায় বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে স্থাপিত। একজনের মনে হয়েছে তিনি উপাচার্য হবেন, তার অধ্যক্ষ পদের চাইতে উন্নত পদ চাই। তিনি ক্ষমতার বলয়ে থাকা মানুষ, তার শখের মূল্য আছে, সেই শখের মূল্য দিতে জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো একটা বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়। একটা বিষয়ের জন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে যে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ গড়ে ওঠার কথা ছিল, তা হলো না। বরং নিজেরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে পেশার উন্নয়নে সাধারণ মানুষের চোখ থেকে হারিয়ে গেল। আজ পেশাগত সমস্যা সমাধান তো দূরের কথা নিজেদের সংকীর্ণতার কারণে এ মানুষগুলো সমস্যা সৃষ্টি করেই চলে। দেশে একটার পর একটা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। তাদের বয়সকাল নেহাত কম নয়। জনগণ এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে কি পেয়েছে? হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ১০০ বছর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও আমাদের তৈরি একটা ব্রিজও এর অর্ধেক জীবনকাল পায় না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আজ যত বছর ধরে নির্মাণ করা হচ্ছে তত বছর জীবনকাল পাবে এমন নিশ্চয়তা কি আমাদের পেশাজীবীরা দিতে পারবেন? সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে আরও কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরও আমাদের পেশাজীবীরা নির্মাণের জীবনকাল নিশ্চিন্ত করতে পারবেন না। কারণ গ্রামবাংলার সাধারণ মানূষ যখন শোনে আমাদের প্রকৌশলীরা পুকুর কাটা শিখতে বিদেশে যাচ্ছে, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করতে আফ্রিকায় যাচ্ছে তখন তাদের সব বিশ্বাস ফানুস হয়ে উড়ে যায়। 

বর্তমান সরকার সবক্ষেত্রে দেশকে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটা প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে। পরিতাপের বিষয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় তা অর্জনে সমর্থ এখনো হলো না, বরং দিনে দিনে যেন পিছিয়ে যাচ্ছে। আর বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় জনগণকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেই চলেছে। একটা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পায়, কিন্তু পদ পদবী সবকিছুই সমান। কারিগরি শিক্ষার ব্যয় সাধারণ শিক্ষার চাইতে বেশি এটা সবাই জানে এবং মানে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অনুষদ হলেই যেখানে শিক্ষা সম্ভব সেখানে একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষার ব্যবস্থা করার ফলে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে তার দায় কে বহন করবে? জাতি যদি লাভবান হতো তাহলে বিষয়টা ভেবে দেখা সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভব হতো। আশা করা যায় বিষয়টা এখনো জাতির স্বার্থে সরকার ভেবে দেখবে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদরা সরকারের একের পর এক বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তের বিপরীতে সোচ্চার হবেন। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে সরকারের ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা কোনো ব্যক্তি জাতীয় খেলা হাডুডুর জন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি করে বাস্তবায়ন করে ফেলবেন। 

দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ই আজ অস্থির। এত অস্থিরতার মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা এগিয়ে নেয়া কঠিন। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা মানবিক গুনাবলী অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের প্রশাসন, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক ইত্যাদি শ্রেণি-পেশার মানুষদের কাছে সাধারণ মানুষ মানবতা খুঁজে ফিরছে। তাই আমাদের প্রতিটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্থিরতা মুক্তির আশু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। আমাদের শিক্ষার্থীদের অতীত ঐতিহ্য ফিরে পেতে মানবিক পরামর্শক নিয়োগ প্রয়োজন। দেশের প্রতিটা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন করে মানসিক চিকিৎসক বা সমাজবিজ্ঞানীকে পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষকসহ শিক্ষার্থী মানবিক হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো। মানবিক গুণাবলি অর্জন ছাড়া দেশ ও জাতিকে ভালোবাসা সম্ভব নয়। আর দেশ ও জাতিকে ভালো না বাসতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাকে সেবা করবে কীভাবে?

লেখক: এম আর খায়রুল উমাম
সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh