নতুন খ্রিস্টিয় বছরে প্রত্যাশা

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের একটি বছর পেরিয়ে নতুন বছরে পা রাখলাম। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের এই একটি বছরে আমাদের প্রত্যাশা কতটা পূরণের চেষ্টা হবে, তা গবেষক ও পণ্ডিতজনেরা হয়তো নির্ণয় করবেন। তবে আজ প্রশ্ন তুলছি, বিগত একটি বছর বাংলাদেশের মানুষ, বাঙালি-ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সবাই মিলে যা কিছু পেতে চেয়েছিলাম তার কতটা পূর্ণ হয়েছে? 

তবে হ্যাঁ এ কথাতো বলতেই পারি, সরকারের যে উন্নয়নের হিসাব তা হয়তো অনেকটাই দৃশ্যমান এবং এই দেশের নাগরিক হিসেবে সেজন্য নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞ থাকার কথা। কিন্তু পারছি কি তা? অবকাঠামোগত উন্নয়নের বহুল প্রচার আমাদের চোখকে ঝাপসা করে দিচ্ছে, আর সেই অর্ধমগ্ন চোখে আমরা যে দেখতে পাচ্ছি মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ছে। পরিকল্পিত কর্মসূচির বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় বাস্তবায়িত কর্মের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে আদৌ কি ভাবি? প্রবৃদ্ধির উন্নতির হারের কামনায় আমরা এতটা ব্যস্ততায় দিনাতিপাত করি যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এর কোনো গতিসঞ্চার করতে পেরেছে, তা ভাবারই হয়তো সময় পাই না। 

কর্মবর্ষের শুরুটা করি খ্রিস্টীয় দিনপঞ্জি হিসেবে। প্রাসঙ্গিকভাবে যদি প্রশ্ন করি, আমরা বাংলার মানুষ, বাংলা সাল তারিখের প্রচলনও এ দেশে বর্তমান- তারপরও প্রায় দুইশ’ বছরের ইংরেজ শাসন শোষণে সে ইতিহাস ঐতিহ্য আজ ভুলে আছি। বিজয়ের আটচল্লিশ বছর পার করে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি আমরা। তবু ১৯৫২’র রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষা বাংলাকে যে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলাম, আজও তা পারিনি। আমলাতান্ত্রিকতার স্বভাবে যে কথকতায় জবাব আসবে, তা হলো, বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য আমরা ইংরেজি ভাষাকে আজও অবলম্বন করে চলেছি। বাংলার ইতিহাস ও লড়াই-সংগ্রামের আদ্যপান্ত লিখিতভাবে আজও গৃহীত হয়নি। ফলে ইতিহাস বিকৃতি, যার যা খুশি সেইভাবে নতুন ‘ঘটনাপঞ্জি’ যুক্ত করে ইতিহাস সৃষ্টির অপপ্রয়াস করছে। তাকে রুখে দেওয়ার জন্য সরকারের উদ্যোগে ইতিহাসবেত্তাদের একটি কর্মপ্রয়াস এ বছর থেকেই চালু করুন। এটা বাংলার মানুষ হিসেবে আমাদের চাওয়া। 

অতীব দুঃখের সঙ্গে দেশের চলমান দিনপঞ্জিতে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ভূমি গ্রাস, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের যে অমানবিক পাশবিক আচরণ সারাবছর ধরে প্রত্যক্ষ করলাম, তা আমাদের চিত্তে চাঞ্চল্য সৃষ্টি অথবা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, আমরা কিন্তু এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারিনি। সংবাদপত্রে লেখা, টিভির টকশো, কিংবা সচেতন দু’চারজন ব্যক্তির বিবৃতি অথবা দু’একটি ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিবাদ মিছিল বা সমাবেশ এত বড় নিপীড়নকে পরাস্ত করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তথা প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টির প্রয়োজন। এ কলংকিত জীবনের বিরুদ্ধে বিচারালয়ের যথার্থ রায়, পুলিশের সঠিক এবং সততাপূর্ণ তদন্ত পারে এইসব সমাজবিরোধী চরিত্রকে প্রতিরোধ করতে। আমাদের প্রত্যাশা নতুন এই খ্রিস্টীয় বছরে যেন আমরা কলংকিত ঘটনাবলির যথার্থ বিচার ও শাস্তিবিধান করতে পারি, তা না হলে অপরাধীরাই নির্বিঘ্ন হবে তাই নয়, আমরাও কিন্তু ভবিষ্যৎকে বিপন্ন অবস্থায় ঠেলে দেব। 

আমাদের অস্বাভাবিক যানজট শহুরে জীবন যাপনে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। কত শ্রমঘণ্টা নির্বিবাদে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার যেমন হিসেব রাখছি না, তেমনি উন্নয়নের বিড়ম্বনায় বায়ুদূষণেও যেন তেমন কর্ণপাত করছি না। আমাদের ক্রিকেট টিম যখন দিল্লীতে খেলতে গেল তখন দিল্লির পরিবেশদূষণ নিয়ে আমরা নাক সিটকেছি। অথচ আজ সেই দূষণে আমরা নিজেরাই দুষ্ট। শুধু কি তাই, যে বিকট শব্দ তুলে ট্রাক, লরি, বাস বসতি এলাকা, স্কুলের সামনে কিংবা হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাবার সময় শব্দদূষণের সৃষ্টি করে, তা নিয়ন্ত্রণের আজও কোনো পদক্ষেপ দেখি না। নাগরিক আচরণ সম্পর্কে চালক, ট্রাফিক পুলিশ কেউই তোয়াক্কা করে না। এই তো রাজধানী শহর ঢাকার চালচিত্র। তাতে আবার যানজট নিরসনের ‘পবিত্র’ প্রত্যাশায় মেট্রোরেলের লাইন বসাবার জন্য শহরময় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব লেগে গেছে। হায়, জানি না এ ব্যবস্থা জট কমাবে না বাড়াবে। শহরের রাস্তাই তো কম, তাও আবার অপ্রশস্ত- তারপরও একে ‘রাজধানী শহর’ আখ্যা দিয়েছি। কিন্তু রাজধানীর যা কিছু উপকরণ থাকার কথা সেই নগরায়ণ সঠিকভাবে তো হয়নি, তারপরও ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’ সৃষ্টি করে তৃপ্তি পাচ্ছি আমরা। 

২০১৯-এর উল্লেখযোগ্য এবং ঐতিহাসিক ঘটনা হলো ২৭ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ বা ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠান। যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন এর ফলাফলে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার সংরক্ষণ কমিটির প্রতিনিধি নূরুল হক নুরু ও তার দু’একজন ছাড়া ডাকসুর সব পদেই ছাত্রলীগের সদস্যরাই নির্বাচিত হয়েছেন। ডাকসুর জিএস পদে নির্বাচিত হয়েছে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অপসারিত গোলাম রাব্বানী। সংগঠন থেকে অপসারিত হলেও তিনি তো ডাকসুতে নির্বাচিত জিএস। নির্বাচনের আগে থেকে নুরুল হক নুরের সঙ্গে ওদের আদর্শিক বিরোধ চলে আসছে। আর সেই বিরোধের কারণেই নুর ভিপির দায়িত্ব পালন করতে পারছেনই না, বরং  বারবার মার খেয়ে চলেছেন প্রতিপক্ষের হাতে। কোনোবারই প্রহারের দায়দায়িত্ব গোলাম রাব্বানীরা নেননি। সর্বশেষ বেধড়ক মার দিয়েছে ভিপির কক্ষে ঢুকে লাইট অফ করে। এই মারের পর ক্ষমতাসীন দল এই প্রহারের বিরুদ্ধে খানিকটা ভূমিকা নিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের’ তিনজন নেতাকে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

এই আশাহত পরিস্থিতি থেকে নতুন খ্রিস্টীয় বছর আমাদের মুক্তি দিক, এটাই কামনা করছি। ডাকসু ঐতিহ্যবাহী সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাকিস্তানি জামানার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির চর্চা করবে এটাই প্রত্যাশা করছি। এই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যে সব সচেতন ব্যক্তি নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁরা সংকীর্ণ ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে ছাত্রদের উসকানি যেন না দেন, আসছে বছরে সে আশাও করতে চাই। শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বত্র সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসুক এই কামনা রইল। 

মাদকাসক্তি, নানা বর্ণের দুর্নীতি, সর্বোপরি ধর্মান্ধতার পরিবেশকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের কপালে বিজয় তিলক এঁকে দিক, এই তো বিজয়ী বাংলার রক্তিম শপথের অঙ্গীকারে প্রদীপ্ত জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষা। সামনের খ্রিস্টীয় বছর যেন তারই ক্ষেত্র প্রস্তুত করে মুক্ত স্বদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে এই কামনাই রইল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির কাছে।

লেখক: কামাল লোহানী 
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh