তাহাদের অমৃতবাণী

রাজা ষোড়শ লুইয়ের শাসনকালে ফ্রান্সে খাদ্য সংকটে পাউরুটি অমূল্য হয়ে পড়ে। তখন রানী মারি আতোয়ানেত প্রজাদের পাউরুটি না পেলে কেক খেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশে পেঁয়াজ অমূল্য করে দিয়ে আমাদের রাজারা ফ্রান্সের রানীর মতোই পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। সবাই নিজের মতো করে অমৃত বর্ষণ করে চলেছেন। 

খাদ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন তিনি পেঁয়াজ ছাড়াই ২২ পদের রান্না জানেন। মন্ত্রীর বাড়িতে যোগাযোগ করলে মিডিয়া জানতে পারতো ২২ পদের রান্না পেঁয়াজ ছাড়া হয়ে থাকে। আস্ফালন দেখা গিয়েছে শিল্পমন্ত্রীর কথায়ও। ‘পেঁয়াজের বাজার যেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল সেটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে’- মন্ত্রীর ঘোষণা শুনেই পেঁয়াজের বাজার ২৬০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেলো। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সব সাধারণ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর কথা মতো পেঁয়াজ ছাড়া খাওয়ার আবেদন রাখতে থাকে। এতে বোধ করি বাণিজ্যমন্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলেন, বেশি ঘাটাঘাটি করলে বাজার থেকে পেঁয়াজই উধাও হয়ে যাবে। যে দেশের মানুষ প্লেনে চড়তে পারে না, সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রী প্লেনে করে পেঁয়াজ নিয়ে এসেছেন সরকারি কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে, তাতে যদি একটু ব্যবসাই না হয় তাহলে লাভ কি? ব্যবসায়ী হিসেবে গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করার দায়িত্ববোধ থেকে এবার তিনি পেঁয়াজকে সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দিয়েছেন। রাজনীতিতে যতো ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে ততোই তার ক্ষেত্র বেড়ে চলেছে। এখানে সরকারের ভূমিকা আস্ফালনের মধ্যে সীমিত।

দেশের সাধারণ মানুষ ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের আস্ফালনে মজা পায়। অপরদিকে সিন্ডিকেটকে লালন করতে সরকার ব্যস্ত। এদের জন্য সুবিধার দুয়ার খুলে দেবে কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করবে না। উল্টো যতোদিন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে। সাধারণ মানুষের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করে ক্ষমতার বলয় শুরু করে বচনামৃত বর্ষণ। 

সৃষ্ট সমস্যা জনজীবনকে বিশৃঙ্খল করে দিলেও বচনগুলো প্রচুর শান্তি দিয়ে থাকে। ক্ষমতার বলয়ের বচন শুনতে পেয়ে সাধারণ বাঙালির প্রিয় আড্ডাগুলো গরম হয়ে উঠে। আলোচনা, পর্যালোচনা, সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। এখনতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুব সরব। পূর্বে আড্ডার স্থলেই সবকিছু সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন আর তা হয় না। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। 

নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর থেকে মসনদে বসা রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নেতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিবেদিত। এখনো সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার বাইরে কেউ আসেনি। মহাজোট সরকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সোনার বাংলা সাধারণ মানুষকে উপহার দিতে শ্রম দিয়ে চলেছে। আমাদের বর্তমান অর্থমন্ত্রী সাধারণ জনগণকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কানাডার সমান হয়ে যাবে। সরকারের ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুফল। দেশ উন্নয়নশীল থেকে উন্নত বিশ্বের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সবার সুখ্যাতিতে আপ্লুত আমরা। প্রকৃত পরিস্থিতি হলো বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতার মসনদে আসার আগের বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশ্ব অর্থনীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৭-এ আর বর্তমানে তা ১৬৮-তে।

বিশ্ব পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেনো আমাদের জাতীয় বাজেট বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, আমদানি-রফতানি বাড়ছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাড়ছে, আয়ের বৈষম্য বাড়ছে, সেকেন্ড হোম তৈরি বাড়ছে, ব্যাংক জালিয়াতি বাড়ছে, ঋণ খেলাপি বাড়ছে, সিন্ডিকেট বাড়ছে, কালোবাজারি বাড়ছে, ঘুষ-দুর্নীতি-সন্ত্রাস বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, গড় আয়ু বাড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। নিশ্চয়ই এসব কিছু অর্থনীতির সূচককে সমৃদ্ধ করছে। এই আনন্দে আপ্লুত হয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন শিগগিরই বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ল্যাপটপ রফতানি হবে। অর্থমন্ত্রীর কানাডা দেখতে দেশের মানুষকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হলেও তথ্যমন্ত্রী এখনই আকাশ থেকে ঢাকা শহরকে লসঅ্যাঞ্জেলস মনে করছেন, হাতিরঝিলকে প্যারিস শহরের অংশ মনে করছেন।

‘সোনার বাংলা শ্মশান কেনো?’ আজ আমরা বলতে পারি না ঠিকই কিন্তু তার মধ্যেই বাস করতে হচ্ছে আমাদের। 

দেশে অনেকেই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি আশা করে। রাস্তায় বের হলে সুস্থ শরীরে বাসায় ফেরার গ্যারান্টি নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও আমাদের সন্তানরা নিরাপদ বোধ করছে না। প্রতিনিয়ত আগুনে পুড়ে কয়লা হচ্ছে মানুষ। পরিবেশ দূষণে মানুষ মারা যাচ্ছে, ডেঙ্গুতে মানুষ মরছে, ক্রসফায়ারে মানুষ মরছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ মরছে, আধিপত্য বিস্তারে মানুষ মরছে, সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে। সাধারণ মানুষের এই মৃত্যুর মিছিল নিয়ে ক্ষমতার বলয় গভীরভাবে সহানুভূতি প্রকাশ করে থাকে। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়েছে থেকে শুরু করে আমাদের দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার অন্য অনেক দেশের তুলনায় কম বলে আফসোস করতে শোনা যায়।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে ১১শ’র বেশি শ্রমিক নিহত হবার ঘটনায় সবচাইতে চমকপ্রদ সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন ঘটনার জন্য অন্য কেউ দায়ী নয়, বিএনপি ছাড়া, নিজেদের ডাকা হরতাল সফল করার উদ্দেশ্যে বিএনপির কর্মীরা ওই ভবনের দেয়াল ধরে ধাক্কাধাক্কি করেছিল। উচ্চ আদালত বিজিএমইএ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করে সরকার আন্তরিক হলে সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্ব দিতে পারেন। তিনি কিছু কর্মী নিয়ে ভবনটির দেয়াল ধরে ধাক্কাধাক্কি করে বিএনপির কর্মীদের চাইতে নিশ্চয়ই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দেবেন। এতে অন্তত জনগণের অর্থ অপচয়ের হাত থেকে বাঁচবে।

সাগর-রুনি হত্যার ঘটনায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের পাকড়াও করা হবে। সেই চব্বিশ ঘণ্টা আজও শেষ না হলেও জনগণ এই সময়কে চব্বিশ বছর বলে ভরসা করে বসে আছে। জনগণ একথাও শুনে থাকে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আইনের গতি যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর চব্বিশ ঘণ্টাকে চব্বিশ বছরে পরিণত করে তাহলে বলার কিছু থাকে না সাধারণ মানুষের। কারণ মন্ত্রী নির্দেশ দিয়েই অন্য দায়িত্ব পালনে নিবেদিত হয়ে যান। বিপরীতে হত্যা মামলার আসামি একজনের ফাঁসি হলেও অন্য জনকে বিদেশ থেকে এনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার ব্যবস্থা করে আবার বিদেশে পাঠাতে দেখা যায়।

দায় স্বীকারের সংস্কৃতি দেশে তৈরিই হয়নি। তাই দেশের ড্যাম সিভিলিয়ানরা ক্ষমতার বলয় থেকে যে বচনামৃত বর্ষণ হোক না কেন তাতেই আপ্লুত হয়ে পড়ে। সব পেশাজীবীদের রাজনৈতিক বিভাজন এখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ক্ষমতার বলয় এই আনন্দে দুর্বার গতিতে ছুটে চলে এবং চলছে।

এভাবে মহাজ্ঞানী মহাজনরা একে অপরের পথ অনুসরণ করে চলেছে। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা চলছে-চলবে।

এম আর খায়রুল উমাম
সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh