চাঁদ অভিযানে সবার অংশগ্রহণ থাকুক

পৃথিবীর নিঃসঙ্গ উপগ্রহ চাঁদ, গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার মাইল ঘিরে পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে আবর্তন করে চলেছে। এই চাঁদে মানুষ প্রথম পা রেখেছিল আজ থেকে ৫০ বছর আগে। পৃথিবীর বাইরে আরেকটি ভূমি, চাঁদে যে মানুষটি প্রথম পা রেখেছিলেন তিনি নিল আর্মস্ট্রং। তার পা চাঁদের মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলো মানবজাতি। বাস্তবিক অর্থে মানুষের মহাজাগতিক বিস্তার ঘটেছিলো। ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই অ্যাপোলো-১১ মহাকাশ যানে মোট তিনজন চাঁদে পৌঁছান। মাইকেল কলিন্সকে কক্ষপথে মূল নভোযানে রেখে ছোট চন্দ্রযানে করে আর্মস্ট্রং ও অ্যাডউইন অলড্রিন চাঁদের ভূমিতে নেমে আসেন। চাঁদে প্রথম পা দিয়ে নিলো আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, এটি একজন মানুষের জন্য ক্ষুদ্র একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিশাল অগ্রযাত্রা। 

মানুষের মহাকাশ অভিযানের ধারাবাহিকতায় প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক, কুকুর লাইকা, ইউরি গ্যাগারিন, ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা হয়ে নিল আর্মস্ট্রং, অ্যাডইউন বাজ অলড্রিন চাঁদে পৌঁছে যান। চাঁদে শুধু ওই দু’জনই যাননি। গেছেন একে একে ১২ জন। ‘৬৯ থেকে ৭২’ সালের মধ্যে ঘটনাগুলো ঘটেছে। তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এদের মধ্যে ছয়জন এখনো বেঁচে আছেন। সর্বমোট ছয়টি চন্দ্রাভিযানে ১২ নভোচারীর আটজনই চন্দ্রপৃষ্ঠে হাঁটাহাঁটি করেছেন, বাকি চারজন লুনার রোভারে চড়ে চাঁদের বিস্তীর্ণ এলাকা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেছেন। তাদের পর অবশ্য আর কেউ চাঁদে যাননি।

তারা যে চাঁদে গিয়েছিলেন সেই চাঁদ সম্পর্কে গ্যালিলিও গ্যালিলি চারশত বছর আগে অনেক কিছু বলেছিলেন, চাঁদ সম্পর্কে গ্রহগতিবিদ্যার জনক জোহানস কেপলার ‘দ্য ড্রিম’ নামে একটি সায়েন্স ফিকশন লিখে ফেলেছিলেন। কেপলার নিজেকে নায়কের ভূমিকায় রেখে চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখেছিলেন। চাঁদের সত্যিকার অভিযাত্রীরা এসব পর্যবেক্ষণের সত্যতার প্রমাণ পেয়েছিলেন। হয়তো কেপলারের মতো স্বপ্ন আর যুক্তি দিয়ে এবড়োখেবড়ো চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখেছিলেন। আর বলেছিলেন ওই হলো পৃথিবী, নীলাভ সাদা।

এতকিছুর পরও এক শ্রেণির মানুষ ‘চাঁদে মানুষ রাখেনি পা’- খবরটি বিশ্বাস করেছে। এ ধরনের গুজব বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে ছাপা হয়েছিলো। যেসব উৎস থেকে লেখা হয়েছে, সেগুলোও তেমন গুরুত্ব বহন করে না। নাসাও খবরটির প্রতিবাদ করেছে। নভোযান অ্যাপোলো-১১-এ করে ২ লাখ ৩০ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে মানুষ চাঁদে পৌঁছে। সেখানে একটি প্রতিফলক রেখে এসেছিলেন নভোচারীরা, যা দিয়ে পৃথিবী থেকে লেজার লাইটের মাধ্যমে চাঁদের দূরত্ব পরিমাপ করা যায়। তাদের ফ্লাগের প্রমাণও রয়েছে। আরও অনেক ধরনের সন্দেহের অবসান ঘটানো হয়েছে, কিন্তু তারপরও অনেকে বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির দুর্বলতায় একই প্রশ্ন তোলেন।

তবে একটি প্রশ্ন সবাইকে আলোড়িত করেছে। এত বড় অগ্রগতির পরও তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকল না কেনো? শুধু ২০১১ সালের জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে গুগলে এর উত্তরে তথ্য খোঁজা হয়েছিলো দেড় কোটিবার। চাঁদে অবতরণ মানবজাতির ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বাস্তবায়ন হয়েছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। কারণ সেই সময় সোভিয়েতরা স্পষ্টত মার্কিনিদের চেয়ে মহাকাশ অভিযানে এগিয়ে ছিলো। এটাকে টেক্কা মারার জন্য চাঁদে মানুষের অবতরণের চেয়ে বড় স্বপ্ন ছিলো না। এটা করতে গিয়ে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা যেসব প্রকল্প নিয়েছিলো, যেসব কারখানা গড়ে উঠেছিলো, তা শুধু চাঁদে অবতরণের কর্মকাণ্ডকে সহযোগিতা করার জন্য। ফলে চাঁদে যাওয়ার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে গেলে তার আর উপযোগিতা ছিলো না। সমকালীন রকেট ও মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাণিজ্যিকভাবে এ প্রকল্পকে গতিশীল রাখা সম্ভব হয়নি। 

বর্তমানে ইউরোপ ও রুশ মহাকাশ সংস্থার তত্ত্বাবধানে চাঁদে স্থায়ী বসবাসের ঠিকানা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বেসরকারিভাবে চাঁদ ও মহাকাশে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে অনেক কোম্পানি। এরই মধ্যে গোল্ডেন স্পাইক ঘোষণা দিয়েছে,  দ্বিতীয় দশকের শেষ নাগাদ তারা চাঁদে মানুষ পাঠাবে। এ জন্য তারা রকেট ও ক্যাপসুল প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। আসন থাকবে দুটি। এতে খরচ পড়তে পারে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে খরচ আরো কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে কোম্পানিটি। চাঁদে ব্যাপকভাবে মানববসতি না হলেও মহাকাশ উৎক্ষেপণের স্টেশন হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। কেননা চাঁদে মহাকর্ষ শক্তি কম থাকায় উৎক্ষেপণের কর্মকাণ্ড অনেক সহজ হবে। এ ছাড়া চাঁদ বেস ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার হতে পারে।

বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের এক বক্তৃতা থেকে পুরনো অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার আবার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নাসা নাকি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আবারো চাঁদে নভোচারী পাঠাবে; সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদের উল্টো পিঠে চীনের চালানো রোবটিক মিশন একটা বড় কারণ হিসেবে রয়েছে। পুরনো সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা বলছেন, বিশ শতকে চাঁদে মনুষ্য পদার্পণকারী প্রথম দেশ যুক্তরাষ্ট্র, একুশ শতকেও চাঁদে মহাকাশচারী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম জাতি হতে চায় তারা। 

এক্ষেত্রে যে কারণগুলো কাজ করছে তাহলো, চাঁদে জমাট পানি বা বরফের একটি আধার আছে, যাকে মহাকাশযানের জন্য জ্বালানি রূপান্তরে সম্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে নাসা। চাঁদের বুকে গাছের চারা গজিয়ে চীন আরেকটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে; খনিজ দ্রব্যের প্রাপ্তির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। তাছাড়া বেস ক্যাম্প ও বসতি স্থাপন তো রয়েছে। এ সম্ভাবনাগুলোর কারণে নতুন করে মহাকাশ দখলের প্রতিযোগিতার প্রবণতাগুলো কাজ করছে। এদিকে চাঁদের মালিকানা আসলে কার- সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতিমালা এখনো নির্ধারিত হয়নি। অনেকটা পৃথিবীর মতোই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, জোর যার মুল্লুক তার। তাহলে পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার মারামারি, হানাহানি, দখলদারিত্ব আমরা মহাকাশে নিয়ে যাবো?

স্পেস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইন মস্কোর অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ইগর মিত্রোনভের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরাও বলতে পারি, একবিংশ শতাব্দীতে মানব সভ্যতার নতুন আবাসস্থল হবে এই চাঁদ, যা মানুষ গড়ে তুলবে। ষাট-সত্তরের দশকের মতো অন্যান্য জাতির সঙ্গে প্রতি প্রতিদ্বন্ধিতা করে নয় বরং সব দেশের মানুষ এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে। তার থেকে বাংলাদেশের নবপ্রজন্ম বাদ পড়বে না। সর্বশেষ চাঁদে পদার্পণকারী ইউজেন এ সারনানের উক্তি দিয়ে বলতে পারি, আমরা হলাম পৃথিবীবাসী; জাতিগত বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ভুলে মানবজাতি মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ুক।

লেখক: আসিফ, বিজ্ঞানবক্তা

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh