শহীদ আসাদ ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

বাংলাদেশের ইতিহাসে আসাদ এক অবিস্মরণীয় নাম। আসাদ এক সংগ্রামের প্রতীক। সে সংগ্রাম হলো- জাতীয় মুক্তি আর শ্রেণি শোষণ থেকে মুক্তির সংগ্রাম। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি আসাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জনগণের আন্দোলন বিদ্রোহের দাবানলে রূপান্তরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে। এক উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে ঢল নেমেছিল ছাত্রসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। রাজনীতির মঞ্চে উঠে এসেছিল শ্রমিকশ্রেণি তার নিজস্ব শ্রেণি স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। ফুঁসে উঠেছিল বাংলার কৃষক। ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কোনো তুলনা নাই আমাদের দেশের ইতিহাসে।

আসাদের যখন মৃত্যু হয়, তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ছিল সামরিক স্বৈরশাসক স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। আইয়ুবশাহীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্ররা আন্দোলন করে আসছিল। ’৬২ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন অমান্য করে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় ছাত্রবিক্ষোভ এক প্রচণ্ড রূপ গ্রহণ করেছিল। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ছয় দফা পেশ করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ছয় দফাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হলেও ছয় দফায় শ্রমিক-কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কোনো দাবি-দাওয়া ছিল না। জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিয়াটো, সেন্টো ও পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য ছিল না।

১৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ দফা পেশ করা হয়। এই ১১ দফায় ছাত্রদের শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক-কৃষক, মেহনতি মানুষের দাবি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও জোটবহির্ভূত স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতির দাবি তোলা হয়েছিল। একই সঙ্গে ১১ দফায় ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এখন একটু আগের ইতিহাসে ফিরে আসি। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলেন। ’৬৮ সাল ছিল আইয়ুবশাহীর দশ বছর পূর্তির বছর। বিগত দশ বছর দেশের কী উন্নতি হয়েছে, তারই প্রচার চলেছিল বছরজুড়ে। আইয়ুব আমলে পাকিস্তানের অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এর বেশিরভাগ হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। বস্তুত আইয়ুব আমলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের কথা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু নির্বাচন হওয়ার কথা আইয়ুব খান প্রবর্তিত বেসিক ডেমোক্রেসির (মৌলিক গণতন্ত্র) ভিত্তিতে- জনসাধারণের প্রত্যক্ষ ভোটে নয়।

পশ্চিম পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক দলই এই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। ’৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে জেলে থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সে সময় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই কারা অন্তরীণ ছিলেন। আওয়ামী লীগও এই নির্বাচন বর্জনের কথা বলেছিলেন।

’৬৮-এর ৬ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে ভাসানী ন্যাপের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জনসভায় ভাসানী আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসির ভিত্তিতে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন দাবি করেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিও তুলে ধরেন।

মিটিং চলাকালে তখনকার গভর্নর মোনেম খাঁর গাড়ির বহর পল্টন ময়দানের পাশ দিয়ে গভর্নর হাউসে ঢুকছিল। নিয়মমাফিক বহরের সামনে পুলিশের গাড়ি সমানে হুইসেল দিয়ে চলেছে রাস্তা যানমুক্ত করার জন্য। ভাসানী কিছক্ষণ বক্তৃতা বন্ধ করে আবার শুরু করলেন, মোনেম খাঁ, তুমি দুই পয়সার বটতলার উকিল। আমার সামনে দিয়া বাঁশি বাজাইয়া যাও!

মওলানা ভাসানী জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাঝে মাঝে এরকম রসিকতাও করতেন। সভা শেষে ভাসানী ঘোষণা দিলেন, গভর্নর হাউস ঘেরাও হবে। ভাসানী আগে আগে হেঁটে চলছেন, পেছনে আমরা হাজারো জনতা। পুলিশ প্রহরা থাকায় সেদিন গভর্নমেন্ট হাউসের গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারিনি। কিন্তু জনতা খুব মারমুখী ছিল। ভাসানী পরদিন ৭ ডিসেম্বর ঢাকা শহরে হরতালের আহ্বান জানান।

হরতাল প্রতিহত করতে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই খণ্ড খণ্ড মিছিল বের হয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হন। মওলানা ভাসানী নিজে বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল বের করেন এবং পরদিন ৮ ডিসেম্বর আবারও হরতালের ঘোষণা দেন।

৮ ডিসেম্বরের হরতালও খুব সফল হয়েছিল। মওলানা বুঝেছিলেন, শুধু ঢাকা শহরের মধ্যেই আন্দোলন সীমাবদ্ধ রাখলে দাবি আদায় করা যাবে না। সেজন্য তিনি ’৬৮-এর ২৯ ডিসেম্বর সারাদেশে হাট হরতালের ডাক দেন।

সে সময় কৃষক সমিতির (ভাসানী) খুব শক্তিশালী সংগঠন ছিল। কৃষক সমিতি সক্রিয়ভাবে গ্রামাঞ্চলে হাট হরতাল কর্মসূচিতে অংশ নেয়।

প্রায় সারাদেশেই হাট হরতাল পালিত হয়। কিছু কিছু জায়গায় হরতালকারীরা পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। নড়াইল ও পাবনার আটঘরিয়ায় পুলিশ জনতার ওপর গুলি চালায়। সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয় নরসিংদী জেলার মনোরহদী উপজেলার (তখন থানা) হাতিরদিয়ায়।

আটষট্টির ডিসেম্বর থেকেই তিনটা ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ একটা ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়। তখন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন- যথাক্রমে আবদুর রউফ ও খালেদ মোহাম্মদ আলী, ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা আর ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল্লাহ। তখন মাহবুব উল্লাহর নামে মামলা থাকায় সে আত্মগোপনে ছিল। সেই কমিটিতে আমি ছিলাম সহসভাপতি ও দীপা দত্ত সহ-সম্পাদক। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) সঙ্গে আলোচনার সময় ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) পক্ষে জামাল হায়দারের সঙ্গে দীপা দত্ত ও আমি উপস্থিত থাকতাম। তাছাড়া ‘ডাকসু’র পক্ষে উপস্থিত থাকতো সহসভাপতি তোফায়েল আহমদ (ছাত্রলীগ) ও সাধারণ সম্পাদক নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)। নাজিম কামরান চৌধুরী থাকলেও এনএসএফ তখনও সাংগঠনিকভাবে আমাদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়নি। 

যৌথ আন্দোলনের দাবি নিয়ে আলোচনার সময় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, ছাত্রদের কর্মসূচিতে ছয়টা দফা থাকতে হবে। এই প্রস্তাবের পক্ষে মানিক ভাই অনেকটা রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের বক্তব্য ছিল, ছাত্রদের দাবিও ছয় দফা হলে সবাই ভাববে এটা বুঝি আওয়ামী লীগের ছয় দফা। আগে দাবির বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে হবে। পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দফা কয়টা হবে।

দাবি নির্ধারণ করাও খুব সহজ কাজ ছিল না। আলোচনায় বহু বিতর্কিত বিষয় উঠে আসে। প্রথমে প্রস্তাব আসে শুধু ছাত্রদের সমস্যা সংক্রান্ত দাবিই উত্থাপন করা হবে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য ছিল, ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্যু’ আনতে হবে দাবিনামায়। শ্রমিক, কৃষকের দাবি এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বক্তব্যও সংযুক্ত করার প্রস্তাব করি আমরা। শ্রমিক কৃষকের দাবির প্রশ্নে তেমন কোনো দ্বিমত দেখা দেয়নি। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দেয় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার প্রশ্নে। ছাত্রলীগের বক্তব্য ছিল ছাত্রদের দাবিতে সাম্রাজ্যবাদ আসবে কেন। ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এই প্রশ্নে মোটামুটি নিশ্চুপ থাকেন।

অনেক আলোচনার পর ছাত্রলীগ প্রস্তাব দেয়, আওয়ামী লীগের ছয় দফা ছাত্রদের দাবির একটা দফা করা হলে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী একটা দাবি গ্রহণ করা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত যে ১১ দফা দাবিনামা গৃহীত হয়, তার তিন নম্বর দফাটি ছিল আওয়ামী লীগের ছয় দফা সংক্রান্ত এবং দশ নম্বর দফায় ছিল সিয়াটো, সেন্টো, পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের কথা।

বহু আলোচনার ভিত্তিতে ছাত্রদের ১১ দফা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন তিনটি ছাত্র সংগঠন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) নেতৃবৃন্দ ডাকসু কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রথম এই ১১ দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। তবে ১১ দফা সম্বলিত প্রথম প্রচারপত্রটি ছাপা হয় সংগ্রামী ছাত্র সমাজের নামে ১৯৬৯ সালের ১৪ জানুয়ারি। এতে স্বাক্ষর করেন আটজন। তাঁরা হচ্ছেন- পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পক্ষে সভাপতি আবদুর রউফ এবং সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) পক্ষে সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক এবং সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার, সহ-সম্পাদিকা দীপা দত্ত এবং ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমদ (ছাত্রলীগ) ও সাধারণ সম্পাদক নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন এনএসএফ-এর তেমন কোনো সমর্থন ছাত্রদের মধ্যে ছিল না। তবে মারামারিতে তারা বেশ পটু ছিল। এনএসএফ প্রথম অবস্থায় ১১ দফা সমর্থন না করলেও পরে উপলব্ধি করে যে, ১১ দফার পেছনে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। তখন মাহবুবুল হক দোলনের নেতৃত্বে একটা অংশ সংগ্রাম পরিষদে যোগ দেয়। যেহেতু এগারো দফা প্রণয়নের সময় তারা উপস্থিত ছিল না, তাই তারা প্রস্তাব দেয় যে ১১ দফা পরিবর্তন করে ১০ দফা করতে হবে। তবে তাদের এই আবদার গ্রহণ করা হয়নি।

সে সময় সরাসরি ডাকসু (ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন) নির্বাচন হতো না। পর্যায়ক্রমে প্রতি বছর নির্ধারিত হতো সে বছর কোন হল থেকে ডাকসুর কোন কর্মকর্তা নির্বাচিত হবে। প্রত্যেক হলে নির্বাচনের সময় ছাত্র সংখ্যার ভিত্তিতে দুই বা তিন জন ছাত্র ডাকসুর সদস্য নির্বাচিত হতো। এই নির্বাচিত ডাকসুর সদস্যরাই সম্পাদকমণ্ডলী নির্বাচন করতো- তবে শুধু যে হলের কোটায় যে পদ নির্ধারিত থাকত সেই হলের নির্বাচিত ডাকসু সদস্যদের মধ্য থেকেই সেই পদের নির্বাচন হতো। সে বছর ইকবাল হলের জন্য সহসভাপতি এবং জিন্নাহ হলের জন্য সাধারণ সম্পাদক পদটি নির্ধারিত ছিল।

নির্বাচনের দিন এনএসএফ তাদের সব শক্তি একত্রিত করে জিন্নাহ হলে সমবেত হয় এবং সাধারণ ছাত্রদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে না দিয়ে এককভাবে নির্বাচন করে হল সংসদ এবং ডাকসুর সদস্য পদগুলো দখল করে। জিন্নাহ হলের দুইজন নির্বাচিত ডাকসু সদস্যের মধ্যে ছিল নাজিম কামরান চৌধুরী এবং সে-ই ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়।

সদ্য প্রণীত ১১ দফার ব্যাখ্যা ও ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৪ জানুয়ারি ত্রিদলীয় ছাত্র কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয় তখনকার কলা ভবনের মধুর ক্যান্টিনের সামনের মাঠে। এই ছাত্র সভাতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের এগারো দফা কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাব ঘোষণা করে। সভায় সিদ্ধান্ত হয় ১১ দফা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হবে ১৭ জানুয়ারি। কিন্তু তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিল। আমরা ও ছাত্রলীগ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মিছিল বের করার পক্ষে ছিলাম। ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) বক্তব্য ছিল, ১৪৪ ধারা ভাঙার আগে ছাত্রদের আরও সংগঠিত করতে হবে। এবং ব্যাপকভাবে ১১ দফার পক্ষে প্রচারণা চালাতে হবে। এই বক্তব্যে তারা অনড় ছিল। তিন দলের ঐক্য প্রায় ভাঙার পথে। ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুর রউফ ও সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী গোপনে দীপা ও আমার সঙ্গে কথা বলেন এবং কৌশলগত কারণে ১৪৪ ধারা না ভাঙার প্রস্তাব মেনে নেওয়ার অনুরোধ করেন। তাঁরা জানান, প্রস্তুতি থাকবে। সময়মতো ১৪৪ ধারা ঠিকই ভাঙা হবে। আমরা এতে সম্মত হই।

১৭ জানুয়ারি এখনকার কলা ভবনের বটতলায় বেশ বড় একটা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করি। মিছিল বের করার সময় কোনো পুলিশি বাধা পাইনি। কিন্তু মিছিলটি জগন্নাথ হলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় অতর্কিতে পুলিশ মিছিলের ওপর আক্রমণ চালায়। মিছিলের একাংশ দেয়াল টপকে জগন্নাথ হলের মাঠে ঢুকে পড়ে। কাদের, চঞ্চল, ফিজুসহ আমরা আরও কয়েকজন এই অংশে ছিলাম। মিছিলের বাকি অংশ আবার কলা ভবনে ফিরে যায়।

কিছুক্ষণ পর আমরা অন্যপথে আবার কলা ভবনে ফিরে গিয়ে দেখি পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের খণ্ড খণ্ড সংঘর্ষ চলছে। হঠাৎ পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এর আগে টিয়ার গ্যাসের যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা ছিল না। গ্যাসের ফলে আমার দুই চোখ প্রচণ্ডভাবে জ্বলতে শুরু করে। রুমালে পানি ভিজিয়ে অনবরত চোখে পানি দিচ্ছি। কিন্তু চোখের জ্বালা কিংবা পানি পড়া- কোনোটাই কমছে না। ঘণ্টাখানেক পরে পরিবেশ শান্ত হয়ে আসে। তখন সিদ্ধান্ত হয় বিকেলে পরবর্তী কর্মসূচির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

১৮ জানুয়ারি আবার কলা ভবনে সমাবেশ ও জঙ্গি মিছিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, সমাবেশে কোনো বক্তৃতা হবে না। শুধু ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ সূচনা বক্তব্য দিয়ে সবাইকে মিছিলে যাওয়ার আহ্বান জানাবেন।

সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাড়া মহল্লা থেকে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে জমায়েত হতে থাকে। সবার মধ্যেই বেশ জঙ্গিভাব, অনেকের হাতেই লাঠি। পুলিশও প্রস্তুত- কলা ভবন ঘিরে রেখেছে। সামনের রাস্তা দিয়ে গরম ও রঙিনপানি ছিটানোর গাড়ি টহল দিচ্ছে।

প্রথম দফায় আমরা মিছিল বের করতে ব্যর্থ হই। তখন ছাত্ররা তিন অংশে বিভক্ত হয়ে তিন দিক থেকে মিছিল বের করার চেষ্টা চালায়।

একটা অংশে ছিলাম জামাল ভাই, দীপা, শেখ কাদের ও আমিসহ দলের আরও কয়েকজন। পুলিশের অবরোধ ভেঙে আমরা মিছিল বের করতে সক্ষম হই। অবশ্য পুলিশের জল কামানের কারণে আমাদের সবার জামা লাল হয়ে যায়। যাহোক, আমরা প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে মিছিল নিয়ে গুলিস্তান পর্যন্ত পৌঁছাই। মিছিল দেখে আশপাশের সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের কাপড়ে লাল রঙ দেখে অনেক উৎসুক পথচারী জানতে চায় গোলাগুলি হয়েছে কিনা।

১৯ জানুয়ারি রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। সেদিন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা মিছিল বের হয়। মিছিলের ওপর গুলি হলে আবদুল হক নামে একজন নিহত হন।

২০ জানুয়ারি আবার সমাবেশের কর্মসূচি নেওয়া হয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সূচনালগ্নে এক অবিস্মরণীয় দিন ২০ জানুয়ারি। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে আমরা মিছিল বের করি। মিছিলটা কলা ভবন থেকে বের হয়ে মেডিক্যাল কলেজের সামনে দিয়ে যখন চাঁনখারপুল পার হচ্ছে, তখন হঠাৎ প্রচুর সংখ্যক পুলিশ মিছিলের মাঝখানে আক্রমণ চালায়। ফলে মিছিলটা দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সামনের অংশ চাঁনখারপুল পার হয়ে নাজিমুদ্দিন রোড ধরে পুরান ঢাকার দিকে এগিয়ে যায়। বাকি অর্ধেক মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে যায়। এই অংশেই আসাদ ছিল, আমিও ছিলাম।

প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রমণের মুখে ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে আবার আমরা সংঘবদ্ধ হতে থাকি। আমরা মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে অবস্থান নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছুড়তে থাকি এবং আবার মিছিল বের করার চেষ্টা চালাই। পুলিশেরও পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে।

এ অবস্থায় খালেদ মোহাম্মদ আলী ও আমি সিদ্ধান্ত নেই যে, যেকোনো অবস্থায়ই আমাদের মিছিল বের করতে হবে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সবাইকে জড়ো করে আমরা মেডিক্যাল কলেজ থেকে বের হয়ে পুলিশের বেষ্টনীর দিকে ধেয়ে যাই। তখন আসাদ আমার পাশেই ছিল। পুলিশের ওপর এই হঠাৎ আক্রমণ আর আক্রমণকারীদের জঙ্গিরূপ দেখে পুলিশ পিছু হটতে থাকে। আমরা যখন প্রায় পুলিশের কাছাকাছি চলে এসেছি, তখন হঠাৎ কয়েকটা গুলির শব্দ শুনতে পাই। দৌড়ানো অবস্থায়ই দেখলাম আসাদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।

এদিকে তাড়া খেয়ে পুলিশ চাঁনখারপুল পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। সেখানে পুলিশের দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকগুলোও রণে ভঙ্গ দিয়েছে। হুড়োহুড়ি করে ট্রাকে উঠতে গিয়ে তিনজন পুলিশ ট্রাক থেকে পড়ে যায়। তারা ছাত্রদের হাতে বন্দি হয়। আমি কিছুটা এগিয়ে আবার ফিরে আসি। দেখলাম চঞ্চল সেনসহ কয়েকজন আসাদের প্রাণহীন দেহটাকে ধরাধরি করে মেডিক্যাল কলেজের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে।

আসাদের মৃত্যুর খবর বিদ্যুৎগতিতে সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মেডিক্যাল কলেজের ভেতরে-বাইরে জনতার ঢল নামে। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) পক্ষ থেকে প্রথম উচ্চারিত হয় এক নতুন স্লোগান- ‘আসাদের মন্ত্র, জনগণতন্ত্র’।

বিকেল তিনটায় মেডিক্যাল কলেজের সামনে থেকে এক বিশাল নগ্নপদ শোক মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। এই মিছিলের প্রথম সারিতেই ছিল দীপা দত্ত। পরদিন প্রায় সকল দৈনিক পত্রিকাসহ দৈনিক আজাদ-এর প্রথম পৃষ্ঠায় এই মিছিলের একটা ছবি ছাপা হয়েছিল।

মিছিল শেষ করে আমি আর জামাল ভাই ফিরে এলাম মেডিক্যাল কলেজে। সে সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ছিলেন ডা. রুহুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক ডা. আশিক। ডা. আশিক আমাদের জানালেন, তাঁদের কাছে খবর এসেছে, আর্মি মেডিক্যাল কলেজে ঢুকে আসাদের মৃতদেহ নিয়ে যাবে। সে জন্য তারা আসাদের মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলেছে।

সে রাতে আমি আর জামাল ভাই মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারদের বিশ্রাম কক্ষে ছিলাম। ডা. আশিক ও ছাত্রনেতা ডা. জিন্নাহ আমাদের সঙ্গে সারা রাত ছিল।

রাত ১২টার দিকে ঠিকই আর্মি এসে তল্লাশি চালায়। কিন্তু তারা আসাদের মৃতদেহ খুঁজে পায়নি। অবশ্য পরদিন ভোরে আসাদের বড় ভাই ও পরিবারের আরও কয়েকজন এসে মৃতদেহ দেশের বাড়ি শিবপুরের ধনুয়া গ্রামে নিয়ে যায়।

আসাদের মৃত্যুর পর আন্দোলন বিদ্রোহের দাবানলে রূপান্তরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এক উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে শামিল হয় ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-জনতা। এই অভ্যুত্থানে যারা প্রত্যক্ষ করেনি, বর্ণনা দিয়ে তাদেরকে এর তীব্রতা আর ব্যাপকতা বোঝানো সম্ভব নয়।

আসাদের মৃত্যুর পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে পরদিন ২১ জানুয়ারি ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারি এই তিনদিন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট, ২৩ জানুয়ারি মশাল মিছিল এবং ২৪ জানুয়ারি ‘শোক দিবস’ পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

২৩ জানুয়ারি বিকেল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ছাত্র-জনতা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হতে থাকে। ঠিক সন্ধ্যার সময় ৫০০-৬০০ মশাল জ্বলে ওঠে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় মশালের সংখ্যা খুবই কম ছিল। কিন্তু মিছিল যে এলাকা দিয়ে পার হচ্ছিলো, সেসব এলাকার জনগণ স্থানীয়ভাবে মশাল জ্বালিয়ে মিছিলে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত একটা বিশাল মশাল মিছিল পাক মটর (এখন বাংলা মটর), মগবাজার, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে। মিছিল থেকে শ্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে- ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’, ‘আসাদের মৃত্যু- বৃথা যেতে দেবো না’, ‘আসাদের মন্ত্র- জনগণতন্ত্র’।

২৪ জানুয়ারি। সেদিন ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল। রাস্তায় রাস্তায় মেশিনগান হাতে মিলিটারি টহল দিচ্ছে। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে ঢাকা পরিণত হয়েছে এক রণক্ষেত্রে।

২৪ জানুয়ারি ঢাকায় যে গণঅভ্যুত্থান হয়, পরবর্তীতে তার উত্তাপ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল আন্দোলনে উত্তাল পূর্ব বাংলা। চারদিকে বিক্ষোভ আর বিক্ষোভ। ভাসানীর আহ্বানে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাট হরতাল চলছে। গ্রামে গ্রামে সাধারণ মানুষ সংগঠিত হয়ে গরু চোর আর স্থানীয় শোষকদের উচ্ছেদ করছে। পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশনের (সভাপতি কাজী জাফর আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আকবর খান রনো) নেতৃত্বে শ্রমিক এলাকায় চলছে ঘেরাও আন্দোলন। বামপন্থীদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে ‘শ্রমিক-কৃষক অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’, ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা কায়েম করো’ স্লোগান। আর আওয়ামী লীগ স্লোগান দিচ্ছে ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা’।

এ সময় ভাসানী সারাদেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি নতুন স্লোগান তুললেন- ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না; তা হবে না, তা হবে না’।


লেখক : ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক। সে সময় তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি। তিনি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (১৯৭০-১৯৭২)। একাত্তরের রণাঙ্গণ : শিবপুর, আগুনঝরা সেই দিনগুলো, সময় দুঃসময় গ্রন্থের রচয়িতা।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh