নারীর সমতা অর্জনে বড় বাধা ‘তামাক’

কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে শ্রমিক নারীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল নিউ ইয়র্কের সুঁই কারখানায়। ১৯১০ সালে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন মার্চের ৮ তারিখ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও দিনটি পালন সে সময় থেকে গত শতাব্দীর সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কেবল সোভিয়েত রাশিয়াসহ বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশেই গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হতো। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে দেশে দেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। 

সমতার ভিত্তি তৈরি করার অঙ্গীকার আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশেষভাবে আলোচনার বিষয়। কাজের মর্যাদা ও মজুরিতে বৈষম্য রাখা যাবে না। শ্রমিক নারীর এই দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাজের সার্বিক পরিবেশ, নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন। অর্জনও হয়েছে অনেক, পিছিয়েও গেছে খানিকটা। একসময় পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতাই মুখ্য ছিল, দেখতে পাইনি যে এরই মধ্যে ঢুকে পড়েছে পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এখন আমরা পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্র- দুটোর সমন্বয়ে শোষিত হচ্ছি। 

পুঁজিতন্ত্রের চাকচিক্য মধ্যবিত্ত ও উচ্চ শ্রেণির নারীদের স্বাধীনতার ধারণায় নতুন ধরনের ভাব তৈরি করেছে। পুঁজিবাদ মধ্যবিত্ত নারীর বোধ ও আকাঙ্ক্ষা তাদের মুনাফা অর্জনের কাজে লাগিয়েছে। ফেমিনিজম বা নারীবাদের সব ধারা বা চিন্তা এক রকম নয়। সব মধ্যবিত্ত নারীও একভাবে স্বাধীনতা বোঝেন না। যেমন একটি ‘জনপ্রিয়’ অথচ নিকৃষ্ট ধারণা হচ্ছে- নারীবাদ মানে পুরুষের পোশাক এবং পুরুষের বদ স্বভাব রপ্ত করা। বদ স্বভাবটি হচ্ছে ধূমপান। নারী-পুরুষ সমতার দাবি এবং নারী স্বাধীনতার দাবি যখন থেকে পশ্চিমা দেশে উচ্চারিত হতে শুরু করেছে, তখন থেকেই তামাক কোম্পানি নারীদের পিছু নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ কেরোলিনার নার্সিং বিভাগ থেকে সম্প্রতি নারীদের ধূমপানের ১০০ বছর নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে- ১৯২০ সাল থেকেই আমেরিকা তামাক কোম্পানি নারীর জন্য সিগারেট বানাতে শুরু করে দেয়। ইউরোপ-আমেরিকায় নারীদের মাঝে সে সময় ধূমপান খুব কম ছিল, থাকলেও তা খুব ভাল চোখে দেখা হতো না। অর্থাৎ সামাজিক বাধা ছিল। কিন্তু যতোই নারীদের সমধিকারের দাবী বাড়তে থাকে, ততই নারীদের মাঝে ধূমপানের হারও বেড়ে যায়। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রী ফার্স্টলেডি এলিনর রুজভেল্ট একজন ফেমিনিস্ট আইকন ছিলেন। তামাক কোম্পানি এমন আইকনদের তামাক সেবনে ব্যবহার করে ফেমিনিস্টদের মাঝে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছিল । 

সেবনকারী নিজে জানুক বা না জানুক তামাক কোম্পানি জানে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। তাই তারা ধূমপানে আকৃষ্ট করলেও দেখাতে চেয়েছে পুরুষ যে সিগারেট সেবন করে নারী তা করছে না। তাদের জন্য ‘মাইল্ড’ ধরনের ‘হাল্কা’, ‘নরম’ ব্র্যান্ডের সিগারেট বাজারে ছাড়া হয়েছে। কোম্পানির এই কৌশলে কাজ হয়েছিল ভালোই; ১৯২০ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত নারী ধূমপায়ীদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কর্মক্ষেত্রে নারীর যোগদান বেড়ে গেল, যা নারী স্বাধীনতার দিক থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেল; একই সঙ্গে নারীদের ধূমপানও বাড়তে থাকল। 

নারীদের আকৃষ্ট করতে ধূমপানের সঙ্গে ওজন কমে যাওয়ার বিষয়টি তাদের বিজ্ঞাপনে প্রচার করতে থাকল। লাকি স্ট্রাইক নামক সিগারেটের বিজ্ঞাপনে প্রখ্যাত বৈমানিক ও লেখিকা অ্যামেলিয়া ম্যারি আরহার্টের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। অ্যামেলিয়ার কারণে অনেক নারী বৈমানিক পেশায় আগ্রহী হয়েছিল। গ্রেটা গার্বো, জোয়ান ক্রানফোর্ডের মতো প্রখ্যাত নায়িকারা সিগারেটের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। সুন্দরী এবং আধুনিক হতে হলে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিগারেট খাওয়া নারীদের জন্য আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, সিগারেট কোম্পানি টার্গেট করেছিল মধ্যবিত্ত নারীদেরই যাদের হাতে পয়সা খরচ করার ক্ষমতাও আছে । 

আধুনিক নারীবাদীদের ধূমপান বেড়ে গেল; ১৯৬৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সমাজ কল্যাণের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়- ৪১.৯ শতাংশ নারী ধূমপান করছেন। ইতোমধ্যে ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা শুরু হলো। তাই সরকারের পক্ষ থেকে সিগারেটের ওপর সতর্কতা লেবেল ‘সতর্কতা: ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে’ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলো। এর ফলে কিছুটা ব্যবহার কমে গেলেও, কোম্পানি তার কৌশল অব্যাহত রাখলো। এই সময় (১৯৬৮) তারা ভার্জিনিয়া স্লিম সিগারেট চালু করল। আশির দশক পর্যন্ত তাদের রমরমা ব্যবসা চলল। ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল (পিএমআই) বিশেষভাবে নারী স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে সিগারেট খাওয়াকে উৎসাহিত করল। একটি বিশেষ স্লোগান ‘তুমি অনেক অগ্রসর হয়েছ, বেবি’ দিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো, যেখানে ছবি ব্যবহার করা হলো যে, ১৯১৫ সালে নারী গোপনে ধূমপান করত কিন্তু এখন তারা স্বাধীন। প্রকাশ্যে ধূমপান করতে পারে। কোম্পানি বড় বড় বিল বোর্ড এবং টিভি বিজ্ঞাপনে এই স্লোগান ব্যবহার করতে লাগল। ফেমিনিজমের সমতার ধারণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই বিজ্ঞাপন নারীদের আকৃষ্ট করল- স্বাধীনতা, স্লিম হওয়া এবং গ্ল্যামারের মিশ্রণ। হ্যাঁ, পুরুষের সঙ্গে সমতা অবশ্যই অর্জিত হয়েছিল। সেটা হচ্ছে, আগে বেশির ভাগ পুরুষ ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা যেতো, ধূমপানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের মধ্যে ফুসফুসে ক্যান্সারের কারণে মৃত্যুর হার বেড়ে গেল, প্রায় পুরুষের সমান হয়ে গেল। সমতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ বটে, যা তামাক কোম্পানি নারীদের উপহার দিলো!

কিন্তু ১৯৭৯ সালের দিকে যখন বিজ্ঞাপন দেওয়া নিষিদ্ধ করা হলো, নারীদের মধ্যে ধূমপানের হার ৩০ শতাংশ হয়ে গেল এবং যতোই স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সতর্কতা জারি করা হতে লাগল, ততই ধূমপানের হার মধ্যবিত্ত নারীদের কমতে থাকল। নব্বইয়ের দশকে ২২ শতাংশে দাঁড়াল।

এই খবরে তামাক কোম্পানি মোটেও বিচলিত না হয়ে তারা মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত ও সচেতন নারীদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে গরিব ও অল্পবয়সী নারীদের নারীদের দিকে নিবদ্ধ করল। তাদের জন্য স্লিম হওয়ার দরকার নেই, বরং সিগারেটের সঙ্গে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা দিতে শুরু করল। এর ফলে নারীদের ধূমপান বেড়ে দাঁড়ালো ৪০ শতাংশ। মেডিকেল তথ্য থেকে দেখা যায়, নারীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারে মৃত্যুর প্রধান কারণ ধূমপান। এবং এই ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর ঝুঁকি অনেক বেশি। 

বাংলাদেশে নারীর সমতার দাবি দীর্ঘদিনের। এখানেও নারীবাদের একটি ধারা আধুনিকতা ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ধূমপান করে। তবুও মোট ধূমপায়ীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক কম; পুরুষ ৩৬.২ শতাংশ, নারী ০.৮ শতাংশ। এর মধ্যে ভাগ করলে দেখা যাচ্ছে, নারী সিগারেট সেবনকারীর হার ০.২ শতাংশ; এবং বিড়ি সেবনকারী হচ্ছে ০.৬ শতাংশ। কিন্তু এখানে নারী অন্যভাবে ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হচ্ছে। যেমন- পুরুষের ধূমপানের কারণে কর্মক্ষেত্রে ১৯.২ শতাংশ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১১.৪ শতাংশ, অফিস-আদালতে ২২.৮ শতাংশ, গণপরিবহনে ৩৮.২ শতাংশ, রেস্তোরাঁয় ২২.৪ শতাংশ, স্কুলে ৫.২ শতাংশ এবং নিজ বাড়িতে ৩৬.৫ শতাংশ নারী পরোক্ষভাবে ধূমপান বা সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোকিং দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আরও ভয়াবহভাবে আসছে ই-সিগারেট, যা এখনো তরুণদের মধ্যে বেশি ব্যবহার হলেও তরুণীদের হাতেও উঠছে এবং ধারণা দেওয়া হচ্ছে এগুলো সিগারেটের মতো ক্ষতিকর নয়। 

বাংলাদেশের নারীরা ধূমপানে কম করলেও ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা, সাদাপাতা, গুল) ব্যবহারে পুরুষের তুলনায় এগিয়ে আছে। এখানেও নারীকে একভাবে বোঝানো হয় যে, বিয়ের পর তাকে স্বামীর কাছে আকর্ষণীয় হতে হলে ঠোট লাল করে রাখতে হবে। নিম্নবিত্ত নারী এই ফাঁদে পড়ে একসময় আশক্ত হয়ে যায়। তখন সে নিজেই সেবন করতে থাকে। 

স্বামীকে যদি কোনো স্ত্রী বলে যে তামাক চাষ করে তার এবং তার সন্তানদের স্বাস্থ্য ক্ষতি হচ্ছে, তাহলে সে শুনবে না কারণ তামাক থেকে নগদ লাভ হয়। যে তামাক কোম্পানি একসময় নারীকে সমতা অর্জনের জন্য আমেরিকার মতো দেশের নারীর হাতে সিগারেট তুলে দিয়ে ফুসফুসের ক্যান্সারের রোগী বানিয়েছিল, সেই তামাক কোম্পানি বাংলাদেশের মতো দেশের নারীকে তামাক পাতা উৎপাদনে ব্যবহার করে স্বামীকে লাভের লোভ দেখিয়ে স্ত্রীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এবং নারীকে উপহার দিচ্ছে নানা রকম রোগ। 

তামাক সেবন এবং উৎপাদন পুঁজিতান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণের হাতিয়ার, কোনো অবস্থাতেই নারীর সমধিকারের মাধ্যম হতে পারে না। এই সহজ সত্যটি বুঝতে হবে।

ফরিদা আখতার

নির্বাহী পরিচালক

উবিনীগ

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh