মানবিকতা জাগরণের মাস রমজান

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এ বছর পালিত হচ্ছে সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান। মহামারি সংক্রমণ ঠেকাতে সারাবিশ্বের সঙ্গে আমাদের দেশেও চলছে লকডাউন। এ ফল ভোগ করতে হচ্ছে সব শ্রেণির মানুুষকে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষদের রোগের চেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে জীবিকা। তাই সক্ষম মানুষদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব বর্তেছে এইসব বিপন্ন মানুষের প্রতি সমবেদনার প্রতিফলন ঘটানোর।

অফুরন্ত কল্যাণের বার্তাবাহী মাহে রমজানুল মোবারকের আজ ১৩ তারিখ। এ মাসের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে হজরত সালমান ফারসি (রা.) বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসের এক পর্যায়ে মহানবী (সা.) এরশাদ করেছেন, এটা সমবেদনার মাস।

পারস্পরিক সম্প্রীতি, সহানুভূতি পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বের অন্যতম শর্ত। তাই ইসলামে এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন মজিদে মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন ও সব মানুষের সঙ্গে সদাচার এবং সহানুভূতিমূলক আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব অরোপ করা হয়েছে। ইসলামে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের প্রতি কর্তব্য পালনের ওপর এতই জোর দেওয়া হয়েছে, বিশ্বের অন্য কোনো ধর্ম ও আদর্শে যার নজির পাওয়া যায় না। মহানবী (সা.) বলেন, জিব্রাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে এতই তাগিদ দিতে থাকেন যে, আমি মনে করেছিলাম প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত করা হবে।

আদম-হাওয়ার সন্তান হিসেবে পৃথিবীর সব মানুষ একই পরিবারের সদস্য এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হতে হবে সহমর্মিতা ও সহানুভূতিমূলক- এটাই ইসলামের শিক্ষা। কোরআন মজিদে মুসলমানদের একে অপরের ভাই বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (সুরা হুজুরাত-১০)

বিশ্বমানবতা একই আদম-হাওয়ার সন্তান বা একই পরিবারের সদস্য হিসেবে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকবে, একজনের দুঃখ ও আনন্দে অন্যরাও মানসিকভাবে অংশগ্রহণ করবে, একই দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো পরস্পরের সম্পর্ক হবে নিবিড়- এটাই কাম্য আল্লাহ ও তার প্রেরিত মহাপুরুষদের।

হাদিস শরিফে পুরো সৃষ্টি জগতকে আল্লাহর পরিবার সাব্যস্ত করে সৃষ্টির সেবাকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার উপায় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত নবী করীম (সা.) এরশাদ করেন, গোটা সৃষ্টিকুল আল্লাহর পরিবার। এই পরিবারের কল্যাণে যে ব্যক্তি আত্মনিয়োগ করে, সে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়।

এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস প্রসিদ্ধ রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম। তুমি আমাকে খাবার দাওনি। মানুষ বলবে, হে আল্লাহ আপনি রাব্বুল আলামিন। আপনাকে খাওয়াব কীভাবে? তিনি বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল। তুমি তাকে খাবার দাওনি। সেদিন তুমি তাকে খাবার দিলে আজ তা আমার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম। তুমি আমাকে পানি দাওনি। মানুষ বলবে, আপনি সারা জগতের পালনকর্তা। আপনাকে পানি পান করাব কীভাবে? আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল। তুমি তাকে পানি দাওনি। সেদিন যদি তাকে পানি দিতে, তাহলে আজ তা আমার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ ছিলাম। তুমি আমার সেবা করনি। মানুষ বলবে, আপনি রাব্বুল আলামিন। আপনাকে সেবা করব কীভাবে? আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা রোগে কাতর ছিল। তুমি তার সেবা করনি। সেদিন তুমি তার সেবা করলে আমাকে সেখানে পেতে।

মহানবী (সা.) গোটা মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, কারও চোখে যন্ত্রণা হলে যেমন পুরো শরীর অস্বস্তি বোধ করে, মাথাব্যথা হলে যেমন পুরো শরীর অসুস্থ হয়, গোটা মুসলিম উম্মাহ এমনই।

পারস্যের কবি শেখ সাদী তার বিখ্যাত গুলিস্তা গ্রন্থে কাব্যিক ভাষায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আদম সন্তানরা একটি দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো। কেননা তাদের সৃষ্টির মূল উৎস একটাই। একটি অঙ্গে যখন যন্ত্রণা হয়, অন্য অঙ্গগুলোরও তখন স্বস্তি থাকে না। অন্যদের ব্যথায় যদি নির্বিকার থাক, তাহলে তুমি মানুষ নামে আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য নও।

ইসলাম এমন সমাজ ব্যবস্থার নির্দেশনা দেয়, যেখানে একে অপরের সুখ ও আনন্দে যেমন শরীক হবে, তেমনি দুঃখ কষ্টের বেলায়ও সবাই একে অপরের পাশে এসে দাঁড়াবে।

মাহে রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিনদের মধ্যে পরস্পরের মধ্যে সহানুভূতি ও সমবেদনার গুুণ অর্জিত হয়। বিশেষ করে যারা দুস্থ, অনাহারের কষ্ট যাদের সহ্য করতে হয়, তাদের ব্যথা বোঝার সুযোগ হয় সিয়াম পালনের কারণে। যারা কখনো ক্ষুধার যন্ত্রণা পোহায়নি, খাবারের অভাব কাকে বলে, তা যারা জানে না, তারা কীভাবে বুঝবে অভাবী লোকদের ব্যথা? লাগাতার একমাস রোজা রাখার কারণে এই ব্যক্তিরা নিরন্ন মানুষদের প্রতি সদয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারে। পুরো একমাস রোজার হুকুম দেওয়ার একটা তাৎপর্য বোঝা যায় এখান থেকে। কেননা দু’একদিন খাবার গ্রহণে ব্যত্যয়ের কোনো প্রভাব নাও পড়তে পারে; কিন্তু লাগাতার একমাস সুনির্দিষ্ট দীর্ঘ সময় খাবার গ্রহণ থেকে বাধ্যতামূলক বিরত থাকার অভিজ্ঞতা অবশ্যই একজন মানুষকে সচেতন করবে। অভাবী ও গরিব মানুষদের প্রতি অন্তরে দয়ার উদ্রেক করবে এবং তাদের কল্যাণে ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে।

এ জন্যই মহানবী (সা.) ইসলামের অন্যতম ভিত্তি সাব্যস্ত করেছেন রমজান মাসের সিয়ামকে। তিনি আরও বলেছেন, এ মাসে যে ব্যক্তি তার অধীনস্তের কাজের ভার লাঘব করবে, তার পাপরাশি ক্ষমা করে তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।

আসমানি সব শরিয়তেই বনি আদমের পারস্পরিক মৈত্রী ও সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক ও আচরণের নির্দেশনা রয়েছে। মাহে রমজান উম্মতে মুহাম্মদির জন্য সম্প্রীতি ও সমবেদনার অমিয় শিক্ষা নিয়ে উপস্থিত হয়। রমজানের শেষে ঈদ উৎসবে যেন সচ্ছল পরিবারের সঙ্গে অভাবী পরিবারের সদস্যরাও অংশ নিতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে বলা হয়েছে বিশেষভাবে। ঈদের আগে সদাকাতুল ফিতর আদায়ের বিধান আনন্দ উৎসবে সবাইকে শরিক করে নেওয়ার অনুপম ব্যবস্থা। তেমনি গোটা মাসের রোজা পালনে যেসব ত্রুটি বিচ্যুতি হয়ে যায়, তার প্রতিকার এই সদকা। এ জন্য মহানবী (সা.) এটিকে রোজার পরিশুদ্ধি ও অভাবীদের খাবার বলে আখ্যায়িত করেছেন। রমজানের শেষ দশকে মুসলিম সমাজে এই আর্থিক কর্তব্যটি পালনে আন্তরিক উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়।

প্রকৃতপক্ষে অধীনস্তদের প্রতি সদয় আচরণের এবং দুস্থদের প্রতি সহানুভূতির তাগিদ রয়েছে সারা বছরের জন্য। তাই রমজানের এই শিক্ষা যদি সারা বছর অনুসরণ করা যায়, তাহলে যেমন সিয়াম পালন সার্থক হবে, তেমনি সমাজে নেমে আসতে পারে জান্নাতি পরিবেশ। আসুন আমরা এ বছর সিয়াম সাধনার মাসে আমাদের এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটির উৎকর্ষ সাধনে এবং এটির বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোয় আরও যত্নবান হই।

লেখক: মাওলানা লিয়াকত আলী, ইসলামি চিন্তাবিদ

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh