বাংলা নববর্ষ: অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন

সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন আল্লামা আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজী চান্দ্রবর্ষ আর সৌরবর্ষের সমন্বয়ে সেকালে সুবে বাংলার জন্য যে ফসলি সন তৈরি করেছিলেন, তা-ই আমাদের বঙ্গাব্দ। 

কৃষিপ্রধান বাংলা মুল্লুকে বাংলা অর্থবছর শুরু হয় পহেলা বৈশাখ থেকে। শীতকালীন ফসল বোনার মৌসুম কার্তিক মাস আর ফসল তোলার মৌসুম হলো মাঘের শেষ থেকে চৈত্রের প্রথম অবধি। 

সরকার মহাজন আর জমিদার শ্রেণি বুঝে নিয়েছিল চৈত্র মাসের মধ্যেই যা কিছু পাওনা তা কৃষকের কাছ থেকে নিয়ে নিতে হবে, ছলে, বলে কিংবা কৌশলে। কেননা চৈত্র শেষ হয়ে গেলে কৃষকের হাতে আর কোনো টাকা থাকবে না। সুতরাং চৈত্র কৃষককে নিংড়ে নেয়ার মাস, আর জমিদার, মহাজন, দোকানদার ও পাওনাদার গোষ্ঠীর কাছে চৈত্র হলো আদায় ওসুলের মাস।

এজন্যই অতীতের জমিদাররা বসাতেন পুণ্যাহ। এই পুণ্যাহর দিনে তামাম প্রজাপাটকে যেতে হতো জমিদার বাড়ি। প্রজাদের আকৃষ্ট করার জন্য এ সময় জমিদারবাড়িতে চলত লাঠিখেলা, জমতো কবি গানের আসর, ঘোষণা করা হতো সালতামামিতে খাজনা শোধ করলে বকেয়া সুদ লাগবে না। এই পুণ্যাহর দিনে জমিদার বাবুরা সাধারণ প্রজা সাধারণকে দর্শন দিতেন। খাজনা দিয়ে, বাজনা শুনে প্রজাপাট মিষ্টিমুখ করে বাড়ি ফিরে যেত। এখানে প্রজার স্বার্থ বা আনন্দের উৎস কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও নববর্ষ বাঙালি কৃষকের জন্য একটি উৎসবের দিন হয়ে আসে। 

পৃথিবীর সব দেশেই আধিপত্যকারী শ্রেণির সংস্কৃতিই জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে পরিগণিত হয় ও উৎসবপাগল আমজনতা সেই মেওয়া লুফে নেয়। জমিদার মহাজনদের ভাড়াটে লাঠিয়ালের লাঠিখেলা, কুস্তিগিরের কুস্তি কসরত আর বায়না করা কবিয়ালের কবিগান ছিল উৎপাদক কৃষক-প্রজাকে নিংড়ে নেয়ার মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতিপূরণ। 

আমরা এখনো দেখি, আমাদের জাতীয় উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত সম্প্রদায় হলো কৃষক। যদিও আমরা এখন আর আক্ষরিক অর্থেই একটা কৃষিপ্রধান অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে নেই। অথচ এই পুঁজিবাদী সমাজে থেকেও এমন প্রহসনের ভেতর দিয়ে কি আমরা যাচ্ছি না? আমরা সরকারকে যে ট্যাক্স দেই তা কোথায়, কোন খাতে কতটা খরচ হয় আমরা কিছু জানি না। আমাদের গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ানো হয়, আমরা তার কোনো প্রতিবাদ করি না। আমাদের সামনে উন্নয়নের একটা মুলা ঝোলানো হয়। কাঠমোগত উন্নয়ন যে প্রকৃত-অর্থে উন্নয়ন না, সে কথা আমরা মুখ ফুটে বলি না। কারণ আমাদের বলার স্বাধীনতাও প্রশ্নবিদ্ধ। আমরাও উৎসবে বুঁদ হয়ে থাকি। উৎসবপ্রবণ জাতি মূলত আত্মকেন্দ্রিক হয়। সামগ্রিকতায় তাদের উৎসাহ কম। তারা বিপ্লবে অনীহ। তাই করপোরেট জগৎ আমাদের সামনে নানা উৎসবের মুলা ঝুলিয়ে রাখে। আমাদের জাতীয় শোক, জাতীয় গৌরব সবকিছু এক করপোরেট র‌্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে উৎসবের আমেজে আমাদের সামনে হাজির করা হয়। 

এ ধরনের কর্মকাণ্ড মূলত সমাজপতিদের এক অলিখিত চক্রান্ত। সেই আমলে উৎসব আয়োজনের ছদ্মাবরণে জমিদারের লাঠিয়াল, পাইক, বরকন্দাজেরা মূলত হাতি, বাঘ, সিংহ, সাপ, শকুনসহ নানা হিংস্র বন্যপ্রাণীর মুখোশ পরে, যতসব লোমহর্ষক বীভৎস কর্মকাণ্ডের মহড়া চালাত গোটা চৈত্র মাসজুড়ে। পিঠে বড়শি গেঁথে চড়ক ঘোরানো হতো মানুষকে। অর্থাৎ প্রজাদের জানিয়ে দেয়া হতো খাজনাপাতি না দিলে কি অবস্থা তাদের হতে পারে। 

জমিদারদের উদ্যোগে ও আনুকূল্যে এই অন্তজ শ্রেণির পাইক-পেয়াদা, বরকন্দাজরা এসব মেলা, আড়ং, লাঠিখেলা, চড়ক, কবিগানের উৎসব আয়োজন চালাত চৈত্র পর্যন্ত। ইতিহাস সাক্ষী গ্রামীণ প্রজা ও কৃষককুল তথা উৎপাদক শ্রেণি নববর্ষের মতো এইসব উৎসব আয়োজন ও পার্বণ কখনো পালন করেনি। বরং জমিদারের পাইক-পেয়াদাদের ঢাকের বাড়ি শুনে গ্রামীণ কৃষক দুরু দুরু বুকে উপলব্ধি করত সালতামামির দিন এসে গেছে; প্রয়োজনে হাঁড়ি-কুড়ি বিক্রি করে হলেও যাবতীয় ধার-দেনা পরিশোধ করতে হবে। 

পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলে পশ্চিমাদের বিরোধিতায় বাঙালি যে বাংলা সনকে গ্রহণ করেছিল, তা ছিল নিছক রাজনৈতিক। শিক্ষিত বাঙালির মানস জগতে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঘটতে থাকে। রাজনীতির ক্ষেত্রে যেমন গণতন্ত্র ও স্বাধিকারের আন্দোলন, ভাষার ক্ষেত্রে যেমন বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম, তেমন বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ব্যাপারগুলো সামনে চলে আসে। আমাদের রাজনীতির সব রণকৌশল এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। 

কৃষিপ্রধান বাংলার শাসন কাঠামোয়ও অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আর সন হিসেবে পহেলা বৈশাখ আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক স্থায়ী ভীত গড়তে সক্ষম হয়েছে। 

স্বাধীনতা-পরবর্তীকাল থেকে বাংলা নববর্ষ আক্ষরিক অর্থেই বাঙালির একটা উৎসবের দিন। যদিও করপোরেট বাণিজ্যের জোয়ারে এর আঙ্গিকে যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে। এসো-হে-বৈশাখের সুরে যেন দেশের সব হাটখোলা বটতলা কোলাহল মুখরিত। সত্যিই কি তা-ই? এই দিনটা কি নিছকই একটা উৎসবের দিন? আগেকার দিনে সাহা-মুৎসুদ্দিরা কোনো একটা উপলক্ষ পেলেই মেলা জমাতো উদ্দেশ্য নিছক বেনিয়াবৃত্তি। সে জায়গায় এসেছে পাশ্চাত্যের ‘শোবিজ’। এটি যে আমাদের দেশে এসে দেশজ সংস্কৃতির ধারক ও বাহকের ভূমিকায় করপোরেট বাণিজ্যকে প্রসারিত করেছে, সে বিষয়টা এখন সর্বজনবিদিত। 

তবে বেনিয়াবৃত্তির ধারায় যখন কোনো সংস্কৃতি গড়িয়ে যেতে থাকে, তখন সে সংস্কৃতির পরিণতি সম্পর্কে সংশয় না জেগে পারে না। 

এক সময়ে সমাজপতিরা ভাবতেন উৎসবের গায়ে একটি ধর্মীয় আবরণ পরিয়ে দিলে তাতে খানিক গতি আনা যায়। আর তাইতো আবির্ভূত হয়েছিল চড়ক পূজার। চৈত্রসংক্রান্তি আর চড়ক পূজা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। অথচ আদিতে এই চড়ক পূজার সাথে দেবদেবীর কোনো সম্পর্ক ছিল না। পরবর্তীকালে অন্তজশ্রেণির দেবতা শিবকে এর সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়। 

সেই একই ধারাবাহিকতায় আকবরের রত্ন সভায় বাংলা সন আরবি হিজরি সনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তৈরি করা হয়। বাংলা সনের ‘সন’ শব্দটি আরবি। পয়লা বৈশাখের ‘পয়লা’ শব্দটি ফার্সি। ‘হালখাতা’ মুসলমানি শব্দ। সুতরাং হিংস্র জীব-জন্তুর মুখোশ নিয়ে রাস্তাঘাটে যতই মঙ্গল শোভাযাত্রা হোক না কেন, এর ভিত্তি কিন্তু অন্যত্র।

তবে বাংলা নববর্ষের শেকড় এদেশের মাটির গভীরে প্রোথিত হয়ে গেছে। এটি সর্বজনীন। ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, পেশা নির্বিশেষে এই দিনটা সকলের। বাংলা নববর্ষ দিনটিকে রাজনীতি ও বাণিজ্যিকীকরণের বাইরে নিয়ে গিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে গ্রহণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh