বাজেটে অর্থ পাচার এবং পাচারকারীদের দেশত্যাগ প্রসঙ্গ

বাংলাদেশ সম্প্রতি করোনা আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে ১৮তম আর মৃতের দিক থেকে ৩১তম স্থানে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে এবং সরকার শেষ পর্যন্ত লাল জোন চিহ্নিত স্থানগুলো লকডাউন করে সংক্রমণ ও মৃত্যুপ্রতিরোধ করতে চাইছে, তাতে কী ফল দেবে, মহামারি আমরা প্রতিরোধ করতে পারব কি না- তা আগামী দিনেই বলা যাবে; কিন্তু সরকার ও জনগণের নানা দিক থেকে নানা অসফলতা-সীমাবদ্ধতা-দুর্বলতা ও অশুভ-মন্দ প্রবণতার মধ্যে করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণের দুর্ভাগ্য মেনে নিয়েও এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, না খেয়ে এখনো কোনো মৃতু্যু না হওয়াটা জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

এমন কি সরকার নিয়মানুযায়ী যথাসময়ে বাজেট পর্যন্ত দিয়েছে। বাজেট নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনাও যথারীতি চলছে। আসলে করোনাকাল না গেলে কিছুই বোঝা যাবে না। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও সঠিকভাবেই বলেছেন, ‘এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে পারলে, আমরা আলোর পথে যেতে পারব।’

বলাই বাহুল্য বাজেট নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ না থাকলেও ব্যবসায়ী-আমলা-রাজনীতিক টাকাওয়ালা ব্যক্তিদের বিদেশ গমন, অর্থ পাচার আর সেই সঙ্গে বিদেশে সম্পদ ও ব্যবসা নিয়ে সবাই সমানভাবে সোচ্চার। কেউ কেউ তো বিমান ভাড়া করে সস্ত্রীক, বিএনপির সাবেক মন্ত্রী মোর্শেদ খান ও প্রখ্যাত ব্যবসায়ী সোহেল এফ রহমান এবং নিজস্ব বিমান নিয়ে মামলার আসামি শিকদার ভ্রাতৃদ্বয় দেশ থেকে চলে গেছেন। আর ‘এ যাত্রার সঙ্গে অর্থ পাচারের কী সম্পর্ক আছে, সেই প্রশ্নে সুনির্দিষ্টভাবে কেউ কিছু তেমন বলতে পারছেন না। তবে সবাই ক্ষেপে আছেন।’ মধ্যবিত্তরা সাধারণভাবে যখন সংকটে এবং ঘর থেকে বের হতে পারছেন না, তখন বিত্তবানদের এভাবে বিদেশ যাত্রার বিষয়টা বিরাট ইস্যু হওয়াটাই স্বাভাবিক।

২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি-রফতানি ও ভুয়া বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ পাচার প্রমাণিত হলে ৫০ শতাংশ কর আরোপ করার বিধান রাখা হয়েছে। এ দিকে পুঁজি পাচার ঠেকাতে অর্থাৎ দেশের বাইরে অর্থ পরিশোধ, বৈদেশিক বিনিময় ও সিকিউরিটিজের লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণ-রৌপ্যের আমদানি, রফতানি সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের জন্য সরকার পুরনো আইনকে যুগোপযোগী করে ‘বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থাপনা আইন’ নামে একটি নতুন আইন করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ওই চূড়ান্ত খসড়া তাদের ওয়েবসাইটে দিয়ে জনমতামত জানানোর অনুরোধও করেছে বলে জানা গেছে। প্রসঙ্গত, দেশের দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে দীর্ঘ ৬ বছর পরিচালক হিসেবে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি- আইন যুগোপযোগী ও কঠোর হলেও এবং ধরা পড়লে শতকরা ৫০ শতাংশ কর দেয়ার বিধান থাকলেও পুঁজি পাচার রোধ করা বেশ জটিল ও কঠিন হবে। এই ক্ষেত্রে ফাঁক-ফোকর বেহুলা-লখীন্দরের লোহার বাসরঘরের ছিদ্রের চাইতে বিস্তর ও বহুমুখী। একই সঙ্গে ক্ষতির বিষয়। টাকা কালো হলেও দেশে থাকে, নড়চড়ও হয়; কিন্তু বিদেশে পাচার হলে হয় সর্বৈব ক্ষতি, তাই জনগণের ক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সরকার তথা আমদানি-রফতানি ও বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে ফাঁক-ফোকর উহ্য, আইন প্রয়োগের কঠিন কাজটি করা ভিন্ন এখন বিকল্প নেই। এটা চ্যালেঞ্জিং এবং তা দেশের প্রত্যক্ষভাবে অর্থনীতি এবং পরোক্ষভাবে রাজনীতি ও সমাজের উন্নতি অগ্রগতি বিশেষত গণতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রসঙ্গত, পত্র পত্রিকায় অর্থমন্ত্রীর বাজেট-উত্তর ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন যতটুকু লক্ষ্য করা গেছে, তাতে মনে হয়েছে অর্থ পাচার ইস্যুতেই তিনি সবচেয়ে বিক্ষিপ্ত ভাব প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিজেদের ওয়েবসাইটেই ঘোষণা দিচ্ছেন বিভিন্ন দেশে তাদের বিনিয়োগ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে অন্ধকারে। অর্থ পাচারকারীদের ধরতে সরকার কি আন্তরিক?’ জবাব দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রথমে খোঁজেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে। তাকে না পেয়ে জবাব দেয়ার দায়িত্ব দেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের একজনকে। তিনি অপারগতা প্রকাশ করতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে খোঁজেন। গভর্নরকে পাওয়ার পর অবশ্য অর্থমন্ত্রীই প্রশ্নের জবাব দেন।

প্রশ্নের উত্তর দিতে এভাবে হাতড়িয়ে বেড়ানো দিয়ে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায়, এই ইস্যুতে সরকার কতটা বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে। তাই এ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মনে অনেক প্রশ্নের উদয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক পর্যায়ে তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গভর্নরকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বিদেশে অর্থ চলে যাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোকদ্দমা হচ্ছে না। আইনটিতে কোনো ত্রুটি থাকলে নতুন আইন করতে হবে।’ পরে তিনিই আবার বলেন, ‘আসলে এ ব্যাপারে যথাযথ কোনো আইনই নেই।’ তবে এগুলো অনেক কমেছে এবং স্বয়ংক্রিয় হলে আরো কমবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তারপর তিনি বলেন, ‘কোনো সরকারই চাইবে না অর্থ বিদেশে চলে যাক।’ এই কথাটা যখন পড়েছি, তখন খটকায় একশেষ হয়েছি। কোনো সরকার মানে? অতীতের সব সরকার কী? যদি তাই হয়, তবে খালেদা জিয়ার সৌদি আরব যাওয়ার সময় সুটকেস ভর্তি করে টাকা নিয়ে যাওয়ার কিংবা তারেক-কোকোর অর্থ পাচারের অভিযোগের হবেটা কী? তারপর বিষয়টি তিনি সাংবাদিক বা জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা হলে কেউ যদি আমাকে, গভর্নরকে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে জানান, আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব।’

এই কথাগুলো শোনার পর বিগত কয়েক বছর ধরে পত্রিকায় অর্থ পাচার সংক্রান্ত যেসব খবর বের হয়েছে, তা চোখের সামনে ভেসে উঠল। খবরগুলো নিয়ে কোনো সরকারি দপ্তর অনুসন্ধান বা ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা বোধ করি এখন অর্থমন্ত্রীকে একজন নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন করতে পারাই যায়। সব শেষে তিনি বলেছেন, ‘যারা দেশে টাকা রাখতে চান না, তারা একেবারেই বিদেশ চলে যাক না।’ আওয়ামী লীগের গত নির্বাচনী ইশতেহারে লেখা আছে, ‘কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়’, ‘আইনসমূহের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে’ ইত্যাদি। যারা বিদেশে টাকা রেখেছেন বা রাখতে চাইছেন, তাদের বিদেশে চলে যেতে দিতে চাওয়াটা কি আইনি! আইন অনুযায়ী তো তাদের আটক, মামলা ও শাস্তি দেয়া জরুরি এবং অর্থমন্ত্রীরই তো এ ব্যাপারে উদ্যোগে নেয়ার কথা। এ নিয়ে পাগলারে সাঁকো নাড়াতে মানা করার প্রবাদটাই কেবল মনে পড়ে!

প্রসঙ্গত, মালয়েশিয়ায় ‘মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সম্পত্তিবানদের হুমড়ি  খেয়ে পড়ার খবর এবং কতজন সেখানে দ্বিতীয় নিবাস গড়েছেন সেই সংখ্যা বিগত বছরগুলোতে বার বার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায়, বাংলাদেশ নাকি চীন ও যুক্তরাজ্যের পরে এই প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে। থাইল্যান্ড দ্বিতীয় নিবাস গড়ার সুযোগ দিলে কতটুকু কি সেখানে হয়েছে, সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে শুনেছি, সেখানে অনেকেই বাড়ি ও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। সম্রাট ইস্যুতে এমন খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকাতেও অর্থ পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সর্বোপরি কানাডায় তো অর্থবানদের অবৈধ অর্থ পাচার-বাড়ি কেনা-সন্তানসহ স্ত্রী পাঠানো নিয়ে ভারতীয় পরিচালকের ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘বেগমপুরা’ শব্দ প্রবাসী বাঙালিদের কাছে খুবই পপুলার। ব্যবসায়ী-আমলা-রাজনীতিক অর্থ পাচারকারীদের নাম নাকি সেখানকার মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ডাকাত প্রশান্ত কুমার হালদার নাকি সেখানেই চম্পট দিয়েছেন। জন্মভূমি হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা বিবেচনায় ‘রুখো পাচারকারী বাঁচাও দেশ’ স্লোগান নিয়ে সেখানকার প্রবাসী বাঙালিরা ব্যতিক্রমী প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। যাদের নাম অর্থ প্রচারের তালিকায় আছে, তাদের একজন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নাকি মামলাও করেছেন। সর্বোপরি এটাও জানা যায়, কখনো কখনো সরকারি সংস্থাগুলো এই ইস্যু নিয়ে অনুসন্ধানের ঘোষণা দিলেও তা অগ্রসর হয়নি।

এইসব যদি সত্য হয়, তবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতাহারের ‘অর্থ পাচার রোধ করার লক্ষ্য’ শিরোনামের কৌশল ও পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবায়নের সময় এখন সমুপস্থিত। প্রসঙ্গত, কালো টাকায় কর ফাঁকি দেয়া হলেও তা দেশে থাকে, নড়চড় হয়তো হয়; কিন্তু বিদেশে টাকা পাচার হলে আম-ছালা দুই-ই শূন্য হয়। পাকিস্তানি আমলে ২২ পারিবারের লুটপাট ও পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ পাচার নিয়েই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান হয়েছিল। এক গবেষণা থেকে জানা যায়, তখন পাচার হতো ১৫ থেকে ২৫ কোটি টাকার মতো। এখন হয় কত? মুক্তিযুদ্ধের আগে বাঙালি পুঁজিপতিদের কোনো সংগঠন ও স্বতন্ত্র আন্দোলন ছিল না। এখন তো আছে। দেশের উন্নয়ন তো তাদেরও উন্নয়ন। তারাও কি বলতে পারবেন কত টাকা পাচার হচ্ছে, আর টাকা পাচারের জন্য কতটা উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের এবং তাদেরও!

ইতোমধ্যে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় বার বছর এবং বিগত নির্বাচনের দেড় বছর সময় অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তাই এখনই সময় অঙ্গীকারের কৌশল ও পদক্ষেপগুলোকে বাস্তবায়িত করার। জনগণ চায়, ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)’ এবং ‘অপরাধ ও শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে অর্জিত সম্পদ পাচার রোধ এবং পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে’ সরকারের সব কার্যক্রম জনগণের সামনে প্রতিভাত হয়ে উঠুক। এটা হোক মুজিব বর্ষের একান্ত অঙ্গীকার।


শেখর দত্ত, কলাম লেখক, রাজনীতিক

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

<