কামাল লোহানী: প্রগতির বটবৃক্ষের প্রস্থান

বেশ কিছুদিন ধরেই বিশিষ্ট সাংবাদিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর অসুস্থতার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। অবশেষে ২০ জুন সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর মহাখালীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন চির বিদ্রোহী এই ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এদেশের সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। 

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ; স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন- সর্বক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন কামাল লোহানী। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার খান সনতলা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার নাম রাখা হয়েছিল আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। পাবনা জেলা স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৫২ সালে বাঙালির ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার পর প্রতিটি সংগ্রামে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন কামাল লোহানী। সংগ্রামী জীবনে বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গেও এক কারাকক্ষে বন্দিজীবন কাটিয়েছিলেন তিনি। 

স্কুলে থাকতেই কমিউনিস্ট মতাদর্শিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায়, উচ্চ মাধ্যমিকের পর তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর এগোয়নি। এর মধ্যে সাংবাদিকতা শুরু করেন ১৯৫৫ সালে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকা দিয়ে। এরপর দৈনিক আজাদ, সংবাদ, জনপদ, বঙ্গবার্তা, পূর্বদেশ, বাংলার বাণী, দৈনিক বার্তার মতো পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী ভূমিকায়। ১৯৬০ সালে কামাল লোহানী বিয়ে করেন। স্ত্রী দীপ্তি লোহানী বেশ কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে কামাল লোহানীও তাতে যুক্ত হন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিকামী বাঙালি যে খবরটি শোনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে ছিল, উন্মুখ হয়েছিল, সেই বিজয়ের খবরটিও এসেছিল কামাল লোহানীর কণ্ঠেই। ‘আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।’ খুব সংক্ষিপ্ত এই ঘোষণার পর সবাইকে নিয়ে মেতেছিলেন বিজয় উদযাপনে, সেই সঙ্গে গোটা দেশও।

জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকিত ছিলেন। তবে এখনকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ব্যাপারে হতাশ ছিলেন কামাল লোহানী। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান আমলে লবণের দাম বেড়েছিল, তখন গান লেখা হয়েছিল। কবিতা লেখা হয়েছিল; কিন্তু আজ দুইশ’ টাকার বেশি দাম উঠলেও তা নিয়ে কোনো গান লেখা হয় না, কবিতা হয় না।’

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকালের প্রতি কামাল লোহানীর ছিল বিশেষ ভালোবাসা। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি নিজে লিখতে পারতেন না। মুখে বলতেন, অন্য কাউকে তা লিখে নিতে হতো। তারপরও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজ উদ্যোগে শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে সেইসব লেখা পাঠাতেন আমাদের কাছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সাম্প্রতিক দেশকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসেছিলেন তিনি। এক মাথা ধবধবে সাদা চুল। সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি। ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন এই পত্রিকা নিয়ে। টেলিফোনে আলাপকালে পত্রিকাটি ভালো করার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে সম্পাদকসহ আমাদের নানারকম পরামর্শ দিতেন। তিনি ছিলেন আমাদের উপদেষ্টার মতো। সাম্প্রতিক দেশকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এসে পত্রিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সপ্তাহ শেষে সাম্প্রতিক দেশকাল ঘটনার পেছনের খবর আর সংবাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরে, দেশের দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর পার্থক্য এটাই। পত্রিকাটিকে ভিন্নমতের দেখেছি।’ এটুকু বলেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। তিনি তার বক্তব্যে চিরকালের চেনা সেই প্রতিবাদের সুর ছড়িয়ে বলেন, আমি সাবধান করে দিতে চাই, সামনে ভয়ানক পরিস্থিতি আসছে। মানুষের কথা বলতে গেলে বিপন্ন হতে হবে। ৫৭ ধারা পরিবর্তন করে আরো ভয়ানক আইন ৩২ ধারা এসেছে। কেউই এই কালো আইনের প্রতিবাদ করছে না। এমন আইনের বিরুদ্ধে জোরেশোরে প্রতিবাদ করা উচিত।

সাম্প্রতিক দেশকাল সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, ‘পত্রিকাটির চরিত্র- তারা জনগণের কথা বলতে চাইছে। সামনে চলার পথে তারা যেন এভাবেই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। সত্যিকার সাংবাদিকতার জন্য সাহস নিয়ে এগোতে হবে। পত্রিকাটির প্রকাশকেরও অসাধারণ সাহস আছে। তিনি লোকসান দিয়েও পত্রিকাটি চালিয়ে নিচ্ছেন।’ কামাল লোহানী সাম্প্রতিক দেশকাল কার্যালয়ে প্রতি সপ্তাহে একটি সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডা অনুষ্ঠান করার সুপারিশ করেন। এই পরামর্শের খানিকটা পরিবর্তিত রূপ হিসেবেই পরবর্তীতে সাম্প্রতিক দেশকালে প্রতি মাসে একটি বৈঠকী ও গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আমৃত্যু এই মানুষটি তার সৃজনশীল চিন্তা-চেতনার ছাপ রেখে গেছেন।

কামাল লোহানীর লেখা অসংখ্য বই রয়ে গেছে, যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে এদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করতে সাহায্য করবে। তার লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘আমরা হারবো না’, ‘সত্যি কথা বলতে কী’, ‘যেন ভুলে না যাই’, ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘এ দেশ আমার গর্ব’, ‘আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম’, ‘লড়াইয়ের গান’, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার’, ‘দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত’ এবং কবিতার বই ‘শব্দের বিদ্রোহ।’

কামাল লোহানী ২০১৫ সালে সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও তিনি কলকাতা পুরসভার দ্বিশতবর্ষ সম্মাননা, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সম্মাননা, রাজশাহী লেখক সংঘ সম্মাননা, ক্রান্তি স্মারক, ঋষিজ সম্মাননা ও স্মারক, জাহানারা ইমাম পদকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

কামাল লোহানী আজ আমাদের মাঝে নেই। অভিভাবকের মতো তিনি আমাদের পাশে ছিলেন। তার শূন্যতা সাম্প্রতিক দেশকাল অনুভব করবে সব সময়; কিন্তু আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে তার অবদান, বিপ্লবে ও বিদ্রোহে তার অগ্রগামী কণ্ঠস্বর আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে রয়ে যাবে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাম্প্রতিক দেশকাল


মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh