ফনেটিক ইউনিজয়
ফিচার
অতিথি পাখির পদচারণায় মুখর জাবি
দীপংকর গৌতম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছরই বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয়ে এসে জড়ো হয় অতিথি পাখিরা। তার মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। রাতে কুয়াশা, সকালে শিশিরকণার ঝলকানি। ঋতুর এ সন্ধিক্ষণে প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ হয় ভিন্ন মাত্রা। বরাবরের মতো এবারও রক্তকমল শোভিত লেকগুলোয় আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি। অতিথি পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ঘুম ভাঙে। বছরের সেপ্টেম্বরের শেষেই প্রতি বছরই উত্তরের শীতপ্রধান সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, জিনজিয়াং ও ভারতে শীত নামতে শুরু করে। তখন সেখানে পাখিদের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে আর কঠিন হয়ে পড়ে জীবন রক্ষা করা। তাই হাজার হাজার অতিথি পাখি দক্ষিণ এশিয়ার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট-বড় ১৪-১৫টি লেক থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনের সামনের লেক, জাহানারা ইমাম ও প্রীতিলতা হলসংলগ্ন লেক, ট্রান্সপটের কাছের লেক, জিমনেসিয়াম-সংলগ্ন লেক ও ডব্লিউআরসি (ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টার)-সংলগ্ন লেকে অতিথি পাখির পদচারণা বেশি। মূলত নভেম্বরের  প্রথম দিকে এরা আসে, আবার মার্চের শেষ দিকে ফিরে যায়। এ কারণে এখানকার লেকগুলোতে পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে, পাশাপাশি এদের দেখার জন্য ভিড় করতে শুরু করেছে উৎসুক পাখি প্রেমী মানুষ। আড্ডা জমাচ্ছেন ফটোগ্রাফাররা। ঝাঁকে ঝাঁকে আসা পাখিরা লেকের জলে মেতে থাকছে জলকেলী আর ডুব-সাঁতারে। কখনো এরা চক্রাকারে উড়ছে ক্যাম্পাসের মুক্ত আকাশজুড়ে। সব মিলিয়ে পাখির কিচিরমিচিরে ক্যাম্পাসে বিরাজ করছে মধুময় সুরের আবহ; যা দেখে দর্শক বিমোহিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দর্শনার্থীদের জন্য এবারও পাখিমেলা আয়োজন করা হবে।
পাখি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ফিরোজ বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরে যে পাখিগুলো আসে এগুলোর অধিকাংশই আমাদের দেশীয় হাঁস জাতীয় পাখি। অল্প কয়েক প্রজাতির বিদেশি পাখিও আসে। তবে তারা আসে ডিসেম্বরে। এখন যে পাখিগুলো এসেছে এগুলো সরালি। এরা সাধারণত বাংলাদেশের হিমালয়ের কাছাকাছি দূরত্বের জেলাগুলো ও হাওর-বাওরে বাস করে। জাহাঙ্গীরনগরেও এদের ডিম পাড়া ও বাচ্চা ফোটানোর ঘটনা ঘটেছে। এদের অতিথি বা পরিযায়ী পাখি বলা যায় না। হয়তো জাহাঙ্গীরনগরের জন্য অতিথি বলা যেতে পারে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগ সূত্রে আরও জানা যায়, দুই ধরনের পাখির আগমন ঘটে এ ক্যাম্পাসে। এক ধরনের পাখি ডাঙ্গায় শুকনো স্থানে বা ডালে বসে বিশ্রাম নেয়। আরেক ধরনের পাখি বিশ্রাম নেয় পানিতে। এদের বেশির ভাগই হাঁস জাতীয়। এর মধ্যে সরালি, পচার্ড, ফ্লাইফেচার, গার্গেনি, ছোট জিরিয়া, পান্তামুখী, পাতারি, মুরগ্যাধি, কোম্বডাক, পাতারী হাঁস, জলকুক্কুট, খয়রা  ও কামপাখি অন্যতম।
এছাড়াও  মানিকজোড়, কলাই, ছোট নগ, জলপিপি, নাকতা, খঞ্জনা, চিতাটুপি, বামুনিয়া হাঁস, লাল গুড়গুটি, নর্দানপিনটেল ও কাস্তোচাড়া প্রভূতি পাখিও আসে এই ক্যাম্পাসে। এরা ডানায় ভর করে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসে। পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ প্রতিবছর ক্যাম্পাসে আয়োজন করে ‘পাখিমেলার’।
পাখি বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান জানান, বাংলাদেশে মোট ৬৯০ প্রজাতির পাখির মধ্যে প্রায় ২৩৮ প্রজাতির অতিথি পাখি আছে। ১৯৮৬ সাল থেকে এ ক্যাম্পাসে অতিথি পাখির পদচারণা শুরু। সে সময় জাহাঙ্গীরনগরে ৯০ প্রজাতির পাখি দেখা যেত। বর্তমানে ১৯৫ প্রজাতির পাখি দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে ১২৬টি দেশি ও ৬৯টি পরিযায়ী বা অতিথি পাখি। দেশি প্রজাতির মধ্যে ৭৮টি ক্যাম্পাসে নিয়মিত থাকছে। তিনি আরও বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব অতিথি পাখি আসে এর বেশির ভাগই হাঁস-জাতীয় ও পানিতে বসবাস করা। এর মধ্যে প্রায় ১০ প্রজাতির হাঁস-জাতীয় পাখি ক্যাম্পাসে দেখা যায়। এর মধ্যে ছোট সরালি, বড় সরালি, খঞ্জনা, পাতারি হাঁস, ভূতিহাঁস, খুন্তে হাঁস, লেঞ্জা হাঁস, গার্গেনী, ঝুঁটি হাঁস প্রধান। আরেক ধরনের পাখি বিশ্রাম নেয় পানিতে। এদের বেশিরভাগই হাঁস জাতীয়। এর মধ্যে সরালি, পচার্ড, ফ্লাইফেচার, গার্গেনি, ছোট জিরিয়া, পান্তামুখী, পাতারি, মুরগ্যাধি, কোম্বডাক, পাতারী হাঁস, জলকুক্কুট ও খয়রা পাখি অন্যতম। এছাড়া মানিকজোড়, কলাই, ছোট নগ, জলপিপি, নাকতা, খঞ্জনা, চিতাটুপি, বামুনিয়া হাঁস, লাল গুড়গুটি, নর্দানপিনটেল ও কাস্তেচাড়া প্রভৃতি পাখির দেখাও মেলে এখানে। এরা ডানায় ভর করে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এ অঞ্চলে আসে। একটু আশ্রয়ের আশায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যে পাখিরা এসে আশ্রয় নেয় বাংলা মায়ের বুকে তারা যেন কোনো ধরনের বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতির কবলে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের সবার কর্তব্য। অতিথি যে লক্ষ্মী। এর হেনস্তা হতে নেই যে। এদিকে জলাশয়ের পাশে গাড়ির হর্ণ বাজানো, ছবি তোলার জন্য পাখিদের দিকে ঢিল ছোড়া কিংবা দর্শনার্থীদের একেবারে পাখির কাছে চলে যাওয়া এসব বন্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোন তৎপরতা দেখা যায় না। পাখিমেলা করে পাখি উম্মুক্ত করা বা সচেতনতা বাড়ানোর চেয়ে জরুরি পাখিদের নিরাপত্তা দেয়া। প্রতিবেশ-পরিবেশের ভারসাম্য মানেই আমাদের সুস্থ্য উদ্বেগহীন জীবনের বিষয় আশায়। এমনো খবর জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় যে শীতে হাঁসের মাংস বলে বিক্রি হয় তা সরালি বা বালি হাঁসের মাংস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জ্ঞাতসারে এসব পাখি রাতের আঁধারে শিকার করে বিক্রি করা হয়। এ খবর সত্য না হোক তা যেমন চাই তেমনই চাই বাঙালি অতিথি আপ্যায়নের চিরায়ত বাণী, অতিথি নারায়ণ। তাদের নিরাপত্তা আমাদের দিতে হবে, উপদ্রব কমাতে আমাদের ভুমিকা নিতে হবে। নতুবা আমরা পাখিশুন্য হয়ে যাবো। যেটা মোটেও কাম্য নয়।

Disconnect