ফনেটিক ইউনিজয়
বোকা মিয়ার ইতিকথা আসহাব উদ্দীন আহমদের জীবনস্মৃতি প্রসঙ্গে
সলিমুল্লাহ খান

এই নিবন্ধটি আমি লিখিয়াছিলাম পরলোকগত মনীষী আসহাব উদ্দীন আহমদের পুত্র ও তাঁহার রচনাবলির (তিন খণ্ড) অন্যতর সম্পাদক এনতেজার উদ্দীন আহমদের আমন্ত্রণে। অল্প কয়েক দিন সময় তিনি আমাকে বাঁধিয়া দিয়াছিলেন। লেখাটি যথাসময়ে শেষও করিয়াছিলাম। সে আজ হইতে দুই বছরেরও বেশি আগেকার কথা। লেখার নিচে দাগাইয়া রাখা তারিখ অনুসারে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর নাগাদ লেখাটি তাঁহাকে পাঠাই। দুর্ভাগ্যবশত তিনি প্রস্তাব করেন লেখাটি ছাপাইতে হইলে প্রথম অনুচ্ছেদের শেষ দুই বাক্য বাদ দিতে হইবে। আমি রাজি হই নাই। তাঁহাকে অনুরোধ করিয়াছিলাম কাটাছেঁড়া ছাড়া ছাপা যদি সম্ভব না হয় তো গোটা লেখাটাই তিনি ছাপাখানার বাহিরে রাখুন-তাহাতে আমার কোন আপত্তি থাকিবে না।
তাহার পর তিনি আমার সহিত কোন প্রকার যোগাযোগ করেন নাই। প্রস্তাবিত যে সংকলন বা স্মারকগ্রন্থের জন্য এই নিবন্ধ প্রস্তুত করিয়াছিলাম সে সংকলনটি আখেরে প্রকাশিত হইয়াছিল কিনা তাহাও আর জানিতে পারি নাই। নতুন পাঠকের জ্ঞাতার্থে এখানে এনতেজার উদ্দীন আহমদ কর্তৃক বিতর্কিত আমার লেখা সেই দুই বাক্যের পুনরাবৃত্তি করিতেছি: ‘কিন্তু যতদূর জানি এই দেশ-বিশেষ এই দেশের ধুরন্ধর সমাজ-তাঁহাকে তাঁহার প্রাপ্য কদর বুঝাইয়া দেয় নাই। পরিবারের বাহিরে কোথাও কেহ তাঁহার শতবর্ষ পালন করে নাই।’
এখানে মুদ্রণের সময় পুরাতন লেখার উপর আমি কিছু কিছু প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করিয়াছি আর এই অবসরে নতুন কিছু কথাও যোগ করিবার সুযোগ গ্রহণ করিয়াছি। অস্বীকার করার উপায় নাই অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদের জীবনকাহিনী আরও বড় পরিসরে আলোচনা করার দরকার আছে। সময় ও সুযোগ হইলে হয়তো তাহা অন্য কোনদিন করিব। ইতি-সলিমুল্লাহ খান, ২৮ মে ২০১৭।

অনেক ছোটবেলা হইতেই আসহাব উদ্দীন আহমদের নাম শুনিতেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা এই জীবনে তাঁহার সহিত আমার কোনদিন দেখা হয় নাই। পরিণত বয়সেই তিনি স্বর্গলাভ করিয়াছিলেন। তিনি জন্মিয়াছিলেন ইংরেজি ১৯১৪ নাগাদ আর এন্তেকাল করিয়াছিলেন ১৯৯৪ সালে। তাহারও দেখিতে দেখিতে আজ বিশ বছর হইয়া গেল। বাঁচিয়া থাকিলে এবছর তাঁহার বয়স পাকা একশত বছর হইত। কিন্তু যতদূর জানি এই দেশ-বিশেষ এই দেশের ধুরন্ধর সমাজ-তাঁহাকে তাঁহার প্রাপ্য কদর বুঝাইয়া দেয় নাই। পরিবারের বাহিরে কোথাও কেহ তাঁহার শতবর্ষ পালন করে নাই।
আসহাব উদ্দীন আহমদ জীবনের প্রথম ভাগে পেশা হিশাবে শিক্ষকতার ব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি শিক্ষক হিশাবে কর্মরত ছিলেন জেলা শহর কুমিল্লায়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসক (ও শোষক) শ্রেণীর কা-কারখানা দেখিয়া দিনের পর দিন তাঁহার মনে অসন্তোষ জমিয়া উঠিতেছিল। শিক্ষকতার সংকীর্ণ জীবন তাঁহার বিস্বাদ লাগিতেছিল। তাঁহার ভাষায় বলিতে, ‘[শোষিত] জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যারা বৃহত্তর সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন তাঁদের পেছনের কাতারে গিয়ে দাঁড়ানোর এক অদম্য আকাক্সক্ষা আমাকে পেয়ে বসেছিল। ভাষা আন্দোলন আমাকে ধাক্কা মেরে শিক্ষাঙ্গন থেকে রাজনীতির অঙ্গনে পার করিয়ে দেয়।’ (আহমদ ২০০৪: ৩১)
তাহার পর প্রায় তিরিশ বছর তিনি একাধারে পেশাদার রাজনীতিবিদেরÑঅন্যধারে ক্ষুরধার লেখকের-জীবন যাপন করিয়াছেন। তাহার মধ্যে পনের বছর আবার আন্ডারগ্রাউন্ড ওরফে আত্মগোপনের রাজনীতি। শেষজীবনে তিনি প্রচলিত রাজনীতির উপর অনেকখানি বীতশ্রদ্ধ হইয়াছিলেন। শেষজীবনের প্রায় পনের বছর তিনি হইয়াছিলেন শুদ্ধ একান্ত লেখক। শেষবয়সে অনেক উন্নতিশীল লেখকের সঙ্গে যুক্ত হইয়া তিনি নিজের একান্ত সাধনাকে আরো সংবর্ধিত করিয়াছিলেন। যুক্ত হইয়াছিলেন ‘লেখক শিবির’ নামক একটি প্রগতিবাদী জাতীয় মঞ্চে। এই পর্বেই একদিন তিনি অধুনা পরলোকগত বুদ্ধিজীবী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সহিতও পরিচিত হইয়াছিলেন। ইলিয়াসও তাঁহার সম্পর্কে দুইটি সত্য কথা শুনাইয়াছিলেন আমাদের।

এক.
লেখক পরিচয়ে আসহাব উদ্দীন আহমদ ঠিক কোন জায়গায় বিশিষ্ট? ইলিয়াস বলিতেছেন, “আসহাব উদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্য প্রকাশের জন্য কথা-সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত কোন মাধ্যমের কাছে হাত পাতেননি। টুকরো টুকরো ঘটনাকে কাহিনীর বিন্যাসে তিনি গাঁথেন না, সিকোয়েন্সের আড়ালে থেকে কোন ছবিকে সামনে ঠেলে দিতে তাঁর ঘোরতর আপত্তি, কোন চরিত্রকে নিজের মুখপাত্র হিসাবে নিয়োগের অভ্যাসও তাঁর নেই, তিনি নিজেই নিজের কথা বলেন।” তাঁহার বিষয়ে ইলিয়াসের দ্বিতীয় মন্তব্যও আমাদের মনে সমানে দাগ কাটিতেছে। ইলিয়াসের মতে, “কোন পরিচিত কাঠামোর ভেতর না গিয়েও আসহাব উদ্দীন পাঠককে যে আকৃষ্ট করতে পারেন তার প্রধান কারণ তাঁর কৌতুক ও ব্যঙ্গ এবং হাস্যরস। তাঁর রচনা আগাগোড়া কৌতুক ও ব্যঙ্গরসে পূর্ণ।” (ইলিয়াস ২০১৩ : ১১২-১১৪)
আসহাব উদ্দীন আহমদের অপর অনুরাগী-ইলিয়াসের পরলোকগমনের কিছুদিন পরে পরলোকগত-আহমদ ছফা। তিনিও তাঁহার অপরিশোধ্য ঋণ শোধ করিয়াছেন এই কায়দায়: “তাঁর বাড়ি বাঁশখালি থানায়-আমাদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়। ছোটবেলায় তাঁর কথা শুনে কমিউনিজমের প্রতি অনুরক্ত হয়েছিলাম।” আসহাব উদ্দীন আহমদ যে বছর ইহলোক ছাড়িলেন সেই বছরের-ইংরেজি ১৯৯৪ সালের-গোড়ার দিকে আহমদ ছফা কিছু অধিক স্মরণ করিয়াছিলেন: “আসহাব উদ্দীন আহমদ সাহেবকে আমি প্রথম দেখি আমাদের গ্রামে ন্যাপের জনসভায় বক্তৃতা দিতে। তাঁর সেই বক্তৃতাটি এখনো [মানে ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পরও] মনে আছে। সেদিন তিনি আমাদের বাড়িতে খেয়েছিলেন।” দুর্ভাগ্যের কথা, আহমদ ছফাও তাঁহার সাহিত্য-বহির্ভূত লেখাজোকার বিশেষ একটা কদর-আদর করেন নাই। হয়তো তিনি অন্য কোন গূঢ় সত্যের দিকে অঙ্গুলি দেখাইতেছিলেন। তিনি বলিয়াছেন, ‘তাঁর লেখা “ধার” বইটি ভাল লেগেছিল। পরের লেখাগুলো কোন কাজের জিনিশ নয়। তবে মানুষ হিসেবে তিনি খুব সজ্জন ছিলেন।’ (ছফা ২০০৮: ৩৬৩-৬৪)
আমি সামান্য মানুষ। আহমদ ছফার সহিত বিবাদ আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। সবিনয়ে শুদ্ধ একটা কথা নিবেদন করিÑআসহাব উদ্দীন আহমদের নানা লেখার ভিতর জীবনস্মৃতি গোত্রের কিছু লেখাও আছে। এইগুলি মনে হয় খুব কাজের জিনিশ হইয়াছে। সাহিত্য হিশাবে না হোক, সত্য হিশাবে। বিশেষ করিয়া গত একশত বছরে বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের অযোগ্যতার কিস্সা আর উদ্বর্তনের কাহিনী যাঁহারা পরিহার করিতে চাহেন না (অর্থাৎ আমল করিতে চাহেন) তাঁহারা এখানে কিছু পোষ্যজনোচিত ভালমন্দ খোরাক কিছু পাইবেন। আসহাব উদ্দীন আহমদ নামক একজন মানুষকে বুঝিলে লাভ আছে, সন্দেহ নাই। গত একশত বছরে বাংলাদেশে যাহা ঘটিয়াছে তাহা বুঝিতে পারিলে আরও গুরুতর লাভ। এই ইতিহাসের একজন অতি নগণ্য ছাত্র হিশাবে এখানে লিখিয়া দিতেছি, আসহাব উদ্দীন আহমদের কয়েক খণ্ড জীবনস্মৃতি পড়িয়া আমিও অনেকদূর পর্যন্ত শিক্ষালাভ করিয়াছি। সেই কথা পর্বে পর্বে বলিতে হইবে। আজ শুদ্ধ প্রথম পর্ব বলিলাম।
আসহাব উদ্দীন আহমদের জন্ম মোটামুটি সচ্ছল এক কৃষক পরিবারে। এই পরিবার-কিংবদন্তী অনুসারে-সপ্তদশ শতাব্দীতে গৌড় হইতে চট্টগ্রামে আসিয়া বসত স্থাপন করিয়াছিলেন। মোগল বাদশাহ শাহজাহানের মৃত্যুর পর তাঁহার পুত্রদের মধ্যে গৃহবিবাদের যুগে এই পরিবারের এক শাখা বাঁশখালি উপজেলার ‘সাধনপুর’ গ্রামে আর এক শাখা চট্টগ্রাম শহরের ‘কাট্টলি’ নামক পাড়ায় কায়েমমোকাম হইয়াছিল। বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের ইতিহাস বলিতে আমরা যাহা জানি-আসহাব উদ্দীন আহমদের ইতিহাসও দেখা যাইতেছে তাহার বাহিরে নহে। এই সমাজের কেহ কেহ স্থানীয় জনগোষ্ঠী হইতে ধর্মান্তরিত, আর কেহ কেহ বা বাংলাদেশের বাহির হইতে আগত আবাদকার। এ সত্যে সন্দেহ নাই।
সেকালে এই এলাকা দুর্গম ছিল। তিনি লিখিতেছেন, “চট্টগ্রাম শহর হইতে এই এলাকার উত্তর প্রান্তের দূরত্ব বারো মাইল। স্থলযানে শহর হইতে ছয়টি থানা ঘুরিয়া ষাট মাইল অতিক্রম করিয়া এই স্থানে পৌঁছিতে হয়। জলযানে এই বারো মাইল এলাকা আঁকাবাঁকা জলপথে অতিক্রম করিতে লাগে চার-পাঁচ ঘণ্টা, সাম্পানে লাগে আট-দশ ঘণ্টা। যাতায়াতের এই অব্যবস্থার কারণে উত্তর চট্টগ্রামবাসীরা বিদ্রƒপ করিয়া বাঁশখালীকে ‘ছোট আকিয়াব’ আখ্যায়িত করিত। বাঁশখালী সম্পর্কে যাহা সত্য গোটা দক্ষিণ চট্টগ্রাম (কক্সবাজারসহ) সম্পর্কেও তাহা সত্য।” (আহমদ ২০০৪: ৫৯)
বাবার কথা বলিতে বসিয়া আসহাব উদ্দীন আহমদ লিখিয়াছেন, ‘আমাদের গ্রামের পূর্বদিকে পাহাড়। এ পাহাড় গোটা থানার উত্তরসীমা থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পাহাড় বাঁশখালি ও সাতকানিয়া উপজেলার মাঝখানে অবস্থিত, উভয় উপজেলার বিভক্তিরেখাস্বরূপ। পাহাড়ের যে অংশ আমাদের গ্রামের পূর্বদিকে অবস্থিত, সেখানে ইংরেজ সাহেবের চা-বাগান ছিল। বাবা ছিলেন চা-বাগানের ম্যানেজার। সৎলোক বলে বাবার সুখ্যাতি ছিল। এ জন্য সাহেবও তাঁকে খুব সম্মান করতেন।’ একটু পরে তিনি আরো লিখিয়াছেন: ‘বাবার কাজকর্মে সাহেব এত সন্তষ্ট ছিলেন যে বিলেত চলে যাওয়ার সময় এই পাহাড় তিনি অল্প সালামিতে দশ বছরের জন্য বাবাকে বন্দোবস্ত দিয়ে যান। এতে আমাদের পরিবারের আর্থিক জীবনে দ্রুত আশাতীত উন্নতিলাভ ঘটে। পাহাড়ের আয় থেকে বহু জায়গাজমি কিনে বাবা একজন জোতদারে পরিণত হন।” (আহমদ ২০০৪: ৫১-৫২)
আসহাব উদ্দীন আহমদের দীর্ঘ জীবনে বাবার ছায়া দীর্ঘতর হইয়াই পড়িয়াছিল। জোতদার হইলেও তাঁহার বাবা ছিলেন বড় পরহিতৈষী, জনদরদি মানুষ। আসহাব উদ্দীনের লেখায় একটা ইশারা এইরকম: “বাবার জীবনে প্রচুর অর্থাগম হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অর্থলোভ ছিল না। দীর্ঘ দশ বছর এই পাহাড় বন্দোবস্তসূত্রে বাবার মালিকানায় ছিল। তিনি কোনদিন গ্রামের লোক থেকে লাকড়ি কাটা, গরুছাগল চরানোর জন্য কোন ট্যাক্স নিতেন না।” (আহমদ ২০০৪: ৫৪)
আসহাব উদ্দীন আহমদের জীবনে মায়ের প্রভাবও কম নহে। তিনি লিখিয়াছেন, “আমার নানার বাড়ি ছিল পার্শ্ববর্তী সাতকানিয়া উপজেলার আলিনগর গ্রামে। নানা মুন্শী নাদেরুজ্জামান ছিলেন ফার্সি[নবিশ] উকিল। [আমি] মনে করি যে তিনি যখন ওকালতি শেখেন, তখন ফার্সিই অফিস-আদালতের ভাষা ছিল। মা অত্যন্ত দয়ালু মহিলা ছিলেন। পরের দুঃখে তাঁর হৃদয় গলে যেত। দুঃস্থ ও বিপন্নকে তিনি যথাসাধ্য সাহায্য করতেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি পাড়ার গরিব-দুঃখী মানুষ বিশেষ করে অসহায় বিধবাদের বলে দেন, খবরদার, উপোস থেকো না। আমার দু’ছেলে রুজি রোজগার করছে।” (আহমদ ২০০৪: ৫৭)
সেকালের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি কেমন ছিল তাহার ইঙ্গিতও তাঁহার লেখায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আর পাঁচ এলাকার মতো চট্টগ্রামের বাঁশখালি উপজেলায়ও হিন্দুসমাজই শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসর ছিল। আসহাব উদ্দীন আহমদ লিখিয়াছেন, ‘আমাদের গ্রামের লোকসংখ্যার এক উল্লেখযোগ্য অংশ হিন্দুসম্প্রদায়ভুক্ত। নানাদিক থেকে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর হিন্দুসমাজের আচার-আচরণ, রীতিনীতি আমরা অনগ্রসর মুসলমানরা অনুসরণ অনুকরণ করতাম। এমনকি একসময় এদেশের সর্বত্র ভদ্রস্থানীয় মুসলমানরা ঘরে লুঙ্গি পরলেও অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজে, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার সময় ধুতি পরতেন। সে হিসেবে জন্মের পর ব্রাহ্মণ ডেকে নবজাতকের কোষ্ঠী তৈরি করান আমাদের পরিবারে রেওয়াজ ছিল। কিন্তু যেসব এলাকা একচেটিয়া মুসলমান অধ্যুষিত ছিল সেসব এলাকায় মুসলমানরা ব্রাহ্মণ ডেকে কোষ্ঠী লিখাত না।’
তাঁহার স্মৃতিকথা হইতে জানা যাইতেছে, যে বছর আসহাব উদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন তাহার চারি কি পাঁচ বছর পর তাঁহাদের গ্রামে একবার আগুন লাগে। তাহাতে অন্যান্য সবকিছুর সহিত তাঁহার কোষ্ঠীটাও পুড়িয়া ছাই হইয়া যায়। ফলে ঠিক কত তারিখে বা কি বারে তাঁহার জন্ম হইয়াছিল তাহা জানিবার উপায় আর ছিল না। বংশের ইতিহাস তো দূরের কথা-নিজের জন্মের কথাও-বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে সকলের জানা থাকে না। আসহাব উদ্দিন আহমদও ইহার ব্যতিক্রম নহেন। এক জায়গায় তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমার বয়স তখন সাত কি পৌনে সাত। সঠিক বলা যাইতেছে না। কারণ একবার ঘরে আগুন লাগিয়াছিল। তাহাতে অন্যান্য সবকিছুর সহিত আমার কোষ্ঠীটাও পুড়িয়া ছাই হইয়া যায়।’ কিছুক্ষণ পরে আবার লিখিয়াছেন, ‘পাড়ায় যখন আগুন লাগিয়াছিল তখন আমার বয়স চার-পাঁচ বছরের বেশি হইবে না।’ জীবনস্মৃতির এক জায়গায় তাই তিনি লিখিয়াছেন, ‘পরবর্তীকালে পাড়ার বয়স্ক লোকদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে জেনেছি যে আমার জন্ম ১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসের কোন এক দিনে।’ (আহমদ ২০০৪: ৩২, ৩৭, ৩৩)
এই আগুন লাগার ঘটনায় কোষ্ঠীটাই শুদ্ধ পুড়িয়া যায় নাই, যে নবজাতকের ভাগ্যে কোষ্ঠী তৈরি করানো হইয়াছিল সেই নবজাতকটিও পুড়িয়া মরিতে বসিয়াছিল। মাত্র আবেগাতুর মায়ের কারণেই সেবার তাঁহার প্রাণ রক্ষা পায়। আগুন লাগার ঘটনাটি তিনি সবিস্তার বয়ান করিয়াছেন। শ্রুতিলিপিটা ভালই লিখিয়াছেন তিনি: ‘মাটির দেয়ালের ঘর। ওপরে মাটির ছাদ। অর্থাৎ বাঁশের বেড়া দিয়ে তার ওপর মাটি লেপে দেয়া হয়েছিল। আগুন লাগাতে সবাই ঘরের দরজা বন্ধ করে দৌড়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল। আর পানি ছুঁড়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিল। ঘরের ছনের ছাউনি জ্বলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছিল। এ সময় আমার মা চিৎকার দিয়ে ওঠেন: আমার ছেলে কই? আগুন লাগাতে দিশেহারা হয়ে তাড়াহুড়ো করে তারা সবাই আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেলে বাইরে চলে এসেছিল।’ (আহমদ ২০০৪: ৩৭)
বাড়ির একজন মৌসুমি দিনমজুরের বুদ্ধি ও সাহসের সুবাদে সেদিন একটি মাসুম শিশুর প্রাণ বাঁচে। এই শিশুই আমাদের আসহাব। এই ঘটনার মধ্যে বাঙ্গালি মুসলমান সমাজে ধর্মের প্রভাব বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত শিক্ষাও পাওয়া যাইতেছে। ইহার পর আসহাবের বাবা নিয়ত করিলেন, এই শিশুকে তিনি আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত করিবেন, মৌলবি বানাইবেন। আসহাব উদ্দীন আহমদ লিখিয়াছেন, “আল্লাহ তাআলার অপার কৃপায় যার জীবন রক্ষা পেয়েছে, তার আল্লাহ এবং ইসলামের সেবায় জীবন কাটানোই শ্রেয় হবে। তাছাড়া তখনকার দিনে লোকের ধারণা ছিল, কোন লোক আলেম হলে তিনি হাশরের ময়দানে আল্লাহতালার কাছে সুপারিশ করে সাতপুরুষকে (generation) বেহেশতে নিয়ে যেতে পারবেন।” (আহমদ ২০০৪: ৩৭)
বাবার জীবদ্দশাতেই আসহাব উদ্দীন আহমদের বিদ্যাশিক্ষায় হাতেখড়ি হইয়াছিল। হাতেখড়ির পর পরই তাঁহাকে নিজ গ্রামের মক্তবে ভর্তি করাইয়া দেওয়া হয়। তিনি স্মরণ করিয়াছেন, তাঁহার মক্তবে ভর্তি হওয়া উপলক্ষে সেদিন মক্তবের সকল ছাত্রছাত্রীকে মুরগির গোশ্ত দিয়া চালের গুঁড়ার রুটি খাওয়ানো হইয়াছিল। সেই দিনের কথা তিনি এইভাবে স্মরণ করিয়াছেন: “মক্তব ছুটির পর যখন বাড়ি গেলাম তখন আমার মনে হতে লাগল আমি আগের মানুষটি নেই। আমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এখন আমার পরিচয় আমি একজন মক্তবের ছাত্র। এই ভেবে আমি গর্ববোধ করতাম।” (আহমদ ২০০৪: ৩৬)
ততদিনে খেলাফত আন্দোলনের যুগ আসিয়া গিয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন, “খেলাফত আন্দোলনের অস্পষ্ট ছবি আমার মনে রয়েছে। চারদিকে বিলিতি কাপড় পোড়ান হচ্ছিল। একদিন বাবা আমাকে দর্জির দোকানে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং আমার জন্য একটা খদ্দর-কাপড়ের জামা সেলাই করে নিয়েছিলেন। গান্ধীর চট্টগ্রাম আগমনের খবর গ্রামাঞ্চলেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। তার ঢেউ আমার মনেও দোলা দিয়েছিল।” (আহমদ ২০০৪: ৩৬)
আসহাব উদ্দীন আহমদের বয়স যখন সাত বছরের মতন তখন তাঁহার বাবার আকস্মিক মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন বাবার দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। তাঁহার মায়ের ঘরে বড় একটি ভাই থাকিলেও তিনি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার ভয়ে বাড়ি হইতে পলাইয়া ছিলেন। আসহাব উদ্দীন আহমদ লিখিয়াছেন, “বাবার মৃত্যুর পর আমাদের জীবনে নেমে এল এক অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়।” (আহমদ ২০০৪ : ৫৪)
কিন্তু এই বিপর্যয়ের মধ্যেও মনে হয় একটা কল্যাণ কোথায়ও বা লুকাইয়া ছিল। বাবা ঐসময়ে যদি মৃত্যুবরণ না করিতেন তবে আসহাব উদ্দীন আহমদ হয়তো কোনদিন আমাদের আজিকার মাননীয় আসহাব উদ্দীন আহমদই হইতেন নাÑপিতৃদত্ত নাম অনুসারে ‘আসহাব মিয়া চৌধুরী’ই থাকিয়া যাইতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি যাহা হইয়াছিলেনÑঅর্থাৎ বিপ্লববিলাসী কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদী মনীষী বা-তাঁহার আপন জবানিতে ‘বোকা মিয়া’-তাহা কোন ধরনের বেহতর দ্রব্য-বলা বেশ কঠিন। ‘আরবি লাইনে পড়াশোনা করলে,’ তিনি লিখিতেছেন, ‘হয়তো আমার পরিচয় হত আমি একজন জেহাদি মওলানা, তলোয়ারে বাংলা-এ জাতীয় কিছু।’ (আহমদ ২০০৪: ৩৮)
জীবনের উপান্তে আসিয়া একই স্মৃতিকথায় আসহাব উদ্দিন আহমদ বলিয়াছেন, “জীবনের আঁকাবাঁকা পথে চলিতে চলিতে অনেক চড়াই-উতরাই পার হইবার পর শেষ পর্যায়ে আমার পরিচয় হইয়াছে: আমি একজন সমাজতন্ত্রী-বৈপ্লবিক সংগ্রামের মাধ্যমে শোষক শ্রেণীকে উচ্ছেদ করিয়া শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা কায়েমে বিশ্বাসী। আমার নীতি হল: সবাই মিলে উৎপাদন কর, সবাই মিলে ন্যায়নীতি মেনে ভাগ করে ভোগ কর। কেউ খাবে তো কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না।” (আহমদ ২০০৪: ৩৮)
জিহাদী মওলানা তলোয়ারে বাংলার বিশ্বাস হইতে এই নীতির পার্থক্য কোথায়? দুইটাই তো বিশ্বাসের নীতি।
মাদ্রাসার না পৌঁছিয়া মধ্য-ইংরেজি স্কুলে পৌঁছার মতন আর একটি যুগান্তকারী ঘটনাও ঘটে তাঁহার জীবনে। ‘আমার মেজ বোনের বিবাহ হইয়াছিল আমাদের গ্রাম হইতে দুই মাইল দক্ষিণে ইলসা গ্রামে। তাহার এক দেবরের নাম ছিল ফজল করিম। তিনি ছিলেন প্রাইমারি শিক্ষক। প্রৌঢ় বয়সে তিনি উন্মাদ হইয়া যান এবং আত্মহত্যা করেন। তিনি ছিলেন মাসিক “সওগাত” পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক। সেখানে বেড়াতে গিয়া তাহার ঘরে পাইলাম একগাদা মাসিক “সওগাত”। “সওগাত”-এ আমি গোটা জগৎকে না পাইলেও গোটা মুসলিম জগৎকে আবিষ্কার করিলাম। বিশেষ করিয়া “মুসলিম জাহান” কলামে। আর পরিচিত হইলাম তৎকালীন মুসলিম লেখকদের সাহিত্য-সাধনার সাথে। “সওগাত” আমার মনে যে বিস্ময় ও আনন্দের সৃষ্টি করেছিল তা ইংরেজ কবি কিটস চ্যাপম্যান অনূদিত গ্রিসের মহাকবি হোমারের কাব্যপাঠ করে যে বিস্ময় ও আনন্দে অভিভূত হয়েছিলেন তারই সাথে তুলনীয়।’ (আহমদ ২০০৪: ৬৯)

দুই.
মক্তবের পড়া শেষ করিবার আগেই আসহাব উদ্দীন পিতাকে হারাইলেন। তাঁহার মক্তবের পড়াশোনা শেষ হইবার পর ভবিষ্যত করণীয় লেখাপড়ার কথাটা আরো জোরেশোরে উঠিল। পড়শিরা বলিতে থাকিলেন, মুনশি সাহেব-মানে শিশুর বাবা-বাঁচিয়া নাই। থাকিলে তিনি এ ছেলেকে মৌলবি বানাইতেন। তাঁহার অবর্তমানে পিতার ইচ্ছাই পূরণ করা দরকার। সমস্যার মধ্যে, তাঁহাদের বাড়ির ধারেকাছে কোন মাদ্রাসা ছিল না। আর মায়ের সাহসেই সেবারও তাঁহার জীবন-মানে মানসজীবন-রক্ষা পাইয়াছিল। মা জননী তাঁহাকে মাদ্রাসায় না পাঠাইয়া মধ্য-ইংরেজি স্কুলে পাঠাইবার সিদ্ধান্ত লইলেন। ছেলের ভাষায়, ‘এক্ষেত্রে ধর্মের চেয়ে মাতৃস্নেহই প্রবলতর ভূমিকা পালন’ করিল। তিনি আরো বলিয়াছেন, ‘আজ আমি ভাবি, যদি মা ধর্মপরায়ণতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আখেরাতের বিশেষ সুবিধা বিবেচনা করিয়া আরবি শিক্ষার দিকে ঝুঝিয়া পড়িতেন এবং আমাকে বাড়ি হইতে দূরে কোন মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়া দিতেন তাহা হইলে আমি কি হইতাম, আমার পরিচয় কি হইত।’
আসহাব উদ্দীন আহমদ লিখিতেছেন, ‘আমার মধ্যে কোমলতা বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে তার অনেকখানি আমি মায়ের [কাছ] থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি বলে মনে করি। মা ছিলেন আমার কাছে “কোমলতার প্রতীক”।’ (আহমদ ২০০৪: ৫৭)
মাতার এই কোমলতাই আসহাব উদ্দীন আহমদকে মাদ্রাসায় পড়ার হাত হইতে বাঁচাইয়া দিল। তিনি লিখিলেন, ‘বাবার ইচ্ছে, ধ্যানধারণার প্রতি মার অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি বাধ সাধলেন। তাঁর কথা হল, আমি আমার এত কম বয়সের ছেলেকে আরবি এলেম হাছেলের জন্য বাড়ির থেকে দূরে কোথাও পাঠাব না। আগে স্কুলের পড়া শেষ করুক। তারপর না হয় আরবি লাইনে দেয়ার কথা বিবেচনা করা যাবে।’ আসহাব উদ্দীন আহমদ লিখিয়াছেন, ‘যাক, মাদ্রাসায় না পাঠিয়ে আমাকে মধ্য-ইংরেজি স্কুলে পড়ানোর আমার মায়ের সিদ্ধান্তকে আমি আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিকাল (turning point) বলে মনে করি।’ (আহমদ ২০০৪: ৩৭-৩৮)
আমরাও তাহাই মনে করি। যদি তিনি মধ্য-ইংরেজি স্কুলে ভর্তি না হইয়া কোন আরবি লাইনের মাদ্রাসায় দাখেল হইতেন তো তাহার-উদ্দীন আহমদ-এই নতুন নামটাই জারি হইত না। ঘটনাটা তাঁহার ‘কলেজ-স্মৃতি’ অর্থাৎ জীবনস্মৃতির দ্বিতীয় পর্বে আছে। আমি তাঁহার জবানিতেই লিখিতেছি: “১৯৩১ সাল। আমি বাঁশখালি থানার বাণীগ্রাম হাই স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র। এ সময়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্কুল ইনস্পেক্টর (এখন বলা হয় জনশিক্ষা উপপরিচালক, ইংরেজিতে সংক্ষেপে ডিডিপিআই) ছিলেন শামসুল ওলামা কামাল উদ্দীন আহমদ। এর আগে একসময় তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি আমাদের স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। দশম শ্রেণীতে ঢুকে তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, ‘আসহাব মিয়া।’ তিনি বললেন, ‘আসহাব মিয়া নয়’, [এখন থেকে] ‘আসহাব উদ্দীন আহমদ’ লিখবে।’ (আহমদ ২০০৪: ১২৪)
আমরা জানিতে পারিলাম আসহাব উদ্দীন আহমদ নামটি কোথা হইতে পাহিয়াছিলেন তিনি। এই নামকরণের সামাজিক মূল্যও অতি অল্প নহে। আসহাব উদ্দীন আহমদ এই জায়গায় থামিয়া মন্তব্য করিয়াছেন, ‘সে যুগে [বাঙ্গালি] মুসলমানদের মধ্যে [ইংরেজি] শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে প্রায় ক্ষেত্রে নামের শেষে “মিয়া” লাগানোর ব্যাপক প্রচলন ছিল।’ একথা ষোল আনা মিথ্যা নহে। শুদ্ধ মনে রাখিতে হইবে, আসহাব উদ্দীন আহমদের বাবার নাম ছিল সফর আলী চৌধুরী আর তাঁহার বড় ভাইয়ের নাম ছিল আশরাফ মিয়া চৌধুরী। তাহার এক চাচার নাম মুনশি আবদুল জব্বার চৌধুরী। অধিক কি, তাঁহার বংশের একটি শাখা চট্টগ্রাম শহরের উত্তরে ‘কাট্টলি’ গ্রামে বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন। সেই শাখার এক উজ্জ্বল রত্নের নাম নূরুল হক চৌধুরী। ইনি ছিলেন যুক্তবঙ্গের একজন প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতা।
আসহাব উদ্দীন আহমদ একদিকে ‘চৌধুরী’ পদটা যেমন সযত্নে পরিহার করিয়াছেন অন্যদিকে তেমনি তাঁহার নামের ‘উদ্দীন’ ও ‘আহমদ’ পদদ্বয় সানন্দে এস্তেমাল। এই নতুন নাম কোথা হইতে আসিয়াছে তাহার একটা সুরাহাও তিনি করিয়াছেন। এই নাম আসিয়াছে শামসুল ওলামা [মওলানা] কামাল উদ্দীন আহমদের নাম হইতে। এই ঘটনাকেও বাঙ্গালি মুসলমানের ‘আধুনিক’ হইবার পথে একটি সন্ধিকাল বলিয়া গণ্য করা চলে।
আসহাব উদ্দিন আহমদের এই সমস্ত খণ্ড খণ্ড টুকরা টুকরা স্মৃতিকথা পড়িয়া আমার মনেও একটি প্রশ্ন জাগিয়াছে-এহেন নিরীহ মানুষটি কেন রাজনীতিতে জড়াইতে গেলেন? এক জায়গায় আসিয়া ইহার জবাবও একটা পাইয়া গেলাম। এই জবাব-এককথায় বলিতে-তিনি রাজনীতিতে জড়াইয়াছেন নিতান্ত ‘ভুল করিয়া’। চলুন, ঘোড়ার মুখ হইতেই শুনিয়া লই জওয়াবটা। ‘বোকা মিয়ার ইতিকথা’ নামক স্মৃতিকথার এক জায়গায় তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমার ম্যাট্রিক পাশ করার পর চট্টগ্রাম কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তখন আমি বড় ভাইকে বলি: “আপনিও শহরে চলুন। আমাকে কলেজে ভর্তি করাইয়া দিয়া বাড়ি ফিরিবেন।” এই কথার জওয়াবে অভিভাবক বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “তুমি ম্যাট্রিক পাশ করিয়াছ। যদি শহরে গিয়া নিজে কলেজে ভর্তি হইতে না পার, তোমার কলেজে পড়িবার দরকার নাই”। তখন ভয়ে ভয়ে দ্বিধাগ্রস্ত মনে শহরের পথ ধরিলাম। ইহার আগে মাত্র তিনবার শহরে গিয়াছিলাম। পথঘাট চিনিতাম না।’
এই ঘটনা সাক্ষী রাখিয়া আসহাব উদ্দিন আহমদ একটি পরম সত্যই উচ্চারণ করিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘রাজনৈতিক জীবনেও আমি অনেক সময় চাহিতাম যে আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অংশীদার না হই-অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যাহা সিদ্ধান্ত করেন কোমর বাঁধিয়া তাহার বাস্তবায়নে লাগিয়া যাই, গ্রামেগঞ্জে তাঁহাদের তৈরি কর্মসূচি ছড়াইয়া দিই।’ ইহার মানে কি? আসহাব উদ্দিন আহমদ লিখিতেছেন, ‘মানে, পরিচালনা করার চাহিতে পরিচালিত হইবার দিকেই যেন আমার অধিকতর প্রবণতা ছিল’। আত্মসমালোচনার এই রকম দৃষ্টান্ত-আমাদের দেশে নিতান্ত অবিরল নহে। আসহাব উদ্দীন আহমদ লিখিয়াছেন, ‘সময় সময় নেতারা জরুরি বিষয়ের দিকে যথোচিত গুরুত্ব দেন নাই। সে ক্ষেত্রে তাঁহাদের সমালোচনা করিলেও তাঁহাদের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে যেভাবে রুখিয়া দাঁড়ানো প্রয়োজন ছিল উদ্যোগহীনতার অভাবে সেভাবে রুখিয়া দাঁড়াই নাই। ইহাতে ক্ষেত্রবিশেষে দলীয় রাজনীতির খুব ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া মনে করি। প্রবীণদের তুলনায় রাজনীতিতে নবাগত ছিলাম বলিয়াও নানান বিষয়ে আমি সঙ্কোচ বোধ করিতাম। তাই তো দুইটা ছাগল জবাই করিয়াÑঘটা করিয়া আকিকা উৎসব করিয়াÑমা-বাবা যে নাম রাখিয়াছিলেন তাহা বাদ দিয়া “বোকা মিয়া” নাম লইয়াছি।’ (আহমদ ২০০৪: ৬৬-৬৭) ২৮ মে ২০১৭

দোহাই
১. আসহাব উদ্দীন আহমদ, রচনা সমগ্র, ১ম খণ্ড, আনু মুহাম্মদ ও এনতেজার উদ্দীন আহমদ সম্পাদিত (ঢাকা: মীরা প্রকাশন, ২০০৪)।
২. আহমদ ছফা, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮)।
৩. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনা সমগ্র, ৩য় খণ্ড, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস সম্পাদিত, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৩)।

আরো খবর

Disconnect