ফনেটিক ইউনিজয়
স্টিফেন হকিং
বিজ্ঞানের চিন্তাধারাকে এক নতুন স্তরে নিয়ে গেছেন
আসিফ

বিজ্ঞানের অবদান প্রযুক্তিকে আমরা এমনভাবে ব্যবহার করেছি, যা সমাজ-সভ্যতার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। হিরোশিমায় পরমাণু বোমা বর্ষণ থেকে বর্তমানে এক দেশের বিরুদ্ধে আরেক দেশের আধুনিক অস্ত্রের প্রয়োগ দেখলে তা বোঝা যায়। বিজ্ঞান চিন্তকরা আগেই বলেছিলেন, বিজ্ঞানকে সংস্কৃতির অংশ করতে না পারলে সামনে আরও বিপদ অপেক্ষা করছে। ঠিক এ রকম একটি সময়ে স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী সমাজ-সভ্যতা, রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে অবিরাম কথা বলে গেছেন- এগুলো নিয়েই রচনা।
১৯৮৭ সাল। বই খুঁজে বেড়ানোর দিনগুলো। সেসব বই- রচনা যা পথ চলতে অনুপ্রেরণা জোগায়, জীবনকে ছন্দময় করে তোলে। ঠিক সেরকম একটি সময়, ক্লান্ত এক সন্ধ্যায় দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত সাময়িকীর একটি সংখ্যা আমার চোখের সামনে দেখতে পাই। ক্লান্তভাবে আমি পত্রিকার সাময়িকীটা নিয়ে নড়াচড়া করি। বিশাল একটি প্রবন্ধের দিকে বিরক্তভরে তাকাই। শিরোনামটি ‘বিজ্ঞানীর’ শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেটাই কিছুটা উৎসাহ জোগালো মনযোগ দিয়ে পড়তে। একটা প্যারা পড়ার পর আরেকটি প্যারা যেন টেনে ধরলো, ছুটতে পারলাম না। যেমন, সেখানে প্রথম প্যারায় লেখা ছিল- ‘আপনার সংস্কৃতি বড়, তারটি ছোট- ভালবেসে তাকে কিছু জায়গা ছাড়বেন আপনি? বড় বলে এই অহঙ্কার আসে কোথা থেকে- সংস্কৃতি কি জায়গাজোড়া ভল্যুমেট্রিক ঘটনা, না ছড়িয়ে পড়া কাপড়ের মতো আয়তনভিত্তিক বর্গমিটারের ব্যাপার?...’ আবার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের একটা জায়গায় আছে- ‘অঙ্ক করবার একটা ঘোর আছে, শিল্প গড়বারও ঠিক তাই থাকে, নিজের ভিতর নিজে ডুবে যাবার ঘোর।’
আকর্ষণ অনুভব করলাম, আমার মনযোগও বেড়ে গেল। প্রবন্ধে এক পদার্থবিজ্ঞানীর কথা বলা হচ্ছে, যিনি বর্তমানে লুকাসিয়ান প্রফেসর পদে আসীন। এই আসনে নিউটনও ছিলেন আরো কম বয়সে।... আমি আটো সাটো হয়ে বসি। পড়তে থাকি গভীর মনযোগে। আমার তারুণ্যের প্রারম্ভে ওই সন্ধ্যায় হালকা ফ্যানের বাতাসে যুক্ত হয়েছিল অসাধারণ একটি অভিজ্ঞতা। রুদ্ধশ্বাসে সম্পূর্ণ পাঁচ হাজার চারশ শব্দের প্রবন্ধটি শেষ করলাম। এবার প্রথম প্রবন্ধের শিরোনামের দিকে তাকালাম, ‘বিজ্ঞানীর নৈঃসঙ্গ’ আর লেখক হচ্ছেন ওয়াহিদুল হক। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে লেখকের সঙ্গেও পরিচয় ঘটেছিল। পরিচয় ঘটেছিল চেতনা ধারায় এসো বইটির সঙ্গে। পরে আরো ভালোভাবে জেনেছিলাম আমাদের সাংস্কৃতিক জাগরণের এই অগ্রপথিককে। তাঁর কল্যাণেই চিনতে পেরেছিলাম দুটো অসাধারণ চরিত্র- জ্যোতির্বিদ ইয়ান শেলটন ও পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংকে।
১৯৮৮ সালে টাইম পত্রিকায় স্টিফেন হকিংকে নিয়ে একটি প্রচ্ছদ হয়। সেখানে তাঁকে অভিহিত করা হয় মাস্টার অব দ্য ইউনিভার্স বলে। বিশ্বসৃষ্টি রহস্য উম্মোচনে মানবেতিহাসের সবচাইতে অগ্রসর অভিযাত্রী হিসেবে বিজ্ঞানী মহল আপাতত মেনে নিয়েছেন। কৃষ্ণবিবর ও মহাবিশ্ব গবেষণার মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞানকে এক নতুন যৌক্তিক স্তরে নিয়ে গেছেন। অথচ তিনি তো কেদারায় অর্ধাসীন একটা যন্ত্র ছাড়া কিছু নন। তাঁর ভ্যাবলাকান্ত ভাবলেশহীন মুখটায় কখনো সখনো একটা বাঁকামত হাসি খেলে যায়, তখন যে মুখভাব হয় এমনটা কোনো জীবন্ত মানুষের সচরাচর হয় না। তাঁকে সবকিছুই বলা যায়, উত্তরের ব্যাপারটা অনিশ্চিত। উত্তর দিতে হলে তাঁকে তাঁর বহুমূল্য চক্রকেদারার কম্পিউটার কনসোলটিকে চালু করতে হয়। বাঁ-হাতে কোনো জিনিস টেপা এবং ছাড়ার ক্ষমতাটি এখনও রয়ে গিয়েছে- সেই হাতে ডান দিকের হাতলে সুইচ টিপলে একটা টিভি পর্দা জ্বলে ওঠে। তাতে ভেসে ওঠে বিশেষভাবে বিন্যস্ত আড়াই হাজার শব্দ। পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী প্রতিভাবান মনকে ওই আড়াই হাজার শব্দের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। তার থেকে এক একটা করে শব্দ বাছতে থাকেন টেপাটেপি করে। শব্দগুলো পর্যায়ক্রমে গাঁথা হতে থাকে এক জায়গায়। এক সময়ে তা মিলে মিশে বাক্য হয়, হয় সমীকরণ। উত্তরটি কেবল পড়া যায় তা নয়, শোনাও যায়। একটি সিন্থেসাইজার তাঁর যান্ত্রিক কণ্ঠে সেটি উচ্চারণ করে। ওয়াহিদুল হকের ভাষায়, সেই উচ্চারণ তাঁর মুখচ্ছবির চাইতেও ভাবলেশরসহীন। হকিং নিঃসঙ্গ, ভীষণই নিঃশব্দ কারণ মানুষের সঙ্গে মানব সম্পর্কে- মানবিক সম্পর্কে- আসতে পারেন না, কিংবা মানুষই যেতে পারে না তাঁর কাছে মানবিক নৈকট্যের উষ্ণতায়। সবার মধ্যে থেকেও তিনি দেহ দিয়ে মন দিয়ে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। যেন যোগীর অনন্ত সমাধিতে প্রবেশ করেছেন তিনি, ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছেন, যেন ঈশ্বরের দিকেই যাচ্ছেন...।
আমার পরিষ্কার মনে আছে, প্রবন্ধটি পড়ার পর আমি চুপচাপ বসেছিলাম আর আপনমনে ভাবছিলাম। কেউ সামনে আসলেও সাড়া দেবার মতো অবস্থায় ছিলাম না। কিন্তু ভিতরে ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম। সামনে চলার এক দূর্দান্ত উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত রেখাকেই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম। খুবই বিস্ময়কর অথচ বাস্তব। দেখা ও শোনার ক্ষমতা থাকলেও হাঁটাচলা করতে পারেন না। ক্ষীণমাত্রার স্পর্শবোধও কাজে লাগাতে পারেন না- শরীরের কোনো প্রত্যঙ্গের ব্যবহার তাঁর আয়ত্তে নেই বলে। তাঁর গন্ধেন্দ্রিয়ও একেবারেই অকেজো, জিহ্বারও স্বাদ নেবার ক্ষমতা সম্পূর্ণ অকেজো। তাঁর কথা মনে আসায় বা মানবেতিহাসকে কেন্দ্রীকরণের মানুষের স্বভাবজাত আচরণ থেকে বেড়িয়ে আসার জন্যও বেশ কয়েকটি নাম মনে পড়ে গেল। কবি ও রাজনৈতিক কর্মী আর প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকারের লড়াইয়ে এক নিরলস কর্মী হেলেন কেলার, প্রথম রকেটের নকশা পরিকল্পনাকারী আলেক্সান্দার কিবালচিচ, ইস্পাত উপন্যাসের লেখক নিকোলাই অস্ত্রভস্কি। ...অনেকটা হকিং-এর মতোই একই পথের যাত্রী। এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের ইতিহাস কতো নির্মম পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে অগ্রসর হয়েছে।
আমরা যদি ইস্পাতের লেখক নিকোলাই অস্ত্রভস্কির কথা চিন্তা করি, তাহলেও মানব শক্তির এক অকল্পনীয় উৎসের খোঁজ পাই। তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩২ বছর। তার মধ্যে জীবনের শেষ ১২ বছর গুরুতর অসুস্থ ও শেষ আট বছর দৃষ্টিশক্তিহীন অবস্থায় ছিলেন। অস্ত্রভস্কি বলেছিলেন, ‘বীরত্ব জন্মে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে, আর কঠোর অবস্থার ভিতর দিয়ে সেগুলোর পরীক্ষা হয়’।
রুশ বিপ্লবের সময় অস্ত্রভস্কির বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। একটি রেল স্টেশনের রেস্তোরাঁয় তাঁকে কাজ করতে হতো দিনে ১২/১৪ ঘন্টা, সরু আঁকা-বাঁকা সিঁড়ি দিয়ে ভারি ভারি সামোভার তুলতে-নামাতে হত, চুল্লিতে জ্বালানি যোগানোর কাজ করতে হতো। ১৫ বছর বয়সে তিনি গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরে তিনি কিয়েভে রেলপথ নির্মাণের কাজেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯২৪ সালের শেষে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দেখা গেল মেরুদন্ডের ক্ষয়রোগ তাঁর শরীরে জেঁকে বসেছে। বাল্যে অপুষ্টি আর মাত্রারিক্ত শ্রম, গৃহযুদ্ধের ফ্রন্টে জখম- এ সবেরই ফলাফল ওই রোগ। এই তারুণ্যে অঙ্গ-প্রতঙ্গ অকেজো হয়ে গেল, তারপরে দৃষ্টিশক্তিও গেল। রোগ তাকে যোদ্ধাশ্রেণি থেকে সরিয়ে দিয়ে তার শয্যা-সমাধি অবধারিত করে দিল। তিনি ছিলেন আসলেই বিপ্লবের এক যোদ্ধা, উত্তর পুরুষের কাছে বলে যাবেন তাঁর জবানবন্দী, মানব সমাজের গন্তব্য, সেটাই তাঁর অভিপ্রায়। তিনি লেখা শুরু করলেন। প্রথমে অসার আঙ্গুল দিয়ে পেন্সিল চেপে ধরে অস্ত্রভস্কি অতিকষ্টে একটা একটা করে অক্ষর ফুটিয়ে তুলতেন। কিন্তু প্রায় এক একটা পঙক্তি তার আগেরটার উপর পড়ে দুটো পঙক্তিই দুষ্পাঠ্য হয়ে যেত। তাই হাতখানাকে দিশা দেবার জন্য একটা খাজকাটা বোর্ডের ব্যবস্থা হলো শিগগিরই, অনেকটা হকিংয়ের যান্ত্রিক সুবিধার মতোই। এক সাধারণ পিজবোর্ডের ফাইল থেকে তৈরি এই জিনিসটা ছিল সহজ-সরল। ফাইলটার ওপরের পাল্লা থেকে সমান্তরালভাবে ৮ মিলিমিটার চওড়া ফালি-ফালি কেটে নেওয়া হয়েছিল- তখন ফাইলটার ভিতরে একখানা কাগজ দেওয়া হলে তিনি কশিগুলো বরাবর লিখে যেতে পারতেন।
অস্ত্রভস্কি সাধারণত লিখতেন রাতে- যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়তো। তাঁর স্ত্রী কিংবা মা পঁচিশ-ত্রিশ খানা কাগজ ফাইলে ঢুকিয়ে দিয়ে যেতেন, আর সরু করে কাটা কয়েকটা পেন্সিল রেখে যেতেন বিছানার পাশে। রাতেই সব কাগজ লিখে ফেলতেন। তখন তাঁর পরিবার কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে থেকে কেউ পাঠোদ্ধার করে সেই লেখা টাইপ করে দিত।
তিনি এক বন্ধুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, ‘কাজ ধরেছি রাতের শিফ্টে, ভোরে ঘুমিয়ে পড়ি। রাতে সব শান্ত, কোথাও টু-শব্দটি নেই। আমার সামনে ঘটনার পর ঘটনা উঠে আসে, যেন ফিল্মের মতো, মনশ্চক্ষে আবার ফুটে ওঠে কত যে ছবি আর গোট দৃশ্য....।’
এভাবে ইস্পাতের মতো ৪০০ পৃষ্ঠার গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে আর বিশ্বে আলোড়িত হয়েছিল। ইস্পাতের পটভূমি ছিল খুবই বাস্তবসম্মত, প্রধান চরিত্রটি ছিল প্রত্যয়জনক, সমগ্র কাহিনীটিই ছিল এক ফালি বাস্তব জীবন, পরমোৎকৃষ্ট রুচিবোধ আর সূক্ষ্ম নাটকীয়তা বোধ অনুসারে সেটাকে উপস্থিত করা হয়েছে। সে সময় প্রায় কোটি কপি ছাপানো হয়েছিল। একবার এক জরিপে এসেছিল, যদি মঙ্গলে যাওয়ার সময় একটি বই নেওয়ার কথা বলা হয় তাহলে কোন বইটি অভিযাত্রী নেবে, বেশিরভাগেরই উত্তর ছিল ‘ইস্পাত’।
এই উদাহরণটি আমাদের জানায় মানুষ কতো প্রতিবন্ধকতা, অসহনীয় যন্ত্রণা, কত দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে উঠে আসতে পারে। সমগ্র ইতিহাসে খোঁজ করলে আমরা সংখ্যায় খুবই স্বল্প হলেও এ ধরনের কিছু চরিত্রের খোঁজ মিলবে। অতএব বলা যায়, হকিংই শেষ নয় বা প্রথমও নয়, হকিং শুধু আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, মানুষ ভবিষ্যদ্বনীর অযোগ্য এক প্রতিভাস। তাঁর পক্ষে অনেককিছুই সম্ভব। তবে এরকম একটি চরিত্রের উঠে আসার জন্য পরিবার, বন্ধ-ুবান্ধব এবং সামাজিক সহযোগিতার মনোভাব লাগে। আমার মনে হয় এরকম সহযোগিতা পাওয়ার উপলব্ধি ও কৃতজ্ঞতাবোধ হকিংকে প্ররোচিত করেছিল। তিনি আবেগ অনুভব করেছিলেন, মানুষকে বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বের ধারণাবলী থেকে দূরে না রেখে এগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন। তাহলেই মানুষ অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হবে। সত্যি তিনি তা করেছিলেন- এক, মহাবিশ্বের লয় বা সৃষ্টি ধর্মগ্রন্থের বিষয় থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিলেন বিজ্ঞানের গবেষণায়। আর আইজ্যাক আসিমভ, আর্থার সি ক্লার্ক ও কার্ল সাগানের পথ ধরে বিজ্ঞানকে, বিশেষত মহাবিশ্ব বিষয়ক গবেষণা গণমানুষের চিন্তার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। কেননা মহাবিশ্বে মানুষ নিজের অবস্থান বুঝতে পারলে পৃথিবীর প্রতি তার একটি স্বচ্ছ ধারণা জš§ নেবে। তবেই পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষার্থে মানুষ সচেতন হয়ে উঠবে।
১৯৭৪ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালের ব্রিফ হিস্টোরি অব টাইম বইটা লেখার পর তিনি পৃথিবীর মানুষের কাছে অপরিচিত থাকেননি। এই বইটি  লিখে তিনি পৃথিবীর মানুষের হৃদয় জয় করেন। সাধারণ মানুষও মহাবিশ্ব, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, কৃষ্ণবিবর নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ হয়। তাঁর বই লেখার ধরন দেখেই বোঝা যায়, কৃষ্ণবিবরের এই গবেষক গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের মৌলিক ভাবনাগুলোর সঙ্গে সাধারণের যোগাযোগ না ঘটলে সমাজ কখনোই সামনের দিকে এগোতে পারে না; স্থিতিশীলও হয় না। এ কারণে বিজ্ঞান ছাড়া প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার সভ্যতাকে রীতিমতো অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিয়েছে। মার্টিন রিজ, কার্ল সাগানের মতো বিজ্ঞানীরা গ্রহান্তরে ছড়িয়ে পড়াকে এই সংকট নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় মনে করেছেন। হকিংও এই বিষয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করে হেঁটেছেন।
তিনি লুকাশিয়ান প্রফেসরের পদ থেকে অবসর নেন ২০০৯ সালের অক্টোবরে। এই পদে শুধু নিউটন নন, প্রতি পদার্থ ধারণার প্রবর্তক পল ডিরাকও ছিলেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে মটর নিউরন ডিজিজে আক্রান্ত হন হকিং। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, বছর দুয়েকের বেশি আয়ু নেই তাঁর। রোগে আক্রান্ত হওয়ার কিছুদিনের ভেতর হারিয়ে ফেলেন স্বাভাবিক যোগাযোগের ক্ষমতা। তারপরও তিনি টিকে ছিলেন অনেকদিন। প্রায় ৪৫ বছর ধরেই স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষমতা ছিল না হকিংয়ের। কিন্তু অসাধারণ সব গবেষণা করেছেন।
প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে এত বিশাল অগ্রগতির পেছনে গ্যালিলিওর চেয়ে বেশি অবদান আর কেউ রাখতে পারেননি বলেই স্টিফেন হকিং মনে করতেন। এই কারণে গ্যালিলিওর মৃত্যুদিনে জন্মেছিলেন বলে তিনি গর্ববোধ করতেন। তাঁর জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৪ মার্চ। দিনটি আপেক্ষিক তত্ত্বের জনক আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিবস। আর এই দিনে স্টিফেন হকিং ৭৬ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। গ্যালিলিওর মৃত্যুর ঠিক তিনশত বছর পরে, ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারি স্টিফেন হকিং অক্সফোর্ডে জন্মেছিলেন।
বর্তমানে মহাবিশ্ব থেকে আরম্ভ করে জীবন-মৃত্যু সংক্রান্ত যেকোনো মন্তব্য পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ মানুষটিও তাঁকে ভাবনার মধ্যে নিয়েছে। পত্র-পত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করেছে তাঁর কথা। তাঁর প্রকাশিত মন্তব্য শুধু বিজ্ঞান নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজ, সভ্যতা, রাজনীতি এমনকি প্রেম নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। ২০১৭ সালের মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে তিনি অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে কথা বলেছেন, এ ব্যাপারে তিনি সতর্কও করেছিলেন। তিনি নিজের ভুলকেও অকপটে স্বীকার করেছেন এবং বারবার নিজেকে ভেঙেছেন আর নতুন ধারণার কথা বলেছেন। এভাবেই মহাবিশ্বকে সূক্ষ্মতিসূক্ষ্মভাবে বুঝতে চেয়েছেন, অন্যকেও বোঝাতে চেয়েছেন।
তিনি কোয়ান্টাম জগতের অনিশ্চয়তা নীতিকে নিয়ে গেছেন কৃষ্ণ গহ্বরের কাছে। আশ্চর্য হয়ে দেখালেন কৃষ্ণগহ্বর কালো নয়! ওখান থেকে বের হয়ে আসছে কণাস্রোত! তার মানে, কণা বের হয়ে এক সময় কৃষ্ণবিবরও নিঃশ্বেষ হয়ে যাবে। ১৯৭৩ সালে হকিং কৃষ্ণবিবরের এই কণাস্রোতের কথা বলেন। আর তা ঘটছে কৃষ্ণগহ্বরের প্রভাবে কোনো বস্তুকণা বা আলোকে আটকে ফেলার শেষ সীমানা ঘটনার দিগন্ত থেকে। মহাকর্ষের প্রভাবে স্থানকালের শূন্যতায় সৃষ্টি হচ্ছে কণা-প্রতিকণা। একটি ঢুকে যাচ্ছে কৃষ্ণগহ্বরে। আর একটি সরে যাচ্ছে। দূরের দর্শকদের কাছে মনে হবে কৃষ্ণগহ্বর থেকে যেন কণাস্রোত বের হয়ে আসছে। এর নামই হচ্ছে হকিং বিকিরণ!
পদার্থবিজ্ঞানে হকিংয়ের দুটি অবদানের একটি হচ্ছে এটি। কখনো কখনো একে বেকেনস্টাইন-হকিং বিকিরণ নামে অভিহিত করা হয়। দ্বিতীয় অবদানটি হচ্ছে সতীর্থ রজার পেনরাজের সঙ্গে মিলে সাধারণ আপেক্ষিকতায় অনন্যতার তত্ত্ব। তিনি প্রথম জীবনে এই কাজটি করেছিলেন। ১৯৭০ সালে কৃষ্ণগহ্বরের এই অনন্যতার তত্ত্ব তারা মহাবিশ্ব সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনে ব্যবহার করেন এবং দেখান যে সৃষ্টির প্রারম্ভে যখন  কিছুই ছিল না তখন এমন একটি অনন্যতা ছিল যার ঘনত্ব ও তাপমাত্রা ছিল প্রায় অসীম।
আমরা জানি যে, লাপাসের প্রত্যাশিত নিমিত্তবাদ বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে না। অন্তত লাপলাস যেভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন তার ভিত্তিতে তো নয়ই। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনিশ্চয়তার নীতি ইঙ্গিত করে যে, একজোড়া নিদিষ্ট পরিমাণসূচক সংখ্যা (যেমন একটি কণার অবস্থান ও গতিবেগ) একসাথে উভয়ই পুরোপুরি নির্ভুলভাবে অনুমান করা সম্ভব নয়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এই পরিস্থিতি এক শ্রেণির বেশ কয়েকটি কোয়ান্টামতত্ত্বের মাধ্যমে মোকাবেলা করে। এখানে কণাগুলোর নিদিষ্ট অবস্থান ও গতিবেগ নির্ধারণ করা হয়নি। তার বদলে তাদেরকে একটি তরঙ্গধর্ম হিসেবে প্রকাশ করা হয়। এসব কোয়ান্টাম তত্ত্ব সময়ের পরিবর্তনের সাথে তরঙ্গের বিকাশের নিয়মকানুন দিতে পারে। এই অর্থে এই কোয়ান্টাম তত্ত্বগুলো নিমিত্তবাদভিত্তিক। কাজেই আমরা যদি কোন একটি সময়ের তরঙ্গ সম্পর্কে জানতে পারি, তাহলে অন্য যে কোন সময়ের জন্য এই তরঙ্গকে নির্ণয় করতে পারবো। এখানে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। কিন্তু যখনই আমরা তরঙ্গকে কণার অবস্থান ও গতিবেগের ভিত্তিকে প্রকাশ করতে যাই তখনই শুধু এলোমেলো মৌল কণা পাওয়া যায় যার সম্পর্কে অগ্রিম বলা অসম্ভব। হকিং-এর ভাষায়, এটি সম্ভবত আমাদেরই ভুল। হতে পারে কোথাও কণার কোন অবস্থান ও গতিবেগ বলে কিছু নেই, তার বদলে শুধু তরঙ্গই আছে। আসলে অবস্থান আর গতিবেগ সম্পর্কে আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে তরঙ্গকে আমরা খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করি বলেই এমনটি ঘটে। এই আপাত কারণেই ফলাফলটাও মেলে না। এর ফলে আমরা বিজ্ঞানের কাজের ধারা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছি। সেটি হল এমন নিয়মকানুন আবিষ্কার করা, যা দিয়ে অনিশ্চয়তার নীতির নির্ধারিত সীমার মধ্যে আমরা কোন ঘটনা সম্পর্কে আগাম বলতে পারবো। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়- মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে কীভাবে বা কেন এই নিয়মকানুনগুলো বেছে নেয়া হয়েছিল?
যে বইগুলো রচনার জন্য পৃথিবীর কাছে তিনি সবচেয়ে পরিচিত মানুষদের একজন হয়ে দাঁড়িয়েছেন সেগুলো হচ্ছে: আ ব্রিফ হিস্টোরি অব টাইম (১৯৮৮), ব্ল্যাক হোলস অ্যান্ড বেবি ইউনিভার্সেস অ্যান্ড আদার এসেস (১৯৯৩), দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল (২০০১) অন দ্য সোল্ডার্স অব জায়ান্টস (২০০২), দ্য ড্রিমস দ্যাট স্টাফ ইজ মেড অফ: দ্য মোস্ট অ্যাস্টাউন্ডিং পেপার্স অব কোয়ান্টাম ফিজিক্স অ্যান্ড হাউ দে শুক দ্য সায়েন্টিফিক, মাই ব্রিফ হিস্ট্রি (২০১৩)। রজার পেনরোজের সঙ্গে লিখেছেন দ্য নেচার অব স্পেস টাইম। ডব্লিউ অ্যালিসের সঙ্গে লিখেছেন দ্য লার্জ স্কেল স্ট্রাকচার অফ স্পেস টাইম। এছাড়াও সম্পাদনা করেছেন, গড ক্রিয়েটেড দ্য ইন্টিজার্স: দ্য ম্যাথমেটিক্যাল ব্রেক থ্রু দ্যাট চেঞ্জড হিস্ট্রি (২০০৫)। তিনি রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টসের সম্মানীয় ফেলো ছিলেন। ২০১৪ সালে তাঁকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়, যেটির নাম থিওরি অব এভরিথিং।
স্টিফেন হকিং-এর বাবা ড. ফ্রাঙ্ক হকিং (১৯০৫-১৯৮৬) একজন জীববিজ্ঞান গবেষক ও মা ইসোবেল হকিং (১৯১৫-২০১৩) একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন একজন স্কটিশ। হকিং-এর জন্মের পর তাঁরা আবার লল্ডনে ফিরে আসেন। ফিলিপ্পা ও মেরি নামে হকিং-এর দুই বোন রয়েছে। ১৯৫০ হকিং-এর পরিবার হার্টফোর্ডশায়ারের সেন্ট অ্যালবাতে চলে যান। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত হকিং সেন্ট অ্যালবার মেয়েদের স্কুলে পড়তেন। স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে গণিত শিক্ষক ডিকরান তাহতার অনুপ্রেরণার কথা হকিং পরবর্তী জীবনে স্মরণ করেন। পরবর্তী সময়ে স্কুলের সঙ্গে হকিং তাঁর সম্পর্ক বজায় রাখেন।
বিজ্ঞানে হকিং-এর সহজাত আগ্রহ থাকলেও তাঁর বাবার ইচ্ছে ছিল হকিং যেন তাঁর মতো ডাক্তার হয়। কিন্তু হকিং গণিত পড়ার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু যেহেতু সেখানে গণিতের কোর্স পড়ানো হতো না, সেজন্য হকিং পদার্থবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়া শুরু করেন। সেসময় তাঁর আগ্রহের বিষয় ছিল তাপগতিবিদ্যা, আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা।
স্টিফেন হকিং ক্যামব্রিজের গনভিলি এবং কেয়াস কলেজের ফেলো হিসাবেও কাজ করেছেন। শারীরিকভাবে ভীষণরকম অচল হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীকে শুধু পদার্থবিজ্ঞানে নয় সমগ্র চিন্তার ক্ষেত্রকে এগিয়ে দেওয়ার প্রণোদনা জুগিয়েছেন। তিনি মানব অস্তিত্ব রক্ষায় বারবার সতর্ক করেছেন। কয়েক বছর আগে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি শিশু ও নারীদের নির্বিচারে হত্যা করলে হকিংই প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। উল্লেখ্য, সে সময় বিনা উস্কানিতে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী ৯ দিন ধরে গাজা শহরে মানবতা-বিবর্জিত হামলা চালায়। এই পদার্থবিজ্ঞানী শুধু নিন্দাই জানালেন না; ইসরায়েলের জেরুজালেম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন। স্টিফেন হকিংয়ের এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের জন্যে এক বড় ধরনের আঘাত ছিল বলে গার্ডিয়ান পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছিল। কেননা, হকিংয়ের পথ ধরে আরও অনেক বিজ্ঞানী এই কনফারেন্সে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এমনকি অনেক সংগীতশিল্পী, চিত্রকর ও লেখকও কনফারেন্সে যোগ দেননি।
ধর্ম ও পরকাল নিয়ে হকিং এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যে কোনো ধর্মের মানুষের পক্ষেই স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া কঠিন- এত সরাসরি আর কেউ পৃথিবীর মানুষের সামনে ধর্মের পরকাল নিয়ে এভাবে কথা বলেছেন কি-না সন্দেহ। কিন্তু তিনি এমন এক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কথাগুলো বললেন যে, সবচেয়ে সাধারণ মানুষটিও দুঃখ প্রকাশ করলেন এভাবে- ‘হকিং এ কথা বলতে পারলেন!’ পরক্ষণেই আবার চিন্তামগ্ন হলেন। অর্থাৎ কেন এ রকম কথা বললেন হকিং? ৫০০ কোটি পাউন্ডের প্রকল্প লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডরে হিগস-বোসন কণার সন্ধানে পরীক্ষার সময় সবাই যখন বলছিল, এত খরচ করে কী ফল হবে? তখন তিনি বলেছেন, যদি মানবজাতি জিডিপির ১০ শতাংশ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় খরচ করতে না পারে তাহলে মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়াই উচিত নয়।
সেই স্টিফেন হকিংই বলেছেন, ‘মহাবিশ্বের অনেক রহস্যই উপলব্ধি করতে পেরেছি; কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাতারাতি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণ বুঝতে পারিনি।’ ৩১ মে ২০১৭ ব্রিটেনের আইটিভিতে ‘গুড মর্নিং ব্রিটেন’ অনুষ্ঠানে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সম্পর্কে স্টিফেন হকিং এ রকম মনোভাবই প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এই মার্কিন কোটিপতিকে একজন ‘বক্তৃতাবাজ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাঁর জনপ্রিয়তা একটা রহস্যই বটে। আর রহস্যই হবে না কেন? একজন মানুষ শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য প্রতিমুহূর্তে প্রতি-বিপরীত কথা বলে যাচ্ছেন। তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি।
আমেরিকায় মুসলিমদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করা উচিত- এমন বক্তব্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হলেও হাততালি পেয়েছেন নিজ দেশে, যা খুবই বিপদের কথা। মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের রাজনীতি বিশ্বকে প্রভাবিত করে। নিউক্লিয়ার শক্তিধর দেশ হিসেবেও আমেরিকা বিশ্বে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সে রকম একটি দেশে এ রকম একজন ব্যক্তির জনপ্রিয়তা ও চূড়ান্ত পর্যায়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়া শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, হতাশাব্যঞ্জক এবং বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। তাই ট্রাম্প সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে হকিং স্বভাবসুলভ ভাষায় বলেন, এ মানুষটা কী করে একজন জননেতা হন, বুঝতে পারছি না! তিনি বলেন, যতদিন যাচ্ছে, ততই আমরা বিশ্বের মানুষ নিজেদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এতটা অযৌক্তিক, হাস্যকর হতে পারেন না।

বিজ্ঞানীদেরও এগিয়ে আসতে হবে
রাজনীতি ও বিজ্ঞান- দুটি পৃথক শব্দবন্ধ। কখনও মেলেনি। বরং বলা উচিত, রাজনীতি কখনও বিজ্ঞানকে নিজের করে নেয়নি। নিলে সমাজ ও সভ্যতা অন্যরকম হতো। মানবসৃষ্ট বিশ্ব-উষ্ণায়নের কবলে পড়তাম না আমরা। রাজনীতিকরা বিজ্ঞানকে দেখেছেন উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার বা ক্ষমতা লাভের উপায় হিসেবে। তাই রাজনীতিতে বিজ্ঞানীদের পদচারণা তেমন দেখা যায় না কোনো উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হওয়া ছাড়া। দেখা গেলেও তারা রাজনীতির কূটচক্রে জড়িয়ে গিয়ে কথা বলেন, বিজ্ঞানের বাস্তবতা বা বিজ্ঞানের উপলব্ধি নিয়ে কোনো কথা তাদের নেই। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সমাজ-সভ্যতার সমন্বয় ঘটেনি। এ কারণেই প্রযুক্তির বিকাশে যে বিশ্বায়ন দেখা দিয়েছে, তাতে সৃষ্ট সাংস্কৃতিক সংকট মোকাবেলায় আমরা তাল মেলাতে পারছি না। রাজনীতিতে এসে যেহেতু বিজ্ঞানীরা রাজনীতির সনাতন ধারার বাইরে যান না, সেহেতু তাদের কথা আলাদাভাবে গুরুত্ব লাভ করেনি; ফলে একজন বিজ্ঞানের মানুষের নিজস্ব উপলব্ধির কথা পৃথিবীর মানুষ, নিদেনপক্ষে তার দেশের মানুষ মনোযোগ দিয়ে শুনবেনÑ সেটা আশা করা এখনও প্রায় দুরাশার পর্যায়ে পড়ে।
ঠিক এ রকম একটি সময়ে স্টিফেন হকিংয়ের মতো খ্যাতনামা বিজ্ঞানী সমাজ-সভ্যতা, রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে কথা বলে চলেছেন। নানা বিষয়ে তাঁর মত প্রকাশ করছেন; রাজনীতির ক্রীড়নক হিসেবে নয়, একজন বিজ্ঞানীর স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই। তাঁর এ মতামত, বক্তব্য পৃথিবীর গণমাধ্যমগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে বা ছেপেছে। তিনি বিগত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের মনোনয়ন বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সেই অভিমতে বিরক্তি ও বিপদের সতর্কতা প্রকাশ পেয়েছে। ট্রাম্পের অর্থহীন প্রলাপগুলো কেন আমাদের আলোড়িত করছে সেটা তিনি ধরতে পারছেন না। স্টিফেন হকিংয়ের এ মতামত গণমাধ্যম পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। হকিংয়ের কারণেই আরও বেশি পাঠক তা মনোযোগ দিয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, একবার আলবার্ট আইনস্টাইন যুদ্ধ থেকে সরে এসে শান্তির পৃথিবী প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতাধর দেশগুলোকে কিছু পরামর্শ দিলে অনেকে বলতে লাগলেন তিনি রাজনীতি বোঝেন না, তাঁর সব বিষয়ে কথা বলা ঠিক নয়। আইনস্টাইন তখন বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি বর্বর গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শান্তির কথা বলছি না, সুসভ্য জাতিগুলোর মধ্যে শান্তির কথা বলছি। সে জায়গায় রাজনীতির কৌশল প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি না।
১৯১১ সালে রাদারফোর্ডের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সভ্যতা প্রথম বুঝতে পারলো পরমাণুর অভ্যন্তরের না-জানা বিপুল সম্ভাবনাময় এক জগৎ সম্পর্কে। ডেনমার্কের নিলস বোর তার সঠিক ব্যাখ্যা দ্বারা পরমাণু জগতের তত্ত্ব দিলেন, যা রাদারফোর্ড-বোর পরমাণু মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করলো। জার্মান বিজ্ঞানী লিস মিটনার ও অটো হ্যান জানালেন, সব পরমাণুর অভ্যন্তর ভারি যেমন প্লটোনিয়াম ও ইউরেনিয়াম, তাদেরকে বিভাজিত করলে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। এটাকেই ফিসন বিক্রিয়া বলে। এখানে পদার্থ রূপান্তর হয়ে শক্তিতে পরিণত হয়। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন অবশ্য আগেই তাঁর বিখ্যাত ই = এমসিস্কয়ার (ব = সপক্ষ্ম) সমীকরণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন পদার্থ ও শক্তির রূপান্তরের সেই নিখুঁত সম্পর্ক। পরমাণুর বিস্ময়কর জগৎ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যত জানতে লাগলেন ততই মানুষের চিন্তার জগৎ পরিবর্তিত ও বিকশিত হতে থাকলো। নতুন বাস্তবতা ও উপলব্ধি মনোজগতে ছাপ ফেলতে লাগল। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা সেই বাস্তবতা বা সেই উপলব্ধি নয়, মানবজাতির নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং বিজ্ঞানের ওই পরমাণুজাত কৌশলকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীদের প্রতি গুরুত্বারোপ করলেন, তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা হলো। এ ব্যাপারে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, নিলস বোর, লিস মিটনার, কাপিৎজার, জেডি বার্নালের কথা বাদ দিলে তেমন নাম খুব চোখে পড়ে না, যারা বিজ্ঞানীর ভাবনা থেকে সোচ্চার হতে পেরেছেন, সমাজ-রাজনীতিকে নাড়া দিতে পেরেছেন। কেউ কেউ চেষ্টা করলেও তাদের কথা খুব একটা গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হয় না। ফলে সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে বিজ্ঞানের বিভাজন বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানের অবদান প্রযুক্তিকে আমরা এমনভাবে ব্যবহার করেছি, যা সমাজ-সভ্যতার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। হিরোশিমায় পরমাণু বোমা বর্ষণ থেকে বর্তমানে এক দেশের বিরুদ্ধে আরেক দেশের আধুনিক অস্ত্রের প্রয়োগ দেখলে তা বোঝা যায়। এ ব্যাপারে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ব্যাখ্যাকার সিপি স্নো, জেকব ব্রনোওস্কি, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী কার্ল সাগান আগেই বলেছিলেন, বিজ্ঞানকে সংস্কৃতির অংশ করতে না পারলে সামনে আরও বিপদ অপেক্ষা করছে। সে বিপদকে আরো নিশ্চিতভাবে জানানও দিলেন। বললেন আর সময় নেই। স্টিফেন হকিং সে স্রোতকেই বেগবান করার চেষ্টা করেছেন
স্টিফেন হকিংয়ের রাজনীতি, সমাজনীতি বিষয়ক বিভিন্ন বিবৃতি আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ভাবিয়েছে। বিজ্ঞানী সমাজ যদি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশ, সমাজ নিয়ে রাজনীতির ভাষায় নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে জোরালোভাবে মতামত প্রকাশ করেন তবে সাধারণ মানুষের নতুনভাবে ভাবনার জায়গাটা আত্মবিশ্বাসী ও স্বচ্ছ হয়ে উঠবে। তিনি পৃথিবীর মানুষের চলার পথের নির্দেশনা দিয়ে সতর্ক করেছেন। কেননা এ ব্যাপারে বিজ্ঞানবোধ সম্পন্ন মানুষেরাই পারেন। যেমনটি তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের ব্যাপারে বলেছেন, এ দ্বারা আমাদের ভাবনা-চিন্তাকে যখন বহু গুণ বাড়িয়ে তোলা যাবে, কল্পনাও করতে পারি না, কোথায় গিয়ে পৌঁছব আমরা! এই উন্নতির বিরোধি না হলেও এটার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া দরকার। তাঁর ভাষায়, হয় এটা মানুষের সেরা উদ্ভাবন, নয় তো সব চেয়ে খারাপ।
প্রায়শ এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাহলো হকিং কি নোবেল পুরুস্কার পেয়েছেন বা তার পাওয়া উচিৎ ছিল? উত্তরে বলা যায়, যে কোনো তত্ত্ব যত সুন্দর হোক তার ফলগুলো পরীক্ষিত না হলে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় না। সেজন্য ইউনিফায়েড থিওরি বা একীভূত তত্ত্বকে পরীক্ষিত হতে হবে। তা হলে স্টিফেন হকিংয়ের ধারণা আরও শক্তিশালী হবে। আর সবকিছুকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে মাপা উচিৎ নয়। আমার মনে হয় স্টিফেন হকিংকে ঘিরে মানবজাতি, পৃথিবীর অস্তিত্ব ইত্যাদি ব্যাপার আছে। তাঁর দর্শনও মানুষকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছিল। তিনি আসলে দেশ-জাতির উর্ধ্বে উঠে মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। পৃথিবীর দূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেছিলেন। পৃথিবীর মানুষের গ্রহান্তরে ছড়িয়ে পড়ার কথা ভেবেছিলেন।
স্টিফেন হকিং, পৃথিবীর মানুষ আপনার কথা সবসময় মনে রাখবে।
রচনা : এপ্রিল, ২০১৮

তথ্যপঞ্জি
১. বিজ্ঞানীর নৈঃসঙ্গ
২. ইস্পাত ১ ও ২
- নিকোলাই অস্ত্রভস্কি
৩. অফিয়াকাস (সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান ত্রৈমাসিক পত্রিকা)

Disconnect