ফনেটিক ইউনিজয়
পাঠ প্রতিক্রিয়া
পারিবারিক সহিংতার উৎস কোথায়?
মুন্সী তিমুচীন, নতুন উপশহর, যশোর

সাম্প্রতিক দেশকাল-এর ১৬ নভেম্বর ২০১৭ সংখ্যায় সীমাদত্ত লিখিত ‘পারিবারিক সহিংসতার উৎস কোথায়?’ নামক প্রতিবেদনটি পড়লাম। নিচে আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানো হলো। শুরুতেই সীমাদত্তকে নারীমুক্তি ও শোষিত শ্রেণির শোষণ মুক্তির অনুভবের জন্য ধন্যবাদ জানাই।
লেখিকা বলেছেন, ‘সারা বিশ্বে পরিবারপ্রথা একটি বিকাশমান প্রক্রিয়া।’
ওপরের বক্তব্য দিয়ে দুই রকম অর্থ তৈরি হয়, সেই কারণে বিষয়টি একটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল। আমার মতামত, গোত্রের মধ্যে পরিবারের সূত্রপাত। নিজের জীবন ও পরিবারের জীবন উৎপাদনের জন্যই সমাজবদ্ধতার প্রশ্ন এসেছিল। ইতিহাসে দেখা গেছে বিভিন্ন ব্যবস্থায় সামাজিক বা যৌথভাবে জীবনধারণের উপকরণ উৎপাদন করতে হয়। হোক সেটা ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক অথবা সামাজিক মালিকানাধীন। ইতিহাসে লক্ষ করি সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবার তার আকার সর্বস্ব রূপ ধারণ করে, অন্যদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একান্তবর্তী পরিবার ভাঙতে থাকে। মানে পুঁজিবাদী অর্থনীতি পরিবার ভাঙার অনুঘটক। ইতিহাসের এ পর্যায়ে পরিবার বলতে আমরা দেখি স্বামী-স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে। অন্যদিকে উন্নত পুঁজিবাদী ইউরোপ-আমেরিকা ও প্রাচ্যের জাপানে পরিবার গড়ে উঠছে কেবল স্বামী-স্ত্রী নিয়ে। কারণ পরিবার সন্তানের দায়িত্ব নিচ্ছে না। এমনকি স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিচ্ছেন অথবা স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিচ্ছেন। তাঁরা এককভাবেও থাকছেন অনেকে। এমন অনেক নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা বিবাহবহির্ভূত যৌনাচারকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন। ভবিষ্যৎ সাম্যবাদী সমাজে পরিবার বিলুপ্ত হবে, এ কথা মহান নেতা কার্ল মার্ক্স তাঁর পুঁজি গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ উভয়ই পরিবার বিলুপ্তির কাজ করে চলেছে।
আমার মনে হয়েছে, লেখিকার মানুষ-সম্পর্কিত ধারণা পরিষ্কার নয়? তিনি যখন নারী সম্পর্কে আলোচনা করছেন অথবা শ্রমিক সম্পর্কে বলছেন, তা এই মানুষ অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে। অথচ অনৈতিহাসিক মানুষ নিয়ে আমাদের আলোচনা নয়, ও পথে মুক্তির সম্ভাবনা নেই।
ইতিহাসে নারী সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত কোথায়, কীভাবে হয়েছে তা দেখা যাক। গোত্রতান্ত্রিক সমাজে সম্পত্তি সম্পর্কে প্রথাগত ধারণা স্বামী বা পিতার সাথে সম্পর্কনির্ভর। এখানে সম্পত্তি ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক হওয়ার কারণে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নারী মুক্তি পূর্ণতা পেতে পারে না। উৎপাদানের উপায় অর্থাৎ জমি, কারখানা, খনি, জলমহাল ইত্যাদির মালিক রূপে যার উপস্থিতি, তিনিই স্বাধীনতা ভোগ করেন। অন্যদিকে লাখ লাখ নারী-পুরুষ শুধু গতর বা দৈহিক শ্রমের মালিক, তাঁরা আধুনিক দাম, কাজকর্ম পেলে ঘোড়া কিংবা গরুর মতো জীবন বাঁচেন। নচেৎ অনাহারে, অর্ধাহারে জীবন কাটে, ওখানে স্বাধীনতা-নারীর স্বাধীন সত্তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
মাতৃতান্ত্রিক সমাজ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে, এটা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। যেমন ইতিহাস, বিজ্ঞান বিচার করার সময় খেয়াল রাখা প্রয়োজন। জীববিজ্ঞান, প্রকৃতি বিজ্ঞান অথবা পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে ইতিহাসের উদাহরণ দেওয়া উচিত নয়। আমি বলতে চাই, এই যে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নানা সভ্যতা গড়ে উঠেছে, সব জায়গায় কিন্তু মাতৃতান্ত্রিকতা ছিল না। বরং কোথাও কোথাও ছিল। ফলে ঢালাওভাবে সর্বত্র মাতৃতান্ত্রিক ছিল, এ দাবি ধোপে ঠেকে না। এবার নারী মুক্তি আন্দোলন সম্পর্কে লেখিকাকে বলতে চাচ্ছি, সুদীর্ঘকাল ধরে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশে^র বিভিন্ন দেশে ধারাবাহিক আন্দোলন চলে আসছে এবং নারী মুক্তি আন্দোলনের নেতারা যেসব অধিকার অর্জন করেছেন, তিনি কি তার খোঁজখবর রাখেন? তাঁর একরোখা বিচার এই প্রতিবেদনকে দুর্বল করেছে। বর্তমান সময় শিশু-নারীদের ওপর বিভিন্ন নির্যাতন চলছে। এ ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য কী? নারী মুক্তি, নারীর অধিকার অর্জন কি অন্যদের দয়ার দান? শুধু নারী নন, এ দেশের লাখ লাখ শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী মানুষ নানামাত্রিক শোষণ-নির্যাতনের মধ্যে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন, আপনি কি মনে করেন না নারী-পুরুষ ঐক্যবদ্ধভাবে শোষণ মুক্তির লড়াই করা প্রয়োজন। নারীর বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কী ধরনের নির্যাতনমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার উল্লেখই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নারী সমাজকে সংগঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি অবমাননার জবাব দিতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, রাষ্ট্র বা শাসকশ্রেণি নারীর পক্ষে যেসব আইন তৈরি করেছে, তার পেছনে বিশে^র বিভিন্ন জাতি-বর্ণ নির্যাতিত নারী-আন্দোলনের ভূমিকা থাকে, এটা এই প্রতিবেদনের কোথাও উল্লেখ নেই। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ ও ভাষাভিত্তিক নারীদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় শাসকশ্রেণি দয়া করে কোনো আইন তৈরি করে দেবে না। নারী সমাজকে সংগঠিতভাবে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে আইন তৈরি করতে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে। আশা করি লেখিকা এবং সাম্প্রতিক দেশকাল-এর পাঠক/পাঠিকারা আমার বক্তব্যকে বিবেচনা করবেন।

আরো খবর

Disconnect