আজ পবিত্র লাইলাতুল কদর

আজ ২৬ রমজান। আজ পবিত্র লাইলাতুল কদর। মুসলমানদের কাছে শবে কদর অত্যন্ত মহিমান্বিত একটি রাত। 

এই রাতে পবিত্র কোরআন শরীফ অবতীর্ণ হয় ও এই রাতকে কেন্দ্র করে ‘আল-কদর’ নামে একটি সুরাও নাজিল হয়। কদর নিয়েও এর পূর্বে কয়েকটা লেখায় আলোচনা করা হয়েছে।

অন্যান্য সময়ে এক হাজার মাস ইবাদত করলে যে সওয়াব পাওয়া যায়, শবে কদরের রাতে ইবাদত করলে তার চেয়ে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। এই রাতে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীদের সম্মান বৃদ্ধি করা হয় ও মানবজাতির ভাগ্য পুননির্ধারণ করা হয়। সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এই রাত অতীব পুণ্যময় ও মহিমান্বিত। 

একদিন প্রিয় নবী (সা.) এ ভেবে অস্থির হচ্ছিলেন যে, আগের নবীর উম্মতেরা দীর্ঘজীবন পেতেন। ফলে তারা অনেক বেশি ইবাদত বন্দেগির সুযোগ পেতেন। কিন্তু শেষ নবীর উম্মতের জীবন খুবই সীমিত। এত অল্প সময়ের ইবাদতে তারা মাবুদের কাছে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন কিভাবে। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরা কদরের উপহার নিয়ে উপস্থিত হন হযরত জিবরাইল (আ.)।

শান্ত হন রাহমাতাল্লিল আলামিন (সা.) ও তার সাহাবিরা। আল্লাহ এ রাতেই মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজিল করেছেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু রাত কোনটি তা বলে দেননি। হাদিস শরিফেও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি কোনটি কদরের রাত। নিঃসন্দেহে এতে অনেক রহস্য ও তাৎপর্য রয়েছে। হয়তো আল্লাহতায়ালা ও তার রাসূল (সা.) চাননি মুসলমানরা একটি রাতের ভরসায় বসে থেকে সারা বছর বা সারা মাস অবহেলায় কাটিয়ে দিক। এজন্য এটিকে রহস্যময় করে রাখা হয়েছে। 

তাছাড়া পরিশ্রম ও সাধনার মাধ্যমেই মূল্যবান কিছু অর্জন করতে হয়। যে রাতের মূল্য হাজার মাসের চেয়ে বেশি, তা যদি সহজে পাওয়া যেত, তাহলে মানুষ হয়তো এটিকে বেশি গুরুত্ব দিতো না। তাই তা অনির্দিষ্ট করে রেখে মানুষকে অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে।

নবীজী (সা.) রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করতে বলেছেন। কেউ কেউ রমজানের যেকোনো অংশে এ রাত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।

কিন্তু বেশিরভাগ মনীষীর মতে রমজানের শেষ দশকেই তা লুকানো রয়েছে। আবার কারও কারও মতে, এ রাতের তারিখ পরিবর্তনশীল। কোনো বছর ২১, কোনো বছর ২৩, কোনো বছর ২৫, কোনো বছর ২৭ আবার কোনো বছর ২৯ তারিখের রাত লাইলাতুল কদর হয়। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে অনেক মনীষী রমজানের ২৭ তারিখের রাতকে লাইলাতুল কদর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এ ব্যাপারে সাহাবিদের মধ্যে এ উম্মতের শ্রেষ্ঠ কারী হিসেবে আখ্যায়িত উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি জোর দিয়ে বলতেন, রমজানের ২৭তম রাতই কদরের রাত।

অন্যদিকে ফিকাহ ও ইজতেহাদের জ্ঞানে চার খলিফার পরই যার স্থান, সেই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলতেন, এটি রমজানের বাইরেও হতে পারে।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মন্তব্য সম্পর্কে হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বলতেন, আমার ভাই আবদুল্লাহ ভালো করেই জানেন, এটি রমজানের মধ্যে ও তা ২৭তম রাত। কিন্তু লোকেরা এ রাতের ভরসায় বসে থাকবে ও আলসেমিতে সারা বছর ও সারা রমজান মাস কাটিয়ে দেবে এ ভয়ে তিনি তা লোকদের জানাতে চান না।

উবাই ইবনে কাবকে (রা.) প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন ২৭ রমজানের রাতটিই কদরের রাত? জবাবে তিনি বলেন, এ রাতের যেসব আলামত মহানবী (সা.) আমাদের বলেছেন, আমরা সেগুলো ২৭ তারিখে পেয়েছি।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও হযরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) সহ এক দল মনীষীর ব্যাপারে বলা হয়, তারা রমজানের ২৭ তারিখের রাতকে লাইলাতুল কদর বলে মনে করতেন। এসব মনীষীর নাম যুক্ত হওয়ায় রমজানের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতটি অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করার ধারা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

তবে মনে রাখতে হবে, কদরের রাতের যে মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য, তার মূল আকর্ষণ হল কোরআনুল কারিম। বিশ্বমানবতার মুক্তি ও কল্যাণের জন্য জীবন ব্যবস্থার চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে কোরআন শরিফ নাজিলের সাথে রাতটি সম্পর্কিত হওয়ায় এত মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়েছে। অতএব, এ রাতের সুফল পুরোপুরিভাবে পেতে কোরআন শরিফের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করাই আসল কাজ।

বুঝে বুঝে কোরআন পাঠ, কোরআনের মর্ম অনুধাবন, নিয়মিত অধ্যয়ন ও কোরআনের বিধান ও নির্দেশনা অনুসরণে জীবনযাপনই মুমিনের জীবনের সাফলতার চূড়ান্ত স্তর। লাইলাতুল কদরে নামাজ, তেলাওয়াত ও জিকির-তাসবিহের সাথে যেমন অতীত জীবনের পাপ মোচনের জন্য প্রভুর কাছে আকুল আবেদন জানাতে হবে, তেমনি তার কাছে সাহায্য চাইতে হবে আল কোরআনের আলোকে আগামীর দিনগুলো আমরা যেন অতিবাহিত করতে পারি। 

হে আরশের মালিক মওলা! আপনি আমাদের সেই তাওফিক দিন। আমিন!

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh