ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ
কৃষক ফেডারেশনের মধ্যে ভাঙ্গন সৃষ্টির ফলে পটুয়াখালী ও খুলনায় আমাদের ক্ষতি হয়েছিল। এর ফলে পটুয়াখালীতে আমি আর কখনো যাই নি। আমাদের সাথে কোন স্থানীয় কৃষক সংগঠক ও নেতার কোন ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকে নি। সেটা যাতে না হয় তার দিকে সাত্তার খান সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। এ কারণে অন্যান্য জেলার মত পটুয়াখালীর গ্রামাঞ্চলে আমি বিশেষ কোন সফর করি নি। আমি শুধু সাত্তার খানের গ্রাম দশমিনাতেই যেতাম। সাত্তার খান বিভিন্ন এলাকার কর্মীদেরকে সেখানে ডেকে এনে বৈঠকের ব্যবস্থা করতেন। এছাড়া সাত্তার খানের সাথে আমি একবার গলাচিপা গিয়েছিলাম। আর একবার বরিশাল শহরে। এর ফলে সাত্তার খানদের সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর আমার পক্ষে সাংগঠনিক কাজে পটুয়াখালী যাওয়া আর হয়ে ওঠে নি।
খুলনায় আবদুল মজিদ ও কালু সাহা চলে যাওয়ার ফলে ক্ষতি হলেও খুলনা জেলাতে আমাদের অবস্থা সে রকম খারাপ ছিল না। তবে বটিয়াঘাটা থানায় অবস্থা দাঁড়িয়েছিল পটুয়াখালীর মতই। সেখানে কালু সাহার সাথে আমি ব্যাপকভাবে সফর করাতে এমন কোন সাংগঠনিক কর্মী ছিল না, যার সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে আমি কালু সাহার সাহায্য ছাড়া সফর করতে পারতাম। সেখানে যার সাথে বেশ ভাল যোগাযোগ ছিল একমাত্র নরেশ গোলদারের সাথে। কিন্তু আমার সাথে ভাল পরিচয় ও সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন কালু সাহার অনেক দিনের সহকর্মী। কাজেই কালু সাহার সাথে তিনিও চলে গেলেন।
আশাশুনীর অবস্থাও হয়েছিল একই রকম। রফিকুল ইসলাম মজিদ সাহেবদের সাথে চলে যাওয়ায় সেখানেও আর যাওয়া হয় নি। তবে সেখানে বটিয়াঘাটা বা ডুমুরিয়ার মত ভাল সংগঠন ছিল না। মজিদ সাহেব ডুমুরিয়ার বটিয়াঘাটা অঞ্চলে কৃষক ফেডারেশনের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। কিন্তু আমাদের থেকে আলাদা হওয়ার পর তাঁদের কৃষক ফেডারেশনের বিশেষ কোন কাজ করতে পারেন নি। সাত্তার খান আগে পটুয়াখালীর বাহিরে কোন এলাকায় সাংগঠনিক সফর করেন নি। কিন্তু ভাঙ্গনের পর দুই একবার ডুমুরিয়া গিয়েছিলেন, কিন্তু তাতে কোন কাজ হয় নি। আবদুল মজিদ কৃষক এলাকায় সাংগঠনিক কাজের থেকে ডুমুরিয়ায় কাঠামো নির্বাচন করে প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করতেন। পরে তিনি প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন।
ডুমুরিয়ায় আবদুল মজিদ ছাড়া অন্যদের সাথেও আমাদের ভাল যোগাযোগ ছিল। তার মধ্যে ছিলেন ফরিদ আহমদ। তাঁদের বাড়ীও ছিল ডুমুরিয়ায়। এছাড়া ডুমুরিয়ায় ছিলেন আবদুল হাই, আলতাফ হালদার এবং অন্যেরা। তাঁদের সহযোগিতায়, বিশেষতঃ আবদুল হাইয়ের সহযোগিতায় আমি ডুমুরিয়ার অনেক জায়গায় সফর করেছিলাম। ফরিদ আহমদের সাথে আমি কোথাও সাংগঠনিক সফর করি নি।
১৯৮২ সালের জানুয়ারীতে ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিন সফরের ব্যবস্থার জন্য আমি ফরিদ আহমদকে চিঠি দিয়ে বলেছিলাম, তিনিও বলেছিলেন ব্যবস্থা করবেন। সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট তারিখে আমি খুলনা গেলাম। সেখান থেকে আবদুল হাই এর সাথে গেলাম ডুমুরিয়া। ফরিদ আহমদ তখন ছিলেন ডুমুরিয়ায়। তাঁর বাড়ীতেই উঠলাম। ডুমুরিয়া অঞ্চলের কৃষক কর্মীদের একটা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল সেখানে। কিন্তু দেখলাম এত আগে থেকে প্রোগ্রাম করা সত্ত্বেও কেউ এলো না। আসলে বৈঠকের জন্য যে যোগাযোগ করা দরকার ছিল সেটা তিনি করেন নি। এলাকায় তিনি পরিচিত হলেও এবং তাঁর কিছু প্রভাব থাকলেও সাংগঠনিক কাজে কোন দক্ষতা তাঁর ছিল না। তবে আবদুল হাই এর যোগাযোগের মাধ্যমে এলেন সুভাষ সাহা। তাঁর বাড়ী ছিল মিকসিমিল। তিনি আগে ছিলেন জাসদ এর সদস্য। কিন্তু পরে তাদের সাথে থাকেন নি। আবদুল হাই তাঁকে ‘সংস্কৃতি’ পড়তে দিতেন। ‘সংস্কৃতি’ পড়ে তিনি আমার সাথে আলোচনায় আগ্রহী হন। ফরিদ আহমদের বাড়ীতে আমি তাঁর সাথে দীর্ঘ সময় দেশের পরিস্থিতি, আমাদের রাজনীতি, কৃষক ফেডারেশন, লেখক শিবির, সংগঠন বিষয়ে আলোচনা করলাম। এই আলোচনার পর সুভাষ সাহা আমাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী হলেন। এখনো পর্যন্ত তিনি কৃষক ফেডারেশন এবং লেখক শিবিরের সাথেই আছেন।
এখানে প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে কৃষক ফেডারেশন তিল এর মহাজনদের ওজন কারচুপির বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন করে। এলাকাটা ছিল খুলনা থেকে ডুমরিয়া যাওয়ার পথে গুটুদিয়া ও ডুমুরিয়ার মাঝামাঝি কেয়ায়। কেয়া বাজার একেবারে নদীর ধারে। এখানে নদী পার হতে হতো ফেরিতে। পরে বেলী ব্রিজ হয়েছিল। এখন সেখানে পাকা ব্রিজ হয়েছে কিনা জানি না। ঐ এলাকায় ব্যাপকভাবে তিল চাষ হতো। কৃষকরা বাজারে তিল বিক্রী করতে গেলে তাঁদেরকে এক মনে ৪০ সেরের পরিবর্তে দিতে হতো ৪২ সের অর্থাৎ দুই সের বেশী। এই ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল। কৃষক ফেডারেশন স্থানীয় কৃষকদেরকে নিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। ফসল ওঠার পর খোদ উৎপাদকদের পক্ষে ফসল ধরে রাখা কঠিন হয়। ঋণ পরিশোধ করা থেকে অন্যান্য জরুরী প্রয়োজনে নগদ টাকার দরকার হয়। সে জন্য কম করে হলেও কৃষক কিছু ফসল বিক্রী করতে বাধ্য হন। এর সুযোগ ব্যাপারীরা সব সময় নিয়ে থাকে। তিল এর ব্যাপারীরাও এই সুযোগ নিয়ে প্রতি মনে দুই সের তিল বেশী রাখতো। আন্দোলনের সময় ঐ এলাকার কৃষকরা কষ্ট হলেও মন প্রতি দুই সের বেশী দিয়ে তিল বিক্রী করতে অস্বীকার করলে শেষ পর্যন্ত মহাজনরা এক মনে ৪২ সেরের জায়গায় ৪০ সের নিতে বাধ্য হয়। সেই থেকে সেখানে আগের ব্যবস্থা উঠে যায়। আন্দোলনটা ৪০-৪২ এর আন্দোলন নামে পরিচিত হয়েছিল।
ডুমুরিয়া বাংলাদেশের একটা উপকূলীয় অঞ্চল। এই উপজেলায় অসংখ্য ছোট ছোট নদী নালা, খালবিল। নদীগুলোর সাথে বঙ্গপোসাগরের সংযোগ থাকায় সেখানে নিয়মিত জোয়ার ভাটায় নদী খাল বিলে পানি ওঠা নামা করতো। বিলের জমিতে একমাত্র আমন ধান ছাড়া আর কিছু হতো না। নদী ও বিলে সারা বছর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। নৌকাই ছিল যাতায়াতের একমাত্র উপায়। বিলে সাত মাস কোন ফসল না থাকায় বিলগুলো ছিল গরুছাগলের চারণভূমি। ১৯৬০- এর দশকে আইয়ুব খানের শাসন আমলে অপরিকল্পিত বাধ দেওয়ার ফলে নদী খাল বিলের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ রুদ্ধ হয়। নদীর সাথে যুক্ত বিলগুলিতে সøুইস গেটের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ভাটার সময় নদীতে ছেড়ে দেওয়া হতো এবং বাকী সময় গেট বন্ধ রাখা হতো। নদীর পানি প্রয়োজন না থাকলে ছাড়া হতো না। এর ফলে নদীর পলি মাটি নদীতে জমতে থাকে। পরে নদীর তলদেশ বাঁধের ভেতরে বিলের জমির থেকে  উচুঁ হয়ে যায়। সে অবস্থায় বিলের বাড়তি পানি গেট দিয়ে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিলগুলো উঁচু নীচু, ফলে বিলের নীচের অংশের পানি সরিয়ে ধান চাষ করা অসম্ভব হয়। সেই অবস্থায় জমির মালিকরা জমিতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ শুরু করে। তাকে বলা হতো মিষ্টি পানির চিংড়ি ঘের। এ সময় ডুমুরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে শোভনা ইউনিয়নের জিয়ালতলা গ্রামের বালুইঝাঁকি বিলে ডুমুরিয়া থানা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি দেলোয়ার হোসেন খান (দিলু খাঁ) বিলের কিছু অংশে লবন পানির চিংড়ি ঘের করে। ফলে ঐ বিলের অন্যান্য চাষীর জমিতে লোনা পানি ঢুকে বড় আকারে ফসলের ক্ষতি করতে থাকে। এলাকাটিতে ছিল প্রধানতঃ নমসূদ্র সম্প্রদায়ের বসবাস। দিলু খাঁ থানা এবং ওয়াপদার কর্মচারীদের সাথে যোগসাজস করে বেআইনীভাবে ওয়াপদার বাঁধ কেটে নদীর লোনা পানি বিলে ঢুকিয়ে চিংড়ী চাষ করতে শুরু করে। বালুইঝাঁকি বিলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জমির মালিকরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু কোন রাজনৈতিক দল এর সাথে যুক্ত না হওয়ায় এ সময় এলাকার দুই যুবক মুকুন্দ জোয়ার্দার ও গৌর জোয়ার্দার আবদুল হাই এর মাধ্যমে কৃষক ফেডারেশনের সাথে যোগাযোগ করে। তার পর লোনা পানি, চিংড়ী ঘের ইত্যাদি স্থানীয় সমস্যা নিয়ে এলাকায় কৃষক ফেডারেশন কমিটি গঠন করে। আমি ডুমুরিয়া অঞ্চলে ১৯৮২ সালের প্রথম দিকে সফরের সময় সেখানকার অবস্থা এ রকমই ছিল। আমি তখন অন্য দুই এক জায়গাসহ জিয়ালতলা সফর করেছিলাম।

আরো খবর

Disconnect