ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান মাকর্সবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

আমি ঠিক করলাম ব্রাসেলস্ থেকে একদিনের জন্য অ্যামসটারডাম ঘুরে আসবো। এজন্য আমি ট্যুরিষ্ট বাসে এক দিনের সফরের জন্য অ্যামসটারডাম এর টিকেট কিনলাম। সেখানে যাওয়ার পথে বাস তিন জায়গায় থামলো। প্রথমে ভলেন্ডম নামে একটা জায়গায়। গ্রামই বলা চলে। সেখানে ছিল হল্যান্ডের বিখ্যাত পনিরের অন্যতম বড় কারখানা। দেখলাম সেখানে নানা ধরন, আকার প্রকারের পনির, ছোট বড় নানান সাইজের। দেখলাম বিশাল আকারের গোল একটা গোলাকার পনির। এছাড়া পনির দিয়ে বানানো নানা ধরনের পুতুল এবং অন্য ধরনের জিনিষ। দ্বিতীয় এক জায়গায় দাঁড়ালাম। সেটা ছিল ধাতু দিয়ে নানান ধরনের গয়না ও জিনিষপত্র তৈরীর কারখানা। কয়েকজন বাঙালী ছেলেকে দেখলাম সেখানে কাজ করতে। তৃতীয় জায়গা হলো, নেদারল্যান্ডের রাজধানী ডেন হেগে আন্তর্জাতিক আদালত ভবনের সামনে। একটা প্রাসাদের মত বিল্ডিং। পথে যেতে যেতে অনেক জায়গাতেই দেখলাম কৃষি কাজ করা লোকদের পায়ে কাঠের জুতো যার জন্য হল্যান্ড বিখ্যাত।
অ্যামসটারডামে আছে বিখ্যাত বিয়ার কোম্পানী হাইনেক্যানের কারখানা। বাসের থেকে কোন খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। যেখানে বাস দাঁড়ালো একটা রেস্তোরায় খেলাম। আমি জানতাম না যে, অ্যামসটারডামে শহরের মধ্যে একটা লম্বা খাল ছিল যার ওপর নৌকা করে ঘোরা যেতো। সেখানে যাতে আমরা ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে ঘুরতে পারি এজন্য বাস কিছুক্ষণ দাঁড়াবে বললো। কাজেই আমরা সেখান থেকে নৌকায় চড়ে অ্যামসটারডামের কিছু জায়গা দেখলাম। এক সময় খালের এক পাশে একটা বাড়ী দেখিয়ে গাইড আমাদেরকে বললো সেটা হচ্ছে অ্যানা ফ্রাঙ্কের বাসা যেখান থেকে তারা নাৎসীদের হাতে যুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায়ে ধরা পড়েছিল। অ্যানা ফ্রাঙ্কসহ প্রায় সকলকেই তারা খুন করেছিল গ্যাস চেম্বারে নিয়ে। শুধু তার বাবা কোন রকমে বেঁচে গিয়েছিলেন। তেরো চোদ্দ বছরের অ্যানা ফ্রাঙ্ক সেই বাড়ীতে লুকিয়ে থাকার সময় ডায়েরী লিখেছিলেন যা অ্যানা ফ্রাঙ্কের ডায়েরী হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত।
অ্যামসটারডামে এছাড়া আমরা গিয়েছিলাম সেখানকার বিখ্যাত আর্ট মিউজিয়ামে। সেখানে অনেক প্যেনটিং এর মধ্যে ছিল চিত্রকর র‌্যামব্রান্টের ছবি The Night Watch। সেটাই ছিল মিউজিয়ামের সব থেকে পরিচিত ও বিখ্যাত চিত্র। তার সামনে অনেকটা জায়গা চেন দিয়ে ঘেরা ছিল যাতে কেউ তার কাছে যেতে না পারে। এর আগে চিত্রটি আমি প্রথম দেখেছিলাম ১৯৬০ সালে ব্রাসেলস্ এ একটা আর্ট একজিবিশনে। ১৯৬০ সালে আমি আমার অক্সফোর্ডের বন্ধু ব্রায়ানের সাথে ইউরোপের কতকগুলি শহর ঘোরার সময় প্যারিসের লুভরসহ প্রত্যেক জায়গাতেই আমরা আর্ট গ্যালারীগুলি দেখেছিলাম। প্যারিসে চিত্রশিল্পী ডুরে এর স্কেচের একটা প্রদর্শনী দেখেছিলাম।
অ্যামসটারডাম ঘুরে আসার পর জীনাত ও ইকবাল আমাকে নিয়ে গেলেন ওয়াটারলু। ব্রাসেলস্ থেকে কাছেই, দশ পনেরো মাইলের মতো দূরে ওয়াটারলুতে ইংরেজদের সাথে সর্বশেষ যুদ্ধ হয়েছিল নেপোলিয়ানের এবং সে যুদ্ধে তিনি উইলসটন চার্চিলের দাদো ডিউক অব মার্লবরোর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ইংরেজরা নেপোলিয়ানকে বন্দী করে পাঠিয়েছিল সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। সেখানেই বন্দী অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ঠিক যে জায়গায় যুদ্ধটি হয়েছিল সেখানে একটি বিল্ডিং এর দোতলায় গোলাকৃত একটা বড় হলের চারদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে ইংরেজ ও নেপোলিয়ানের ফরাসী বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান চিত্রিত করা আছে। এমন সুন্দরভাবে এ কাজ করা হয়েছে যাতে উভয় পক্ষের অবস্থান ভালভাবেই বোঝা যায়, হলের যে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে। বিল্ডিংটির চারদিকে অনেক দূর পর্যন্ত জায়গা মাঠের মত ফাঁকা রাখা আছে যাতে বাইর থেকেও পুরো যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
ইউরোপের সব থেকে প্রাচীন দুই বিশ্ববিদ্যালয় হলো বেলজিয়ামের লুভেন ও জার্মানীর হাইডেলবার্গ। লুভেন ব্রাসেলস্ থেকে কাছেই। লুভেনে পিএইচডি করছিলেন এমন একজন বাঙালী ছাত্রের সাথে পরিচয় হয়। তিনি বলেছিলেন একবার যেন লুভেন যাই বেড়াতে। একদিন গেলাম সেখানে জীনাতদের সাথে। দেখেই বোঝা যায় খুব পুরোনো শহর। অনেক রাস্তাই পাথরের টুকরো দিয়ে তৈরী (Cobbled)। কাজেই খুব শক্ত, কিন্তু মসৃণ নয়। লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিংগুলোও খুব পুরোনো। শহরে অলিগলির সংখ্যা অনেক। হাইডেলবার্গও এ রকম দেখা যায়, যদিও তা একটা বড় শহর।
জীনাত ব্রাসেলস্ এ গিয়েছিলো ১৯৭৫ সালে। তার আগে জন্ম হয়েছিল তার মেয়ে নওরীনের। পরে সেখানে তার ছেলে নওশাদের জন্ম হয়েছিল। আমি ১৯৮৭ সালে যখন গিয়েছিলাম তখন নওরীন উঁচু ক্লাসে পড়তো। বাসে করে স্কুলে যেতো। নওশাদ পড়তো বাড়ীর কাছেই ছোটদের একটা স্কুলে। জীনাতের সাথে আমি দুদিন গিয়েছিলাম হাঁটা পথ ধরে তাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতে। নওশাদের বন্ধুরা ক্লাস থেকে বের হয়ে এলে আমি তাদের ছবি তুলেছিলাম। তারা সকলে খুব হৈচৈ করেছিল।
বাঙলাদেশের কিছু ছাত্রের সাথে ওখানকার কমিউনিস্ট পার্টির কয়েকজন কর্মীর পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল। তাদের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল, কিন্তু পার্টির কোন নেতার সাথে আমার দেখা হয় নি। সেটা পরে হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। জীনাত ও ইকবালের কিছু বন্ধুবান্ধবের বাসায় আমাকে দাওয়াত করায় তাঁদের বাসায় গিয়েছিলাম। জীনাতদের বাসার কাছে বনের কথা বলেছি। সে বনের মধ্যে একদিন বেড়াতে গেলাম ইকবালের সাথে। শহরের পাশেই একটা বনের মধ্যে ঘোরাঘুরি করে ভালই লেগেছিল। ব্রাসেলস্ এ কিছু দেখার জায়গাতেও গিয়েছিলাম। তার মধ্যে একটা ছিল আর্ট গ্যালারী। সেখানে নিয়ে গিয়েছিলাম নিয়াজকে। নিয়াজ কোন দিন সেখানে যায় নি। তার কথাও বিশেষ জানতো না।
দুতিন সপ্তাহ ব্রাসেলস্ এ থাকার পর ওসটেন্ড থেকে ফেরীতে ওঠার জন্য ব্রাসেলস্ থেকে ট্রেনে উঠলাম। জীনাত ও ইকবাল স্টেশন পর্যন্ত এসে আমাকে ট্রেনে চড়িয়ে দিলেন। ট্রেনে একটা ছোট কামরায় আমি বসলাম। আমি একাই ছিলাম। ট্রেন ছাড়ার একটু আগে একটি পচিশ ছাব্বিস বছরের মেয়ে কামরায় এসে বসলো। সেও লন্ডন যাবে। বললো তার বাড়ী অস্ট্রেলিয়ার একেবারে পশ্চিম দিকে পার্থ শহরে। তার দাদো তারও একপুরুষ আগে তাদের পরিবার ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল। সে এখন বেড়াতে বেরিয়ে ইউরোপের কয়েকটি জায়গা ঘুরে ইংল্যান্ডে যাচ্ছে পূর্ব পুরুষদের দেশ দেখার জন্য। তার সাথে গল্প করতে করতে ওসটেন্ড পৌঁছে গেলাম।
ওসটেন্ডে নেমে সে আমাকে বললো ফেরীতে যাবে না। সে যাবে হোভারক্রাফট এ। হোভারক্রাফট পানির ওপর দিয়ে না গিয়ে পানির কিছুটা ওপর দিয়ে যেতো, উড়াল দিয়ে কিন্তু পানি স্পর্শ না করে। আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে চলে গেলো হোভারক্রাফট এর টিকিট কিনতে। আমি গিয়ে ফেরীতে উঠলাম। ফেরীর সিঁড়িতে ওঠার সময় সামনে দেখলাম সেই মেয়েকে। আমি অবাক হলাম। পেছন থেকে তার বাজু ধরে একটা ঝাঁকানি দিতেই সে তাকালো। তাকে বললাম ব্যাপার কি? তুমি ফেরীতে? সে বললো সেদিন হোভারক্রাফট যাবে না। কাজেই দৌঁড়ে তাড়াতাড়ি টিকিট কিনে ফেরীতে উঠেছে।
আমি ওপরে উঠে জানালার ধারে একটা চেয়ারে বসলাম। দেখলাম টেবিলের অন্য পাশে একটি কুড়ি বাইশ বছরের মেয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে বই পড়ছে। আমি সমুদ্র দেখতে থাকলাম এবং ডেকে লোকজনের চলা ফেরা। কিছুক্ষণ পর সামনে শুয়ে থাকা মেয়েটি উঠে বসলো। তার হাতে একটা সিগারেট। আমাকে বললো, তোমার দেশালাইটা কি দিতে পারো? আমাকে সে সিগারেট খেতে দেখেছিল। আমি তাকে দেশালাই দিলাম। তখনকার দিনে তামাক খাওয়া নিয়ে এখনকার মত কড়াকড়ি ছিল না।
সিগারেট খেতে খেতে মেয়েটি কথাবার্তার সময় জানতে চাইলো আমি কোথাকার লোক, কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছি ইত্যাদি। সে বললো তার বাবা ইংরেজ, তবে মা ইতালিয়ান। লন্ডনেই থাকে। দেখলাম রাজনীতিতেও তার আগ্রহ আছে। বললো সে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির লোক, মেয়েটির চেহারার সাথে কবি শেলীর চেহারার মিল ছিল এ কথা তাকে বলায় সে খুশী হলো। বললো সে একজনকে ভালবাসে এবং শীঘ্রই তাদের বিয়ে হবে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার মেয়েটি ঘুরে ফিরে আমাদের কাছেই এসে বসেছিল। আর একটি লোকও এসে বসলো। তার বয়স হবে বছর ত্রিশের মত। কথায় কথায় সে বললো তার বাড়ী আয়ারল্যান্ড, তবে কাজ করে লন্ডনে। সে লেবার পার্টির লোক। অস্ট্রেলিয়ান মেয়েটি কোন রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ছিল বলে মনে হয় না। একেবারেই অরাজনৈতিক। পূর্ব পুরুষের দেশে যাচ্ছে এই চিন্তাই তার মাথায় ঘুরছিল।
কিছুক্ষণ পরে আমরা গেলাম কফি খেতে। লাঞ্চের সময় হয়েছিল। অন্যেরা কফির সাথে টুকটাক কিছু কিনলো। আমি শুধু কফি কিনলাম। জীনাত আমাকে স্যান্ডউইচ বানিয়ে দিয়েছিল আমি সেটা খেলাম কফির সাথে। পরে আমি এবং ইংরেজ মেয়েটি ও আয়ারল্যান্ডের লোকটি আগের জায়গায় গিয়ে বসলাম। অস্ট্রেলিয়ান মেয়েটি কিছুটা অস্থির ছিল। সে আগে ইংল্যান্ডে কখনো আসে নি।  তাদের পরিচিত দুই একজনকে খবর দিয়েছিল তার লন্ডন যাওয়ার কথা জানিয়ে। সে চিন্তায় ছিল, যদি তারা না আসে তাহলে সে কি করবে। এদিকে কিছুক্ষণ পরই ফেরী ডোভার পৌঁছাবে এ নিয়ে আবার সে বেশ উত্তেজিত ছিল। পরে সে ফেরীর একেবারে ওপরে উঠে সেখান থেকে ইংল্যান্ডের দৃশ্য দেখতে গিয়েছিল।
ইতিমধ্যে ইংরেজ মেয়েটি বললো, চলো ডিউটি ফ্রি শপ ঘুরে আসি। আমি বললাম আমার কিছু কেনার নেই। কিন্তু সে বললো, কেনার দরকার নেই। এমনি দেখবো। দোকানগুলোর মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে পারফিউম এর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ফরাসী পারফিউম দেখিয়ে সে আমাকে বললো, এটা তোমার স্ত্রীর জন্য নিয়ে যাও, ভাল জিনিস। দাম ভালই ছিল। সেটা কিনলাম। সে বললো, তোমার স্ত্রী খুশী হবে।
ডোভারে নেমে আমরা চারজন ট্রেনে একই কামরায় বসলাম। অস্ট্রেলিয়ান মেয়েটির উদ্বেগ ও উত্তেজনা বেশ বাড়তে থাকলো। এটা তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। অবশেষে ট্রেন ভিক্টোরিয়া স্টেশনে পৌঁছালো এবং আমরা নামলাম। আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকা অবস্থায় এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে অস্ট্রেলিয়ান মেয়েটি প্রায় চিৎকার করে উঠলো। তার লোক এসেছে তাকে রিসিভ করতে। সে আমাদের দিকে আর ফিরেও তাকালো না, বিদায় নিলো না। দৌঁড়ে সামনের দিকে চলে গেলো। ইংরেজ মেয়েটি তো লন্ডনেই থাকতো। সে আমার ও আয়ারল্যান্ডের লোকটির গালে একটা করে চুমু দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।

আরো খবর

Disconnect