ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান মাকর্সবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

পূর্ব বার্লিন থেকে ঘুরে আসার পর আমি  ফ্রাঙ্কফার্ট ফিরলাম। বিমানেই যাওয়া আসা করেছিলাম। ফ্রাঙ্কফার্টে না থেকে গেলাম অফেনবাখে। সেখান থেকেই কেউ এসেছিল আমাকে নিতে। জার্মানীতে যাওয়ার পর অনেকের সাথেই দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল, যাদের সাথে কোন পূর্ব পরিচয় ছিল না। জার্মানী ছেড়ে আসার সময় তাদের সংখ্যা কম ছিল না। অনেকের সাথেও এখনো পর্যন্ত যোগাযোগ আছে। বার্লিন থেকে ফেরার পর আমার নোতুন কোন প্রোগ্রাম ছিল না। কাজেই আমি কয়েকদিন পরই লন্ডন ফেরার তারিখ ঠিক করলাম। তার আগে অফেনবাখে থাকার সময়েই আমি একটা ভাল জাপানী ক্যামেরা কিনলাম।
আগেই ঠিক করেছিলাম, জার্মানী থেকে ব্রাসেলস হয়ে লন্ডন ফিরবো। সেই অনুযায়ী ফ্রাঙ্কফার্ট থেকে আমি ট্রেন ধরলাম। ব্রাসেলস যেতে হলে কলোনে ট্রেন পালটাতে হতো। কলোনে থাকতেন আসাদ চৌধুরী। আমার যাওয়ার কথা জেনে তিনি জানিয়ে দিলেন কলোন স্টেশনে তিনি আসবেন দেখা করতে। কলোনে ট্রেন দাঁড়াতে সেখানে নেমে পরলাম। অল্প কিছুক্ষণ পরই মনে হয় আধ ঘন্টার মধ্যেই ব্রাসেলস এর ট্রেন আসার কথা। প্ল্যাটফর্মে দেখা হলো আসাদ চৌধুরী সাথে। তাঁর সাথে ছিলেন আবদুল্লাহ ফারুক নামে একজন যার সাথে আমার পরিচয় ছিল না। তবে হাইডেলবার্গে তাঁর কথা শুনেছিলাম। তিনিও রেডিও ডয়েশ ভ্যালিতে কাজ করতেন। আসাদ চৌধুরী বললেন, চলুন প্ল্যাটফর্মের একটা স্টলে কফি খাওয়া যাক। আমরা তিনজন সেখানে কফি খেলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমরা কথাবার্তা বলছিলাম। ব্রাসেলস এর ট্রেন এলো নির্দিষ্ট সময়েই। তাঁদের থেকে বিদায় নিয়ে আমি ট্রেনে উঠলাম।
প্রথমবার ব্রাসেলস এ আমি দুতিন সপ্তাহ ছিলাম। এবার দিন দশেকের মত থেকে লন্ডন ফিরে যাওয়া স্থির করলাম। ইকবাল আতাহার সাহেব আমাকে বলেছিলেন ব্রাসেলস গেলে যেন অবশ্যই তাঁর কাছে যাই। সেখানে গেলাম জীনাতের সাথে। তিনি খুশী হলেন এবং অনেকক্ষণ তাঁর সাথে নানা কথা হলো। এছাড়া ছিলেন অধ্যাপক আর্নেষ্ট ম্যানডেল। তাঁর কাছেও একদিন গেলাম। তিনি আমাকে দুপুর পর্যন্ত থাকতে বললেন। কাজেই ইকবাল আমাকে রেখে চলে গেলেন। ম্যানডেল সাহেব বললেন, আমাকে পৌঁছে দেবেন। তাঁর সাথে অনেকক্ষণ কথা হলো। নিজের বই দিলেন। তিনি বললেন আগে আমাকে ভাল রেস্তোঁরায় খাওয়ানো হয় নি। এবার তিনি একটা ভাল রেস্তোঁরায় আমাকে নিয়ে যাবেন। সেখানে তিনি নিজে তাঁর গাড়ী ড্রাইভ করে আমাকে নিয়ে গেলেন। আমাকে কয়েক রকম জিনিষ খাওয়ালেন। তবে নিজে খেলেন কাঁচা শামুক। লাঞ্চের পর আমি তাঁকে বললাম, আমাকে ব্রাসেলস রেল স্টেশনের কাছে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দিতে। সেখান থেকেই বাস ধরেই আমি জিনাতদের বাসায় যেতাম। ব্রাসেলস এর রাস্তাঘাট তো আমার পরিচিত ছিল না।
একদিন গেলাম বেলজিয়ামের এক উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সাথে দেখা করতে। তাঁর নাম এখন মনে নেই। ইকবালের সাথে তাঁর ভাল যোগাযোগ ছিল। তাঁকে ইকবাল আমার কথা বলেছিলেন। তিনি মনে হয় বেলজিয়াম সরকারের কোন ধরনের অফিসার হিসেবে বিদেশীদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। কোন অসুবিধা হলে বা সমস্যা দেখা দিলে বিদেশীরা তাঁর কাছে যেতো। ভদ্রলোক দেখতে খুব সুপুরুষ ছিলেন। আমার সাথে দেখা হওয়ার পর ইকবাল একদিন তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে বাসায় ডিনারের দাওয়াৎ করলেন। তাঁরা দুজনেই এসেছিলেন।
কোন কাজ তো ছিল না। ব্রাসেলস যেতাম জীনাতদের সাথে দেথা করতে। কাজেই তাদের সাথে সময় কাটাতাম। আর মাঝে মাঝে তাদের কয়েকজন পারিবারিক বন্ধুর বাসায় দাওয়াৎ খেতাম। যার মধ্যে ছিলেন নবাব উদ্দীন সাহেব। তিনি ব্যবসা করতেন। সাগির নামে একজন ছিলেন। তিনি সরকারী চাকরী করতেন। থাকতেন শহরের এক প্রান্তে তাঁর নিজের বাড়ীতে। তাঁর বাড়ীর পাশেই যে জমি ছিল তাতে তিনি নিজেই নানা ধরনের ভাল ভাল সব্জী লাগাতেন। বেশীরভাগেই আমাদের দেশী শাকসব্জী। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বেলজিয়ান। তাঁদের দুই তিন ছেলে মেয়ে ছিল জীনাতের ছেলে মেয়ের বন্ধু। অন্য একজন ছিলেন সুজা তাঁর একটা বড় রেস্তোঁরা ছিল। তাঁর স্ত্রী আনার ছিলেন খুব সামাজিক ব্যক্তি। তাঁরা একদিন তাঁদের বাড়ীতে আমার জন্য একটা লাঞ্চ দিলেন যাতে আরো অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
ব্রাসেলস এ কয়েকদিন থেকে আমি ট্রেনে ওমটেন্ড গিয়ে ফেরীতে উঠে ডোভার গেলাম ও সেখান থেকে লন্ডন। পারফেট স্ট্রীটে তসদ্দুক ভাই এর ফ্ল্যাটের একটা চাবি আমার কাছেই ছিল। কাজেই কোন অসুবিধা হলো না। তসদ্দুক ভাইকে খবর দিলাম আমার লন্ডন ফেরার। পরদিন সকালে তাঁর সাথে দেখা হলো।
ইংল্যান্ডে যতদিন থাকবো ভেবে এসেছিলাম তার থেকে অনেক বেশী থাকা হয়ে গেল। ইউরোপে ব্রাসেলস যাওয়া ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ছিল না। সেটা তো আগেই গিয়েছিলাম নভেম্বর মাসের দিকে। পরে জার্মানী যাওয়ার প্রোগ্রাম হওয়ায় আরও কিছুদিন থাকতে হলো। আমার বিশেষ কোন কাজ আর সেখানে ছিল না। তবে আগেই ঠিক করেছিলাম যে, ফেরার আগে সেখানে লেখক শিবিরের একটা কমিটি করে আসবো। অন্য কারণে নয়, আমাদের পত্র পত্রিকা, বই, দলিলপত্র যাতে সেখানে লোকেদের কাছে পৌঁছানো যায় সেটাই মূল উদ্দেশ্য ছিল। যোগাযোগের একটা উপায় হিসেবেই এ চিন্তা করেছিলাম। কাজেই তার জন্য তসদ্দুক ভাই তো বটেই, এছাড়া সৈয়দ সামসুল হক, সেলিম সাহেব, ইকবালসহ কয়েকজনের সহায়তায় সে ব্যবস্থা হয়েছিল। আমার ফেরার তারিখ ঠিক করেছিলাম ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে।
অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদ তখন কোন কাজে লন্ডনে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী হামিদা ভাবীর সাথে একই প্লেনে যে আমি লন্ডন গিয়েছিলাম সেটা আগেই বলেছি। তাঁরা দুতিনবার পারফেট স্ট্রীটে এসেছিলেন। আমি অক্সফোর্ডে ছাত্র থাকার সময়েও সালাহউদ্দিন ভাই লন্ডনে ছিলেন। তখন হামিদা ভাবীও কিছুদিনের জন্য সেখানে এসেছিলেন। আমি সে সময় মাঝে মাঝে লন্ডন যেতাম ও তাঁদের সাথে দেখা হতো। আমরা একসাথে কখনো কখনো বাইরে ঘুরতাম। এবার সেভাবে তাঁদের সাথে বাইরে কোথাও যাওয়া হয় নি, শুধু একবার ছাড়া। একদিন আমরা গেলাম ডাক্তার আনোয়ারুল হাফিজের বাড়ীতে। তাঁর সাথে আমার পরিচয় ছিল ঢাকাতেই। তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্যও যেতাম। তাঁর প্রথম বিয়ে হয়েছিল কবি গোলাম মোস্তফার বড় মেয়ের মেয়ে মঞ্জুর সাথে। মঞ্জুর মায়ের সাথে সুরাইয়ার ভাল জানাশোনা ছিল এবং সুরাইয়া তাঁকে বলতেন জ্যোৎস্না আপা। তিনি আমাদের শান্তিনগরের বাসাতেও এসেছেন। যাই হোক, মঞ্জুর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর ডাক্তার হাফিজ বিয়ে করেছিলেন এক বিদেশী মহিলাকে। তাঁরা এসেছিলেন পোল্যান্ড থেকে। তাঁদের বাড়ী যাওয়ার পর একদিন ডাক্তার হাফিজ ও তাঁর স্ত্রী এসেছিলেন পারফেট স্ট্রীটে আমার সাথে দেখা করার জন্য। তখন সালাহউদ্দীন ভাই, হামিদা ভাবী এবং তসদ্দুক ভাই সেখানে ছিলেন। ডাক্তার হাফিজের দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি ঢাকাতেই চলে আসেন। মাঝে মাঝে লন্ডন যান তার ছেলে মেয়ের সাথে কিছুদিন করে থাকার জন্য। এখনো ঢাকায় তাঁর সাথে মাঝে মাঝে দেখা সাক্ষাৎ হয়।
মনসুর জিলানীর কথা এখানে একটু বলা দরকার। তিনি পারফেট স্ট্রীটে দুই তিন সপ্তাহ থাকার পর কাছাকাছি একটা জায়গায় একটা কামরা ভাড়া করে সেখানে উঠে গিয়েছিলেন। সে কামরার অবস্থা ভাল ছিল না। সামান্য কিছু পুরানো ফার্নিচার ছিল। তাঁর খাওয়া দাওয়াও মনে হয় ঠিকমত হতো না। কোন কাজ না থাকা সত্ত্বেও তিনি সেখানকার সামান্য খরচও কিভাবে চালাতেন জানি না। তাঁর এক পুরানো মেয়ে বন্ধু থাকতেন লন্ডনের বাইরে। সেখানেই তিনি মনে হয় কোন হাসপাতালে কাজ করতেন। জিলানী বলেছিলেন তিনি মাঝে মাঝে তাঁকে কিছু পাউন্ড পাঠান। মোটকথা, তাঁর অবস্থা বেশ শোচনীয় ছিল। তার ওপর তাঁর ছিল সিগারেট ও শরাবের নেশা। হার্টের গুরুতর অসুখের কারণে এ দুই-ই তাঁর জন্য নিষিদ্ধ ছিল, বিশেষতঃ সিগারেট। কিন্তু তিনি খুব সিগারেট খেতেন। সব কিছু মিলিয়ে জিলানীকে শেষ জীবনে এত দুঃখকষ্টের মধ্যে পড়তে দেখে আমার নিজেরও খুব কষ্ট হতো। পারফেট স্ট্রীটে থাকার সময় তাঁকে একদিন ঠাট্টা করে বলেছিলাম, আমি লন্ডনে থাকতে থাকতে আপনি মারা যাবেন না। আপনার বডি নিয়ে আমি কোন ঝামেলায় পড়তে চাই না। সেটাই হয়েছিল। আমি চলে এসেছিলাম ফেব্রুয়ারী মাসে। মার্চ মাসের ১৩/১৪ তারিখেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তিনি তাঁর মরদেহ হোয়াইট চ্যাপেল হাসপাতালে দেওয়ার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। তসদ্দুক ভাই সেই অনুযায়ী তাঁর দেহ সেখানে দিয়েছিলেন।
আমি লন্ডন থেকে আসার কয়েকদিন আগে ইংলন্ডে যাঁদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ এবং আলাপ আলোচনা হয়েছিল তাঁদের একটা সভার আয়োজন করলাম লেখক শিবিরের কমিটি গঠনের জন্য। পারফেট স্ট্রীটের কাছেই তসদ্দুক ভাই তার জন্য একটা জায়গা ঠিক করলেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে লেখক শিবিরের মধ্যে থাকতে না চাইলেও আমাকে সম্ভাব্য সব দিক দিয়েই সাহায্য করেছিলেন। নির্ধারিত দিনে, মনে হয় ফেব্রুয়ারীর একেবারে প্রথম দিকে, বিকেলে সভা হলো। চললো দুই-তিন ঘন্টা। অধিকাংশ লোকই এসেছিলেন লন্ডনের বাইর থেকে। তাঁদের সাথে লেখক শিবির ছাড়াও দেশের পরিস্থিতির ওপর আমি অনেক্ষণ আলোচনা করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত একটা কমিটি গঠন করা হলো। তাতে যাঁরা থাকলেন তাঁদের মধ্যে ‘জনমত’ এর সম্পাদক সৈয়দ সামসুল হক, ইকবাল ও সেলিম সাহেবের কথা মনে করতে পারছি। সভায় উপস্থিতরা লেখক শিবিরের জন্য দুই তিনশ পাউন্ড চাঁদাও দিলেন। ঐ দিনের সভার পর আমার আর কোন কাজ থাকলো না।
আমার ফেরার তারিখ ঠিক করলাম। ইকবাল বললেন, তিনি আমাকে হিথরো বিমান বন্দরে তার গাড়ীতে করে নিয়ে যাবেন। সেই অনুযায়ী তিনি গাড়ী নিয়ে সময়মত এলেন। আমাকে বিদায় দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন তসদ্দুক ভাই এবং অ্যাড্রিয়ান কুপার। মনসুর জিলানীও ছিলেন। তিনি বললেন, বিমান বন্দর পর্যন্ত যাবেন। আমরা তিনজন ইকবালের গাড়ীতে চড়ে রওয়ানা হলাম। বিমান বন্দরে গিয়ে দেখলাম আমাদের ভাগ্নীজামাই আশরাফ, যার কথা আগে বলেছি, সেখানে এসেছে আমার সাথে দেখা করার জন্য। ইকবাল আমার মালপত্র ঠিক ঠাক করে ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন। বোর্ডিং কার্ড নিয়ে ভেতরে ঢোকার আগে আমি তাঁদের থেকে বিদায় নিলাম। মনসুর জিলানীর সাথে সেই আমার শেষ দেখা।

আরো খবর

Disconnect