ফনেটিক ইউনিজয়
আমার জীবন
বদরুদ্দীন উমর

বদরুদ্দীন উমর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান মাকর্সবাদী তাত্ত্বিক, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ। খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দেন। তাঁর জীবনস্মৃতির বর্তমান অংশে উঠে এসেছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ

তিরানার বিমান বন্দর ছোটই বলতে হবে। আলবেনিয়ার নিজের কোন এয়ারলাইন্স ছিল না। বিদেশী বিমানই এই বিমানবন্দরে যাওয়া আসা করতো। তিরানায় আসতে হলে সাধারণত: যাত্রীদেরকে রোম অথবা প্যারিস হয়ে আসতে হতো। কোন বড় প্লেন নামার ব্যবস্থা তিরানা বিমান বন্দরে ছিল না। ছোট প্লেনেই তিরানা আসতে হতো। এর অন্য কারণ ছিল যাত্রীর সংখ্যাল্পতা। আমাদের প্লেনেও সব আসন ভর্তি ছিল না।
তিরানা বিমান বন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে আমরা বাইরে এলাম। আমাদেরকে নেওয়ার জন্য এসেছিলেন পিরো মিশো। তিনি ছিলেন আলবেনিয়া বিদেশী ভাষা প্রকাশনী সংস্থার একজন বড় কর্মকর্তা। আলবেনিয়ায় থাকার সময় তিনিই আমার ইন্টারপ্রেটার ছিলেন। সব জায়গায় আমাকে নিয়ে যেতেন এবং আমাকে সঙ্গ দিতেন। তিনি ইংরেজী ও ফরাসী জানতেন। যে গাড়ী আমার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল তার ড্রাইভারের নাম ছিল আকরাম। তিনি ইংরেজী জানতেন না। তাঁর সাথে কথাবার্তা পিরো মিশোর মাধ্যমে হতো। তবে তাঁর ইংরেজী না জানা বিষয়ে আমার সামান্য সন্দেহ ছিল। ইংরেজী জানা একজন বিদেশী অতিথির গাড়ীর ড্রাইভার হিসেবে ইংরেজী না জানা লোককে দেওয়া ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হয় নি।
বিমান বন্দর থেকে আমরা হোটেলে গেলাম। সেটি ছিল তিরানার প্রধান রাস্তার ওপর এবং তিরানার সব থেকে বড় হোটেল, যদিও পাঁচতারা হোটেলের মত কিছু না। মনে হয়েছিল অনেকটা ঢাকার ‘পূর্বাণী’ হোটেলের মত। সেখানে পৌঁছাবার পর আমাদেরকে প্রথমে আমাদের কামরায় জিনিষপত্রসহ পাঠানো হলো। লিফটে করে উঠতে হলো কয়েকতলা ওপরে। আমার এবং ওবায়েদের কামরা কাছাকাছিই ছিল। মুখ হাত ধুয়ে পরে আমরা নীচে এসে ডাইনিং হলে চা খেলাম। পরে লাউঞ্চে বসে কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর পিরো মিশো বিদায় নিবেন এবং বললেন পরদিন সকালে আসবেন। আমরাও একটু ক্লান্ত ছিলাম। সকাল সকাল ডিনার সেরে নিজেদের কামরায় গেলাম।
আমি কোন ডায়েরী কখনো লিখিনি। তবে আলবেনিয়ায় থাকার সময় আমি ডায়েরী লেখার মত করে মাঝে মাঝে লিখেছিলাম। তাতে কিছু জায়গার কথা একটু বিস্তারিতভাবে আছে। অন্য অনেক কিছু মনে থাকলেও ডায়েরীতে সে বিষয়ে কিছু না থাকায় বিস্তারিত ভাবে এখন কিছু লেখা সম্ভব নয়। তাই তারিখ ও সময় উল্লেখ না করে কিছু জায়গায় যাওয়া এবং কিছু লোকের সাথে দেখা সাক্ষাতের বিষয়ে বিক্ষিপ্তভাবে লেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। কাজেই এখানে আমি তাই করবো।
প্রথম দিনই আমি পিরো মিশোকে বলেছিলাম আমি দশ দিন আলবেনিয়ায় থাকবো। কিন্তু শুধু তিরানায় না থেকে আমি আলবেনিয়ার অন্য জায়গাতেও যেতে চাই। তিরানার সাহিত্য অ্যাসোসিয়েশনের লোক, প্রধান সংস্থার লোক ছাড়াও আমি ট্রেড ইউনিয়নের দুই একজন নেতার সাথেও দেখাসাক্ষাৎ করতে চাই। এছাড়া হাসপাতাল, স্কুল, কারখানা ইত্যাদিতেও যেতে চাই। পার্টির নেতৃস্থানীয় লোকদের সাথে দেখা করা তো অবশ্যই দরকার। সেই অনুযায়ী মিশো আমার প্রোগ্রাম তৈরী করেছিলেন।
১০ই জানুয়ারী তিরানা পৌঁছানোর পরদিন ১১ তারিখ কোথায় গিয়েছিলাম বা ঠিক কাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল মনে করতে পারছি না। তবে মনে হয়, ঐদিন ‘ডিপার্টম্যান্ট অব কালচারাল অ্যান্ড ফ্রেন্ডলি রিলেশন উইথ ফরেন কান্ট্রিস’ এ গিয়েছিলাম এবং সেখানে দেখা হয়েছিল সে ডিপার্টম্যান্টের প্রধান আগুর বেকাজ এর সাথে। ‘ডিরেক্টর অব এক্সপোর্ট ইমপোর্ট অব বুকস’ এর প্রধান রিজা পোদার সাথে দেখা হয়েছিল তাঁর অফিসে। পরে আমার ফেরার সময় তাঁরা আমাকে আলবেনিয়ায় প্রকাশিত বেশ কিছু বই দিয়েছিলেন যার মধ্যে ছিল এনভের হোজা ও ইসমাইল কেদারের বই এবং আলবেনিয়ার ইতিহাসসহ অন্য বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ বই। অন্য লেখকদের বই।
১২ই জানুয়ারী বিকেলে আমরা গেলাম তিরানা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ক্রুইয়া (কৎঁলধ) নামে একটা ছোট শহরে। চারটের দিকে রওয়ানা হয়ে এক ঘন্টার মধ্যেই আমরা সেখানে পৌঁছালাম। আমরা সেখানে পৌঁছানোর একটু পরই সন্ধ্যা হয়ে এলো। তবু অন্ধকার হওয়ার আগে আমরা যে প্রাকৃতিক দৃশ্য সারা পথে দেখতে দেখতে এবং ক্রুইয়া পৌঁছাতে দেখলাম তা খুবই সুন্দর।
পাহাড়ের গায়ে শহরটা। এক কালে পনেরো শতকে এখানে ইস্কান্দার বেগ এর একটা দুর্গ ছিল। অটোম্যানরা আলবেনিয়া দখল করে রাজাকে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে যুবরাজ ইস্কানদার বেগকে তুর্কির রাজধানীতে জিম্মি হিসেবে অনেক দিন আটক রেখেছিল। অটোম্যান দরবারে থাকার সময় তিনি একজন তুর্কী যুবরাজের মতই ছিলেন। কিন্তু আলবেনিয়া স্বাধীন করার জন্য তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। এজন্য তিনি পরে তুর্কী থেকে আলবেনিয়া পালিয়ে এসে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করেন। কিন্তু অনেক যুদ্ধে তুর্কীদেরকে পর্যুদস্ত করলেও আলবেনিয়াকে স্বাধীন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি আলবেনিয়ার স্বাধীনতার জন্য অটোম্যান তুর্কীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন তার জন্য তিনি আলবেনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় বীর হিসেবে সম্মানিত। কমিউনিস্টরা আলবেনিয়ায় ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও একজন জাতীয় বীর হিসেবে তাঁর স্মৃতি রক্ষার জন্য তিরানার কেন্দ্রস্থলে শহরের সব থেকে বড় পার্কের নাম রেখেছে ইস্কান্দার বেগ পার্ক। সেই পার্কে তাঁর একটা বড় প্রস্তর মূর্তি আছে।
ইস্কান্দার বেগের দূর্গ এখন আর নেই, কিন্তু দূর্গটি ঠিক যে জায়গাতে ছিল সেখানে একটা জাদুঘর তৈরী করা হয়েছে যাতে ইস্কান্দার বেগ এর সাথে সম্পর্কিত অনেক কিছু রাখা আছে। জাদুঘর দেখার পর আমি ওবায়েদ, পিরো মিশো আমাদের গাইড এবং ড্রাইভার আকরাম গেলাম আরও একটু ওপরে পাহাড়ের গায়ে এক রেস্তোরায় কফি খেতে। সেখানে তুর্কী স্টাইলে সাজানো একটা ঘরে আমরা তুর্কী কফি খেলাম। কিছুক্ষণ সেখানে বসে কথাবার্তা বলার পর আমরা নীচে নামলাম। কফি হাউজের যাওয়া আসার পথটা ছিল ঈড়ভভষবফ। নামতে অসুবিধা হচ্ছিল। ড্রাইভার আকরাম এজন্য আমাকে ধরে ধরে নামালেন। তাঁর ব্যবহার সব সময়েই ছিল মুগ্ধ হওয়ার মত। সেখানে থাকার সময়েই আমার হাতঘড়ির কাঁচ ও একটা কাঁটা কিভাবে কোথায় পড়ে গেল। আকরাম সেটা ঠিক করার চেষ্টা করবেন বলে আমার কাছ থেকে নিলেন কিন্তু সেটা তিনি ঠিক করতে পারেন নি। ওবায়েদ নিজে থেকেই কাজ চলার মত একটা ঘড়ি কিনে আমাকে দিলেন।
১৩ই জানুয়ারী সকালের দিকে Writes and Artist’s Association এর অফিসে তাদের এক সম্পাদকের সাথে কথা হলো। তার নাম ছিল নাসি লেরা। কথা প্রসঙ্গে আমাদের দেশের লোক সংখ্যা, স্বাক্ষরতা ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ হলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমাদের বই কত কপি এক এক সংস্করণে ছাপা হয়। তখন আমার এবং আমার মত লেখকদের বই ছাপা হতো ২ হাজার বা তার সামান্য বেশী। তিনি আশ্চর্য হলেন এই বলে যে, আমাদের দেশে ১১ কোটি লোক থাকা সত্ত্বেও আমাদের বইয়ের এক একটি সংস্করণ ছাপা হয় এত কম। তিনি বললেন তাঁদের লোক সংখ্যা ৩০ লাখ, কিন্তু কোন বই ১৫ হাজারের নীচে ছাপা হয় না। অন্যান্য বই বেশী ছাপা হয়। যেমন এনভের হোজা ও ইসমাইল কেদারের বই ছাপা হয় এক লাখের মত। আলবেনিয়ায় কেউ নিরক্ষর নেই।
আমাদের ভাষার লেখকদের বই অন্য ভাষায় কতখানি অনুবাদ হয়েছে সেটা তিনি জানতে চাইলেন। বিশেষ কিছুই তো সে দিক দিয়ে হয় নি, যদিও রবীন্দ্রনাথ এবং অন্যদের কিছু বই বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। সম্পাদক জানালেন যে রবীন্দ্রনাথ ও প্রেমচন্দের  দুই একটা করে বই আলবেনিয়ান ভাষায় অনুদিত হয়েছে। আমি বাঙলাদেশে নিরক্ষতার কথা বললাম। বই এত অল্প ছাপার কারণ সেটাই। বাঙলাদেশে সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। আমাদের সমাজব্যবস্থার অবস্থার কথা বললাম। এছাড়া সাহিত্য বিষয়ক অন্য কথাবার্তা হলো। ঘন্টা দেড়েক থাকার পর আমরা হোটেলে ফিরলাম। তখন প্রায় বারোটা বাজে। ওবায়েদ হোটেলেই ছিল। হোটেলের সামনেই তার সাথে দেখা হলো। পরে আমরা বিশ্ববিদ্যালায় এলাকা ও তার আশেপাশে কিছুক্ষণ ঘুরলাম।
বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পিরো মিশো হোটেলে এলেন। তাঁর সঙ্গে গেলাম এখানকার আর্ট গ্যালারীতে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের একটা প্রদর্শনী দেখতে। এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে আলবেনিয়ার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ৪৫ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী (১১ই জানুয়ারী) উপলক্ষ্যে। প্রদর্শনীতে অনেক ছবি ও ভাস্কর্য দেখলাম। কিছু কিছু ছবি ও ভাস্কর্য বেশ ভালো। তবে landscape কম। অধিকাংশই এখানকার জীবন সংগ্রাম ও মানুষের কাজকর্ম সম্পর্কিত। মোটের ওপর প্রদর্শনী ভালই লাগলো।
প্রদর্শনী থেকে গেলাম এনভের হোজা স্মৃতি জাদুঘরে। এগুলো সবই কাছাকাছি জায়গায়। অল্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের হোটেল থেকে হেটে যাওয়া যায়। যে বিল্ডিংটি এই স্মৃতি জাদুঘরের জন্য তৈরী হয়েছে সেটি বেশ বড়। আধুনিক কায়দায় ডিজাইন করা। এর চারজন আর্কিটেক্টের মধ্যে একজন হলেন এনভের হোজার মেয়ে, যিনি নিজে একজন আর্কিটেক্ট। আগের দিন ক্রুইয়াতে আমরা যে জাদুঘর দেখেছিলাম তার দুজন আর্কিটেক্টের মধ্যেও একজন হলেন এনভের হোজার মেয়ে।
বিল্ডিং এর ভেতরে decoration খুবই ব্যয়বহুল ও চমৎকার। এতে এনভের হোজার শৈশব কাল থেকে শুরু করে জীবনের সব পর্যায়ের ঐতিহাসিক দলিলপত্র, ছবি ইত্যাদি আছে। ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিষপত্র, এমনকি যে gum carriage এ তাঁর শবদেহ Martyrs Cemelrj পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেটি পর্যন্ত আছে। বিল্ডিংটি চার তলা। এর প্রত্যেকটি তলায় এনভের হোজার ওপর তোলা ভিডিও দেখনো হচ্ছে। ক্রমাগত চলছে। তবে লোক না থাকলে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। লোকের ভীড় তেমন বেশী ছিল না।
এই জাদুঘর দেখার পর পিরো চলে গেলেন। আমি এবং ওবায়েদ আরও ঘন্টাখানেক বুলভার দিয়ে হাটলাম। এটা বেশ চওড়া। ইস্কান্দার বেগ পার্ক ও তার কাছাকাছি জায়গায় ঘুরলাম। এসময় অসংখ্য লোক সারা রাস্তাগুলো জুড়ে হাঁটছে। কথা বলছে, হাসছে।  কাজেই রাস্তার মধ্যে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করলেও চাপা পড়া বা ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা নেই। কোন tension কোথাও নেই। রাস্তায় কোন প্রাইভেট গাড়ী নেই। প্রাইভেট গাড়ী নিষিদ্ধ। কিছু সরকারী অথবা কোন না কোন দূতাবাসের গাড়ী মাঝে মাঝে চলছে। এছাড়া বাস চলাচল করছে, তবে তেমন বেশী নয়। তবে এরা যেভাবে হাঁটছে এভাবে এতলোক একসাথে দল বাধার মত করে হাঁটতে কোথাও দেখি নি। অধিকাংশ অল্প বয়স্ক। কিন্তু যা লক্ষ্য করার মত তা হলো, ছেলে মেয়ে দুই থাকলেও ছেলেমেয়েরা কেউই হাত ধরাধরি করে হাঁটছে না। ছেলেরা ছেলের ও মেয়েরা মেয়ের হাত ধরে হাঁটছে। আলবেনিয়ায় ৪৫ বছর ধরে কমিউনিস্ট শাসন থাকলেও এক ধরনের ইসলামিক রক্ষণশীলতা একটা আবহের  মধ্যে ছিল, যদিও আলবেনিয়ায় ধর্ম নিষিদ্ধ ছিল। তিরানা মসজিদসহ সব মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মসজিদকে কেন্দ্র করে কিছু লোক চক্রান্ত করতো এজন্য নাকি তা করা হয়েছিল। মসজিদটি আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে ধর্মকর্ম পালন নিষিদ্ধ করা আমার কাছে সঠিক মনে হয় নি। তবে মসজিদে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ হলেও ধর্মকর্ম করা লোকেরা বাড়ীতে নামাজ পড়তো।
তিরানার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আগের দিন এবং এইদিন ইটালিয়ান টেলিভিশন জোর প্রচার করছিল যে, আলবেনিয়ার ছাত্র এবং অন্যেরা বিক্ষোভ করছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের জন্য। এই বিক্ষোভ নাকি হচ্ছে রাজধানী তিরানা এবং আলবেনিয়ার দ্বিতীয় শহর স্কোড্রায়। তিরানায় যে সে রকম কোন কিছুই নেই, সেটা তো আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। আগামীকাল তারা আমাকে স্কোড্রা নিয়ে যাবে। পিরো এবং অন্যেরা বললো সেখানে কিছুই নেই। এটা আমরা সেখানে গেলে স্বচক্ষেই দেখতে পাবো। সাম্রাজ্যবাদীদের সেই প্রচারণা যে কি ধরনের হতে পারে সেটা এখানে বসে দেখা যাচ্ছে তবে পূর্ব ইউরোপের অন্য দেশগুলিতে সেটা দেখার সুযোগ হয় নি, কারণ আমি তো তখন এই অঞ্চলে ছিলাম না। অন্য দেশগুলিতেও এই ধরনের প্রচারণা হয়েছে, যদিও তার মধ্যে কিছু সত্যতা ছিল। যে ধরনের অভ্যন্তরীণ গন্ডগোল ও বিক্ষোভ সে দেশগুলিতে হয়ে চলেছিল এবং সেখানে মার্কিন, জার্মান ইত্যাদি শক্তির উপস্থিতি যেভাবে ছিল, তার কিছুই আলবেনিয়ায় ছিল না। এখানে পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। আমার মনে হয়েছিল আলবেনিয়া সাম্রাজ্যবাদীদের কোন অপপ্রচার এবং অপকৌশল কার্যকর হবে না। কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল, কিন্তু আরও সময় নিয়ে, পরের বছর। এর কারণ নিয়ে আমি অন্যত্র আলোচনা করেছি। এভাবে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা প্রবলভাবে ঘেরাও হয়ে আলবেনিয়ার মত খুবই ছোট দেশের পক্ষে সমাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা অসম্ভব ছিল। তবে আলবেনিয়া যেভাবে সমাজতন্ত্র নির্মাণের চেষ্টা এতদিন করে এসেছে এবং তার জন্য যে সব পদক্ষেপ নিয়ে এসেছে সেটা পূর্ব ইউরোপের অন্য কোন সমাজতান্ত্রিক নামে পরিচিত দেশে হয় নি, হওয়া সম্ভবও ছিল না সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রভাবে তাদের দীর্ঘদিনের অনুগত ভ্রান্ত নীতি, লাইন ও কার্যকলাপের জন্য।

আরো খবর

Disconnect